Published : 13 Jul 2025, 01:09 AM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার গড় নিয়ে ‘কিছু বিষয়ে’ সবশেষ আদমশুমারির ওপর নির্ভর না করে ভোটার সংখ্যাতেই গুরুত্ব দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
বিশেষ করে মহানগর এলাকায় স্থানীয় মানুষের চেয়ে ভাসমান জনসংখ্যার আনাগোনার কারণে জনসংখ্যার গড়ের চেয়ে ভোটার সংখ্যার গড়ের দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।
এক্ষেত্রে জনসংখ্যার পাশাপাশি ভোটার সংখ্যার মোটামুটি সমতার বিষয়টি নিয়ে কারিগরি কমিটিতে পর্যালোচনা করবে নির্বাচন কমিশন।
তবে নির্বাচন বিশ্লেষকের কারো মত হচ্ছে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানায় জনসংখ্যার বিষয়টিই প্রাধান্য দিতে হবে। ভোটারের সংখ্যা বিবেচনায় আনতে হলে আইন করতে হবে।
আবার কেউ বলছেন, ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে আসন সীমানা নির্ধারণ হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করবে।
সবশেষ আদমশুমারি প্রকাশিত হয় ২০২২ সালে, যাতে দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। আসনওয়ারি গড় হতে পারে সাড়ে ৫ লাখেরও বেশি।
আর এবারের ভোটার তালিকায় প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ভোটার হতে পারে; যাতে গড় আসনভিত্তিক ভোটার সংখ্যা দাঁড়াবে ৪ লাখ ১৬ হাজারের উপরে।
জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসনের সীমানা হলেও তিন পার্বত্য জেলা ও সবচেয়ে ছোট জেলায় অন্তত দুটি করে আসন রয়েছে।
নবম সংসদ নির্বাচনের সময় ২০০৮ সালে আসন সীমানায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়। ঢাকা জেলায় ২০টি আসন হয়; যার মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে ১৫টি আসন পড়ে।
এবার এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ৩০০ আসনের সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ নিয়ে কাজ শুরু করছে।
বৃহস্পতিবার অষ্টম কমিশন সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, “সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে আমাদের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আলোকে টেকনিক্যাল কমিটির আরও যাচাই করার সুযোগ রয়েছে।”
সবশেষ ২০২২ সালের আদমশুমারি প্রতিবেদনকে আমলে নিয়ে সীমানা নির্ধারণের কাজের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন তিনি।
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, “আমরা কাজ করে দেখেছি এ শুমারির ওপর খুব নির্ভর করা যাচ্ছে না, কিছু কিছু জায়গায়। কিছু কিছু জায়গায় বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি…এমতাবস্থায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি-সে ডেটাটা আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি রিলায়েবল, সেটা হচ্ছে ভোটার তালিকা। ৯৮-৯৯ শতাংশ নির্ভুল একটা তালিকা। এটাও জনসংখ্যারই একটা বাইপ্রোডাক্ট। সুতরাং এটাকে (ভোটার সংখ্যা) আমরা অগ্রাধিকার দিয়ে জনসংখ্যাকেও বিবেচনায় নিয়ে আমরা করার চেষ্টা কছি।”

সংবিধান ও আইনে যা আছে
আদমশুমারি প্রতিবেদন প্রকাশের পর সীমানা নির্ধারণের বাধ্যবকতার রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।
সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে বলা হয়েছে- নির্বাচন কমিশন এ সংবিধান ও আইনানুযায়ী সংসদে নির্বাচনের জন্য নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ করবে।
২০২১ সালের সীমানা নির্ধারণ আইনে বলা হয়েছে- কমিশন প্রশাসনিক সুবিধা বিবেচনা করে প্রতিটি আঞ্চলিক নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ করবে, যাতে প্রতিটি আঞ্চলিক নির্বাচনি এলাকার ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় থাকে এবং এরূপ সীমানা নির্ধারণ সর্বশেষ আদমশুমারি প্রতিবেদনে উল্লিখিত জনসংখ্যার, যতদূর সম্ভব, বাস্তব বণ্টনের ভিত্তিতে করতে হবে।
এ আইনের ধারা ৮ অনুযায়ী, কমিশন নতুন করিয়া আঞ্চলিক নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ করতে পারবে, যথা : (ক) প্রত্যেক আদমশুমারি সমাপ্তির পর, আদমশুমারির পরবর্তী জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনের উদ্দেশ্যে; (খ) কমিশনের নিকট অন্য কোনো কারণ উপযুক্ত বিবেচিত হলে তা লিপিবদ্ধ করে, জাতীয় সংসদের প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে।
‘সংশোধন অধ্যাদেশ করতে হবে দ্রুত’
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফের ডটকমকে বলেন, “সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে জনসংখ্যার ভিত্তিতে করতে হবে। কারণ, জনপ্রতিনিধি হন সংশ্লিষ্ট সংসদীয় এলাকার মানুষের জন্য। সেক্ষেত্রে শিশু থেকে সবার জনপ্রতিনিধি তিনি। ভোটারের প্রতিনিধির কথা বলা হয়নি।”
তার মতে, সব জেলায় অন্তত দুটি আসন থাকবে এবং পার্বত্য জেলায়ও দুটি আসন থাকবে হবে।
“আদমশুমারি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। আইন অনুযায়ী জনসংখ্যার ভারসাম্য রেখে তা করবে কমিশন। সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকেও এ সংক্রান্ত সুপারিশ রয়েছে,” বলেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক এ সদস্য।
এ ক্ষেত্রে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সুপারিশ হল-
>> মেহেরপুর, পিরোজপুরসহ ছোট জেলাগুলোর জনসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে একটি আলাদা জনসংখ্যা কোটা বিবেচনা করে ১০ শতাংশের বেশি বিচ্যুতি (কম-বেশি) না করে সেসব জেলার সীমানা নির্ধারণ করা। বৃহত্তর জেলার জনসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে একটি আলাদা জনসংখ্যা কোটা বিবেচনা করে ১০ শতাংশের বেশি বিচ্যুতি না করে সেসব জেলার সীমানা নির্ধারণ করা। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের ক্ষেত্রে এ বিচ্যুতি ২৫ শতাংশের বেশি না করা।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি কারিগরি কাজ। এ লক্ষ্যে একটি বিশেষায়িত কমিশন গঠনের বিষয়ে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবও রয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় দলগুলো এ উদ্যোগের একমত হয়েছে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক এ সদস্য বলছেন, “আমাদের বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা আইনের খসড়াও প্রস্তাব করেছি-একটা বিশেষায়িত কমিটি থাকবে।
এটা আনন্দের বিষয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচনাও হয়েছে, ইসি প্রাথমিক কাজ শুরু করলেও বিশেষায়িত কমিটি গঠন ও ভোটার সংখ্যার সমতার বিষয়টি আইনে নেই। এটি যুক্ত করে অধ্যাধেশ আকারে আনতে হবে।”
তার মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নীতিমালা অনুযায়ী, একটা হচ্ছে ভোটার সংখ্যার সমতার ভিত্তিতে করা সম্ভব। জনসংখ্যার সমতা দিয়ে করলে তা নিশ্চিত করা যাবে না। ইসির ভালো উদ্যোগ, ভালো চিন্তা। ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। এখন প্রথম কাজ হচ্ছে আইন সংশোধন করা।
“প্রতিটি আসনের জনসংখ্যার মধ্যে ভোটাররাই তো নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব করছে। ভোটাররাই তো জনসংখ্যার অংশ। ভোটার সংখ্যার সমতা এনে আসন বিন্যাসের উদ্যোগ বেশ ভালো হবে।”
ভোটার ও জনসংখ্যার তারতম্য যেমন
নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেছেন, সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে সুপারিশে ছিল, বড় জেলাগুলোর জনসংখ্যার বিচ্যুতি ১০ শতাংশ পর্যন্ত সমন্বয় করা। বাস্তবতা হলো ১০ শতাংশ অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না। যেমন-যশোর জেলায় একটি আসনের ভোটার রয়েছে ৬ লাখ প্রায়, আরেকটায় রয়েছে ৩ লাখের চেয়ে কম ভোটার। এখন ৩ লাখ ভোটারের বিষয়টি সমন্বয় করতে গেলে সবগুলো আসনকে ভেঙে ভেঙে সাজাতে হবে।
নির্বাচন কমিশনে ইতোমধ্যে অন্তত ৮০টি আসনে ছয় শতাধিক আবেদন পড়েছে সীমানা নিয়ে। ২২১টি আসনের বিষয়ে কোনো আবেদনই হয়নি।
“তবুও যেসব জায়গায় ভেরিয়েশন রয়েছে, আরও কিছু করা যায় কিনা আমরা দেখতে বলেছি। আশা করি, আগামী সপ্তাহে জেনেই যাবেন, পুরো প্রকাশ হবে।”
তার মতে, ঢাকায় শহরের আসন সংখ্যা খুব বেশি কমবে না।
“বাস্তবতা হলো ঢাকা শহরের জন্য সংখ্যা বেড়েছে ব্যাপক হারে। ভোটার সংখ্যাও বেড়েছে বেশ গত সংসদেও। আমাদের ভোটারের জাতীয় গড় হচ্ছে ৪ লাখ ১৮ হাজার থেকে ৪ লাখ ২২ হাজার।”
২০২২ সালের আদমশুমারি প্রতিবেদন ও ভোটার সংখ্যার তারতম্যের বিষয়টি তুলে ধরেন নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ।
তিনি বলেন, “কিছু কিছু জায়গায় বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি; যেমন ২০২২ সালের শুমারির সঙ্গে যদি বর্তমান ভোটার সংখ্যার তুলনা করা হয় তাহলে জাতীয়ভাবে গড়ে ১০০ জনে ৭৩-৭৪ জন ভোটার হয়। কিন্তু ঢাকা শহরে দেখা যাচ্ছে গড়ে ১০০ জনে মাত্র ৫৫ জন ভোটার। গাজীপুর শহরে দেখা যাচ্ছে ১০০ জনে মাত্র ৫১ জন ভোটার।
“অর্থাৎ আমরা জনসংখ্যা ধরে যদি ডিসট্রিবিউট করি তাহলে এসব জায়গায় আরও আসন বাইরে থেকে কেটে এখানে দিতে হবে, ঢাকায়। বাস্তবতা হচ্ছে-ঢাকায় যে জনসংখ্যা দেখছি তারা ভাসমান জনসংখ্যা।”
ঢাকা শহরে আসন প্রতি (ভোটার) গড় হচ্ছে ৪ লাখ ২২ হাজার। জাতীয় গড় হচ্ছে ৪ লাখ ১৮ হাজার থেকে ৪ লাখ ২২ হাজার। যদিও সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব আছে, মহানগর এলাকায় পার্থক্য একটু বেশি হতে পারে, ২৫ শতাংশ পর্যন্ত।
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, বিষয়টির কারিগরি দিকটি আবার দেখার জন্য টেকনিক্যাল কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহ নাগাদ পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সীমানা নির্ধারণে ভোটার সংখ্যার ভারসাম্য যে কারণে
সংসদীয় আসনে কতটিতে পরিবর্তন আসতে পারে তা নিয়েও আভাস দেন এ নির্বাচন কমিশনার।
“সংখ্যাটা সঠিকভাবে বলতে পারবো না; এটুকু বলতে পারি পরিবর্তন খুবই কম হবে। আরেকটু পর্যালোচনার ব্যাপার রয়েছে, টেকনিক্যাল বিষয় রয়েছে।”
ইতোমধ্যে বিশেষায়িত কমিটির মাধ্যমে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের পরামর্শ এসেছে। বাস্তবতার নিরিখে তা কতটুকু করা যাবে, তা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
ঐকমত্য কমিশনের এ আলোচনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, “এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। নির্দিষ্টভাবে ওনারা বলেছেন, ছোট জেলাগুলোর জন্য যেন একটা গড় করা হয়; বড় জেলাগুলোর জন্য যেন একটা গড় করা হয়। মহানগর এলাকায় শতাংশ, জেলায় ১০ শতাংশ পার্থক্য থাকে। বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য সবখানে এগুলো পূরণ করা যাবে না।
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর পাশাপাশি জেলায় আসন সংখ্যা দুটি করে। চুয়াডাঙ্গায় আসনপ্রতি ভোটার সংখ্যা সাড়ে ৪ লাখের উপরে, মেহেরপুরে ৩ লাখের কাছাকাছি। এভাবে এগুলো করা যাবে না।
“তবে আমরা চেষ্টা করছি যতটুকু সম্ভব যেন প্রতিনিধিত্বমূলক হয়; পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক অবস্থানের ক্ষেত্রেও যে ব্যাঘাত না ঘটে।”
আইনেই ভৌগলিক অবস্থা ও অবস্থান, প্রশাসনিক সুবিধা, যাতায়াত ব্যবস্থা ব্যবস্থার কথা বলা আছে জানিয়ে সানাউল্লাহ বলেন, “পাশাপাশি এখতিয়ার রয়েছে-নির্বাচন কমিশনের বিবেচনায় অন্য যে কোনো মাপকাঠি, যেটাকে যৌক্তিক মনে হয় সেটাকে যোগ করে তারপরে করতে হবে। সুতরাং ভোটার সংখ্যা একটি বিষয়, চূড়ান্ত কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতা তো একটু আলাদা।”
জনসংখ্যার ভারসাম্য আনার পাশাপাশি ভোটার সংখ্যার সমতা এনে আসন বিন্যাসের কথা বলেছেন তিনি।
পুরনো খবর”
আসন সীমানা: খসড়ার আগেই ৬০৭ আবেদন, নিষ্পত্তি কীভাবে