Published : 06 Jul 2025, 11:48 PM
সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে রাজনৈতিক দলগুলো যে বিশেষায়িত কমিটি গঠনে একমত হয়েছে, সেই কমিটির অপেক্ষায় রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বৃহস্পতিবার বলেছেন, “এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। কমিশনের আন্ডারে একটা কমিটি; অনেকটাই টেকনিক্যাল কমিটি হবে। তারা (বিশেষায়িত কমিটি) মিলে যেটা করবে, কমিশন সেইভাবে সিদ্ধান্ত নেবে।
“তবে এখন আমাদের কাছে কোনো রূপরেখা নাই যে- কাকে নিয়ে করতে হবে; সেটা আমরা ওয়েট করছি যে সরকারের তরফ থেকে এ ব্যাপারে কোনো পরবর্তী নির্দেশনা আছে কি না।”
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ গত বুধবার জানিয়েছিলেন, সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে বিশেষায়িত কমিটি গঠনের বিষয়ে সব দল একমত হয়েছে।
সেই কমিটি গঠনে সরকারের তরফে এখনো কোনো পরামর্শ বা কোনো দিকনির্দেশনা আসেনি বলে জানিয়েছে ইসি।
এর আগে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সীমানা নির্ধারণে ইসির পরিবর্তে ‘একটি সীমানা নির্ধারণ কমিশন’ করতে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ করেছিল।
এতে বলা হয়, আলাদা কমিশন গঠন না করা পর্যন্ত ইসির সহায়তায় একটি বিশেষায়িত কমিটি গঠন করা; যেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্বাচন কর্মকর্তা, ভূগোলবিদ, মানচিত্রকার, পরিসংখ্যানবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, তথ্য প্রযুক্তিবিদ, জনসংখ্যাবিদসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত হবেন। এ কাজে দেশি-বিদেশি যেকোনো ব্যক্তি, সংস্থারও পরামর্শ নিতে পারে ইসি।
সংস্কার কমিশন এ সংক্রান্ত আইনের খসড়াও প্রস্তাব করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা অন্য কোনো নির্বাচন কমিশনারকে প্রধান করে এ বিশেষায়িত কমিটি হবে। সীমানা নির্ধারণের পদ্ধতি তুলে ধরে বলা হয়, কমিশন বা বিশেষায়িত কমিটি প্রস্তাবিত এলাকা প্রকাশের পর আপত্তি নিয়ে জেলা পর্যায়ে শুনানি নিয়ে চূড়ান্ত তালিকা গেজেটে প্রকাশ করবে।

অধ্যাদেশ দ্রুত সংশোধনের তাগিদ
এজন্য অধ্যাদেশ দ্রুত সংশোধন এবং অধ্যাদেশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশন যাতে কাজ শুরু করতে পারে; তার প্রস্তুতির তাগিদ দিয়েছেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, “এখন দুটি কাজ সামনে। এটা দুইটা জিনিসের উপর নির্ভর করবে। একটা হচ্ছে ওই অধ্যাদেশটা খুব দ্রুত করে ফেলা এবং তারপর নির্বাচন কমিশনকে খুব দ্রুত বিশেষায়িত কমিটি করে কাজ শুরু করে দেওয়া। এই দুইটা কাজ করলে আমার কাছে মনে হয় যে (সীমানা নির্ধারণ কাজ) ঝুলে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।”
তিনি বলেন, অক্টোবরের মধ্যে বিশেষায়িত কমিটির কাজ শেষে চূড়ান্তভাবে সীমানা নির্ধারণ করা সম্ভব। আর সেটি হলে তফসিল ঘোষণার আগেই নির্বাচনি প্রস্তুতি শেষ করা যাবে।
“এটা ইতিবাচক। একটু সময় লাগলেও যেভাবে কাজটা হবে, এটা নিয়ে প্রশ্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না বললেই চলে। তখন প্রশ্ন করলে কেউ বলবে, ইন্টারন্যাশনাল প্র্যাকটিসগুলো ধরেই কাজ করা হয়েছে। এখানে কারো কোনো ব্যক্তিগত বা কারো পছন্দ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করা হচ্ছে না; বরং একটা স্ট্যান্ডার্ড ধরে করা হচ্ছে। কাজেই এটা নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকবে না।”
প্রতি সংসদ নির্বাচনের আগে ৩০০ আসনের সীমানার খসড়া প্রকাশ করে থাকে ইসি। এ খসড়া প্রস্তাবের ওপর দাবি-আপত্তি শুনানি শেষে চূড়ান্ত সীমানার গেজেট প্রকাশ করা হয়।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, এখনও কোনো খসড়া প্রকাশ করেনি ইসি। তবে ইতোমধ্যে ৭৫টি আসনের বিষয়ে ৬০৭টির বেশি আবেদন এসেছে, যা নিয়ে পর্যালোচনা শুরু হয়েছে।
গেল ১২ মে জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এখন সেই অধ্যাদেশও সংশোধনের কথা বলছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ।
তিনি বুধবার বলেছিলেন, দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী সমাধানে যে ঐক্যমত হয়েছে তা হলো- প্রতি আদমশুমারির অনধিক ১০ বছর পরে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের জন্য সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদের দফা এক এর গ শেষে আইনের দ্বারা একটি বিধান যুক্ত করা। এর অর্থ হচ্ছে সংসদীয় আসন নির্ধারণ করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা।
“এই কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সীমানা নির্ধারণের আইন ২০২১, যেটা ২০২৫ সালে সংশোধিত হয়েছে, আমরা সংবিধানে কিছু বিষয় যুক্ত করার কথা বলেছি। তার পাশাপাশি সেটাকে বাস্তবায়ন করার জন্য কমিটির পরিধি ও কার্যপরিধি গঠন নিয়ে সুনির্দিষ্ট আইনের কথা বলেছি।”
সীমানা নির্ধারণে ‘গাইডলাইন’ অনুসরণের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ইতোমধ্যে বলেছেন, “সীমানা পুনর্নির্ধারণ আমাদের যে আইন আছে, সেই আইন অনুযায়ী হবে। যেমন আইনে যে জিনিসগুলো আছে- প্রশাসনিক অখণ্ডতা, ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, ভোটার সংখ্যা ও ঐতিহাসিক ভিত্তিও সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেব।”
• ১৯৭৩ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সীমানা নির্ধারণ মোটামুটি একই পদ্ধতিতে হয়। তখন সীমানা নির্ধারণ নিয়ে বিশেষ কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।
• ২০০৮ সালে সীমানা নির্ধারণে জনসংখ্যার ঘনত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।
• নবম সংসদ নির্বাচনের সময়- কোনো জেলার আসনসংখ্যা দুটির কম হবে না, পার্বত্য তিন জেলায় একটি করে এবং ক্ষুদ্র জেলা মেহেরপুরে দুইটি আসন বরাদ্দ রাখা হয়। ঢাকায় ১৩টি থেকে আসন হয় ২০টি।
‘সময় লাগবে সর্বোচ্চ তিন মাস’
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আব্দুল আলীম শুক্রবার বলেন, “প্রথম বিষয় হচ্ছে- আমাদের যে সুপারিশটা, প্রস্তাবিত আইনটা খসড়া আমরা করে দিয়েছি। তাতে বলেছি- ডেলিমিটেশন একটা টেকনিক্যাল কাজ।
“এই জন্যই টেকনিক্যাল লোকদের সমন্বয়ে একটা বিশেষায়িত কমিটি হবে। যে কমিটি নির্বাচন কমিশনের আন্ডারেই কাজ করবে; ইলেকশন কমিশন ফর্ম করবে।”
সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ের অভাবে এতোদিন কাজটি না হলেও এখন ঐকমত্য কমিশন উদ্যোগ নেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন নির্বাচন বিশ্লেষক আলীম।
“এখন আমি খুশি যে- শেষ পর্যন্ত এই কাজটা হয়েছে ঐকমত্য কমিশনে। এখন এই ভিত্তিতে নতুন করে হয়তো অধ্যাদেশ আকারে এটা জারি হবে। সংশোধিত অধ্যাদেশ করতে কয়েকদিন সময় লাগবে, চাইলে দ্রুত করে ফেলা সম্ভব।”
আব্দুল আলীম বলেন, মে মাসের শুরুতে একটি সামান্য সংশোধনী দিয়ে অধ্যাদেশ জারির পর ইসি সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু করে দিয়েছে। সীমানা নির্ধারণ নিয়ে গত তিনটি নির্বাচনে অসংখ্য প্রশ্ন আছে, এ নিয়ে বিদ্যমান আইন পরিবর্তনের দাবি সংস্কার কমিশনে তোলে অনেক মানুষ।
“আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে এ আইনটা আমরা প্রস্তাব করেছিলাম। এখন এটা করাতে ইলেকশন কমিশন যে খুব বড় ধরনের ঝামেলায় পড়বে- তা না। যদি অধ্যাদেশ খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যায়, ইলেকশন কমিশন খুব দ্রুত একটা বিশেষায়িত কমিটি ফর্ম করে, তাহলে আমার কাছে মনে হয় সীমানার কাজ শেষ করতে সর্বোচ্চ তিন মাস লাগবে।”
জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে বিশেষায়িত কমিটির কাজ শেষ করা সম্ভব বলে মনে করেন আব্দুল আলীম। তার ভাষ্য, দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তি শেষে নভেম্বরের মধ্যে চূড়ান্তভাবে সীমানার গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব।
সীমানা নির্ধারণ কমিটিতে 'একমত', তত্ত্বাবধায়কে 'নানা মত': আলী রীয়াজ
স্থানীয় বিএনপি নেতারা ইসিতে, ২০০১ এর সীমানা বহাল রাখার দাবি
সীমানা নির্ধারণ আইনের ‘জটিলতা’ কাটাতে সংশোধন প্রস্তাব পাঠাবে ইসি
আসন সীমানা: খসড়ার আগেই ৬০৭ আবেদন, নিষ্পত্তি কীভাবে?
সংসদীয় আসনের সীমা নির্ধারণে ভোটার সংখ্যাও বিবেচনার প্রস্তাব