বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক চাকরিটাকে ‘ঐচ্ছিক’ মনে করেন: রাষ্ট্রপতি

“গবেষণার বিষয়ে গণমাধ্যমে যেসব খবর প্রচারিত হয়, তা দেখলে বা শুনলে অনেক সময় আচার্য হিসাবে আমাকেও লজ্জায় পড়তে হয়।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 19 Nov 2022, 11:22 AM
Updated : 19 Nov 2022, 11:22 AM

বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই মূল চাকরির দিকে মনোযোগী নয় অনুযোগ করে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আক্ষেপের সুরে বলেছেন, তারা এ দায়িত্বকে ঐচ্ছিক হিসেবে নেন।

এছাড়া কিছু উপচার্য ও শিক্ষকদের কর্মকাণ্ডে অন্যদের মর্যাদার জায়গাটা সংকুচিত হয়ে আসছে বলেও মনে করেন তিনি।

শনিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩তম সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে শিক্ষকদের মূল্যায়নে এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সবাই কৃতি ও সেরা ছাত্র। তারা যেকোনো ক্ষেত্রে সাফল্য নিয়ে আসতে পারে। তাই শিক্ষক হিসাবে পেশার প্রতি দায়িত্বশীল থাকবেন এটাই সবার প্রত্যাশা।

“অনেক শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটাকে ঐচ্ছিক দায়িত্ব মনে করেন। বৈকালিক কোর্স বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়াকেই তারা অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। ছাত্র-শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের সাথে এটি খুবই বেমানান।”

শিক্ষকদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, আপনারা সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে নেতৃস্থানীয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু ইদানিং কিছু কিছু উপাচার্য ও শিক্ষকদের কর্মকাণ্ডে শিক্ষকদের সম্মানের জায়গাটা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।

“আপনাদের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা ও শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই কিছুসংখ্যক অসাধু লোকের কর্মকাণ্ডের জন্য গোটা শিক্ষক সমাজের মর্যাদা যেন ক্ষুন্ন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।”

তিনি বলেন, একজন উপাচার্যের মূল দায়িত্ব হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান, পরিচালনা, মূল্যায়ন ও উন্নয়ন। কিন্তু ইদানিং পত্রিকা খুললেই মনে হয় পরিবার-পরিজন ও অনুগতদের চাকরি দেওয়া এবং বিভিন্ন উপায়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নেওয়াই যেন কিছু উপাচার্যের মূল দায়িত্ব।

“আমরা চাই উপাচার্যের নেতৃত্বে ও ছাত্র-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও উচ্চ শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হোক অর্থাৎ সেন্টার অব এক্সিলেন্স হিসেবে গড়ে উঠুক। শিক্ষকগণ হয়ে উঠুন সমাজে মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক।

শিক্ষকসহ যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পরামর্শ দেন আচার্য।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার গুণগত ও গবেষণা মান বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আধুনিকতা ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জীবনযাত্রা গতিশীল হলেও দুঃখের বিষয় হলো গবেষণায় আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি।

“এক সময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখা হত। সময়ের বিবর্তনে ক্রমেই যেন সেই ঐতিহ্য সংকুচিত হয়ে আসছে। অথচ ছাত্র শিক্ষক, ভৌত অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত না হলেও কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় শিক্ষার গুনগত মান এবং গবেষণার ক্ষেত্র, পরিমাণ ও মান কতটুকু বেড়েছে বা কমেছে সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে। গবেষণার বিষয়ে গণমাধ্যমে যেসব খবর প্রচারিত হয়, তা দেখলে বা শুনলে অনেক সময় আচার্য হিসাবে আমাকেও লজ্জায় পড়তে হয়।”

তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক, আর তা পূরণে বিশ্ববিদ্যালয়কে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।

গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, সমাবর্তনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন স্বীকৃতি লাভ করে তাদের মেধা ও প্রতিভার, তেমনি সচেতন হয়ে ওঠে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে।

“তোমাদের শিক্ষার্জন যেন সমাবর্তন আর সার্টিফিকেটেই সীমাবদ্ধ না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তোমাদের আজকের এই অর্জনের পিছনে বাবা-মা, শিক্ষকমণ্ডলী এবং রাষ্ট্রের যে অবদান ও ত্যাগ রয়েছে, তা হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। দেশ ও জনগণের কল্যাণে সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখতে হবে, এটাই সকলের প্রত্যাশা।”

সমাবর্তনে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরাসি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. জঁ তিরোল। অনুষ্ঠানে তাকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লজ’ ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

বক্তব্যে তিরল বলেন, পেশাজীবনে সফলতা অর্জনে আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও ঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা থাকতে হবে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত উপায়ে কঠোর পরিশ্রম করলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।

আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশের সাফল্য ও অগ্রগতির প্রশংসা করেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ।

সমাবর্তনে ১৩১ জন কৃতী শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীকে ১৫৩টি স্বর্ণপদক, ৯৭ জনকে পিএইচডি, দুজনকে ডিবিএ এবং ৩৫ জনকে এমফিল ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

মহামারীতে কারণে প্রায় তিন বছর পরের সমাবর্তনে অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের গ্র্যাজুয়েটসহ মোট ৩০ হাজারের বেশি গ্র্যাজুয়েট ও গবেষক অংশ নেন।

এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার উপাদানকল্প কলেজ-ইনস্টিটিউটের গ্র্যাজুয়েট ২২ হাজার ২৮৭ জন এবং সরকারি সাত কলেজের গ্র্যাজুয়েট ৭ হাজার ৭৯৬ জন।

সমাবর্তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও উপাদানকল্প কলেজ-ইনস্টিটিউটের গ্র্যাজুয়েটরা সমাবর্তনের মূল ভেন্যু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে সরাসরি এবং অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের গ্র্যাজুয়েটরা ঢাকা কলেজ ও ইডেন কলেজ ভেন্যু থেকে ভার্চুয়ালি সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করেন।

এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অর্জন ও পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান।

সমাবর্তনে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ।

রেজিস্ট্রার প্রবীর কুমার সরকারের সঞ্চালনায় সাইটেশন পাঠ করেন উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল।

অন্যদের মধ্যে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, সিনেট-সিন্ডিকেট সদস্য, একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্যরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক