গৃহকর্মীর মৃত্যু: সাংবাদিক আশফাক ও তার স্ত্রী ডিবির হাতে

গৃহকর্মী প্রীতি উরাংয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ডেইলি স্টার কেন তাদের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হককে অব্যাহতি দিচ্ছে না, সেই প্রশ্ন উঠেছে ঢাকায় এক বিক্ষোভ সমাবেশে।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 Feb 2024, 06:13 PM
Updated : 15 Feb 2024, 06:13 PM

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ‘ভবন থেকে পড়ে’ কিশোরী গৃহকর্মী প্রীতি উরাংয়ের মৃত্যুর ঘটনায় চারদিনের রিমান্ডে থাকা ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হক ও তার স্ত্রী তানিয়া খন্দকারকে থানা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত বৃহস্পতিবার থানা থেকে ডিবির কাছে হস্তান্তরের পরপরই ওই দুইজনকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নেওয়া হয়।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি মাহফুজুল হক ভূঞা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকেমকে বলেন, “৩০৪ (ক) ধারায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ করা মামলাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলাটি এখন তারাই তদন্ত করবে।

“বিকালে মামলার সকল নথি এবং রিমান্ডে থাকা দুইজনকে আমরা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছি।”

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি আশফাকুল হক ও তার স্ত্রী তানিয়া খন্দকারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত। রিমান্ডের দুই দিনের মাথায় মামলা হস্তান্তর হল।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টার দিকে শাহজাহান রোডের জেনিভা ক্যাম্প সংলগ্ন একটি ভবনের নবম তলায় আশফাকুল হকের বাসা থেকে পড়ে মারা যায় প্রীতি উরাং নামের ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরী। ওই বাসাটি (ফ্ল্যাট) আশফাকের নিজের। প্রীতি প্রায় দুই বছর ধরে ওই বাসায় গৃহ সহায়ক হিসেবে ছিলেন।

প্রীতির মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মিত্তিঙ্গা গ্রামের লোকেশ উরাং পরদিন অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আশফাক ও তার স্ত্রীকে আদালতে পাঠায় পুলিশ।

গ্রেপ্তারের পর আদালতে পাঠিয়ে দুইজনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হলে আদালত তা নাকচ করে তিন দিনের মধ্যে কারা ফটকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়। একইসঙ্গে আসামিদের জামিনের আবেদনও নাকচ করে দেওয়া হয়।

থানা পুলিশ তাদের কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কোনো তথ্য না পাওয়ায় ‘নিবিড়ভাবে’ জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন জানিয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি আদালতের কাছে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে। আদালত তখন চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

এ দিকে ঘটনার পর থানা পুলিশ আশফাকুল হকের বাসার সিসি ক্যামেরা খুঁজতে গিয়ে দেখে ক্যামেরার মেমোরি কার্ড নেই।

চারদিনের রিমান্ড পাওয়ার পরপরই মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার এসআই নাজমুল হাসান বলেছিলেন, ওই কার্ড উদ্ধার করা গেলে তদন্তে অগ্রগতি হওয়ার সুযোগ আছে বলে তিনি মনে করছেন।

তবে দুই দিনের রিমান্ডে আশফাক দম্পতির কাছ থেকে মেমোরি কার্ড নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অতিরিক্ত উপ কমিশনার (মোহাম্মদপুর) মৃত্যূঞ্জয় দে সজল জানান।

এই কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আশফাকুল হকের বক্তব্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানতে পারেনি।

বিক্ষোভ সমাবেশে প্রশ্ন

গৃহকর্মী প্রীতি উরাংয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ডেইলি স্টার কেন তাদের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হককে অব্যাহতি দিচ্ছে না, সেই প্রশ্ন উঠেছে ঢাকায় এক বিক্ষোভ সমাবেশে। 

বৃহস্পতিবার বিকেলে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ’ ব্যানারে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে ডেইলি স্টার থেকে আশফাকুলকে অব্যাহতির দাবি জানানো হয়।

মানবাধিকার কর্মী, শিক্ষক, লেখক, প্রকাশক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সমাবেশে অংশ নেন।

সমাবেশ থেকে প্রীতির মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচারের দাবিও জানানো হয়।

যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম বলেন, “যখন একটি দায়িত্বশীল পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ওঠে, এখন পর্যন্ত তিনি সেই পদে থাকেন কী করে? এটা হচ্ছে আশ্চর্য হওয়া বিষয়। যার বিরুদ্ধে একটা হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নের অভিযোগ আছে, তাকে এখনও চাকরিতে বহাল রাখা হয়েছে।

“আমরা আজকের সমাবেশ দাবি করছি, দ্রুত তাকে তার পদ থেকে অপসারণ করতে হবে। একইসঙ্গে দ্রুত তদন্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আমরা সুবর্ণচরের ঘটনার মতো দৃষ্টান্ত দেখতে চাই। যাতে কোনো প্রভাবশালী মানুষ এধরনের হত্যাকাণ্ড করে রেহাই না পায়।”

আইনজীবী জীবনানন্দ জয়ন্ত বলেন, “গৃহ শ্রমিকের বিষয়টি এখনো আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। এখনো শ্রম আইনের আওতাভুক্ত নয়। যার কারণে একর পর এক গৃহ শ্রমিক হত্যা ও নির্যাতনের যে ঘটনা ঘটে, কিন্তু সেগুলো বিচার বা আলোর মুখ দেখে না।” 

শ্রাবণ প্রকাশনীর প্রকাশক রবীন আহসান বলেন, “ডেইলি স্টার আমাদেরকে প্রতিদিন নীতি বাক্য শেখান। অথচ একজন খুনের দায়ে অভিযুক্তকে স্বপদে বহাল রেখেছে। আমার অবিলম্বে তাকে বরাখাস্ত করার আহ্বান জানাই। একইসঙ্গে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচার দাবি করছি।”

ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি দীপক শীল বলেন, “এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা হত্যাকাণ্ড। এটা যদি হত্যাকাণ্ড না হত, তাহলে দুই লাখ টাকা দিয়ে আপস করার চেষ্টা করা হত না।

“এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য নাটক সাজানো হচ্ছে। প্রথমে উচিত ছিল শ্রম আইনে মামলা দায়ের করা। কিন্তু প্রশাসন পক্ষপাতদুষ্ট আাচরণ করেছে।”

বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম নেতা আকরাম হোসেন বলেন, “আজকে ডেইলি স্টারের ভবন থেকে বিড়াল পড়ে গিয়ে মারা গেলে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিত। অথচ আজকে প্রীতি উরাংয়ের ঘটনায় ওরা নীরব। কোনো বক্তব্য নাই। এটা আমাদের ক্ষয়।

“ডেইলি স্টারের উচিত ছিল তাকে সাসপেন্ড করা। কিন্তু তারা সেটি করেনি। কালকে আদালতে সা্ংবাদিকরা আশফাকের ছবি তুলতে গেলে ডেইলি স্টারের কর্মীরা ধস্তাধস্তি করেছে। আজকে একজন রাজনীতিবিদ হলে ডেইলি স্টার কী করত? আজকে ডেইলি স্টারের কাপড় খুলে গেছে তার কর্মী রক্ষা করতে গিয়ে। তারা সেটা বুঝতে পারছে না।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারহা তানজীম তিতিল, কবি ও লেখক শাহেদ কায়েস, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহম্মেদ, গৃহকর্মী সংগঠনের নেত্রী জাকিয়া সুলতানা, অ্যাক্টিভিস্ট জাকিয়া শিশির, কলাম লেখক ইলোরা দেওয়ান, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিন বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন।

এই পুরো ঘটনায় ডেইলি স্টারের অবস্থান নিয়ে বৃহস্পতিবার একটি বিবৃতি দিয়েছেন পত্রিকাটির সম্পাদক মাহফুজ আনাম।

সেখানে তিনি বলেছেন, “আমরা প্রীতির মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচারের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার আহ্বানের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানাই এবং সত্য উদঘাটন ও এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টায় পূর্ণ সমর্থন দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

আশফাকুল হককে দায়িত্বে রাখার বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এ বিষয়ে আমরা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছি। তবে, পাঠকদেরও সতর্ক করতে চাই যে, কিছু ক্ষেত্রে ঘটনাটি বিকৃত ও অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করা হচ্ছে।”