Published : 11 Oct 2025, 01:17 AM
ভোটের মার্কা হিসেবে শাপলা প্রতীক কোনোভাবেই বরাদ্দ দেওয়া হবে না— সেই সিদ্ধান্ত আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে এএমএম নাসির উদ্দিনের নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
কমিশন বলছে, কোনো দলকে এ প্রতীক দেওয়া না দেওয়া নিয়ে তারা কোনো চাপের মধ্যেও নেই।
ইতোমধ্যে এ প্রতীক নিয়ে একটি দলের আবেদন ইসি একদফা নিষ্পত্তি করেছে। এর মধ্যে আবার নতুন করে এ প্রতীকের দাবি তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি বলছে, প্রতীক তালিকা সংশোধন করে হলেও যেন তাদের প্রতীকটি দেওয়া হয়।
সবশেষ বৃহস্পতিবার বিকালেও ইসিতে গিয়ে নিজেদের দাবির কথা শুনিয়ে আসেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ দলের তিন নেতা।
পরের দিন এসে নির্বাচন কমিশনও আবার আগের সিদ্ধান্তের কথাই স্মরণ করিয়ে দিল।
শাপলা প্রতীক নিয়ে এনসিপির দফায় দফায় আলোচনায় চাপ অনুভব করছেন কিনা, কিংবা ইসির সিদ্ধান্ত বদলের সম্ভাবনা আছে কিনা, নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকারের কাছে এমন প্রশ্ন ছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
জবাবে এই কমিশনার বলেন, “মোটেই না।”
ইসি কোনো চাপে নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা শাপলা প্রতীক (কোনো দলকে) বরাদ্দ দিব না। আইনগতভাবে, সাংবিধানিকভাবে এবং আরপিওর (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) প্রতীক বরাদ্দ বিধি—সব কিছু অনুযায়ী কমিশনের সিদ্ধান্ত হলো, আমরা শাপলা প্রতীক দিতে পারছি না।”
কোনো রাজনৈতিক দলকে শাপলা প্রতীক না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এ নিয়ে কয়েকবার সামনে আনল নির্বাচন কমিশন।
কমিশন এর আগেও জানিয়েছে, ভোটের মার্কা হিসেবে জাতীয় প্রতীক ‘শাপলাকে’ ব্যবহার না করার বিষয়ে তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া আছে।
দলীয় প্রতীক হিসেবে কেটলির পরিবর্তে শাপলা দাবি করেছিল নাগরিক ঐক্য। ইসি সেই আবেদনও নাকচ করে দিয়েছে।


বৃহস্পতিবার যা ঘটল
বৃহস্পতিবার এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে দলের তিন নেতা প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন।
এরপর সন্ধ্যায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “দুই ঘণ্টা আমরা ওনাদেরকে (সিইসি ও সচিব) প্রশ্ন করেছিলাম যে, প্রতীক যদি না দিতে চান, সেটাতে আপনার ব্যাখ্যা কী? দুই ঘণ্টা ওনারা নিশ্চুপ ছিলেন। আমরা ওনাদের বলে দিয়েছি, নিবন্ধন যদি আমাদেরকে দিতে হয়, সেটা শাপলা দিয়েই হবে। শাপলা ছাড়া এনসিপি নিবন্ধন হবে না এবং এনসিপিও শাপলা ছাড়া নিবন্ধন মানবে না।”
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, অথবা এ বিষয়ে যদি চ্যালেঞ্জ বা অবস্টেকল সৃষ্টি করে থাকে, এতে নির্বাচন কমিশন ‘কিছুটা দায়ী’ থাকবে বলে মন্তব্য করেন নাসীরুদ্দীন।
নির্বাচন কমিশন কারও চাপে থাকলেও সেটি এনসিপিকে জানানোর আহ্বান করেন নাসীরুদ্দীন।
সিইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে এনসিপির প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের সঙ্গে তার কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার রাত ৮টা পর্যন্ত আলাদা বৈঠক করেন। একই সময়ে সিইসির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ, নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ও নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বৈঠক করেন।
এনসিপি দলীয় প্রতীক হিসেবে বারবার শাপলা দাবি করে এলেও ইসি তাতে সায় দিচ্ছে না। ‘শাপলা’ প্রতীক ইসির নির্বাচন পরিচালনা বিধিতে না থাকায় সেটি বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না বলে ইসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ইসির তরফে এনসিপিকে প্রতীক বাছাইয়ের জন্য চিঠি দেওয়া হয় এবং ৭ অক্টোবরের মধ্যে তা জানানোর অনুরোধ করা হয়। ইসির অনুরোধ নাকচ করে ৭ অক্টোবর ফের ‘শাপলা’ প্রতীক তালিকায় যুক্ত করতে নির্বাচন পরিচালনা বিধি সংশোধনের দাবি জানায় দলটি।
নজর শুধু ভোটে, ‘চাপ এলেও আমলে নেবে না ইসি’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে আর দুই মাস পরে তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
রোজার আগে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোটের জন্য যখন প্রস্তুতি চলছে, তখন আসছে পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি আর গণভোটের প্রস্তাব।
ভোটের পথে ভোটার তালিকা, সীমানা নির্ধারণ, দল নিবন্ধন, পর্যবেক্ষণ সংস্থার নিবন্ধন, সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটের অ্যাপ চূড়ান্ত ও সংলাপের আয়োজনের মতো মূল অনুষঙ্গ যখন গুছিয়ে নিচ্ছে; তখন প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা করতে হচ্ছে সাংবিধানিক সংস্থাটিকে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, প্রশাসনে রদবদল আর সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির করার কাজও রয়েছে তাদের।
এনসিপির পছন্দের প্রতীক শাপলা নিয়ে ইসির সঙ্গে এতো ‘টানাপড়েন’ চললে ভোটের প্রস্তুতিতে চাপ পড়ার শঙ্কা জাগবে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
একদিকে এনসিপি বলছে, শাপলা ছাড়া নিবন্ধন নেবে না; আর নির্বাচন কমিশন বলছে, শাপলা কোনোভাবেই দলকে বরাদ্দ দেওয়া হবে না।
এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েও ইসি কোনো ধরনের চাপের মধ্যে নেই বলে মনে করছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
শুক্রবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এ কমিশনার বলেন, “এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের (চাপ) ফিলও করছে না ইসি। ভবিষ্যতেও যদি হয়, এটাকে আমলে নেবে না।
“ভোটের সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে। এখন আমাদের মেসেজ একটাই। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে এবং যেকোনো মূল্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হবে।”
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন, নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তারা চট্টগ্রামে রয়েছেন।
শনিবার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কর্মশালা এবং রোববার চট্টগ্রাম বিভাগের প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মত বিনিময় করার কথা রয়েছে তাদের।

দলগুলো নির্বাচনমুখী, ইসি স্বাধীন, মার্কা নিয়ে চাপ সৃষ্টি ‘অনভিপ্রেত’
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী জানান, শাপলা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলাসহ নানা ধরনের দাবি থাকলেও তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি ইসির নিয়ন্ত্রণে আসবে। যেসব বিষয় ইসির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, তা নিয়ে চাপেও কিছু নেই।
বিভিন্ন দলের দাবিদাওয়া ইসির জন্য চাপ হিসেবে দেখতে চান না তিনি।
ইসির সাবেক এ অতিক্তি সচিব বলেন, “এটা ইসির জন্য চাপ নয়। আসলে দলগুলো নির্বাচনমুখী। তবে নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা। স্বাভাবিকভাবে নির্বাচনের পরিবেশ তো ব্যহত হয়ই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেহেতু এখনও ওই পর্যায়ে যায়নি; আরও উন্নত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তো সরকারের বিষয়, এটাও কমিশনের সাবজেক্ট নয়। তফসিল ঘোষণার পর আসবে ইসির বিষয়।”
পিআর পদ্ধতি কিংবা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গণভোট নিয়েও ইসির চাপের কিছু নেই বলে মনে করেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলে, “যেহেতু পিআর সংবিধানে নেই, তা নিয়ে চাপ নেই। জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত এলে পরিকল্পনাটা নিতে হবে ইসির। তফসিল ঘোষণার পর ইসির নিয়ন্ত্রণ বাড়বে; তখন বোঝা যাবে পরিস্থিতির কতটুকু উন্নতি হলো।
প্রতীক নিয়ে ইসির সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত হিসেবে মেনে নেওয়ার কথা বলছেন অনেক পর্যবেক্ষকও।
নির্বাচন নিয়ে ইসির ধারাবাহিক সংলাপে গত ২৮ সেপ্টম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহিয়া আখতার নিজের মতামতে বলেছিলেন, “ইসি যে প্রতীক দেয়, সে প্রতীকেই ভোট করতে হবে।
“বিশেষ মার্কা না দিলে ভোটে রাজি না এমন দাবি- এটা ঠিক না। স্বাধীন ইসির নিজস্ব এখতিয়ার এটা। ইসিকে চাপ দেবেন না। মার্কা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির কোনো অধিকার নেই।”
এ বিষয়ে শুক্রবার এই শিক্ষাবিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করবে। কাকে মার্কা দেবে, কোন মার্কা দেবে, এটা ইসির এখতিয়ার। এখানে কোনো দল চাপ সৃষ্টি করলে তা অনভিপ্রেত এবং অনাকাঙ্খিত; সেটা উচিত নয়। ইসির অনেক মার্কা আছে, সেখান থেকে প্রতীক দিতে পারে; এটা ইসির নিজস্ব এখতিয়ার।”
ভোটে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরিতে ইসির জন্য নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, ইসির মূল নজর জাতীয় নির্বাচনের দিকে থাকতে হবে; তা না হলে তো স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে হতো।
“ইসির অনেক কাজে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, বিশেষ করে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার কারা হবে।”
তিনি বলেন, “পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করলে ভালো নির্বাচন সম্ভব। এখন আইনশৃঙ্খলা খুবই ভালো বলা যাচ্ছে না; ভোটের আগে নির্বিঘ্ন পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ, পরিবেশ ও আস্থা সৃষ্টি করতে হবে ইসিকে।”
শাপলা কেন নয় ব্যাখ্যা দিতে পারেনি ইসি: নাসীরুদ্দীন