Published : 27 Apr 2026, 07:25 PM
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে হত্যার ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেছে আদালত।
ফ্লোরিডার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম টাম্পা বে টোয়েন্টিএইটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিমন ও বৃষ্টিকে হত্যার পর কীভাবে লিমনের লাশ পলিথিনের ট্র্যাশ ব্যাগে ভরে ফেলে আসা হয়েছে তার বিবরণ উঠে এসেছে আদালতের নথিতে।
এদিকে বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশি চলাকালে হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস স্থানীয় একটি জলাশয় থেকে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করেছে। তবে তা বৃষ্টির কি না, তা এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। পিনেলাস কাউন্টি মেডিকেল এক্সামিনার অফিস মরদেহটি শনাক্তের কাজ করছে।
এ জোড়া খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার লিমনের রুমমেট ২৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুগারবিয়েহর বিরুদ্ধে প্রথম ডিগ্রির পরিকল্পিত খুনের দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, তার বাসার ভেতরেই দুজনকে হত্যা করা হয়। পরে শুক্রবার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশ থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, "পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, জিজ্ঞাসাবাদ, সাক্ষ্য ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেখা যায়, হিশাম আবুগারবিয়েহ ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিকে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করেন।
“এরপর তিনি বিভিন্ন ক্লিনিং সরঞ্জাম দিয়ে ঘটনাস্থল পরিষ্কার করেন এবং আগে থেকে কিনে রাখা বড় কালো আবর্জনা ফেলার পলি ব্যাগে লিমনের মরদেহ ভরে ফেলেন। পরে মরদেহটি ব্রিজের উত্তর পাশে ফেলে আসা হয়।"
গোয়েন্দারা যখন কালো রঙের ওই ভারী আবর্জনা ফেলার ব্যাগ খুঁজে পান, তখন সেখান থেকে পচা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল।
We're waiting for confirmation on if the remains that washed up by 4th St & the Howard Frankland Bridge on Sunday are of missing USF doctoral student Nahida Bristy. Her boyfriend Zamil Limon's remains were found Friday on the bridge. Suspect is in custody.
📹: @BN9 pic.twitter.com/13kfDbE9QQ
— Angie Angers (@angie_angers) April 27, 2026
আদালতের নথিতে বলা হয়, আবুগারবিয়েহ নিহত দুজনের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ট্র্যাশ কম্প্যাক্টরে (আবর্জনা বা বর্জ্যকে সংকুচিত করে ফেলার বৈদ্যুতিক যন্ত্র) ফেলে দেন। সেখানে যে রক্তের নমুন পাওয়া গেছে, তাতে বৃষ্টি ও লিমন দুজনের উপস্থিতির বিষয়েই নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারীরা।
লোকেশন ট্র্যাক করে লিমন ও বৃষ্টির মোবাইল ফোনের কাছাকাছি এবং লিমনের মরদেহ ফেলে আসার স্থানে হিশামের ফোনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি ওই ফোনের মাধ্যমেই তিনি অনলাইনে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জাম কিনেছেন এবং লাশ গুম করার উপায় নিয়ে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
তদন্তকারীরা বলছেন, আবুগারবিয়েহর গাড়ির ড্রাইভ ডেটা এবং লিমনের ফোনের লোকেশন মিলে গেছে। নজরদারি ক্যামেরার ভিডিও ও সেলফোন রেকর্ডও লিমন ও বৃষ্টির শেষ অবস্থানের সঙ্গে আবুগারবিয়েহর যোগাযোগের ইংগিত দিচ্ছে।
কৌঁসুলিদের দাবি, আবুগারবিয়েহ পুলিশের কাছে মিথ্যা জবানবন্দি দিয়েছেন এবং আলামত ধ্বংসের চেষ্টা করেছেন।
মেডিকেল এক্সামিনারের রিপোর্টে বলা হয়েছে, লিমনের শরীরে অসংখ্য জখম ও ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার কবজি ও গোড়ালি ছিল বাঁধা। উদ্ধার করার সময় তার মরদেহে পচন শুরু হয়েছিল।
মেডিকেল এক্সামিনার তার পিঠের নিচের অংশে প্রায় দশ সেন্টিমিটার গভীর একটি ক্ষত শনাক্ত করেছেন, যা লিভার পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
তার মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘ধারালো অস্ত্রের বহুবিধ আঘাতের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তার মৃত্যুকে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করে হিশাম আবুগারবিয়েহর জন্য জামিনহীন আটকাদেশ চেয়েছেন কৌঁসুলিরা। তাদের যুক্তি, আবুগারবিয়েহর মুক্তি জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।
টাম্পা বে টোয়েন্টিএইটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচার চলাকালে আবুগারবিয়েহ কারাগারে থাকবেন কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বিচারক। দোষী সাব্যস্ত হলে তার মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।
এদিকে লিমন ও বৃষ্টির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা কর্তৃপক্ষ।
এক বিবৃতিতে ইউএসএফ বলেছে, "জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির অকাল প্রয়াণে আমরা মর্মাহত। আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি এবং তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক লিমন ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন, আর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন।
২৭ বছর বয়সী লিমন ও বৃষ্টি ছিলেন পরস্পরের বন্ধু। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে এসে তারা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
লিমনের ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ বাংলাদেশ থেকে ফ্লোরিডার একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, লিমন ও বৃষ্টির প্রেমের সম্পর্ক সাড়ে চার বছরের। তারা বিয়ে করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকেও দ্বিমত ছিল না। তবে উচ্চ শিক্ষা শেষ করেই তারা বিয়ের কাজটি সারতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই ঘটল মর্মান্তিক ঘটনা।
১৬ এপ্রিল সকাল থেকে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের ফোন বন্ধ পেয়ে এবং কোনোভাবে যোগাযোগ করতে না পেরে পরিবারের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিবার।
তদন্তে নেমে শুক্রবার লিমনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তারপর পুলিশ বৃষ্টির পরিবারকে ফোনে জানায়, তাকেও হত্যা করা হয়েছে। তবে এখনও বৃষ্টির লাশ পাওয়া যায়নি।
লিমনের লাশ উদ্ধারের পর তার রুমমেট ২৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুগারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আবুগারবিয়েহও এক সময় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ছাত্র ছিলেন।
হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস জানিয়েছে, তার অপরাধমূলক ইতিহাস রয়েছে, যার মধ্যে ২০২৩ সালের চুরি ও শারীরিক আঘাতের অভিযোগ রয়েছে। সেই বছরই তার এক আত্মীয় তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার দুটি মামলা করেছিলেন।
তবে কেন তিনি লিমন ও বৃষ্টিকে খুন করলেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি।

যেভাবে গ্রেপ্তার হিশাম আবুগারবিয়েহ
বৃষ্টি ও লিমনকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ১৬ এপ্রিল সকালে। আদালতের নথি অনুযায়ী, বৃষ্টির এক বন্ধু ইউএসএফ পুলিশকে জানান যে তিনি ১৭ এপ্রিল বৃষ্টির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তার ফোন বন্ধ ছিল। এরপর তাদের বন্ধু লিমনের ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়।
লিমনের দুই রুমমেটের একজন পুলিশকে জানান, ১৬ এপ্রিল দুপুর ১টায় যখন তিনি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের হন, লিমনের স্কুটারটি সেখানেই ছিল। লিমনের অন্য রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহ ঘটনার বিষয়ে কিছু জানার কথা অস্বীকার করেন।
তবে গোয়েন্দারা আবুগারবিয়েহর বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে ব্যান্ডেজ করা একটি ক্ষত দেখতে পান। পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে সেটা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তদন্তে দেখা যায়, আবুগারবিয়েহর সাদা হুন্দাই জেনেসিস গাড়িটি ১৬ এপ্রিল রাত ৭টা ৫৩ মিনিটে কোর্টনি ক্যাম্পবেল কজওয়েতে ছিল, যা লিমনের ফোনের লোকেশনে পাওয়া জায়গা থেকে মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বে। পরে আবুগারবিয়েহ দাবি করেন, লিমনের অনুরোধে তিনি তাদের সেখানে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন।
রক্তের দাগ ও আলামত নষ্টের চেষ্টা
লিমনের ঘরে বৃষ্টির এক জোড়া জুতো এবং কর্মস্থল থেকে বের হওয়ার সময় নেওয়া একটি ছাতাটি পাওয়া যায়। এক রুমমেট জানান, ১৬ এপ্রিল রাতে আবুগারবিয়েহকে তিনি লিমনের ঘর থেকে বেশ কিছু কার্ডবোর্ড বক্স ট্রলিতে করে আবর্জনা ফেলার ডাম্পস্টারের দিকে নিয়ে যেতে দেখেছেন।
২৩ এপ্রিল সেই ডাম্পস্টার তল্লাশি করে রক্তমাখা একটি কিচেন ম্যাট, রান্নার হাঁড়ি-পাতিল, লিমনের ওয়ালেট, পরিচয়পত্র, রক্তমাখা শার্ট ও শর্টস এবং বৃষ্টির আইফোন কেস পাওয়া যায়। ফরেনসিক পরীক্ষায় কিচেন ম্যাটে বৃষ্টির এবং শার্টে লিমনের রক্তের নমুনা পাওয়া যায়।
আবুগারবিয়েহর অ্যাপার্টমেন্ট তল্লাশি করে রান্নাঘর থেকে শোবার ঘর পর্যন্ত রক্তের ছোপ এবং ঘষটে নেওয়ার চিহ্ন পাওয়া যায়। তার বিছানার নিচে এবং আবর্জনা ফেলার ডাম্পস্টারে একই ধরনের ভারী কালো রঙের ট্র্যাশ ব্যাগ পাওয়া যায়।

চ্যাটজিপিটির কাছে খুনের উপায় অনুসন্ধান
তদন্তকারীরা আবুগারবিয়েহর ফোন থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ধার করেছেন। খুনের কয়েকদিন আগে ৭ এপ্রিল তিনি অ্যামাজন থেকে ডাক্ট টেপ এবং ১১ এপ্রিল ট্র্যাশ ব্যাগ ও জ্বালানি তেল অর্ডার করেন। ১৫ এপ্রিল তার কাছে একটি নকল দাড়ি পৌঁছায়।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হল, ১৩ এপ্রিল আবুগারবিয়েহ চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চেয়েছিলেন, “মানুষকে কালো প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে ডাম্পস্টারে ফেলে দিলে কী হয়?”
চ্যাটজিপিটি একে ‘বিপজ্জনক’ বললে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, “তারা জানবে কীভাবে?”
১৭ এপ্রিল রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে আবুগারবিয়েহর ফোনের লোকেশন হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের ওপর পাওয়া যায়। এছাড়া ১৯ এপ্রিল তিনি চ্যাটজিপিটির কাছে স্নাইপারের গুলি থেকে কেউ বাঁচে কি না বা বন্দুকের শব্দ প্রতিবেশীরা শুনতে পাবে কি না—এমন প্রশ্নও করেছিলেন।