পূর্বাচল ক্লাব নিয়ে হচ্ছেটা কী?
চব্বিশের পরিবর্তনের পর ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসা শওকত আজিজ রাসেল অ্যাডহক কমিটি গঠনের চিঠির আইনগত ‘বৈধতা’ ও ‘এখতিয়ার’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় পালাবদলের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ক্লাব ও সংগঠনগুলোতে যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছিল, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অভিজাতদের পূর্বাচল ক্লাবও তার বাইরে নয়।
সে সময় এক দফা নেতৃত্ব বদলের পর বিএনপি সরকারের আট মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক চিঠিকে কেন্দ্র করে ক্লাবটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ক্লাব পরিচালনা ও নির্বাচন আয়োজনের জন্য ১০ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই চিঠিতে। সেই নতুন কমিটি দায়িত্ব বুঝে নিয়ে আগামী ১৪ নভেম্বর বিশেষ সাধারণ সভা ডেকেছে।
কিন্তু চব্বিশের পরিবর্তনের পর ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসা শওকত আজিজ রাসেল ওই চিঠির আইনগত ‘বৈধতা’ ও ‘এখতিয়ার’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
গত ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের একান্ত সচিব মো. সাইফুল ইসলাম যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরকে (আরজেএসসি) ওই চিঠি পাঠান। সেখানে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ক্লাব পরিচালনা ও নির্বাচন আয়োজনে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠনের ব্যবস্থা নিতে 'নির্দেশক্রমে অনুরোধ’ করা হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে রাখা হয়েছে বিএনপির স্থানীয় সংসদ সদস্য (নারায়ণগঞ্জ-১ রূপগঞ্জ) মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়াকে। আর সদস্য সচিব করা হয়েছে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা, রূপগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম আবদুল্লাহ বিন শফিককে।
গাজীপুর-৫ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন এই কমিটির উপদেষ্টা। সদস্যদের মধ্যে আছেন কুমিল্লা-৯ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম এবং অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির তিন বারের সম্পাদক।
কমিটির বাকিরা হলেন- ক্লাবটির সদস্য আজিজুর মোহাম্মেদ রহমান, মো. হাসানুজ্জামান, আমির আহমেদ, নাজিম সরকার এবং গাজী কামরুল ইসলাম সজল।
ওই চিঠির বিষয়ে আরজেএসসির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলেও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তারা বলেছেন, চিঠিটি তাদের ‘নজরে আসেনি’।
আবার একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, এ ধরনের চিঠি সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আসে না।
আরজেএসসির নিবন্ধকের কাছে পাঠানো ওই চিঠির একটি অনুলিপি দেখার সুযোগ হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে আরজেএসসির নিবন্ধক আহমেদ উল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি তো ধরেন গত এক সপ্তাহে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি, আমার চোখে পড়েনি চিঠি। মানে আমার হাতে বা চোখে পড়েনি। আমার ডাক ফাইলে পাইনি।”
অতিরিক্ত নিবন্ধক মো. নূর-ই-আলমও একইরকম বক্তব্য দিয়েছেন। তার ভাষ্য, “ঠিক বলতে পারব না, দেখতে হবে। পিএমও থেকে আমাদের এখানে পাঠিয়েছে চিঠি? কি বলেছে?”
কোন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এ ধরনের চিঠি দিয়ে থাকতে পারে, তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ই বলতে পারবে বলে তার ভাষ্য।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য চিঠিতে সই করা প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের একান্ত সচিব মো. সাইফুল ইসলামকে একাধিক ফোন করা হলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিতে বলেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠালে তিনি আর উত্তর দেননি।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে কথা বলতে একাধিক দিন একাধিকবার ফোন করা হয়েছে, পাশাপাশি লিখিত বার্তাও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সাড়া মেলেনি।
এদিকে নতুন কমিটির দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট না করলেও আগামী ১৪ নভেম্বর ইজিএম ডাকার তথ্য দিয়েছেন সদস্য সচিব আবদুল্লাহ বিন শফিক এবং উপদেষ্টা ফজলুল হক মিলন।
কমিটি গঠনের প্রেক্ষাপট জানতে চাইলে মিলন বলেন, “ওই চিঠিতেই তো লেখা আছে, ওর বাইরে আর বলতে পারব না।”
চিঠিতে যা আছে
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে পরিবর্তান আসে।
ওই ঘটনাপ্রবাহে পূর্বাচল ক্লাবের নির্বাহী কমিটিতে সভাপতিসহ কয়েকটি পদ শূন্য হয়ে গেলে সে বছর অক্টোবরে ক্লাবের নতুন সভাপতি মনোনিত হন শওকত আজিজ রাসেল।
পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত এম এ হাসেমের ছেলে রাসেল আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান। তিনি ওই সময় বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন-বিটিএমএর সভাপতির পদেও ছিলেন।
২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ক্লাবের নির্বাহী কমিটির সভায় মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়াকে নির্বাহী সভাপতি এবং ফজলুল হক মিলনকে মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে কো-অপ্ট করা হয়। ১ মার্চ নতুন নেতৃত্বের অভিষেক হয়।
অর্থাৎ নতুন অ্যাডহক কমিটির আহ্বায়ক ও উপদেষ্টা দুজনই এর আগে ক্লাবের নির্বাহী নেতৃত্বে যুক্ত ছিলেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন অ্যাডহক কমিটি গঠনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ জেলাধীন রূপগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত পূর্বাচল ক্লাব “সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য জনাব মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া, নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) কে আহ্বায়ক ও রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব এস এম আব্দুল্লাহ বিন শফিককে সদস্য সচিব করে নিম্নবর্ণিত সদস্যদের নিয়ে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠনের পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল।”
তবে ওই আবেদন কে বা কারা করেছে, তা চিঠিতে বলা হয়নি; এমনকি কার নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল, তাও স্পষ্ট নয়।
আরজেএসসির নিবন্ধক আহমেদ উল্লাহ চিঠি না দেখার কথা বললে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল– “তাহলে কি এ নিয়ে কোনো আলোচনাও হয়নি?”
তিনি জবাবে বলেন, “আলোচনা কোনো… এটা নিয়ে আমি কিছুই জানি না।”
আরজেএসসির আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “আসলে না দেখে তো বলা যাবে না কি হইছে। কারণ আমাদের কিন্তু নরমালি এই ধরনের চিঠি পাঠায় না।
“এখন সরকারের কোনো ইন্টারভেনশন আছে কি না ও ক্লাবের বিষয়ে, এইটা তাহলে আমার জানা লাগবে।”
নিবন্ধকের দ্প্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের এখানে রেজিস্ট্রেশন হয় অ্যাজ এ লিমিটেড কোম্পানি, যদি লিমিটেড কোম্পানি হয়। লিমিটেড কোম্পানি হলেও হতে পারে, আবার সোসাইটি হলেও হতে পারে।
“সাধারণত ক্লাবগুলো, যেমন বড় বড় ক্লাব সবগুলোই হচ্ছে লিমিটেড কোম্পানি। যেটা হচ্ছে আপনার গ্যারান্টি দ্বারা সীমাবদ্ধ আরকি, গ্যারান্টি দিয়ে। একটু ডিফারেন্স আছে অন্য পাবলিক কোম্পানি থেকে, কিন্তু আমাদের এখানে রেজিস্ট্রেশন হয়।”
কী বলছেন রাসেল?
শওকত আজিজ রাসেলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলতে পারেনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তবে তিনি ক্লাবের সদস্যদের উদ্দেশে ফেইসবুকে একটি বিবৃতি দিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, “সম্প্রতি গণমাধ্যমে আমার নজরে এসেছে যে, ক্লাব কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রেরিত বলে উল্লিখিত একটি পত্র পেয়েছে, যেখানে ক্লাবের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠনের জন্য বলা হয়েছে।
“আমি বর্তমানে শহরের বাইরে অবস্থান করায় বিষয়টির আইনগত বৈধতা ও এখতিয়ার যাচাই করার জন্য নির্বাহী কমিটির যথাযথ আইনগত পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করছি। প্রাপ্ত পত্রের আইনগত অবস্থান পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের দায়িত্ব নির্বাহী কমিটির উপরই বর্তায়।”
তিনি দাবি করেন, “সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি, সদস্যপদ হস্তান্তর কিংবা সদস্যপদ বাতিলের বিষয়ে আমি সর্বোচ্চ সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি।
“আমি দায়িত্ব গ্রহণের সময় ক্লাবের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৯১৮ জন, যা আজ পর্যন্ত কার্যত অপরিবর্তিত রয়েছে। এ সময়ে কেবল হাতে গোনা কয়েকটি সদস্যপদ হস্তান্তর হয়ে থাকতে পারে।”
বর্তমানে ক্লাবের সদস্যপদ ফি ২৫ লাখ টাকা। তবে তার সময়ে ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আগ্রহী’ ব্যক্তি ক্লাবের সদস্য হতে বিভিন্ন মহল থেকে ‘নামমাত্র মূল্যে’ কিংবা ‘বিনামূল্যে’ সদস্যপদ দেওয়ার জন্য বারবার ‘অনুরোধ’ ও ‘চাপ’ প্রয়োগ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন রাসেল।
তবে তার ভাষ্য, নির্বাহী কমিটি সেসব অনুরোধ ‘গ্রহণ করেনি’।
“আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই যে, আমার সভাপতিত্বকালে একজন নতুন সদস্যকেও সদস্যপদ প্রদান করা হয়নি।”
তবে কে বা কারা তাকে ‘অনুরোধ’ ও ‘চাপ’ দিয়েছিল সেই বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা দেননি রাসেল।
তিনি বলেন, “স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার স্বার্থে আমি ক্লাবের বিদ্যমান সদস্যপদের হিসাব ও অবস্থান আপনাদের সামনে তুলে ধরছি, যা প্রয়োজনে আনুষ্ঠানিক নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে।
“ভবিষ্যতে এসব তথ্য যাচাই, সংরক্ষণ এবং সদস্যপদ সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব পরবর্তী কমিটির উপর বর্তাবে। প্রস্তাবিত অ্যাডহক কমিটির আইনগত বৈধতা নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষে তারা এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন।”
এ চিঠি ইস্যু হওয়ার একদিন আগে, ১৩ অক্টোবর পূর্বাচলে প্লট দুর্নীতির মামলায় পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত এম এ হাসেমের দুই ছেলে শওকত আজিজ রাসেল ও আশফাক আজিজ রুবেল; রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবালউদ্দিন চৌধুরীসহ আটজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেয় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত।
নির্বাচন কবে?
পত্রে যেহেতু ‘নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে’ অ্যাডহক কমিটি করার কথা বলা হয়েছে, তাই সদস্যদের এ নিয়ে প্রশ্ন রাখা হয়।
কমিটির সদস্য সচিব ইউএনও আবদুল্লাহ বিন শফিক বলেন, “আইনগতভাবে আমরা ১৪ তারিখেই ইজিএম কল করছি। ইজিএমের মাধ্যমে আমরা এটা (নির্বাচন) কল করব।”
কবে নাগাদ নির্বাচন হতে পারে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “অ্যাডহক কমিটি তো দেয়ই তো নির্বাচনের জন্য। ১৪ তারিখে আমরা সিদ্ধান্ত নেব কীভাবে কী করা যায় না করা যায়। কমিটি সদস্যদের মতামত নিয়ে এটা আলোচনা করব।”
চিঠির বাইরে কিছুই বলতে অপারগতা জানিয়ে বিএনপির আইনপ্রণেতা ফজলুল হক মিলন বলেন, “বসাই তো হয় নাই, এইজন্য তো মিটিং ডাকছে।”
এ বিষয়ে কথা বলতে কমিটির আহ্বায়ক মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া ও অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সাড়া মেলেনি।
