০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

গবেষণা নিয়ে জামায়াতের বিবৃতি ‘বিভ্রান্তিমূলক’: টিআইবি

আরপিও ১৯৭২ এর নামমাত্র প্রতিপালনের মাধ্যমে নারীদের স্বতন্ত্র কমিটি গঠন করে একে দলের সর্বস্তরে নারীর অন্তর্ভুক্তি হিসেবে দাবি করাকেও ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলছে সংস্থাটি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 03 Nov 2026, 09:04 PM

Updated : 03 Nov 2026, 09:04 PM

সম্প্রতি ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গণমাধ্যমে যে বিবৃতি দিয়েছেন, তাকে ‘বিভ্রান্তিমূলক ও সত্যের অপলাপ’ বলে মনে করছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি।

একইসঙ্গে আরপিও ১৯৭২ এর নামমাত্র প্রতিপালনের মাধ্যমে নারীদের স্বতন্ত্র কমিটি গঠন করে একে দলের সর্বস্তরে নারীর অন্তর্ভুক্তি হিসেবে দাবি করাকেও ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলছে সংস্থাটি।

মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘বাস্তবতা অস্বীকার’ করে জামায়াতের পক্ষ থেকে এভাবে গবেষণা তথ্যকে ‘অসত্য’’ আখ্যায়িত করে বিবৃতি দেওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে টিআইবি। তবে জামায়াতে ইসলামী গবেষণা প্রতিবেদনটি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করায় টিআইবির পক্ষ থেকে তাদের সাধুবাদও জানানো হয়।

টিআইবির গবেষণার কথা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আরপিও, ১৯৭২ এর ধারা ৯০খ(১)(খ)(আ) অনুযায়ী প্রতিটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সব পর্যায়ের কমিটিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ সদস্যপদ নারীদের জন্য সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব বিশ্লেষণ করলে আইনের এই ধারা পরিপালনে ব্যাপক ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়।

এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটি বলতে কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নির্বাহী কমিটি বা কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ বা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদকে বোঝানো হয়েছে। সব দলের ক্ষেত্রে একই ধরনের কমিটির তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৩-২৫ সময়কালে ১৯ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই; যা আরপিওর সংশ্লিষ্ট বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যেখানে বলা হয়েছে, দলের প্রতিটি কমিটিতে নারী সদস্য থাকতে হবে।

এর বিপরীতে জামায়াতের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায় ১২২ নারী সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া দলটির রুকনদের (সদস্য) মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী।

গত সোমবার এক বিবৃতিতে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গত ১ নভেম্বর টিআইবি প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে দেওয়া এ তথ্যের প্রতিবাদ করে নিন্দা জানান।

টিআইবির ভাষ্য, এই গবেষণায় শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় কমিটি অর্থাৎ কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নির্বাহী পরিষদ বা কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো দলের জাতীয় বা কেন্দ্রীয় কাউন্সিল বা সম্মেলন বা মজলিসে শুরায় কতজন নারী আছে, সে বিষয়ে উল্লেখ করা হয়নি। আরপিও ১৯৭২ এ একটি দলে কতজন নারী সদস্য থাকবে, সে বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি বরং নারী কর্মীদের মধ্যে থেকে কমিটিগুলোতে কতজন নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত হবে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে সেক্রেটারি জেনারেলের এ ধরনের অপ্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্তের উল্লেখ সত্যের অপলাপ ছাড়া আর কিছু নয়।

টিআইবির মতে, বাংলাদেশের অন্য সব রাজনৈতিক দলের সব স্তরে একটি করে কমিটি থাকে, সেখানে বিভিন্ন হারে নারীদের অন্তর্ভুক্তি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রে শুধুমাত্র নারীদের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি স্তরে নারীদের জন্য স্বতন্ত্র কমিটি করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি স্তরে পুরুষদের জন্য একটি কমিটি এবং নারী কর্মীদের জন্য স্বতন্ত্র একটি কমিটি রয়েছে। একইভাবে নারী কর্মীদের স্বতন্ত্র মজলিসে শুরা বা কর্মপরিষদ রাখা হয়েছে।

যদিও নারীদের জন্য পৃথক কোনো কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ রাখা হয়নি এবং দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী কর্মী রাখা হয়নি। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বস্থানীয় কোনো পদে তথা আমিরে জামায়াত, নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ইত্যাদি পদে নারীদের অন্তর্ভুক্ত না করার চর্চা লক্ষ্য করা যায়। শুধুমাত্র নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার করতে নারীদের জন্য স্বতন্ত্র কমিটি করার মাধ্যমে দলীয় কার্যক্রমে নারীদের প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি বোঝায় না বরং এ ক্ষেত্রে নারীদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নারীদের এই স্বতন্ত্র কমিটিগুলোকে দলে নারীর অন্তর্ভুক্তি হিসেবে দাবি করা এক ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি।

টিআইবির ওই গবেষণায় বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো আসনে জামায়াত থেকে কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। জামায়াতের দাবি অনুযায়ী দলে ৪৩ শতাংশ নারী সদস্য থাকলেও তাদের মধ্যে থেকে একজন নারীও নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। যদিও এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী তাদের বিবৃতিতে কোনো মন্তব্য করেনি।

এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারা- ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে সমাজ গঠন এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মেনে না নেওয়া, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য সব নিয়মনীতি ও পন্থাকে প্রত্যাখ্যান করা, ইসলামী আকিদার পরিপন্থি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা, দলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে একমত পোষণ সাপেক্ষে অমুসলিম নাগরিকদের জন্য সহযোগী সদস্য বা সদস্যপদ দেওয়া, গঠনতন্ত্রে মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকদের জন্য ‘সদস্য বা সহযোগী সদস্য’ পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে পৃথক শর্ত আরোপ, নারীকর্মীদের জন্য পৃথক বিভাগ বা কমিটি ও পৃথক কার্যক্রম পরিচালনা করা ইত্যাদি বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের (সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ - ধর্ম নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা, ধর্ম, লিঙ্গ প্রভৃতিকারণেবৈষম্য) সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এ উদাহরণ দিয়ে টিআইবি দাবি করেছে, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি বিষয়ক টিআইবির গবেষণালব্ধ তথ্যকে ‘অসত্য’ বা ‘বিভ্রান্তিমূলক’ বলে দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। বরং টিআইবি মনে করে, এই বিবৃতির মাধ্যমে জামায়াত গবেষণা তথ্যকে অস্বীকার এবং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে দলের মধ্যকার প্রকৃত রাজনৈতিক চর্চাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে।

এ ক্ষেত্রে জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফলকে গুরত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে উত্থাপিত সুপারিশ অনুযায়ী নিজ নিজ দলের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।