২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সিটিটিসির সাবেক প্রধানসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিল ট্রাইব্যুনাল

পলাতক চার আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 20 Sep 2026, 08:13 PM

Updated : 20 Sep 2026, 08:13 PM

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সাবেক প্রধানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

রোববার বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক চার আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

মামলার আসামিরা হলেন—সিটিটিসির সাবেক প্রধান ও ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান, সিটিটিসির সাবেক এডিসি ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে জন, সিটিটিসির সাবেক পুলিশ পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান ওরফে হিরা, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক মো. মেজবাহ উদ্দিন আহাম্মেদ এবং সাবেক এসআই তৌহিদুল ইসলাম সুমন।

তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার থাকা সিটিটিসির সাবেক এডিসি ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে জনকে পরবর্তী শুনানির দিন ২২ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে হাজির করার আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

শুনানি শেষে সিটিটিসির তৎকালীন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “যারা তৎকালীন সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিতেন বা লেখালেখি করতেন, তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের ধরে এনে আদালতে সোপর্দ না করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বেআইনিভাবে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হতো।

“তাদের স্বীকারোক্তি প্রদানে বাধ্য করা হতো এবং তাদের শেখানো কথা ম্যাজিস্ট্রেটকে রেকর্ড করতে বাধ্য করা হতো।”

তিনি বলেন, “পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অস্ত্র মামলা দেওয়া হতো, যাতে তারা সমাজে অপাঙক্তেয়, হেয়প্রতিপন্ন ও সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত হয়। একজনকে অপহরণ, আটক, গুম ও হত্যার পাশাপাশি বাকিদের আটকে রেখে নির্যাতন এবং বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় চালান দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অনারেবল ট্রাইব্যুনাল এই মামলাটি আমলে নিয়েছেন।”

গত ১৬ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহারের অভিযোগ

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক মত, ভিন্নমতাবলম্বী, মানবাধিকারকর্মী ও সরকার সমালোচকদের দমনে বলপূর্বক গুম, অপহরণ, বেআইনি আটক, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

“এসব কর্মকাণ্ড ছিল দেশব্যাপী ব্যাপক, পদ্ধতিগত ও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিচালিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ।”

তৎকালীন সরকারের বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মত দমনের উদ্দেশ্যে র‌্যাব, ডিজিএফআই, ডিবি, এনএসআই ও সিটিটিসিসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে এসব অপরাধ সংঘটিত করা হয় বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।

২৮ জনকে হত্যার অভিযোগ

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে সন্ত্রাসবাদ দমনের উদ্দেশ্যে গঠিত পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসি পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সরকারের বিরোধী দল, ছাত্রসংগঠন ও ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে ব্যবহৃত হয়।

সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের আড়ালে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্রসংগঠনের সদস্য ও মুক্তচিন্তার মানুষদের বেআইনিভাবে আটক করে দিনের পর দিন গ্রেপ্তারের তথ্য গোপন রাখা হতো বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

আটকদের সিটিটিসির কম্পাউন্ডের ‘বিচ্ছিন্ন ও নির্জন কক্ষে আটকে রেখে দীর্ঘ সময় চোখ বেঁধে রাখা, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, ছাদে ঝুলিয়ে মারধর এবং বৈদ্যুতিক চেয়ারে ঘুরিয়ে’ জিজ্ঞাসাবাদের মতো নির্যাতনের বিবরণ দেওয়া হয়েছে অভিযোগে।

সেখানে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করে অনেককে ‘জঙ্গি’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিস্ফোরক ও অন্যান্য মামলায় ফাঁসানো হতো।

‘অপারেশন স্টর্ম-২৬ (কল্যাণপুর)’, ‘অপারেশন হিট স্ট্রং (নারায়ণগঞ্জ)’, রূপনগর অভিযান, টাঙ্গাইল অভিযান, পাতারটেক অভিযান এবং ‘অপারেশন ঈগল হান্টের’ মতো অভিযানে ২৮ জন ইসলামপন্থী ও ভিন্নমতাবলম্বীকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয় তুলে ধরে অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব ঘটনা ‘মানবতাবিরোধী’ অপরাধের অংশ।

৬ জনকে অপহরণ-নির্যাতনের অভিযোগ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা এবং এডিসি ইশতিয়াকের প্ররোচনা, নেতৃত্ব ও প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততায় ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে ছয়জনকে অপহরণ বা বলপূর্বক আটক করে সিটিটিসির কম্পাউন্ডের সপ্তম তলার ‘বন্দিশালায়’ বেআইনিভাবে আটকে রাখা হয়।

তারা হলেন—মো. ফখরুল ইসলাম ও তার ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম, মো. দ্বীন ইসলাম, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন, হাফেজ আব্দুল্লাহ আল মামুন ও মো. সুরুজ্জামান।

এর মধ্যে ফখরুল ইসলাম ও তার ছেলে সাইফুল ইসলামকে ১৮ জানুয়ারি গাজীপুরের জয়দেবপুরের হাতিয়াবো গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে, দ্বীন ইসলামকে ২৪ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের কান্দাপাড়া গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনকে একই দিন ধানমন্ডির স্কয়ার হাসপাতালের সামনে থেকে, আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ২২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জের দত্তপাড়া হেফজ মাদ্রাসা থেকে এবং সুরুজ্জামানকে ১৮ জানুয়ারি গাজীপুরের ভাওরাইদ থেকে আটক করা হয়।

তাদের সিটিটিসির সপ্তম তলার বন্দিশালায় রেখে নির্যাতনের পর ২৮ জানুয়ারি রমনা থানায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জোরপূর্বক জবানবন্দি আদায়ের জন্য আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রিমান্ড নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

মাদ্রাসা অধ্যক্ষকে হত্যা ও লাশ গুম

গাজীপুর মহানগরের চত্বর বাজার এলাকার মাদ্রাসা ইবনে মাসউদের অধ্যক্ষ আবুল হোসেন আল-আমিনকে অপহরণ, গুম, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি তাকে প্রতিষ্ঠান থেকে অপহরণ করে সিটিটিসি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ওই রাত থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাকে গুম রেখে নির্যাতন করা হয়। শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হলে ১৮ ফেব্রুয়ারি তাকে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে তিনি মারা যান।

হত্যার দায় এড়াতে তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামানের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে এবং তৎকালীন এডিসি ইশতিয়াকের নেতৃত্বে অন্য আসামিদের সহযোগিতায় লাশটি কেরাণীগঞ্জের লাকিরচর এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর ওপর তুলসীখালী ব্রিজ থেকে নদীতে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব অপরাধের সঙ্গে আসামিদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা, পরিকল্পনা, নির্দেশনা, প্ররোচনা, সমন্বয় ও পারস্পরিক সহযোগিতার ‘প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে’।

তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামান ও এডিসি ইশতিয়াক এসবের অনুমোদন ও সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

আসামিরা এসব অপরাধ প্রতিরোধ বা বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেননি এবং অধীনস্থদের বিরুদ্ধেও কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বলেও অভিযোগ আনা হয়েছে।