Published : 08 Dec 2025, 11:15 PM
ভোটের সংস্কৃতিতে ‘মার্কা’ দেখে ভোট দেওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, “তাহলে অবশ্যই আমরা একজন স্বৈরাচারী প্রধানের জন্য পরিবেশ তৈরি করছি।”
এ কারণেই ‘আমি তোমাকেই চাই, বারে বারে শুধু তোমাকেই চাই’ এমন পরিবেশ তৈরি হয় বলে পর্যবেক্ষণ তার।
গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সভার উদাহরণ টেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেন, “ঘুরে ঘুরে যে কথাগুলো আসে ওই আমাদের শেখ হাসিনার সময়ের শেষ দিককার একটা মিটিংয়ে ‘আমি তোমাকেই চাই, বারে বারে শুধু তোমাকেই চাই।’ আমাদের বিজনেস কমিউনিটি বলছে যে ‘তাকে ছাড়া দেশ চলবে না‘।
“এই যে একটা অবস্থায় আমরা নিজেদেরকে নিয়ে যাই, এটার পেছনে কিন্তু আমাদের আত্মবিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে আমি মনে করি।”
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন ভবনে রাষ্ট্রায়ত্ত গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের বার্ষিক সম্মেলনে ‘উন্নয়ন ও গণতন্ত্র’ বিষয়ক আলোচনায় এসব কথা বলেন গভর্নর।
এ অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান, বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক কেএএস মুরশিদ, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য মঞ্জুর হোসেন ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক সুলতান হাফিজ রহমান। এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক।
আলোচনায় দেশের রাজনৈতিক ও ভোটের সংস্কৃতির সমালোচনায় মুখর ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান মনসুর।
তিনি বলেন, “আমরা যদি কেবল মার্কার ভিত্তিতে ভোট দেই, তাহলে অবশ্যই আমরা একজন স্বৈরাচারী প্রধানের জন্য পরিবেশ তৈরি করছি। যিনি প্রথমে দল, এরপর সরকার এবং পরবর্তীতে পুরো দেশ পরিচালনার পুরো প্রক্রিয়াটিই দখল করে নিচ্ছেন।
“আর এরপর যা ঘটে তা হলো এই ‘প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট’ সম্পর্ক; অর্থাৎ আমি যদি টিকে থাকতে চাই, যদি ব্যবসায় ভালো করতে চাই, তবে আমাকে সরকারের সাথে আপস করতে হবে। সরকারের সাথেই থাকতে হবে।”
এমন কারণেই ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বিগত সরকারপ্রধানের সামনে তার পক্ষেই সুর মিলিয়েছেন বলে তুলে ধরেন আহসান মনসুর।

ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতীক না দেখে ব্যক্তির যোগ্যতা ও সততা আমলে নিলে দেশের অনেক যোগ্য ব্যক্তিরা উঠে আসতেন বলে তিনি মনে করেন।
এর মূলে তিনি বুদ্ধিজীবি মহলের ‘অবক্ষয়’ দেখার কথা তুলে ধরে বলেন, “সেই অবক্ষয় যেটাকে আমি বলব... যেটা আমাদের শক্তি ছিল, আমি বলব স্বাধীনতা পূর্ব সময়ের, ‘৭১ এর আগে যেটা আমাদের শক্তি ছিল, সেটা কিন্তু আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
“গত ১৫ বছরে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, শিক্ষক সমিতি, আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল গ্রুপের মধ্যে কোনো আলোড়ন কিন্তু আমরা দেখতে পাইনি। এটা দুঃখজনক।”
আহসান মনসুর বলেন, প্রতীক নির্ভর ভোট প্রবণতার জন্য ৯০ পরবর্তী গণতান্ত্রিক সময় বলা হলেও যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুযোগ পেয়েছে। এবং তাদের ক্ষমতা থেকে নামাতে অন্য সব দলেরই শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা অনেক সময় ডিফাইন করি যে ‘৯১ সালের পর থেকে গণতন্ত্র, এটা কখনোই ছিল না। ‘৯৬-তে এসেই তো আবার আন্দোলন শুরু হয়ে গেল এবং সেটার জন্য… ‘আল্টিমেটলি ক্ষমতা ধরে রাখার প্রচেষ্টা’ সেখানে ছিল।
“আবার প্রত্যেক সময়ই আমরা দেখি যে ক্ষমতা ধরে রাখার একটা প্রয়াস। ‘অবৈধভাবে হলেও’ ধরে রাখার একটা প্রয়াস। শক্ত প্রয়াস সেখানে থাকে। বাধ্য হয়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয় ক্ষমতাসীন দলগুলোর।”
তার ভাষ্য, “এই জায়গাটায় একটু ফোকাস না করলে হবে না। এ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় পাওয়ার এত বেশি বড় আকারের হয়ে যায়, এত বেশি পাওয়ারফুল হয়ে যায় যে এটাকে আর ছাড়া যায় না।
“এটা ছাড়লে পরে আমি আর 'আমি' থাকব না, আমি সাধারণ হয়ে যাব বা আমাকে হয়তো দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু আমি তো এই পর্যায়ে নাই এমনভাবে। অথচ পৃথিবীর সব দেশে তো আমরা দেখি যে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, চলে যাচ্ছেন, তারা সাধারণ নাগরিক হয়ে যাচ্ছে।”
শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে বারবার ব্যর্থ হওয়ার কথা তুলে ধরে গভর্নর বলেন, সকলে যেন নিজের জনপ্রতিনিধিকে বেছে নিতে পারে এবং তার অধিকার আদায় করতে পারে সেজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রয়োজন।
“সেই নমিনেশন, সেই কেন্দ্রীয়ভাবে একটা তালিকা চলে এল, ওহি নাজিল হয়ে গেল যে অমুক অমুক অমুক আমাদের প্রতিনিধি এবং তারাই। এই ওহি নাজিল প্রক্রিয়া যদি আমাদের বন্ধ না হয় যেটা এখনো চলমান প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা আসবে কোথা থেকে?"
এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখতে না পাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “যাই হোক, আমাদের আশাবাদী হতে হবে।”