Published : 29 Dec 2025, 11:50 AM
জীবনে কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, যাঁরা কেবল ব্যক্তি নন—একটি সময়, একটি সাহিত্যধারা ও একটি জীবনদর্শনের প্রতিনিধিত্ব করেন। জ্যোতির্ময় দত্ত ও মীনাক্ষী দত্ত ছিলেন তেমনই দু’জন মানুষ। তাঁদের কথা মনে পড়া মানেই বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল অথচ নীরব অধ্যায়ের দিকে ফিরে তাকানো। আর শিল্প-সাহিত্যের বাইরেও তাঁদের আছে আরেক পরিচয়। তাঁরা আমাদের পরম ভালোবাসার মানুষ। আত্মার আত্মীয়।
জ্যোতির্ময় দত্ত ছিলেন কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও অধ্যাপক। কলকাতা থেকে সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যপত্রিকা ‘আড়িয়ালখাঁ’। ষাটের দশকে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সূত্রে তিনি বহির্বিশ্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করলেও তাঁর চিন্তা ও জীবনদর্শন ছিল নির্ভীক, বোহেমিয়ান এবং গভীরভাবে সাহিত্যনিষ্ঠ। আর মীনাক্ষী দত্ত—তিনি শুধু কবি বুদ্ধদেব বসুর কন্যা নন, নিজেই এক স্বতন্ত্র সাহিত্যসত্তা। ডক্টর জিভাগো–সহ বহু ধ্রুপদি গ্রন্থের অনুবাদক, স্মৃতিগদ্যগ্রন্থ ‘অ্যালবাম থেকে কয়েকজন’ ও ‘তুষার কুসুম’–এর লেখক।
এই দম্পতির সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০৪ সালে নিউ ইয়র্ক বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এক অনুষ্ঠানে। এরপর নানা সাহিত্যসভা ও আড্ডায় তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হতো। কখনো নিউ ইয়র্কে, কখনো নিউজার্সিতে তাঁদের বাড়িতে। এই সম্পর্কের ভেতর ছিল আন্তরিকতা, শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘ প্রবাসজীবনের নীরব সখ্য।
মনে পড়ে ২০১৯ সালের এক শনিবারের কথা। লেখক হাসান ফেরদৌস জানালেন—জ্যোতিদা ও মীনাক্ষীদি আমেরিকার পাট চুকিয়ে চিরতরে কলকাতায় ফিরে যাচ্ছেন। এই খবর শোনামাত্রই মন ভারী হয়ে উঠেছিল। প্রবাসে এমন বিদায় মানেই অনেক সময় শেষ দেখা। তাই দ্বিধা না করে তাঁদের বিদায় আড্ডায় যোগ দিলাম।
জ্যোতিদা আর মীনাক্ষীদি নিউজার্সিতে যে বাড়িটায় থাকতেন সেটি শহর থেকে কিছুটা ভেতরের দিকে। রাস্তায় মানুষজনের হৈ হল্লা নেই, খুব আবাসিক এলাকা চারপাশটা নিরিবিলি আর চুপচাপ। যাঁরা নিউইয়র্কে থাকেন তাঁদের জন্য একটু বেশি পরিমাণেই সুনসান এলাকা বলা যেতে পারে। নিউ ইয়র্ক থেকে হাসান ভাইয়ের গাড়ি ড্রাইভ করে আমাদের যাত্রাপথ নিউজার্সির জ্যোতিদা এবং মীনাক্ষীদির বাড়ি। গাড়ির স্টিয়ারিং আমার হাতে। কানেকটিকাট থেকে গল্পকার নসরত আজাদ আসার কথা ছিল। কিন্তু সময়ের কারণে তিনি আসতে পারেননি। গাড়ির সামনের সিটে আমার পাশে বসে আছেন রানু ভাবি। পেছনে লেখক হাসান ফেরদৌস, লেখক আহমাদ মাযহার এবং অভিনয় শিল্পী শিরীন বকুল। লেখক আবেদীন কাদের তখন নিউ জার্সিতেই থাকেন। নিউ জার্সিতে তাঁর বাড়ি থেকেই তিনি আমাদের আড্ডায় অংশ নেবেন বলে হাসান ভাইকে জানিয়েছিলেন । বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই বাড়ির ভেতরের ঝলমলে আলো চোখে পড়ছিলো। ঠিক বুঝতে পারছিলাম জ্যোতিদা এবং মীনাক্ষীদি আমাদের অপেক্ষায় বসে আছেন। বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতেই জ্যোতিদার সেই উচ্চকন্ঠের হোহো করা হাসি বাড়ির চার দেয়ালে ধাক্কা খেল। মীনাক্ষীদি আমাদের দেখেই এক বুক ভালোবাসা দিয়ে আমাদের স্বাগত জানালেন। এদিকে সবার সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করে টেবিলে বসতে না বসতেই জ্যোতিদা রেড ওয়াইনের একটা বোতল হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘আদনান, আগে গলা ভিজুক। তারপর আড্ডা।’ আমি অনভিজ্ঞ হাতে বোতল খুলতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। আমার এই নাকাল অবস্থা দেখে আমাকে উদ্ধার করলেন লেখক আহমাদ মাযহার। লাল টকটকে আঙুরের কোমনীয় রস আমাদের সবাইকে আরেক দফা স্বাগত জানালো। ততক্ষণে বাঙালি আড্ডা জমে উঠেছে। সবাই তখন নানা বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ঘুরেফিরে জ্যোতিদা আর মীনাক্ষীদি। তাঁরা সহসাই কলকাতা ফিরে যাবেন। বলার অপেক্ষা রাখে না এটি আমাদের জন্যে ছিল চরম দুঃখের সংবাদ।
শুরু হলো বাঙালি আড্ডা। জ্যোতিদার জীবনের বিচিত্র গল্প—নৌকায় সমুদ্রযাত্রা, শ্রীলঙ্কা যাওয়ার দুঃসাহস, গান্ধীবাদের টানে খালি পায়ে হাঁটা, অফিসে জুতো না পরার দৃঢ় সিদ্ধান্ত—সবকিছুই তাঁর মুখে ছিল হাসি ও দার্শনিক গভীরতায় ভরা। তিনি বলেছিলেন,
“এই জগৎ সত্যি নয়। এই দেখার পেছনেও আছে আরেক না-দেখার খেলা।”
‘আপনিতো অস্থিমজ্জায় একজন জাত বোহেমিয়ান। শুনেছি আপনি নৌকায় চড়ে বাংলা ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একবার নাকি নৌকা করে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। কত কি কান্ড! একটু বলেন না! জ্যোতিদা!’
ডাইনিং টেবিলকে ঘিরে আমরা যখন বসে গাল গপ্পে ব্যস্ত তখন আমিই জ্যোতিদাকে প্রশ্ন করে বসলাম।
জ্যোতিদা এমনিতেই আড্ডার মুডে আছেন। তার উপর সেই পুরনো স্মৃতি আবার মনে করিয়ে দিতেই তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। তিনি আমার চেয়ারের পেছনে এসে পেছন দিক থেকে আমার কাঁধে হাত রাখলেন তারপর বলতে শুরু করলেন।
‘আহা! কত কত গল্প! সাগর পথে কত বাঁধা! একবার একপাল হাঙরের পাল্লায় পরলাম। আবার আরেকদিনতো বড় তিমির পিঠের ধাক্কায় আমরা উল্টে পরে যাই আরকি! যে কোন মুহূর্তেই আমাদের ডিঙিটা উল্টে যেত! কিন্তু কপাল ভালো ছিল। তিমিটা চলে গেল। কেন সে ফিরে গেল সে এক বড় রহস্য! তা নাহলে ইহলীলা সাঙ্গ হত নিশ্চয়ই! কিন্তু প্রকৃতির কাছে আমাদের হার মানতেই হয়। আমাদের ‘মণিমেখলা’ খুবই ক্ষতি হয়েছিল। শ্রীলঙ্কা আর যাওয়া হল না।
‘মনিমেখলা’? মানে আপনার নৌকা?’
‘হ্যাঁ। নৌকা।’
‘কত কি কাণ্ড ঘটেছে আপনার জীবনে জ্যোতিদা! একবার নাকি মাথায় গান্ধীবাদের শখ চেপেছিল! নিরামিষ খাওয়া শুরু করে দিলেন। রাস্তায় খালি পায়ে হাটছেন! কেন এই আত্মানিমজ্জন?’
জ্যোতিদা এই প্রশ্নের উত্তর দিবেন না বলেই হয়তো ফিক করে হেসে দিলেন। তারপর বললেন, ‘সেই সত্যকে এখনো খুঁজি। এই খোঁজার কি শেষ আছে? কী? কিছু বুঝতে পারলে?’
‘যে সত্যটাকে খুঁজছেন সেটি খুঁজে পেয়েছেন?’
‘মনে হয় পেয়েছি। এই জগৎ সত্যি নয়। সত্যি নয় মোটেও! এই দেখার পেছনেও রয়েছে আরেক না দেখার খেলা। এই আলোর পেছনে রয়েছে আরেক নতুন আলোর নাচন!’
‘এইতো অসাধারণ এক কবিতা হয়ে গেল?’ আমি লাল টুকটুকে আঙুরের রসে ঠোট ছুঁইয়ে বললাম।
‘আমরা সবাই কবি। কবিতা হবে না?’ এই বলেই তিনি আবার উচ্চস্বরে হেসে দিলেন।
কিন্তু আমার মাথায় তখন কিছু প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে। আবার প্রশ্ন।
‘আচ্ছা, আপনি নাকি অফিসেও খালি পায়ে যেতেন? কোন বাঁধা আসতো না?’
‘বাঁধা? কে দিবে বাঁধা?’ জ্যোতিদা আমার কথা শুনে আবার আরেক প্রস্ত হাসলেন। তারপর রেড ওয়াইনে ঠোঁট স্পর্শ করে বললেন,
‘এটাই ছিল আমার চাকরীর অন্যতম শর্ত। আমি জুতো পরবো না। তোমরা কি করবে করো। একবার পত্রিকা থেকে বলেছিল অন্তত অফিসে যেন জুতো পরে আসি।’
‘কোন পত্রিকার কথা বলছেন জ্যোতিদা?’
‘হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড।’
‘আচ্ছা। তারপর?’
‘তারপর আর কী? আমি সোজা মানা করে দিলাম। জুতো আমি পরতে পারবো না।’
‘তাহলে এই নিয়ে কেউ কোন বিরূপ মন্তব্য বা কটাক্ষ করতো না?’ পাশে বসে থাকা আহমাদ মাযহারের প্রশ্ন।
মাযহার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে এবার জ্যোতিদা বললেন,
‘করতো না মানে? আমি নিজের কানে শুনেছি। একদিন আমার সহকর্মী বরুণ সেনগুপ্ত বলেই ফেললেন এই যে খালিপদ এলেন। কিন্তু আমি কারো কথায় কোন গা করিনি।’
এবার হাসান ফেরদৌস ভিন্ন একটা প্রশ্ন করলেন জ্যোতিদাকে।
‘ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎকারটি নিয়েও তো সেই একই ঝামেলা ছিল জ্যোতিদা! প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নিতে আনন্দবাজার আর হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড আপনাকেই নির্বাচন করেছিল। কিন্তু সেখানেও আপনি গোঁ ধরলেন জুতো পরে যাবেন না? তাই না?’
‘ঠিক বলেছ হাসান। সেতো অনেক পুরনো গল্প! অনেক দেনদরবারের পর প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রনালয় থেকে আমাকে বলে দিয়েছিল “জুতো পরতে হবে না, শয়নকক্ষে ব্যাবহার করা হয় এমন একজোড়া স্লিপার কয়েক মিনিটের জন্যে পরলেই চলবে।” আমি তাতেই রাজি হয়েছিলাম।’
‘জ্যোতিদা, আপানার জীবনের এই বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলো কোথাও কোন জার্নালে লিখে রেখেছেন?’ আমি প্রশ্ন করলাম জ্যোতিদাকে।
‘কেন ? অনেক কথাইতো আছে আমার স্মৃতিকথা ‘আমার নাইবা হলো পারে যাওয়া’ গ্রন্থটিতে। এখনো পড়ো নাই?’
এর মধ্যে হুট করে মীনাক্ষীদি আমাদের কথায় যোগ দিলেন। মীনাক্ষীদি অসম্ভব গুণী এক মানুষ। মানুষকে খুব দ্রুত আপন করে নেয়ার শক্তি তাঁর প্রবল। মীনাক্ষীদি আমাদেরকে সবসময় নিজের ঘরের মানুষই মনে করেন। আর বুদ্ধদেব বসুর যথার্থ কন্যা বলে কথা! মনে প্রাণে তিনি আমাদের পূর্ব বাংলার লোক। আমি তাঁকে সবসময় হাসতে হাসতে বলতাম ‘আপনিতো আমাদের বাংলাদেশের কইন্যা।’ এ কথা বললে মীনাক্ষীদি মুচকি হাসতেন। মীনাক্ষীদির সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে চলে এল কবি জীবনানন্দ দাশ প্রসঙ্গ। জীবনানন্দ দাশ তাদের বাড়ির খুব কাছাকাছিই থাকতেন।
মীনাক্ষীদির স্মৃতিচারণে ডুব দিলেন।
‘খুব চুপচাপ থাকতে পছন্দ করতেন। একদিনের কথা মনে আছে। আমরা সম্ভবত কোন নাটকের জন্যে পরিচিত বন্ধুদের কাছ থেকে চাঁদা উঠাচ্ছি। জীবনানন্দ দাশ আমাকে তাঁর বাড়ির সামনে ডেকে নিয়ে আমার হাতে ৫ টাকা ধরিয়ে দিলেন। তারপর আবার নিঃশব্দে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেলেন। খুব চুপচাপ মানুষে ছিলেন তিনি।’
শনিবারের চিঠিতে তো তাঁকে খুব সমালোচনা করতো।
‘সজনীকান্ত দাস এভাবে জীবনানন্দের পেছন কেন লেগেছিলেন মীনাক্ষীদি? আপনার কী মনে হয়?
মাযহার ভাইয়ের প্রশ্ন শুনে মীনাক্ষীদির ঠোটে সেই চিরচেনা হাসি আবার ফুটে উঠলো। তিনি অনেকটা বাচ্চা মেয়েদের মতই বলতে শুরু করলেন।
‘জানো নিশ্চয়ই। আমাদের বাঙালিদের দুটো দিক আছে। একটি হল অতি ভক্তিতে তারা গদগদ প্রশংসায় ডুবে যায়। আর দ্বিতীয় হল ঈর্ষা। বাঙালি খুব ঈর্ষাপরায়ণ জাতি। শনিবারের চিঠিতে যারা রবীন্দ্রনাথের কুৎসা করতো ঠিক তারাই আবার বুদ্ধদেব বসু বিদেশ গিয়ে নাকি রবীন্দ্রনাথের নিন্দা করেছেন এ ধরনের জঘন্য মিথ্যা কথাও ছড়াতো। এখন বোঝো! সেই একই লোকগুলো আবার জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় কেন ‘বরফকুচির মতো স্তন’ লিখলো সেই নিয়ে তাকে আক্রমণ করলো। এই সংস্কৃতি থেকে বাঙালি এখনো বের হতে পারেনি। আর পারবেও না।’
‘আচ্ছা দিদি, মীনাক্ষী নামটি কবিগুরুর দেয়া। তাই না?’ রানু ভাবির প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ। কিন্তু তুমি জানলে কি করে?’
‘না, আপনিই অনেক আগে একবার বলেছিলেন। ভুলে গিয়েছিলাম। আবার যদি বলেন?’ রানু ভাবি চোখে মিনতির রং ফুটিয়ে মীনাক্ষীদির দিকে তাকিয়ে আছেন।
‘আহা! এই গল্পটি কত বার বলেছি! শোন তাহলে। মা-বাবা(বুদ্ধদেব বসু আর প্রতিভা বসু) প্রায় সময়ই কবিগুরুর ওখানে যেতেন। কখনো কখনো তাঁর সাথে বেশ সময় ধরে থাকতেন, শিল্প-সাহিত্যের নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। একদিন মা খুব লজ্জায় ইতস্তত করে কবিগুরুকে বললেন, “আমার মেয়ের একটা নাম দিন।” কবিগুরু কিঞ্চিৎ অভিমান করে বলেছিলেন, “কেন তুমি তোমার কবি স্বামীর কাছে যাও। সেই একটা নাম রাখুক।” কিন্তু আমার মা নাছোড়বান্দা। তিনি কবিগুরুকে জোড় করে ধরলেন, “আপনাকেই নামটি ঠিক করে দিতে হবে।” তারপর কবি গুরু বললেন, “নামতো লেখাই আছে।” এই বলে কবি গুরু একটা নোটবুকের পাতা দেখালেন। সেখানে লেখা রয়েছে ‘মীনাক্ষী’। রানু ভাবির পাল্টা প্রশ্ন।
‘কবিগুরুকে নিয়ে আপনার কোন স্মৃতি আছে?’
‘তখন আমি খুব ছোট। রবীন্দ্রনাথ আমাকে একটা লজেন্স দিয়েছিলেন। এই স্মৃতিটাই শুধু মনে আছে। আরেকটা স্মৃতিও আছে। রবীন্দ্রনাথ বসে আছেন। আমরা সবাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে গেছি। বাবা রবীন্দ্রনাথকে প্রণাম করলেন। এই প্রথম দেখলাম বাবা কাউকে প্রণাম করছেন! বাবা কখনোই কাউকে প্রণাম করতেন না।’
‘আপনার বাবা বিখ্যাত বুদ্ধদেব বসু সম্পর্কে যদি বলতে বলা হয় তাহলে এক কথায় কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?’ আমি প্রশ্ন করলাম মীনাক্ষীদিকে।
‘অসাধারণ মানুষ। নিজের বাবা বলে নয়। মনে প্রাণে অসম্ভব আধুনিক একজন মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর এই আধুনিক মনস্কতার ছাপ ছিল তাঁর সাহিত্যে এবং ঘরে আমাদের স্বাভাবিক জীবনেও।’
‘আর আপনার বাবার সবচেয়ে ভালো লেখা কোনটি? কন্যা হিসেবে আপনার কোন পক্ষপাতিত্ব আছে কি?’ মাযহার ভাইয়ের দ্রুত প্রশ্ন।
‘সেকি? পক্ষপাতিত্ব থাকবে কেন? তাঁর সব লেখাই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ। মা আর বাবা দু’জনকে নিয়েই আমি গর্বিত। বাবা লেখালেখিতে মগ্ন থাকতেন। মাও তাঁর লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তবে বাবার খুব খেয়াল রাখতেন।’
আড্ডা যখন তুঙ্গে তখন মীনাক্ষীদিদের একজন আমেরিকান বন্ধু আমাদের চায়ের কথা স্মরণ করে দিয়ে আপাতত আড্ডায় বিরতি টানলেন। আমি, হাসান ভাই, বকুল আপা, রানু ভাবি সবাই সেই আমেরিকান মহিলার সঙ্গে চলমান নানা বিষয় নিয়ে রীতিমত সিরিয়াস আড্ডা। বিশেষ করে হাসান ভাইয়ের নানা রকম প্রশ্নবানে সেই মহিলা তখন রীতিমত পর্যদুস্ত। এদিকে মাযহারকে দেখা গেল জ্যোতিদার সঙ্গে সাহিত্যের জটিল কোন বিষয় নিয়ে আড্ডায় ডুব দিতে। এইতো আড্ডার আনন্দ! বাঙালি আড্ডা নানা ভাবে ডালপালা গজাবে এই স্বাভাবিক! চায়ের কথা উঠতেই আমরা সব চা-খেকোর চায়ের গরম কেতলির দিকে লোভাতুর চোখ নিয়ে এগিয়ে গেলাম।
আবার জ্যোতিদার মঞ্চ কাঁপিয়ে আগমন। খুব চিন্তিতভাবে বললেন ‘আবেদীন এখনো এলো না। কিন্তু আমি জানি ওঁ ঠিক এসে পড়বে।’ বোঝা যাচ্ছিল জ্যোতিদা আবেদীন ভাইয়ের অনুপস্থিতি খুব দরদ দিয়ে অনুভব করছিলেন। কিন্তু কি আর করা! অনেক সময় জীবনের কত কিছুই অপূরণীয় থেকে যায়। এই ছোট জীবনে সব কিছুই কি মানুষ পায়? কিছুক্ষণ পরই আবেদীন ভাই হাসান ভাইকে কল দিয়ে জানালেন তিনি পথ ভুল করে অন্য কোন রাস্তায় চলে গেছেন। তাই আর আশা হচ্ছে না। শুনে মীনাক্ষীদিও খুব আফসোস করলেন।
এরই মধ্যে জ্যোতিদা বকুল আপাকে অনুরোধ করলেন কোন নাটিকা থেকে পাঠাভিনয় করতে। বকুল আপা বুদ্ধদেব বসুর ‘প্রথম পার্থ’ থেকে পাঠাভিনয় করলেন। আমরা মগ্ন হয়ে সবাই বকুল আপার অসাধারণ অভিনয় দেখলাম। পাঠাভিনয় শেষ হতেই জ্যোতিদা আনন্দে টেবিল চাপড়ে আনন্দ প্রকাশ করলেন।‘অসাধারণ!’
‘আপনার ঢাকার কোন স্মৃতি নেই?’ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মীনাক্ষীদিকে প্রশ্ন করি।
‘অবশ্যই। আমরাতো পূর্ব বঙ্গেরই মানুষ! তাই না! ঢাকার বকশীবাজারের বাড়িটার প্রচুর স্মৃতি এখনো মনে আছে। এখনো মনে আছে সেই বেলকনিটার কথা।’
‘আপনার মার বিশেষ কোন স্মৃতির কথা বলবেন?’ রানু ভাবির প্রশ্ন।
‘অসাধারণ এক মহিলা ছিলেন তিনি। সব কিছু সুন্দর করে সামলাতেন। লেখালেখি করতেন, ছবি আঁকতেন, শেলাই করতেন আবার রান্নাও করতেন।’
‘সম্প্রতি বাংলাদেশের কোন সাহিত্য কি পড়েছেন?
কিন্তু প্রশ্নটা কেড়ে নিলেন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যোতিদা। ‘খুব পড়েছি। এক গুচ্ছ শামসুর রাহমানের কবিতা পড়েছি এই ক’দিন আগেই। অসাধারণ! আর আল মাহমুদের কবিতাও আমাকে প্রচুর টানে। সেদিন পড়ছিলাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে। কি আসাধারণ তাঁর গদ্য!’
এবার হাসান ভাই গুরুগম্ভীর পরিবেশটা আরেকটু হালকা করার জন্য প্রশ্ন করলেন।
‘জ্যোতিদা, বিষয়টা আমরা জানি। আপনি আগেও বহুবার বলেছেন। তবু আবার শুনতে চাই। মীনাক্ষীদির প্রেমে যখন পড়লেন তখন কি ভাবে সব কিছু সামলে নিলেন? আপনিতো পড়াশুনা করেছেন দক্ষিণ ভারতে। বাংলার চেয়ে ইংরেজিতেই লিখতে এবং বলতে পছন্দ করতেন। শুনেছি মীনাক্ষীদিকে উদ্দেশ্য করে একটা ইংরেজিতে লেখা প্রেমের কবিতা লিখেছিলেন? সেই গল্পটা আবার বলুন না! শুনি?’
আগেও দেখেছি এবারও আবিস্কার করলাম জ্যোতিদা এই বিষয় নিয়ে আলাপ করতে সবসময় বেশি আগ্রহী। এদিকে মীনাক্ষীদিও কম যান না! তিনিও যেন জ্যোতিদার চোখে প্রেমার্ত নয়নে তাকালেন! জ্যোতিদা তাঁর স্বভাবসুলভভাবে শরীর দুলিয়ে বলতে শুরু করলেন।
‘মীনাক্ষীর আশেপাশে তখন অনেকেই ঘুরে বেড়ায়। আমি ভাবলাম বুদ্ধদেব বসুর কন্যা। একটা ইংরেজিতে প্রেমের কবিতা লিখি। কিন্তু মীনাক্ষী বললেন “বাংলায় লিখে নিয়ে এসো”। ব্যস। বুঝতে পারলাম কাজটি এগুচ্ছে।’ বাক্য শেষ করতে করতেই জ্যোতিদা হাস্যরস চোখ নিয়ে মীনাক্ষীদির দিকে তাকালেন। আমরা সবাই হাস্যরসে জ্যোতিদার ঘরটা তাতিয়ে রাখি। রাত যত গভীর হয় বাঙালি আড্ডা ততই যেন গরম হতে থাকে। এতো জানা কথা!
মীনাক্ষীদি ছিলেন এই উচ্ছ্বাসের শান্ত প্রতিস্বর। জীবনানন্দ দাশের নীরবতা, শনিবারের চিঠিতে তাঁকে ঘিরে সমালোচনা, বাঙালির ঈর্ষাপরায়ণ মন—সবকিছু তিনি স্মৃতির আলোয় তুলে ধরেছিলেন। বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথের দেওয়া তাঁর নামের গল্প, বাবার কথা—বুদ্ধদেব বসুর আধুনিক মন ও স্বাধীন চিন্তার কথা। ঢাকার বকশীবাজারের বাড়ি আর পূর্ব বাংলার স্মৃতিও তাঁর কণ্ঠে ফিরে এসেছিল বারবার। কত কথা সেদিন ছিল তাঁর মুখে!
জ্যোতিদা আর মীনাক্ষীদির সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল নিউ ইয়র্কে লেখক এবং প্রাবন্ধিক হাসান ফেরদৌসের বাসায়। সেটিও সম্ভবত ২০১৯ সালে। সেটাই ছিল তাঁদের সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা। সেদিন জ্যোতিদা এবং মীনাক্ষীদি দু’জনই এসেছিলেন মূলত আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে। তাঁরা আমেরিকার পাট চুকিয়ে চলে যাচ্ছেন শান্তিনিকেতনে তাঁদের বাড়িতে। উদ্দেশ্য জীবনের শেষদিনগুলি সেখানেই কাটাবেন। মীনাক্ষীদি বছর দুই হয়ে গেল চলে গেলেন। জ্যোতিদাও গতকাল চলে গেলেন। না, তাঁদের সঙ্গে আর দেখা হলো না। এইতো জীবনের নিয়তি। প্রিয় মানুষদের ছেড়ে এভাবেই চলে যেতে হয়।
তবু মনে হয়, তাঁরা যান নি। জ্যোতির্ময় দত্ত ও মীনাক্ষী দত্ত থেকে গেছেন তাঁদের লেখায়, স্মৃতিতে, আর সেইসব সন্ধ্যায়—যেখানে আলো জ্বলে, আড্ডা বসে, আর বাংলা ভাষা নীরবে নিজেকে ছুঁয়ে দেখে। তাঁরা পরম ভালোবাসায় আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। জ্যোতিদা, আপনাকে এ কারণেই বিদায় জানাবো না। আপনিই তো লিখেছেন, ‘আমার নাইবা হলো পারে যাওয়া’। আপনি চির শান্তিতে থাকুন।