Published : 11 Apr 2026, 12:04 AM
সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে হাই কোর্টের দেওয়া রায় ও তার কার্যকারিতা নিয়ে রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ আইনজীবীরা দুই ধরনের মত দিয়েছেন।
হাই কোর্টের রায়ে নির্দেশনা থাকায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কাজ চলমান থাকবে কি না সেই প্রশ্ন আসছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল মনে করেন, হাই কোর্ট বিভাগের এই রায়ের কার্যকারিতাটা এখন থেকেই আসছে না। আপিল বিভাগের চূড়ান্ত বিবেচনার পরে এই রায়ের কার্যকারিতা আসবে।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ আইনজীবীরা বলছেন, স্থগিতাদেশ না আসা পর্যন্ত রায়ের কার্যকারিতা থাকবে। সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কাজ চলমান থাকতে পারে।
একটি রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাই কোর্ট বেঞ্চের দেওয়া ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে মঙ্গলবার।
রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী বাতিল করে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের পূর্ণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
একইসঙ্গে রায়ের তারিখ থেকে তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই অধ্যাদেশ মেনে পৃথক সচিবালয়ও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
২০২৪ সালের সুপ্রিম কোর্টের সাতজন আইনজীবী এই রিট আবেদন করেন। রিটে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস বিধিমালা চ্যালেঞ্জ করা হয়।
একইসঙ্গে বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনাও চাওয়া হয় রিটে।

এই রায় নিয়ে আলোচনার মধ্যে বহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল করে জাতীয় সংসদ।
‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাস করার পর এই সচিবালয়ের চলমান কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে কিনা, এ প্রশ্নটি সামনে এসেছে। বিলটি যে পাস হবে তা নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা চলছিল। সে প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে অভিমত দিয়েছেন।
রিট মামলাটির রায়ে আপিলের বিষয়ে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আপিল করতে রাষ্ট্রপক্ষকে অনুমতি (লিড) নিতে হবে না।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত রয়েছে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে, বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান, ছুটি মঞ্জুরিসহ) শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে।
১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। পরবর্তীতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে তা প্রয়োগ করবেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলা হয়েছে। একইসঙ্গে বলা হয়, সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী ও ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের সিদ্ধান্ত অনুসারে, ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ যেভাবে ছিল সেভাবে সংবিধানে পুনর্বহাল হবে।
এই রায় প্রকাশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল পাস হওয়ার প্রেক্ষাপটে নির্বাহী বিভাগের সামনে আসা প্রশ্ন নিয়ে রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অন্য আইনজীবীরা দুই রকম অভিমত প্রকাশ করেছেন।
রায় প্রকাশের পর এটি চূড়ান্ত রায় নয় জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “রায়ে আমাদের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ, তার সাংবিধানিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িত। যদিও হাই কোর্ট ডিভিশন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠাসহ বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু হাই কোর্ট নিজেই কিন্তু এই রায়টি যে চূড়ান্ত, এটা মনে করেছেন বলে মনে হয়নি।
“কারণ আমাদের সংবিধানের ১০৩-এর ২-এর ‘ক’ অনুচ্ছেদ এবং দফায় বলা আছে, হাই কোর্ট যখন কোনো মামলা নিষ্পত্তি করেন এবং সেই নিষ্পত্তির পরেও যদি সাংবিধানিক কোনো প্রশ্ন জড়িত থাকে, সেক্ষেত্রে হাই কোর্ট এই মর্মে একটা সার্টিফিকেট দেন যে, মামলাটির সাথে এই সংবিধান ব্যাখ্যার বিষয়ে আইনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত রয়েছে।”

কাজল বলেন, এই রায়ের ১৮৪ পৃষ্ঠায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সার্টিফিকেট চাওয়া হয়েছিল, যে এই রায়টি আরও পর্যালোচনা করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যেন সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়।
তিনি বলেন, আদালত স্পষ্টত বলেছেন, “এই মর্মে প্রত্যয়ন করা হচ্ছে যে, মামলাটিতে সংবিধানের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন জড়িত রয়েছে।”
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “আমি হাই কোর্টের এই রায়ের যে অংশটুকু পড়লাম, হুবহু সেই অংশটুকু আমাদের সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদের ২ দফার ‘ক’ উপধারাতে উল্লেখ করা আছে।”
তিনি বলেন, যেহেতু সংবিধানের ব্যাখ্যার প্রয়োজন এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ। আমার মনে হয় এটা আপিল বিভাগেই চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়াটাই কাম্য এবং সমীচীন।
“রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারের অবস্থান হচ্ছে, যেহেতু সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত আইনের ব্যাখ্যা সম্পর্কিত, সুতরাং এটা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমরা আপিল দায়ের করব, যত দ্রুত সম্ভব। আমরা সার্টিফায়েড কপির জন্য দরখাস্ত দিয়েছি। সেটা নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব আমরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আমরা আপিল দায়ের করবো।”
আপিল চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত হাই কোর্টের এই রায়ের কার্যকারিতা থাকবে কি না, এমন প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “যেহেতু বিষয়টি আপিলের চূড়ান্ত বিবেচনায় নিষ্পত্তি হবে আপিল বিভাগে, আমার দৃষ্টিতে এবং আমাদের অভিমত হচ্ছে—এই রায়টি, অর্থাৎ হাই কোর্ট বিভাগের এই রায়ের কার্যকারিতাটা এখন থেকেই আসছে না। এটা চূড়ান্ত বিবেচনার পরে এই রায়ের কার্যকারিতা আসবে বলে আমি মনে করি।”
সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার এই বিষয়টিকে সুপ্রিম কোর্টের ‘নিজস্ব বিষয়’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, আপিল বিভাগ এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।
“পুরো বিষয়টি কিন্তু আমাদের সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ এখানে যে সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে, সেটা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, স্বতন্ত্র সচিবালয়। এবং রায়টি দিয়েছে কিন্তু হাই কোর্ট বিভাগ, সেটা সুপ্রিম কোর্টের অংশ। আমরা এখন যে মামলাটি বা আপিলটি আপিল বিভাগে শুনানি করবো, সেটাও কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট করবে। সুতরাং সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু তার নিজস্ব বিষয় বিবেচনা করবে এবং তার সিদ্ধান্ত দেবেন।”
কাজল বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা থাকবে যে ভবিষ্যতের এই মামলা যখন শুনানি হবে, আমরা খুবই প্রত্যাশা করবো যে কোনোভাবেই যেন এমন কোনো প্রশ্ন কখনো তৈরি না হয় যে, সুপ্রিম কোর্ট তার নিজস্ব ব্যাপারে ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে কেউ সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এটা আমাদের প্রত্যাশা থাকবে।
“আর ইতোমধ্যেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তারা আল্টিমেটলি এই রায়, সুপ্রিম কোর্টে চূড়ান্ত রায়ের জন্যে অপেক্ষমাণ থাকবেন বলে আমরা জানতে পেরেছি।”
এই রিট মামলার অ্যামিকাস কিউরি (আইনি সহায়তাকারী) জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে। অধস্তন আদালতের ওপর যদি সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে হয়, তাহলে স্বতন্ত্র সচিবালয়টাই সেই ব্যবস্থা।”
অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল পাসের আগে এ উদ্যোগে হতাশা ও শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
ওই বিল পাসের একদিন আগেই তিনি বলেন, “রায় রহিতকরণের ব্যাপার নিয়ে আমরা বেশ খানিকটা হতাশ। প্রথমত, এটা কিন্তু বিএনপিরও রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ছিল যে অধস্তন আদালতকে স্বাধীন করা হবে।
“যেহেতু আদালতের একটা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আছে এবং এর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের কোনো স্থগিতাদেশ নেই, তাই হাইকোর্টের রায় সবার জন্যই বাধ্যতামূলক।”
শরীফ ভূঁইয়া বলেন, “স্বতন্ত্র সচিবালয়টা যদি কার্যকর না থাকে, অথবা নির্দেশনার বিপরীতে গিয়ে নিম্ন আদালতের কর্তৃত্ব আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকে, তাহলে দুটো জিনিসই এই রায়ের সাথে সাংঘর্ষিক হবে এবং এতে আদালত অবমাননার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।”
অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে এই আইনজীবী বলেন, “আদালত আইন প্রণয়নের নির্দেশনা দেননি, বলেছেন স্বতন্ত্র সচিবালয় করতে। অধ্যাদেশটা চলে গেলে বর্তমানে কার্যকর সচিবালয়ের আইনি ভিত্তি সরে যাবে। এই শূন্যতা পূরণে নতুন আইন বা যেকোনো প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে হবে।”
তিনি বলেন, “বর্তমান সরকারের মেয়াদ দুই মাসও হয়নি। এর মধ্যে নির্বাহী, বিচার এবং আইন বিভাগের মধ্যে একটা টানাপড়েনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, যা আমাদের এড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।
“মাসদার হোসেন মামলার চেয়েও ১১৬ অনুচ্ছেদের এই মামলা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি আশা করি, আপিল বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়া যাবে, যাতে করে এই দ্বন্দ্ব তৈরি না হয়।”
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. শিশির মনির সংবাদমাধ্যমে বলেন, “এই রায়ে কোর্টের পক্ষ থেকে তিনটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের ওপর অধস্তন বিচার বিভাগের শৃঙ্খলা, বদলি, ছুটি ও পদোন্নতির বিষয়টি ন্যস্ত থাকবে।
“দ্বিতীয়ত, অধস্তন বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধি-২০১৭-কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। আর তৃতীয়ত, ৯০ দিনের মধ্যে বিচার বিভাগীয় পৃথক স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
গত বছর নভেম্বরে অধ্যাদেশ পাসের পর ডিসেম্বরে সচিবালয় উদ্বোধন হয়ে আংশিক কাজ শুরু হলেও সংসদে সেই অধ্যাদেশটি বাতিলের সমালোচনা করেন এই আইনজীবী।
তিনি বলেন, “আমি মনে করি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে আজ একটি কালো দিন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও একটি অঙ্গের স্বাধীনতাকে এভাবে কেড়ে নেওয়ার ঘটনা একটি বিরল নজির। আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সচিবালয়, বিল্ডিং বা জনশক্তির কী হবে?”
রাষ্ট্রপক্ষের ব্যাখ্যার বিরোধিতা
হাই কোর্টের রায় আপাতত কার্যকর হবে না বলে অ্যাটর্নি জেনারেল যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে দ্বিমত পোষণ করে শিশির মনির বলেন, “এটি (অ্যাটর্নি জেনারেল) সঠিক ব্যাখ্যা নয়। হাই কোর্টের একটি রায় এখনো পর্যন্ত বলবৎ আছে। এর ওপর সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক কোনো স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়নি, আপিল বিভাগ থেকে আদেশও নেওয়া হয়নি।
“যতক্ষণ পর্যন্ত এই নির্দেশনার ওপর কোনো স্থগিতাদেশ না থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটি মানতে সরকারসহ সকল কর্তৃপক্ষ বাধ্য। সুপ্রিম কোর্টে আপিল না করেই রায় কার্যকর হবে না বলে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তা সংবিধানের লঙ্ঘন এবং আদালত অবমাননার শামিল।”
হাই কোর্টের রায় বহাল থাকা অবস্থায় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে রায়টিকে অকার্যকর করার চেষ্টার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “একটি প্রতিষ্ঠিত সচিবালয়কে বিলুপ্তি করার মাধ্যমে যে ধরনের কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে, এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ভেঙে খান খান করে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ এবং পার্লামেন্টের মধ্যে একটি দৃশ্যমান সংঘাত তৈরি হচ্ছে।”
শিশির মনিরের মতে, “সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হল, একটি রায় এবং নির্দেশনা হাই কোর্ট দেওয়ার পর সেটিকে রক্ষা না করে পার্লামেন্টের টু-থার্ড মেজরিটির জোরে রায়ের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
“ক্ষমতার বলেই হোক আর টু-থার্ড মেজরিটির বলেই হোক, হাই কোর্ট ডিভিশনের রায়কে অকার্যকর করে দেওয়ার যে প্রবণতা, এটি পার্লামেন্ট এবং সরকারের জন্য একটি ভয়ংকর প্রবণতা।”
আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “যে রহিতকরণ বিল পাস হয়েছে, সেটি একটি পৃথক আইন। আমরা এই আইনের গেজেট সংগ্রহ করে এটিকে চ্যালেঞ্জ করব এবং অসাংবিধানিক ঘোষণার দাবিতে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করব।”
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের যে প্র্যাকটিস, সে প্র্যাকটিস এবং এটার ব্যাপার হাই কোর্টের জাজমেন্টও আছে। অ্যাপিলেট ডিভিশনের জাজমেন্ট আছে।
“কোনো মামলায় যদি হাই কোর্ট রায় দেয়, সে রায়ের বিরুদ্ধে আপনি আপিল করতে পারেন, আপিলে কিন্তু আপনাকে স্থগিতাদেশ নিতে হবে, না নিলে কিন্তু হাই কোর্টের রায়ের কার্যকারিতা থাকে।”
এই ব্যাপারে আপিল বিভাগের একটি নির্দেশনা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এরকম একটা বিষয় যে, স্থগিতাদেশ হয় নাই, কিন্তু সেখানে হাই কোর্টের রায় অনুসারে কর্মকাণ্ড চলছিল। সেইখানে কিন্তু তখন অ্যাপিলেট ডিভিশন বলে দিয়েছে, যে যদি স্থগিতাদেশ না থাকে তাহলে এখানে কোনো বাধা নাই যে এখানে তারা চলতে পারবে না রায় অনুসারে।”
মনজিল মোরসেদ বলেন, এই মামলায় অবশ্য যদিও সার্টিফিকেট দিয়েছে, ওই যে সংশোধনী, কি বলে... ষোড়শ সংশোধনী, সেই মামলায়ও কিন্তু সার্টিফিকেট দিয়েছিল এবং তারা স্থগিতাদেশ চেয়েছিল, কিন্তু পায় নাই। কাজেই বিষয়টা হলো ওইখানে যে স্থগিত হবে কি হবে না। এখানে সার্টিফিকেটের কারণে একটাই সুবিধা পাবে, সেটা হলো তাকে আপিলের অনুমতি নিতে হবে না। সে সরাসরি আপিল করতে পারবে। এইটুকু হল সার্টিফিকেটের সঙ্গে সম্পর্ক।
“কিন্তু সার্টিফিকেটের সঙ্গে মামলার স্থগিতাদেশ থাকবে, সেইটা হয় না।”
তার মতে, হাই কোর্ট যদি রায় আপিল পর্যন্ত স্থগিত রাখত তাহলে আবার সেটা হতো। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই মামলার যেটা রায়, এইটাই কার্যকরী যতক্ষণ পর্যন্ত আপিল না হবে, মানে স্থগিত না হবে।
আপিল খারিজ হয়ে গেলে সংসদের সঙ্গে বিচার বিভাগের কোনো ধরনের একটা অবমাননাকর বিষয় বা সাংঘর্ষিক বিষয় সৃষ্টি হয় কিনা, এ প্রশ্নে এই আইনজীবী বলেন, “না। ওরা (সংসদ) কিন্তু রায় বেরোনোর আগে করেছে (রহিতকরণ বিল পাস), তাই না? আর রায়টা কিন্তু পরের দিন বের হইছে। কাজেই এটা পার্লামেন্ট তো করতে পারে, তাদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আছে। সেখানে কেউ ডিক্টেট করতে পারে না, এটাও আমাদের সুপ্রিম কোর্টের জাজমেন্টে আছে।”
তিনি বলেন, “এখন কথা হলো যে, রায় হয়ে যাওয়ার পরে এই সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় যখন হবে একটা বিষয়ের ওপরে, সেই বিষয়ের ওপরে ওই নির্দেশনার বাইরে গিয়ে পার্লামেন্ট কোনো আইন পাস করতে পারবে না। কারণ হল, সেইটা কিন্তু আমরা ষোড়শ সংশোধনীর মামলায় রেফার করেছি। কারণ এইটা ইন্ডিয়াতে হয়েছিল এরকম একটা মামলা, যেখানে প্রথম হাই কোর্ট রায় দিল, তারপরে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিল।
“রায় দেওয়ার পরে তখন সরকার বাইপাস করে ওই অন্য আরেকটা বিল এনে ওই একই বিষয়ের ওপরে একটা আইন করল। তখন আবার ওই যারা রিট করছিলেন তারা ওইটা চ্যালেঞ্জ করলেন। আপনি সুপ্রিম কোর্ট তো এই রায় দিছিলেন, এই রায়ের পরিপন্থিভাবে আরেকটা আইন করেছে।”
মনজিল মোরসেদ বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট যখন, আপিল বিভাগ যখন একটা রায় করে বলে দেবে, সেইটার পরিপন্থি কোনো আইন করলেও সেইটা আদালতে টিকবে না। এবং নরমালি সেটা, পার্লামেন্ট সেটা করতে পারে না।”
কিন্তু এমনিতে যেকোনো আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ পুরো স্বাধীন, এ কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তারা যেকোনো আইন করতে পারে, ওই আইনটি আবার সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু বাতিল করতে পারে।
তাহলে সুপ্রিম কোর্টের যে সচিবালয়ের কাজ চলমান আছে, সেটা ওই আপিল নিষ্পত্তি, আপিল না করা পর্যন্ত, স্থগিতা না হওয়া পর্যন্ত চলমানই থাকবে কিনা, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, এখন প্রশ্ন হলো যে, সেটা চলমান থাকতে পারে। কারণ হল, হাই কোর্টের তো রায় আছে।”