Published : 13 Sep 2025, 08:23 AM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার অন্তত তিন থেকে সাড়ে তিন মাস বাকি। এরই মধ্যে মাঠ প্রশাসন ও পুলিশে রদবদল শুরু হয়ে গেছে। ভোটের সময় এসব কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থাকে গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ইতোমধ্যে অস্বস্তির কথা রাজনৈতিক দলগুলোর তরফে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে চলতি মাসের শেষার্ধে নির্বাচনি প্রাক-প্রস্তুতি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ইসির বৈঠকের কথা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও সংলাপ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান উপদেষ্টা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেছেন। সেখানে সমন্বিতভাবে কাজ করার করার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক প্রথম সভায় কঠোর বার্তা দিতে হবে ইসিকে। সেইসঙ্গে এখন থেকে মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভোট সম্পৃক্তদের বিষয়ে নজর রাখতে হবে, যাতে তফসিল ঘোষণার পরই পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সমন্বয় করা যায়।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের এক বছর এক মাসের মাথায় প্রশাসন ও পুলিশে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। এ ধারাবাহিকতার মধ্যে ভোটের কয়েক মাস আগে যাদের রদবদল হচ্ছে, তাতে নির্বাচন কমিশনের সায় লাগছে না।
সবশেষ সোমবার পুলিশের ৫৯ কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন। অগাস্ট মাসে জেলা প্রশাসক ও পুলিশের রদবদল হয়েছে।
কিন্তু তফসিল ঘোষণার পর ভোট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রদবদলে ইসির অনুমতি যেমন নিতে হয়, তেমনি সুষ্ঠু ভোটের স্বার্থে নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক সংস্থাটিও পরিবর্তন আনে।
দলীয় সরকারের অধীনে তিন নির্বাচনের সময় পুলিশ ও মাঠ প্রশাসনের ‘নিরপেক্ষতা’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অনিয়মে সম্পৃক্তদের বিষয়ে তদন্তও চলছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের আগে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সভায় যেমন নিরপেক্ষতা বজায়ে কঠোর নির্দেশনা থাকছে, তেমনি এখন থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘আমলনামায়’ নজর রাখতে চায় ইসি।
ইসির নিজস্ব জনবলেরও ইতোমধ্যে ব্যাপক রদবদল শুরু হয়েছে। প্রয়োজনে তফসিল ঘোষণার পরে মাঠ প্রশাসন ও পুলিশের রদবদল আনবে সাংবিধানিক সংস্থাটি।
রোববার নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “আমরা নিজেদের কর্মকর্তাদের চেঞ্জ করছি। প্রশাসন, পুলিশে চেঞ্জ হচ্ছে, আরও চেঞ্জ হবে। শিডিউল ঘোষণার পরে হবে। ভোটের আগের দিনও মেজর কোনো বিষয় থাকে, সেটাও হবে। ভালো ইলেকশনের এগুলো পূর্বশর্ত।”
ভোটের সময় কাজের সমন্বয়ের সুবিধার্থে স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ের ‘ফোকাল পয়েন্ট’ কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়েও পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। এ জন্য নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মন্ত্রণালয়/বিভাগে চিঠি দেওয়া হতে পারে।
মাঠ প্রশাসন সমন্বয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। ইসি সচিবসহ সাত সদস্যের এ কমিটি ইসির সঙ্গে মাঠ প্রশাসনে নিয়োজিত/দায়িত্বপ্রাপ্ত বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, সমন্বয় ও পরামর্শ দেবেন। নির্বাচনকালীন উদ্ভূত যেকোনো সংকট নিরসনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান এবং আচরণ বিধি প্রতিপালনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে সমন্বয় ও পরামর্শ দেবে।
‘নজরদারি অবশ্যই প্রয়োজন’
সোমবার নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, “প্রথমটা হচ্ছে যে, সব জাতীয় নির্বাচনের আগেই পুলিশের রদবদল হয়। তবে রদল দুই রকমভাবে হয়। একটা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যে রদবদল, সেটা মেইনলি ‘নিউট্রালিটি’। নিরপেক্ষতা তাদের দায়িত্ববোধ এই ‘কনসিডারেশন’ নিয়ে করা হত। আবার রাজনৈতিক সরকারের সময় যখন নির্বাচন, সেখানে আবার অন্য আঙ্গিকে তাদেরকে পরিবর্তন বা ট্রান্সফার করতে এসব করা হত।”
তিনি বলেন, “এখন তো ইলেকশন কমিশন তফসিল ঘোষণা না করলে, এই কাজগুলো আসলে দেখতে পারে না এখন পর্যন্ত। তারপরেও কথা হচ্ছে যেহেতু এবারের ইলেকশন ভিন্ন পরিস্থিতিতে হচ্ছে। এখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেটা এক ধরনের কেয়ারটেকার সরকার, তাদের অনেক কিছু নির্বাচন কমিশন শুনছে বা নির্বাচন কমিশনের কথাও তারা শুনছে। এখানে এক ধরনের ‘কো-অর্ডিনেশন’ থাকলে ভালো হয়।”
নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক ধরনের সমন্বয় থাকলে ভালো হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আব্দুল আলীম বলেন, “…যেহেতু অভিযোগ আছে গত ১৫-১৬ বছরে যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগগুলো হয়েছে। এখন সব পুলিশকে তো চাকরিচ্যুত করা যায়নি। সবাই পালিয়েও যায়নি।
“কাজেই নিশ্চয়ই তাদের একটা বিরাট সংখ্যক পুলিশ এখনো চাকরিতে আছে। কাজেই তারা কীভাবে তাদের দায়িত্বটা পালন করে সেটা দেখা দরকার। এজন্যই নজরদারি তো অবশ্যই প্রয়োজন।”
সেপ্টেম্বরে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক প্রাক-প্রস্তুতির বৈঠক
নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি ও পরিবেশ সুষ্ঠু রাখাতে ২৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সশস্ত্রবাহিনী বিভাগসহ বিভিন্ন বাহিনী, সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রথম সভা করার কথা রয়েছে।
ইসির ঘোষিত রোডম্যাপে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক কাজের তালিকায় রয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক প্রথম মতবিনিময় সভা, তফসিল ঘোষণার ১৫ দিন আগে দ্বিতীয় সভা আইনশৃঙ্খলা মোতায়েন পরিকল্পনা, সমন্বয় ও দিকনির্দেশনা নিয়ে, তফসিলের পর নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে ভোট উপলক্ষে রিটার্নিং অফিসারসহ আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক চূড়ান্ত নির্দেশনা ও সমন্বয় নিয়ে তৃতীয় সভা হবে।
এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার আগে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা, প্রতীক বরাদ্দের পর মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনারদের মতবিনিময়, নির্বাহী ও বিচারিক হাকিমদের প্রশিক্ষণ ও ব্রিফিং, ভোটের এক সপ্তাহ আগে আইনশৃঙ্খলা মনিটরিং ও সমন্বয় সেল গঠনসহ নানা কর্মপরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সিনিয়র সচিব/সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, মহাপুলিশ পরিদর্শক, র্যাব, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন সংস্থার মহাপরিচালক, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এর অতিরিক্ত আইজিপিকে নিয়ে কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভা অনুষ্ঠান এবং ভোটকেন্দ্র ও নির্বাচনি এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়ক প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনা নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
‘তফসিলের পরেও রদবদল’
এখন প্রশাসনে নানা ধরনের রদবদল হলেও তফসিল ঘোষণার পর ইসিও রদবদলে যাবে বলে জনপ্রশাসন সচিব মোহাম্মদ মোখলেস উর রহমান জানিয়েছেন।
সচিবালয়ে বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তার মধ্যে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভোটের সঙ্গে জড়িত। এসিল্যান্ড ও অন্য কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে থাকে। ভোটে রিটার্নিং অফিসার কারা হচ্ছে, সেটি জানা যাবে তফসিল ঘোষণার পর।
“তফসিল ঘোষণার পরই আমরা ইসির অধীনে চলে যাই। তখন এ বদলিগুলো করবে ইসি। ইলেকশনের সময় বড় ধরনের রদবদল হয় সেটা ইসি করবে। এটা নিয়ে কারো কোনো তদবির থাকবে না, কথা থাকবে না। যাকে যেখানে দেওয়া হয় সেখানে যেতে বাধ্য,…কঠোর বার্তা তফসিল ঘোষণার পর।”
আগের তিন নির্বাচনে সম্পৃক্তরা এবারের নির্বাচনে থাকছে না বলে জানান জনপ্রশাসন সচিব।
তিনি বলেন, “এবার কেউ এতটুকু যদি এদিক-ওদিক কারো পক্ষে, কোনো দলের পক্ষে এতটুকু যদি..., এখন পর্যন্ত জানি সেই রকম নেই। যদি আমরা এ রকম বুঝি, তাকে আমরা প্রত্যাহার করব, প্রচলিত আইনের আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সামনে রোজার আগে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্থে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হবে। এ লক্ষ্যে ডিসম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল ঘোষণার কথা রয়েছে। ভোটকে সামনে রেখে সেপ্টেম্বরের শেষদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরুর পরিকল্পনা চলছে।
আরও পড়ুন-
ভোট সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলার 'সমন্বয়ে জোর' প্রধান উপদেষ্টার
অভিযোগ নিতে রাজি নই, শেষ পর্যন্ত লড়াই করব: সিইসি
ভোটের সময় 'মব' সুবিধা করতে পারবে না: সিইসি
ভোটের আগে প্রশাসনে রদবদল আসবে, প্রশিক্ষণ পাবে পুলিশ: প্রেস সচিব
আওয়ামী লীগ আমলের তিন নির্বাচনে কারা ছিলেন নির্বাহী হাকিম? তথ্য নিচ্ছে ইসি