Published : 02 Oct 2025, 01:39 AM
দুই দশকেরও বেশি সময় আগে জাতীয় শিক্ষানীতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর আলাদা করার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
এবার গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে আবার উঠেছে সেই প্রস্তাব।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর আলাদা হলে লাভ ও ক্ষতির প্রশ্নে মোটা দাগে দুই ধরনের মত এসেছে, তাতে ভেতরে ভেতের শিক্ষা বনাম প্রশাসন ক্যাডারের মধ্যে কর্তৃত্বের লড়াইয়ের আঁচ পাওয়া যায়।
মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকরা বলছেন, বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন না হওয়ায় তারা ‘বঞ্চিত’ হচ্ছেন এবং ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হচ্ছে মাধ্যমিক শিক্ষা।

শিক্ষাবিষয়ক গবেষকদের মতে, শুধু পদ সৃষ্টি করে কিছু মানুষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়, শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে আলাদা অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
মাধ্যমিক শিক্ষা পরিচালনায় মাধ্যমিকের জন্য প্রথমবার শিক্ষানীতিতে আলাদা অধিদপ্তরের প্রস্তাব আসে ২০০৩ সালে, অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিয়ার নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে।
পরে ২০১০ সালে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিশনও স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব রাখে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে বিভিন্ন সময়ে দাবিও তুলেছিলেন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকরা। তবে, সরকারি কলেজগুলোতে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের দিক থেকে তার বিরোধিতা রয়েছে।
গত বছরের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন খাতে সংস্কার উদ্যোগের মধ্যে আবারও আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আলোচনায় আসে।
গেল জুলাই মাসে নতুন করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে বিভক্ত করার প্রস্তাব পাঠানো হয় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে।
তবে শিক্ষা ক্যাডারের বিরোধিতার কারণে এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে কী-না তা নিয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের ‘শঙ্কা’ থাকার কথা বলেছেন শিক্ষক প্রতিনিধিরা।
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা আলাদা অধিদপ্তর হলে শিক্ষার মান কমে যাওয়ার অজুহাত দিয়ে আসছেন শুরু থেকেই।
তাদের দাবি, প্রশাসন ক্যাডার শিক্ষা প্রশাসনে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর বিভক্ত করার প্রস্তাব তুলেছে।
যদিও প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ‘সেবা প্রদান ও মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম মনিটরিং সহজ করার’ কথা বলে আলাদা অধিদপ্তরের প্রস্তাব তুলেছিলেন।

জুলাই মাসে সর্বশেষ অধিদপ্তরকে বিভক্ত করার প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হয় বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একজন সদ্যসাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যিনি প্রশাসন ক্যাডারভুক্ত। তবে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা এ বিষয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতেও রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে বুধ ও বৃহস্পতিবার একাধিকবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি। খুদে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া মেলেনি তার।
তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের মাধ্যমিক শাখার যুগ্মসচিব বদরুন নাহার শুক্রবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওই প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো আপডেট আমরা এখনো জানি না।”
দেশের সরকারি-বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবগুলোর তদারকির দায়িত্ব মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের৷
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে পদায়ন পান বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা, যে পদটিকে শিক্ষা ক্যাডারের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। এ অধিদপ্তরের পরিচালক, উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকের পদগুলোতেও বসেন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
তবে ২০১৬ সালের নভেম্বরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে বিভক্ত হওয়ার পর আলাদা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর গঠিত হয়। নতুন এই দুটি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পরিচালকের পদে বসেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রায় ১৯ হাজার মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল, ১ হাজার ৪৮০ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ৩ হাজার ৩৪১টি কলেজ রয়েছে, যেগুলো বর্তমানে তদারকি করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। এর বাইরে নয়টি আঞ্চলিক কার্যালয়, ৬৪টি জেলা শিক্ষা কার্যালয়, ৫১৬টি মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয় এ অধিদপ্তরের অধীন।

অধিদপ্তরকে ভাগ করার যত প্রস্তাব
বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পৃথক দুটি জাতীয় শিক্ষানীতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে আলাদা করে দুটি অধিদপ্তর করার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
২০০৩ সালের মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিয়া কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, “মাধ্যমিক শিক্ষার সার্বিক ব্যবস্থাপনা, তত্ত্বাবধান, প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠন করা কাম্য। উচ্চ শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়াদি অন্য অধিদপ্তর গঠন করে সেখানে ন্যস্ত করা যেতে পারে।”
সেই প্রতিবেদনে সুপারিশ ছিল, “শিক্ষকদের ক্যারিয়ার উন্নয়নের পথ খোলা রাখতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মসম্পাদন দক্ষতার মাধমে তারা যেন উচ্চতর পদে উন্নীত এবং নিয়োগ পেতে পারেন তার ব্যবস্থা করতে হবে।
সহকারী শিক্ষক হিসাবে নিয়োজিত শিক্ষকবৃন্দ যাতে পর্যায়ক্রমে সিনিয়র শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক এবং উচ্চ মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে এবং পরিচালক পদেও নিয়োগের সুযোগ পেতে পারেন, তার ব্যবস্থা রাখতে হবে।”
২০১০ সালের অধ্যাপক কবীর চৌধুরী কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়, “শিক্ষা প্রশাসনে বর্তমান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে দুইটি পৃথক অধিদপ্তর- যথাক্রমে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর গঠন করা হবে।”
সেখানে বলা হয়, “শিক্ষা প্রশাসনে নিয়োজিত সকল সংস্থার জন্য দায়িত্ব নির্ধারণ করে তা যথাযথভাবে পালনের জন্যে লোকবল ও অর্থবল এর ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি যথাযথ জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।”
কবীর চৌধুরী কমিশন মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি পৃথক মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠারও প্রস্তাব দিয়েছিল।
২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও ডিসিরা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে দুই ভাগ করার প্রস্তাব করেছিলেন।
তাদের প্রস্তাব ছিল, দুই ভাগের একটি হবে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। শুধু মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার জন্য এই অধিদপ্তর কাজ করবে। আর অপরটি হবে উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। এটি উচ্চ মাধ্যমিক ও পরবর্তী স্তরের শিক্ষা নিয়ে কাজ করবে।

নওগাঁর তৎকালীন ডিসি খালিদ মেহেদী একটি স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব করে বলেছিলেন, “বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব কার্যক্রম, পাঠদান, পরীক্ষা, জনবল ব্যবস্থাপনা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর থেকে সম্পাদিত হয়। এতে অধিদপ্তরের কাজের পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় তা বাস্তবায়নে সমস্যা হয়।
“মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক দুটি পর্যায়ের জন্য পৃথক অধিদপ্তর হলে সেবা প্রদান ও মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম মনিটরিং সহজ হবে।”
২০২৪ সালের ২ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে শিক্ষা প্রশাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি জাতীয় কর্মশালা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের আওতাধীন কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট-সিইডিপি।
সেখানে পাওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে বিয়াম ফাউন্ডেশন গবেষণা ও পরামর্শ সেবা কেন্দ্র একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করে, তাতেও শিক্ষা প্রশাসন ব্যবস্থাপনার বর্তমান কাঠামোর পরিবর্তে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর নামে দুটি পৃথক অধিদপ্তর করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে দুই ভাগ করার প্রস্তাব করেছে।
গেল ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবর্তে আলাদা দুটি অধিদপ্তর-মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর করার সুপারিশ এসেছে।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, “মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মাধ্যমিক বিভাগকে পৃথক করে আলাদা মাধ্যমিক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মাধ্যমিক শিক্ষা অঙ্গীভূত থাকার কারণে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা গুরুত্ব পাচ্ছে না এবং ক্রমেই মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মান কমছে। তাই এটি আলাদা হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
“মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মাধ্যমিক বাদ দিয়ে কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর করা যেতে পারে এবং মহাপরিচালকের পদকে গ্রেড-১ এ উন্নীত করা যেতে পারে।”

কর্তৃত্ব হারানোর শঙ্কায় শিক্ষা ক্যাডার
শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের দাবি, শিক্ষা প্রশাসনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে বিভক্ত করার চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে করছেন।
ঢাকা কলেজে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত একজন সহযোগী অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রশাসন ক্যাডার দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা ক্যাডারকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছে, তাই শিক্ষা প্রশাসনে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এর অংশ হিসাবেই তারা বারবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে বিভক্ত করার চেষ্টা করেছেন।
“শিক্ষা ক্যাডার বিশেষায়িত একটি ক্যাডার, তারা বরাবর শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন। শিক্ষার যে অধিদপ্তর বা দপ্তরগুলোতে প্রশাসন ক্যাডার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, সেগুলো কি ভালো চলছে? তারা দীর্ঘদিন ধরে ‘কন্সপারেসি’ চালিয়ে সফল হননি, তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটের সুযোগ নিতে চাচ্ছেন। এ জন্যই নতুন করে আবার প্রস্তাব চালাচালি শুরু হয়েছে।”
জানতে চাইলে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার পরিচালক খান মাইনুদ্দিন সোহেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিক্ষাকে (প্রশাসন) বিভক্ত করে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। আগে শিক্ষা একীভূত ছিল। কিন্তু পরে তো তা ভাগ হয়েছে। ভাগ হওয়ার পর কী অবস্থা সে বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।
“অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা না করে অধিদপ্তরকে বিভক্ত করার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সেটি ফলপ্রসূ হবে না। আমরা শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসেসিয়েশন মনে করি, এটি একীভূতই থাকা উচিত।”
অধিদপ্তর বিভক্ত হলে শিক্ষা ক্যাডার কর্তৃত্ব হারাবে, এমন শঙ্কার কথা সামনে এসেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে, সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, “যদি একটি পক্ষ চলে যায়, তাহলে আরেকটি পক্ষ আসবে। সে বিষয়টি নিয়েও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন আছে।”
শনিবার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সচিব মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সদ্যসাবেক সহ-সভাপতি ও সাবেক সচিব খ ম কবিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অ্যাডমিন ক্যাডার নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করবে, এমন মানসিকতা থেকে কখনোই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে বিভক্ত করার প্রস্তাব করা হয়নি।”
এক সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা বলেন, “আমি যখন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ছিলাম তখনকার অভিজ্ঞতা থেকে দেখলে মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য আলাদা অধিদপ্তর হওয়া খুবই জরুরি। মাধ্যমিক পর্যায় শিক্ষকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ আছে যে তাদের অবহেলিত করা হচ্ছে।
“মাধ্যমিক শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা জাতির ভিত্তি। তাই এই দুই খাতকে অবহেলিত রাখা কাম্য নয়।”
অন্যকে দোষারোপের প্রবণতা ও আন্তঃক্যাডার কোন্দোল থেকেই কেউ কেউ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়ে দেন বলে মনে করেন এই সাবেক সচিব।

স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর চান শিক্ষকরা
মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকরা বরাবরই স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছেন। তাদের অভিযোগ তারা ‘বঞ্চনার শিকার’, আর তাদের অভিযোগের তীর শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দিকে।
এ দাবি আদায়ে গঠিত সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকদের সংগঠন স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বাস্তবায়ন কমিটির মুখপাত্র ওমর ফারুক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্কুল শিক্ষকরা বঞ্চনার শিকার। জাতীয় শিক্ষানীতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ভেঙে স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর নামে দুটি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার কথা বলা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে দিন দিন মাধ্যমিক শিক্ষা অবহেলিত হচ্ছে।”
খুলনার সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, “কয়েক দশক আগে বিভিন্ন সরকারি স্কুলে যোগদান করে অনেক শিক্ষক এখনো সহকারী শিক্ষক, কেউ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, কেউ সহকারী প্রধান শিক্ষক আবার কেউ প্রধান শিক্ষক। একই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে চারটি ভাগ হয়েছে। শিক্ষকদের টাইম স্কেল দেওয়া হচ্ছে না।”
স্কুলশিক্ষকদের সমস্যার কথা অধিদপ্তর বলে না দাবি করে তিনি বলেন, ২৪ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে ২০ হাজারের বেশি মাধ্যমিক। সাড়ে তিন হাজার কলেজ।
“কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করেন সরকারি কলেজ শিক্ষকরা। মাধ্যমিকের আলাদা অধিদপ্তর হলে এবং তার নিয়ন্ত্রণে সরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষকরা থাকলে সরকারি স্কুলের সমস্যাগুলো দূর হবে।”
সবুজবাগ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আব্দুস সালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের বঞ্চনা নিরসনে আলাদা অধিদপ্তর চাই। মনিরুজ্জামান মিয়া স্যারের নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন ২০০৩ সালের প্রতিবেদনে আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক পর্যন্ত মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের পদায়ন দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। আমরাও তা চাই।
“আর এর ওপরের পদগুলোতে রাষ্ট্র যাকে যোগ্য মনে করে তাদেরই দায়িত্ব দেওয়া হোক।”
মাধ্যমিক পর্যায়ের এই শিক্ষকরা মনে করছেন, ‘একটি পক্ষ’ এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ‘বিরোধিতা’ করছেন এবং করেই যাবেন।

বেসরকারি শিক্ষকদের ক্ষমতায়নও জরুরি
মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষকরাও স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার পক্ষে।
বেসরকারি শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি-বিএসএস মাধ্যমিকের জন্য আলাদা অধিদপ্তর গঠন করে সেখানে প্রেষণে বেসরকারি শিক্ষকদের কর্মকর্তা পদে পদায়নের দাবি করেছে।
সংগঠনটির মহাসচিব মেজবাহুল ইসলাম প্রিন্স বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মধ্যেও অনেক যোগ্য অধ্যক্ষ, শিক্ষক, অধ্যাপক রয়েছেন যারা প্রশাসনিক কাজে দক্ষ। তাদের কর্মকর্তা পদে পদায়ন দিয়ে আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠন করা হলে তারা এমপিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দিকগুলো ভালোভাবে দেখভাল করতে পারবেন।
“এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নানাভাবে বঞ্চনার শিকার। আলাদা অধিদপ্তর গঠন করে সেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন করা হলে এসব বঞ্চনা দূর হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ-এনটিআরসিএ সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক ফোরাম-বিটিএফের সভাপতি মো. হাবিবুল্লাহ্ রাজু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষকদের জন্য আলাদা অধিদপ্তর হলে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে। ৯৭ শতাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর তদারকি করলেও সেখানে একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকও কর্মকর্তা পদে নেই।”
এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের এই যুগ্ম-আহ্বায়ক বলেন, “শিক্ষার যে অংশ যারা পরিচালনা করেন, সে অংশ তদারকির দায়িত্ব তাদের হাতেই থাকা উচিত। শিক্ষা প্রশাসন নিয়ে নানা পক্ষের টানা-হেঁচড়া কাম্য না।”

শিক্ষার মানোন্নয়ন হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য
শিক্ষার মানোন্নয়নকে লক্ষ্য ধরে শিক্ষা প্রশাসন সংস্কারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন গবেষকরা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ এর পরিচালক অধ্যাপক মো. আজম খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন “মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এতদিন যেভাবে চলছিল, তারা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
“দীর্ঘসূত্রতা, অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ বরাবরই ছিল। আমার মনে হয়, মাধ্যমিকের জন্য আলাদা অধিদপ্তর করে মনিটরিং নিশ্চিত করা গেলে তা শিক্ষার মান উন্নয়নে ফলপ্রসু ভূমিকা রাখবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেমের স্কুল অফ সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিজ এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের শিক্ষক সাঈদ ইফতেখার আহমেদ বলেন, “শুধু প্রশাসন ক্যাডারের কয়েকটি পদ সৃষ্টির জন্য নয়, শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠন করা যেতে পারে।
“এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দক্ষতা ও তাদের মানোন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্য আলাদা অধিদপ্তর গঠন হলে সেটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মনে কলেজ শিক্ষকদের নিয়ে, কলেজ শিক্ষকদের মনে স্কুল শিক্ষকদের নিয়ে এক ধরণের হীনম্মন্যতা কাজ করে। কিন্তু এটি কাটিয়ে উঠতে হবে। শিক্ষকদের প্রশাসনিক দায়িত্ব শিক্ষকদের দিতে হবে, তাদের সুযোগ দিতে হবে; দক্ষতা উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন করতে হবে।
“কারণ মাধ্যমিক পর্যায়ের সমস্যাগুলো মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকরাই ভালো বুঝবেন। তাই আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠিত হলে প্রশাসন ক্যাডারকে যোগ করার প্রয়োজন নেই।”
নর্দার্ন অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ শিক্ষকের মতে, বলেন, শিক্ষাবান্ধব নয়, এমন শিক্ষা প্রশাসন শিক্ষার অগ্রসরণে প্রতিবন্ধক। এ বাধা অতিক্রম করতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায় শিক্ষার ভিত্তি গঠনের সময়। এ জায়গাটিকে শিক্ষার্থীবান্ধব করে তুলতে হবে।