Published : 19 Jul 2026, 09:39 PM
স্কটিশ ভ্লগার হিউ অ্যাব্রড বাংলাদেশে ঘুরতে আসেন গত ৩ জুলাই; ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে নেমে এর সামনে জটলা দেখে পড়লেন অস্বস্তিতে।
পাশেই থাকা এটিএম বুথে টাকা তুলতে গেলেন অ্যাব্রড। আশপাশের লোকজনের তাকিয়ে থাকা দেখে তিনি হাসতে হাসতে বললেন, “সত্যি বলতে কি এতগুলো লোকের সামনে এতগুলো টাকা তুলতে বেশ অস্বস্তিই লাগছে৷ বিমানবন্দরে আমি এই পরিবেশ চাই না আসলে। এই পরিবেশটা মোটেই আদর্শ নয়।”
সেখান থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে যেতে চাইলে একজন তার কাছে দুই হাজার টাকা ভাড়া হাঁকান। পরে অবশ্য উবারে করে গন্তব্যে রওনা হন।
ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে এ দৃশ্য নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরপর বিমানবন্দরে এপিবিএন (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন), এভসেক (এভিয়েশন সিকিউরিটি) এবং বিমানবাহিনীর মধ্যে এয়ারপোর্টে দায়িত্ব পালন নিয়ে একধরনের ‘অসন্তোষও’ তৈরি হয়।
দেশের সেই অস্থির সময় থেকেই বিভিন্ন স্থানের মতো বিশৃঙ্খলা শুরু হয় এ বিমানবন্দরে, যা এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ক্যানোপির ভেতরে আগমনী এবং বহির্গমন গেইটের সামনে প্রায় সারাক্ষণই মানুষের ভিড় লেগে থাকে।
সেই ভিড়ে আছেন সিএনজি চালক, ভাড়ায় চালিত প্রাইভেট কার চালক, র্যাপিং সার্ভিস দেওয়া লোকজন, এমনকি যাত্রীদের গাইড করা, ট্রলি ঠেলে দিয়ে কিছু পয়সা দাবি করা লোকজনও।
কী কারণে ক্যানোপিতে এসেছেন, এমন প্রশ্ন করলে যাত্রীদের গাইড করতে চাওয়া একজন উত্তর না দিয়ে ক্যানোপি থেকে বের হয়ে যান।
যাত্রীর সঙ্গে দুজনের বেশি স্বজন বিমানবন্দরে ঢুকতে পারবেন না, এই নির্দেশনা রয়েছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিষেধ করলেও অনেক যাত্রীই সেটি মানতে নারাজ। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের ক্যানোপিতে ঢুকতে দিতে হচ্ছে।
রোববার সকালে বিমানবন্দরে গিয়ে একই চিত্র দেখা গেল। সেখানে কথা হয় বিদেশ থেকে আসা কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে। তাদের প্রায় প্রত্যেকেই এই চিত্র হয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। কেউ-কেউ বলছেন, এমন দৃশ্য বিদেশের বিমানবন্দরে দেখাই যায় না।

দুবাই থেকে আসা রাইসুল ইসলাম যাবেন নওগাঁয়। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি দুবাইয়ের কোনো এয়ারপোর্টে এরকম অবস্থা দেখিনি। আমি শুধু ইমিগ্রেশন শেষ করে বের হলাম। অমনি আমার ব্যাগ ধরে টানাটানি শুরু করলেন কয়েকজন৷ বললাম সিএনজি লাগবে না, তাও শুনল না।”
সৌদি আরব থেকে আসা মনিরুজ্জামানও বলছিলেন একই কথা।
তিনি বলেন, “আমি জেদ্দায় থাকি৷ কোনো দিন জেদ্দা বিমানবন্দরে এরকম চিত্র দেখিনি। এখানে যে অবস্থা, অনায়াসেই পকেটমার হয়ে যেতে পারে। শৃঙ্খলার বালাই নেই।
“শুধু গেটের সামনে খানিকটা জায়গা ফাঁকা। সম্ভব হলে ওইটুকুও দখল করে নিত।”
ক্যানোপিতে অবস্থান নেওয়া কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের এক পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয় টার্মিনাল-২ এর আগমনী ক্যানোপিতে।
সেই পরিবারের আবদুল হক নামের একজনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা কোনো নির্দেশনার কথা জানি না। আমার ছেলে আসছে কাতার থেকে। তাই সপরিবারে আসছি। আমরা এখানেই থাকব; তাতে অসুবিধার কী হল?”
লক্ষ্মীপুরের আরেক দম্পতি এসেছেন ছোট ভাইকে বিদায় দিতে; সেই পরিবারের জামাল হোসেন নামের একজন বলেন, “আমরা সাতজন এসেছি। ভাই চলে যাব। মন তো চায় বিমানে উঠায়ে দিয়ে আসি। সেটা তো হচ্ছে না। ক্যানোপিতেই তো ঢুকলাম একটু, সবাই তো ঢোকে।”
২০২৫ সালের ২৭ জুলাই শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন সঙ্গী প্রবেশ করতে পারবেন—এমন নির্দেশনা জারি করে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
নির্দেশনায় বলা হয়, বিমানবন্দর এলাকায় আগত সবাইকে সুশৃঙ্খলভাবে চলাচল ও কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে হবে। ঈদ, ছুটি বা শিক্ষাবর্ষ শেষে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগমনে বিমানবন্দরে বাড়তি ভিড় হয়। এমন পরিস্থিতিতে যানজট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে এ পদক্ষেপ জরুরি।
ক্যানোপিতে বিশৃঙ্খলা রোধে ২০২৪ সালে বিমানবন্দরের দ্বিতীয় টার্মিনালের ডানপাশে পার্কিং এলাকার দোতলায় একটি যাত্রী বিশ্রামাগার চালু করা হয়েছিল।

সেই বিশ্রামাগার চালু থাকলেও অনেক যাত্রীই সেখানে অবস্থান না নিয়ে টার্মিনালের ক্যানোপিতে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকেন। তাতে করে টার্মিনাল এলাকায় বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান পরিচালনা বোর্ডের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইন্টারন্যাশনালি এইটা তো একদম অগ্রহণযোগ্য। পৃথিবীর কোথাও এরকম সমাবেশ হয় না। আমাদের এখানে একমাত্র হয়। সিভিল এভিয়েশনের পক্ষ থেকেও আগেও চেষ্টা করা হয়েছে এটা রোধ করার জন্য।
“আগেই নিয়ম করা হয়েছিল যে, একজন প্যাসেঞ্জারকে নামাতে ম্যাক্সিমাম দুজন আসতে পারবে না। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষজন তো নিয়ম মানেনই না। আইন ইমপ্লিমেন্টেশনের ব্যবস্থা নিতে হবে। তো সে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না তো।”
তিনি বলেন, “আমাদের এখানে একটা সহজাত প্রবৃত্তি হলো যে, একজন মানুষ যদি বিদেশে যায় বা আসে, তার সাথে অন্তত ১৫ জন, ২০ জন করে লোক আসা-যাওয়া করে ছেড়ে দিতে বা তাকে রিসিভ করতে।
“জাতীয় পর্যায়ে একটা প্রচার-প্রচারণা করে, এটা থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে কিন্তু এটা এটা খুবই মানে নুইসেন্স ক্রিয়েট করে, বিদেশিদের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। ওখানে ওই সাধারণ জনগণের মধ্যে অনেক দুষ্কৃতকারী ঢুকে যায়, তারা চুরি-চামারি করে, পকেটমার থেকে শুরু করে নানারকম দালালি ব্যবসায়ী করে।”
প্রচারের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

জানতে চাইলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগীব সামাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা দর্শনার্থীদের মেনে চলার জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছি। দুর্ভাগ্যবশত, তারা তা মানছেন না এবং পুরো পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের নিয়ে আসছেন। এপিবিএন (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন) ড্রাইভওয়ে এবং ক্যানোপিতে নজরদারি করে।
“অনেক দর্শনার্থী আমাদের নিষেধাজ্ঞা মেনে নিলেও, বেশির ভাগই তা মানেন না। প্রায়শই তাদের বারণ করা হলে তারা আমাদের দলের সাথে সহিংসভাবে জড়িয়ে পড়েন।”
তিনি বলেন, “অন্যদের অসুবিধা সৃষ্টি না করাটা সকলের জন্য একটি সচেতনতার বিষয়। আমাদের সম্মানিত প্রবাসী এবং তাদের পরিচিতজনদের আবেগ-অনুভূতির সাথে জড়িত থাকার কারণে এটি নির্দেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।”
বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমডোর মো. আসিফ ইকবাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা এই চিত্রটা দেখেছি। এখানে দায়িত্বরত ও যাত্রীরা কেউই ঠিকমতো কথা শুনছে না।
“গতকাল আমরা এটা নিয়ে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটা মিটিং করেছি, আমরা আজকেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে একটি অভিযান পরিচালনা করব।”