Published : 29 Sep 2025, 10:55 PM
গত বছরের জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সারাদেশে পুলিশ ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ড গুলি ছুড়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরেই ছোড়া হয় ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড গুলি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর পুলিশ সদর দপ্তরের ২১৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য তুলে ধরেন।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সোমবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জবানবন্দি দেন ৫৪তম সাক্ষী আলমগীর।
ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এ মামলায় শেখ হাসিনার সঙ্গে অপর দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন। সাবেক আইজিপি এ মামলায় রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
গত ১০ জুলাই তিন আসামির বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসেবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট পাঁচ অভিযোগে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
গেল ৩ অগাস্ট বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলার বিচার শুরু হয়। আর তা শুরু হয় সেই আদালতে, যে আদালত তার সরকার গঠন করেছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য।

শেষ সাক্ষী হিসেবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিতে গিয়ে বলেন, তদন্ত চলাকালে চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি এক স্মারকের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জুলাই আন্দোলন দমনে ছাত্র-জনতার ওপর ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলি সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি পেয়েছেন।
“প্রতিবেদনে দেখা যায়, এলএমজি, এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল, শটগান, রিভলবার ও পিস্তলসহ বিভিন্ন মারণাস্ত্র ব্যবহার করে শুধু ঢাকায় ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড গুলি ব্যবহার করা হয়েছে। সারাদেশে ব্যবহার করা হয়েছে ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ড গুলি।”
র্যাব সদর দপ্তর থেকে হেলিকপ্টার ব্যবহার সংক্রান্ত প্রতিবেদনও সংগ্রহ করা হয়েছে বলে তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেছেন।
জবানবন্দিতে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “জুলাই আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হত্যা, জখম, নির্যাতন ও নিপীড়নের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাদের গঠন করা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সংগ্রহ করে জব্দ করা হয়েছে। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে জখমী সাক্ষীদের চিকিৎসা সনদ নেওয়া হয়েছে।
“পাশাপাশি আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম থেকে ৮১ জন অজ্ঞাতনামা লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও সংগ্রহ করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “তদন্তকালে সংগৃহীত, জব্দকৃত আলামত পত্রপত্রিকায় ভিডিও ফুটেজ, অডিও ক্লিক, বই পুস্তক, বিশেষজ্ঞ রিপোর্ট, বিভিন্ন প্রতিবেদন, শহীদ পরিবারের সদস্য, জখমী, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের জবানবন্দি, তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করি।
“পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আইজিপি মামুন গত বছরের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে ব্যাপক মাত্রায় আন্দোলন দমনে শান্তিপূর্ণ ছাত্র-জনতার ওপরে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন।
“প্ররোচনা, সম্পৃক্ততা, উসকানি ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেড় সহস্রাধিক মানুষকে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, হাজার হাজার ছাত্র-জনতাকে জখম, অঙ্গহানি, বেআইনি আটক, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, অপহরণ, জীবিত ও মৃতকে একত্র করে পুড়িয়ে দেওয়া, চিকিৎসা, জানাজা, দাফন ও শেষকৃত্যে বাধা এবং মৃত্যুর কারণ পরিবর্তনে সংশ্লিষ্টদের বাধ্য করা হয়েছে।”
আলমগীর বলেন, “আসামিরা নিহতদের মৃতদেহ পরিবার কর্তৃক শনাক্তের সুযোগ না দিয়ে বেওয়ারিশ আখ্যা দিয়ে তড়িঘড়ি করে লাশ দাফনে বাধ্য করা, আন্দোলনকারী ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন।”
এদিন তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দি শেষ না হওয়ায় মঙ্গলবার অবশিষ্ট জবানবন্দি এবং জেরার দিন ধার্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ।
তিনি বলেনন, “মো. আলমগীরই এ মামলার সর্বশেষ সাক্ষী।”
তার আগে ২৪ সেপ্টেম্বর এ মামলায় সাক্ষ্য দেন বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। পরে তাকে জেরা করেন শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।