Published : 29 Sep 2025, 11:32 PM
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের প্রতি তিনজনের মধ্যে দুইজনের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ে হয়েছে, এক গবেষণায় এমন তথ্য এসেছে।
এসব নারীর প্রায় ৬৫ শতাংশ ১৮ বছর হওয়ার আগেই প্রথম গর্ভধারণ করেছেন। প্রতি তিনজনে একজন নারী শ্রমিক জীবনে অন্তত একবার অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হয়েছেন।
বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের ওপর এক গবেষণায় এসব তথ্য পাওয়ার কথা বলেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি)
সোমবার মহাখালীতে আইসিডিডিআর,বিতে আয়োজিত ‘তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার’ বিষয়ক সেমিনারে গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণাটি করা হয়েছে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার সহায়তায়।
আইসিডিডিআর,বি বলছে, এটি তৈরি পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকদের ওপর এ ধরনের প্রথম কোনো গবেষণা।
সেমিনারে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকার কড়াইল, মিরপুর ও গাজীপুরের টঙ্গী বস্তিতে এই গবেষণা কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
এতে ১৫ থেকে ২৭ বছর বয়সী ৭৭৮ শ্রমিকের তথ্য নেওয়া হয়েছে। প্রতি ছয় মাস অন্তর জরিপের মাধ্যমে এই গবেষণাটি করা হয়।
সেমিনারে বলা হয়েছে, “গবেষণার শুরুতে ৪৯ শতাংশ নারী শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা ছিল। দুই বছর শেষে দেখা যায়, তা ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে। জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি বা ট্যাবলেট সম্পর্কে জ্ঞানও বেড়েছে।

“শুরুতে ১৫ শতাংশ নারী এ সম্পর্কে জানতেন, যা পরে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩৯ শতাংশে। একই সময়ে পরিবার পরিকল্পনায় লিঙ্গ সমতার অর্থাৎ, স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের মতামতের প্রাধান্য দেওয়ার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ৫৪ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ শতাংশে।”
গবেষণার বরাতে সেমিনারে জানানো হয়, পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকরা ঘর ও কর্মস্থল দুই জায়গায়ই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। গেল ১২ মাসে নারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে তাদের স্বামীর সহিংসতার হার ছিল অনেক বেশি। এ সময় যৌন সহিংসতা ছাড়া অন্য সব ধরণের সহিংসতা গত দুই বছরে আরও বেড়েছে। কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার হারও তাদের মধ্যে অনেক বেশি ছিল। গবেষণার শুরুতে প্রায় ৪৮ শতাংশ নারী গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন, যা দুই বছর পর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ শতাংশে।
তবে সহিংসতার শিকার নারীরা প্রায় কেউই আনুষ্ঠানিক সাহায্য চাইতে যান না। শুরুতে ৩৫ শতাংশ নারী পরিবার বা বন্ধুদের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু এই হার ক্রমশ কমে দুই বছর শেষে দাঁড়ায় মাত্র ২১ শতাংশে।
কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার ঘটনায়ও মাত্র প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে একজন নারী শুরুতে কর্তৃপক্ষকে সহিংসতার কথা জানিয়েছিলেন এবং দুই বছর পরে এসেও এই চিত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে গবেষণার বরাত দিয়ে জানিয়েছে আইসিডিডিআর,বি।
প্রধান গবেষক ড. রুচিরা তাবাসসুম নভেদ বলেন, “অর্থনৈতিক দিক থেকে তুলনামূলক এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের অবস্থা অন্য নারীদের চেয়েও খারাপ।
“পরিস্থিতি উন্নয়নের নিয়ামকগুলো নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা দরকার। এ জন্য সরকার, উন্নয়ন সংস্থা ও অংশীদারদের সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।”
তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের অন্যতম সংগঠন বিকেএমইএ এর যুগ্ম সম্পাদক ফারজানা শারমিন বলেন, সমাজ ব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক, তাই নারীদের জন্য 'ওয়ার্ক লাইফ ব্যালান্স' ধরে রাখা বেশ কঠিন। গর্ভধারণের মতো বিষয়েও তাদের মতামতের তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
“এই পরিস্থিতিতে কর্মীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে সরকার একটি সুদূরপ্রসারী ভূমিকা নিতে পারে। কর্মীদের কাছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলো সহজলভ্য করা এবং এই বিষয়ে তাদের জ্ঞান বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যদিকে, সরকারি ক্লিনিকগুলোর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট কার্যসময়ের কারণে কর্মরত নারীরা সেবা গ্রহণের সুযোগ পান না, এটিও বিবেচনা করা উচিত।”
সেমিনারে ‘পপুলেশন কাউন্সিল বাংলাদেশ’ এর সাবেক পরিচালক ড. উবাইদুর রব বলেন, “নারীদের কর্মক্ষেত্র এখন কেবল গার্মেন্টেই সীমাবদ্ধ নেই। তবে যেখানেই কাজ করুক না কেন অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ কমাতে হবে। এজন্য কর্মীদের জ্ঞান বৃদ্ধির বিকল্প নেই।”