Published : 13 May 2026, 09:10 PM
বাংলাদেশের পাঠকদের, বিশেষ করে আশির ও নব্বইয়ের দশকের কিশোর-তরুণদের কৈশোর স্মৃতির ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হয়ে ওঠা সেবা প্রকাশনীর সব কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যায় প্রকাশনীর অন্যতম অংশীদার কাজী শাহনূর হোসেন স্বাক্ষরিত ‘সাময়িক কার্যক্রম স্থগিতের’ নোটিসটি সেবার ফেসবুক পেইজে পোস্ট করা হয়। নোটিসটি পোস্ট করেন সেবা প্রকাশনীর উদ্যোক্তা প্রয়াত লেখক কাজী আনোয়ার হোসেনের ছোট ছেলে কাজী মায়মুর হোসেনের স্ত্রী ও প্রকাশনীর উপদেষ্টা মাসুমা মায়মুর।
নোটিসে বলা হয়, “পাঠক, কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, সেবা প্রকাশনীতে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি সম্প্রতি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এমতাবস্থায় অডিট কার্যক্রম নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার স্বার্থে সেবা প্রকাশনীর সমস্ত কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে।”
কাজী আনোয়ার হোসেনের হাত ধরে ১৯৬৩ সালের মে মাসে যাত্রা শুরু হয়েছিল সেবা প্রকাশনীর। মাসুদ রানা, কুয়াশা, তিন গোয়েন্দা, এবং রোমাঞ্চকর অনুবাদ সিরিজগুলো দিয়ে দ্রুত সেবা প্রকাশনী সব ধরনের পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়।
বিশেষ করে পেপারব্যাক সাহিত্যের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ সৃষ্টির ব্যাপারে সেবা প্রকাশনী পালন করেছিল অগ্রণী ভূমিকা।
চার বছর আগে কাজী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর প্রকাশনীর হাল ধরেছিলেন তার পরিবারের সদস্যরা। দুই ছেলে কাজী শাহনূর হোসেন ও কাজী মায়মুর হোসেনই মূলত চালাচ্ছিলেন প্রকাশনী।
সেবা প্রকাশনীর অফিসিয়াল পেইজে দেওয়া হঠাৎ ঘোষণার বিষয়ে মাসুমা মায়মুর আরও একটি পোস্টে লেখেন, “আপনারা সবাই জানেন, আমি ২০২০ সাল থেকে সেবা প্রকাশনীর উপদেষ্টা পদে দায়িত্ব পালন করে আসছি। তবে শুরুর দিকে কিছুটা কাজ করতে পারলেও আমার শ্বশুর আব্বা (কাজী দা) মারা যাওয়ার পর বিভিন্ন বাস্তবতার কারণে আমি কার্যত এই দায়িত্বে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারিনি।
“সেবা প্রকাশনী নিয়ে আমি কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চাইলেও প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু ব্যক্তি আমাদের বড় ভাইয়া কাজী শাহনূর হোসেন সাহেবকে বিভ্রান্ত করে আমাকে সেই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত করেন। পরবর্তীতে আমি অভিমানে প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিই।

“কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেবা প্রকাশনীর কিছু ভুল সিদ্ধান্ত, আর্থিক অবস্থা ও বিক্রির পরিমাণ নিয়ে আমার সন্দেহ তৈরি হয়। গত দুই মাস ধরে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি অনুসন্ধান করতে শুরু করি। তদন্তের এক পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে এমন কিছু তথ্য ও প্রমাণ আমার হাতে আসে, যা থেকে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে গুরুতর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে আমরা একটি স্বতন্ত্র অডিট ফার্মের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ অডিট কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছি। অডিট সম্পন্ন হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্টভাবে সামনে আসবে।”
মাসুমা লিখেছেন, “আমার কাছে চুরির তথ্য আছে এটা জানার পরে আমি ব্যক্তিগতভাবে নানা ধরনের চাপ ও জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হই। একই সময়ে আমার স্বামী কাজী মায়মুর হোসেন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাকে লাইফ সাপোর্টে দিতে হবে এমন সিদ্ধান্তও হাসপাতাল থেকে নেওয়া হয়ে যায়। আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি সেই অবস্থা থেকে ফিরে আসেন এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন আছে বলে জানিয়েছেন ডাক্তার। তিনি এখনও হাসপাতালে ভর্তি।
“অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও আমি তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সেবা প্রকাশনীর অনিয়মের বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিই। আইনগত পদক্ষেপের শুরুতেই আমি অনিয়মের বিষয়ে অডিট ফার্মের সাহায্য নেব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সঠিক ও নিরপেক্ষ অডিট কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে আমি, উপদেষ্টা মাসুমা মায়মুর, সেবা প্রকাশনীর যাবতীয় কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করছি।”
তিনি লিখেছেন, “আমি জানি, বিষয়টি নিয়ে হয়তো নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ও গুজব ছড়ানোর চেষ্টা হতে পারে। সবাইকে অনুরোধ করব, যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য বিশ্বাস না করার জন্য। আমরা আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব এবং সেবা প্রকাশনীর ব্যবস্থাপনাকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করে দ্রুত পাঠকদের সামনে ফিরে আসব। ভবিষ্যতে সেবা প্রকাশনীকে ‘সেবা প্রকাশনী প্রাইভেট লিমিটেড’ হিসেবে আরও সুসংগঠিতভাবে পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।”
সেবার লেখকদের উদ্দেশ্যে মাসুমা লিখেছেন, “যেহেতু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাই এর দায় আমাদেরই। আপনাদের সকলের প্রাপ্য রয়্যালটি যথাযথভাবে পরিশোধ করা হবে।”
কিশোর ও তরুণ পাঠকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় এই প্রকাশনী আদৌ আবার ফিরতে পারবে কি না–তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে ঘোষণার পোস্টের নিচে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
এ নিয়ে অনেক পাঠক হতাশাও ব্যক্ত করেছেন। অনেকে আবার সেবা প্রকাশনীর জন্য শুভ কামনা জানিয়েছেন।
তবে সেবাকে ‘হারিয়ে যেতে দেবেন না’ অঙ্গীকার করে পাঠকদের উদ্দেশ্যে মাসুমা লিখেছেন, “সেবার পাঠকদের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি বেঁচে থাকতে সেবা প্রকাশনী হারিয়ে যাবে না। আমি হয়তো উপদেষ্টা পদে আর থাকছি না... হতে পারে কোম্পানির এমডি পদটাই হবে আমার। কাজ করতে পারব পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে।
“কোটি কোটি পাঠকের আবেগ আর কাজী আনোয়ার হোসেন সাহেবের লিগ্যাসি রক্ষায় আমার চেষ্টার বিন্দুমাত্র ঘাটতি থাকবে না বলে আমি আপনাদের প্রতিশ্রতি দিচ্ছি।”