২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯ কার্তিক ১৪৩৩

আনা ইসলামের ‘নভেরা’: অন্তরঙ্গ উন্মোচন ও রহস্যমোচন

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

Published : 24 Jun 2020, 12:18 AM

Updated : 23 Jun 2022, 03:59 PM


যতই সময় যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প একুশের বইমেলাকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, যেন বইমেলার আগে বা পরে মানুষ বই কেনে না। অন্য দিকে, প্রতি বছর একুশে বইমেলা উপলক্ষে বই প্রকাশের সংখ্যা বাড়ছে। এটা খুব যে একটা সুখবর তা নয়। ২০১৮ সালে চার হাজার ৫৯১টি এবং ২০১৯ সালে চার হাজার ৮৩৪টি বই একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল। বড় সংখ্যা কিন্তু সত্যিকার অর্থে কেনার মতো বই খুব বেশী থাকে না। শত শত প্রকাশনা সংস্থা টিকে আছে পুরোনো বইয়ের নতুন সংস্করণ প্রকাশের মধ্য দিয়ে : কপিরাইট উঠে গেছে এমন বইয়ের বিভিন্ন সংস্করণ করছে বিভিন্ন প্রকাশনালয়। অনেকেই ভারতীয় গ্রন্থের বাংলাদেশী সংস্করণ করছে। যারা নিয়মিত বই কিনতে আগ্রহী তাদের বিদেশী বই না-কিনে গত্যন্তর নেই। এরকম ক্রমাঘনায়মান দুরবস্থার মধ্যে ২০২০ এ প্রকাশিত "নভেরা বিভুঁইয়ে স্বভূমে" একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এর রচয়িতা প্যারিসনিবাসী আনা ইসলাম। যৌথভাবে গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ ও জার্নিম্যান বুকস্। শক্ত বাঁধাইয়ের ৩১২ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ১,৫০০ টাকা।

আয়তনে সুপরিসর হলেও বইটির মূল টেক্সট ১১০ পৃষ্ঠা। মূল টেক্সটের মধ্যে প্রয়োজন মতো রয়েছে বেশ কিছু ফটো গাঁথা। মূল টেক্সটের পর রয়েছে সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জী যার পরে রয়েছে ভাস্কর্য ও চিত্রকর্মের ফটোসহ ভাস্কর নভেরা আহমেদের বহু দুর্লভ ছবি। বইটির মূদ্রণ সৌকর্য প্রশংসার দাবী রাখে; প্রচ্ছদ, বাঁধাই ইত্যাদি চমৎকার। সংগ্রহে রাখার মতো এবং উপহার দেয়ার মতো একটি সুশোভন বই। এটি প্রকাশের উদ্যোগ নেয়ার জন্যে দুই প্রকাশককে অভিনন্দন।
নভেরা আহমেদকে পূর্ব-বঙ্গের আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃত গণ্য করা হয়: রামকিঙ্কর যেমন ভারতের, নভেরা আহমেদ বাংলাদেশের। এই দাবী নিয়ে কোনো বিসম্বাদ নেই। তার আবির্ভাব ধূমকেতুর মতো। বাংলায় তার কোনো পূর্বজ নেই। ১৯৬১-৬২ তে পাকিস্তানের জাতীয় শিল্প প্রদর্শনীতে তার ভাস্কর্য যখন প্রথম পুরস্কার লাভ করেছে, তারও ২-৩ বছর পরে পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকা আর্ট কলেজে ভাস্কর্য বিভাগ খোলা হয়।

আনা ইসলামের এ প্রকাশনাটি একটি আকরগ্রন্থ বললে ভুল হবে না। স্বল্প পরিসরে তিনি নভেরা আহমেদের জীবন ও কীর্তির ওপর যথেষ্ঠ আলোকপাত করেছেন। নভেরা আহমেদের জীবন ও কর্ম নিয়ে যারা গবেষণা করছেন এই আকরগ্রন্থটি তাদের কাছে অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হবে।

এ গ্রন্থে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমত : নভেরা আহমেদের জন্মসাল নিয়ে যে বিতর্ক দীর্ঘ দিন যাবৎ চলমান তার নিরসন হয়েছে আনা ইসলামের অনুচ্চকণ্ঠ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে। আনা ইসলাম নভেরা আহমেদকে কাছে থেকে দেখার দুর্লভ সুযোগ লাভ করেছিলেন। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা এ গ্রন্থে বিবৃত করেছেন। তবে ব্যক্তিগত যোগাযোগ সত্ত্বেও আনা ইসলাম নভেরা আহমেদের মুখ থেকে সঠিক জন্মতারিখ জেনে নিতে পারেন নি। তাই গ্রন্থের শেষভাগে জীবনপঞ্জীতে জন্ম ১৯৩৯ বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু সন্দেহ থাকায় বন্ধনীতে লিখেছেন 'ক্যাটালগে উল্লিখিত'।
নভেরা আহমেদ বলেছেন তার জন্মসাল ১৯৩৯। নভেরা আহমেদের বাংলাদেশী পাসপোর্টেও তার জন্ম সাল ১৯৩৯ দেয়া আছে। ব্রুসেলস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ১৯৭৪-এ তাকে প্রথম বাংলাদেশী পাসপোর্ট দেয়া হয়েছিল। প্যারিসস্থ দূতাবাস থেকে দেয়া পরবর্তী পাসপোর্টগুলোতেও একই তারিখ অনুবর্তিত। তার পাকিস্তানী পাসপোর্টে জন্মসাল কী লিখিত ছিল তা কৌতূহলের বিষয়। একই কারণে ১৯৬২তে জালাল উদ্দীনের লেখা "আর্ট অব পাকিস্তান" গ্রন্থে (২য় সংস্করণ) নভেরা আহমেদের জীবনীতথ্যে জন্মসাল ১৯৩৫ কীসের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল তা-ও কৌতূহল জাগায়। মৃত্যুর কিছু আগে ২০১৪ তে নভেরা আহমেদের যে অতীতাবলোকন চিত্রপ্রদর্শনী প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তার ক্যাটালগেও তার জন্মসাল ১৯৩৯।

কিন্তু ১৯৩৯ সাল যে অনপনেয় অসঙ্গতির সৃষ্টি করে তা এই যে বড় বোনের সঙ্গে থাকার জন্যে ১৯৫০-এ নভেরা আহমেদ লন্ডন চলে গিয়েছিলেন; ১৯৫১-তে ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসের মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন। এর মানে হলো মাত্র ১১ বৎসর বয়সে নভেরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। এ বয়সে তো তার স্কুলের গণ্ডিও পেরোনোর কথা নয়। বাস্তবে লন্ডনে যাওয়ার আগেই তিনি কলকাতা থেকে ম্যাট্রিকুলেট করেছিলেন এবং ১৯৪৭-এ পাকিস্তান হওয়ার পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। অধিকন্তু লন্ডন যাওয়ার আগেই তার বিয়ে ও তালাক হয়েছিল। ১৯৩৯ বিশ্বাসযোগ্য নয় বলেই আনা ইসলাম তাঁর গ্রন্থে নভেরা আহমেদের জন্মসাল ২৯ মার্চ ১৯৩৯ লিখে বন্ধনীর মধ্যে 'ক্যাটালগে উল্লিখিত' টীকা দিতে ভুল করেন নি।
কিন্তু প্রণিধাণযোগ্য বিষয় হচ্ছে এ গ্রন্থেরই ১০৬ পৃষ্ঠায় নভেরা আহমেদের ভাই-বোনদের জন্মকাল ও বয়স এবং মৃত্যুকাল বিশ্লেষণ করে আনা ইসলাম এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে নভেরা আহমেদের ছোটভাই শাহরিয়ারের জন্ম ১৯৩৩-এ এবং নভেরা আহমেদের জন্ম ১৯৩০-এ। এই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য।

১৯৩০ থেকে ২০১৫ দীর্ঘ সময়। নভেরা দীর্ঘজীবি হয়েছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বৎসর। আনা ইসলাম তাঁর গ্রন্থে ২০১৪-তে গৃহীত ফটো মূদ্রণ করেছেন। তার সঙ্গে কথোপকথন কালে প্রশ্ন বুঝতে নভেরার অপারগতার কথা উল্লেখ করেছেন। অশতীপর মানুষের লক্ষণাদি স্পষ্ট। – এরপর যারা লিখবেন তাদের উচিৎ হবে নভেরা আহমেদের জন্মকাল ১৯৩০ হিসেবে উল্লেখ করা। এমনকি আনুমানিক ১৯৩০ লেখারও প্রয়োজন নেই। স্বামী গ্রেগোয়া দ্য ব্রুনস ১৯৬৪ থেকে নভেরা আহমেদের সঙ্গে আছেন। ২০১৮-তে একাধিক জিজ্ঞাসার জবাবে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, পাসপোর্টের তারিখ সঠিক। তবে সম্প্রতি বলেছেন প্রকৃত জন্মসাল ১৯৩০: এস. এম. আলীর পরামর্শে নভেরা তা' ১৯৩৯ করেছিলেন।


২.
আনা ইসলামের এই গ্রন্থ দ্বিতীয় যে বিতকের্র নিরসন করেছে তা হলো ১৯৫৭-৫৮ কালপর্বে ঢাকায় শহীদ মিনার নির্মাণে নভেরা আহমেদের সংশ্লিষ্টতা প্রসঙ্গে। উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯৫৪ সালের ৭-ই মে পাকিস্তানের গণপরিষদে মুসলিম লীগের সমর্থনে বাংলা ভাষা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধান সংশোধন করে লেখা হয় "পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং বাংলা"। এই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ঐ সময়ে পূর্ব পাকিস্তান সরকার ঢাকায় ১৯৫২'র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতিরক্ষার্থে একটি শহীদ মিনার স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে; কিন্তু সরকারের গৃহনির্মাণ বিভাগে কোনো স্থপতি পাওয়া যায় নি যিনি এই স্মৃতিস্তম্ভের নকশা প্রণয়ন করতে সক্ষম। অবশেষে ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ শিল্পচার্য জয়নুল আবেদীনের মধ্যস্থতায় শিল্পী হামিদুর রহমান নকশা প্রণয়নের কাজটির 'কমিশন' লাভ করেন। আনা ইসলাম তার গ্রন্থে প্রথমবারের মতো দুর্লভ সরকারী দলিল উপস্থাপন করেছেন যাতে হামিদুর রহমানের 'সহযোগী' হিসেবে নভেরা আহমেদের নাম উল্লেখিত আছে। কার্যতঃ আনা ইসলাম সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছেন যে ঢাকায় স্থাপিত শহীদ মিনারের নকশা প্রণয়নে শিল্পী হামিদুর রহমানের সঙ্গে নভেরা আহমেদও অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে এ নকশায় তার ভূমিকা কতখানি তা জ্যেষ্ঠ শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীরের বয়ান থেকে ধারণা করা যায়।

সৈয়দ জাহাঙ্গীর ২০১৪ থেকে ২০১৮ প্রায়ই জাতীয় জাদুঘরে নানা কাজে এসেছেন। ২০১৮-তে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য যাদের নাম প্রস্তাবিত হয়েছিল তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ২০১৬ তে নভেরার নতুন একটি ভাস্কর্য সংগ্রহ করলে তিনি তা দেখতে এসে অনেক কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদ এক সঙ্গেই থাকতেন ও কাজ করতেন; শহীদ মিনার নির্মাণের সময় তারা স্থাপনাস্থলেই অস্থায়ী ঘর বানিয়ে কাজ করছিলেন। হামিদুর রহমান ছিলেন সৈয়দ জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ট বন্ধু। সেই সুবাদে এই কর্মশালায় সৈয়দ জাহাঙ্গীরের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। একদিন এখানে এসে সৈয়দ জাহাঙ্গীর দেখতে পেলেন মাটি দিয়ে তৈরী প্ল্যাটফর্মের ওপর ছোট গাছের শুকনো ডাল বসিয়ে নভেরা আহমেদ শহীদ মিনারের একটি মডেল তৈরী করেছেন। এই মডেল দেখে তার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে শহীদ মিনারের নকশার 'থিমেটিক ক্রেডিট' নভেরা আহমেদের প্রাপ্য।

সৈয়দ জাহাঙ্গীর আরো জানিয়েছিলেন, পূর্ব পাকিস্তান আমলে নির্মিত শহীদ মিনারে ছিল ভূগর্ভস্থ শিল্পজাদুঘর যা হামিদুর রহমার ও নভেরার তৈরী ম্যুরাল ও ফ্রেস্কোতে সজ্জিত ছিল। ১৯৭১ এ ২৫শে মার্চের পর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কামান দেগে শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে ফেলে। ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর নতুন করে শহীদ মিনার নির্মাণকালে ঐ ভূগর্ভস্থ অংশটি আর পুনর্নির্মাণ করা হয় নি। এখন যে অবস্থায় আছে তাতে যথাস্থানে ভূগর্ভস্থ জাদুঘর বা প্রদর্শনশালা নির্মাণ করা সম্ভব হবে না।
প্রসঙ্গতঃ বলা যেতে পারে যে, শহীদ মিনার নির্মাণ ঠিক কবে শেষ হয়েছিল ও কবে সমাপ্ত হয়েছিল এবং নভেরা আহমেদ ঠিক কোন পর্যায়ে দেশ ত্যাগ করেছিলেন — এই তারিখগুলো সুনির্দ্দিষ্টভাবে জানা দরকার।


৩.
আনা ইসলামের এ গ্রন্থের উপজীব্য নভেরা আহমেদের জীবন। তাঁর জীবনের বিভিন্ন তথ্যকণিকা তিনি সংগ্রহ ও সন্নিবেশ করেছেন। তবে পাঠকের সুবিধার্থে এই সন্নিবেশনার কাঠামোটি আরও ধারাবাহিক হওয়া প্রয়োজন। আরও কিছু গবেষণার প্রয়োজন আছে যেমন ব্যাংককে এবং লাহোরে নভেরা ঠিক কত দিন ছিলেন, কীভাবে তার ভরণপোষণ হতো– এ সব তথ্য স্পষ্ট করে জানা দরকার। পরবর্তী গবেষকরা হয়তো সেই চেষ্টা করবেন।
প্যারিসে ও প্যারিসের অদূরে শাঁতমেল গ্রামে নভেরা আহমেদ তাঁর জীবনের অর্ধেকেরও বেশী সময় কাটিয়েছেন। নভেরার সঙ্গে সাক্ষাৎ যোগাযোগ সত্ত্বেও এই দীর্ঘ সময়ের বিবরণ সংক্ষিপ্ত। এর কারণ অস্পষ্ট নয়। প্রায় ৪৫ বৎসর সময় নভেরা স্বগৃহে অন্তরীণ থেকেছেন বললে অত্যূক্তি হয় না। এ সময়ে তার শিল্পচর্চা খুবই সামান্য। এ কি তার অক্ষমতা না অনীহা, এ প্রশ্ন সহসা মুছে যাবে না। তাকে বলা হয়েছে অভিমানী; কবি সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ'র কবিতায় এ কথা আছে। আজকাল অনেকে বলেন শহীদ মিনারের নকশাকার হিসেবে যথাযথ স্বীকৃতি না-দেয়াই এ অভিমানের কারণ। কিন্তু ভুলে যাওয়া চলে না নভেরা নিজেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন জন্মভূমি থেকে; বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন বাংলাদেশ থেকে, বাংলাদেশের মানুষ জন থেকে, বাংলা ভাষা থেকে, এমনকি স্বীয় পরিবার থেকে। বাংলাদেশে থেকে যাওয়া নিজের শিল্পকর্ম সম্পর্কে কখনও সামান্য কৌতূহলও প্রকাশ করেন নি। সুতরাং তার নিরুদ্দেশ জীবনযাপনের কার্যকারণ অন্যত্র অনুসন্ধান করাই ন্যায্য হবে।

দেশের সঙ্গে যোগসূত্রবিচ্ছিন্ন নভেরা স্বাধীনতা-উত্তর কালে ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যান। কার্যত তিনি বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনের নিরুদ্দেশ মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৮৮ তে তিনি মারা গিয়েছেন এই ভিত্তিহীন তথ্যটি প্রচারিত হওয়ার পর তার সম্পর্কে সকলের কৌতূহল নির্বাপিত হয়ে পড়ে।
১৯৯৭-এ প্যারিসের বাংলাদেশ দূতাবাসে নভেরা আহমেদ মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টের পরিবর্তে নতুন পাসপোর্টের জন্য দরখাস্ত করেন। তখন প্রথম জানা গেল যে তিনি বেঁচে আছেন। দূতাবাসের সাহিত্যমনস্ক কর্মকর্তা ইকতিয়ার চৌধুরী একটি প্রতিবেদন ছাপলেন বাংলাদেশের "সাপ্তাহিক বিচিত্রা" পত্রিকায়। এরপর ১৯৯৮ সালে আনা ইসলাম প্রতিবেদন পাঠালেন নভেরা সম্পর্কে। আবার নিরুদ্দিষ্ট নভেরা আহমেদ সম্পর্কে বাংলাদেশ সচেতন ও কৌতূহলী হয়ে উঠলো। কিন্তু এ কৌতূহল মেটানো সম্ভব ছিল না। নভেরা না কারো সঙ্গে দেখা করতেন, না কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলতে সম্মত হতেন। আনা ইসলাম ব্যতিক্রম। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি, দেরীতে হলেও, নভেরার চারপাশে দেয়া কঠিন আবরণ ভেদ করতে পেরেছিলেন।
নভেরা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আনা ইসলাম স্বাভাবিকভাবেই নিজস্ব অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেছেন বেশী। সংক্ষেপে নভেরার জীবন তো এ রকম যে তার জন্ম ব্রিটিশ ভারতে, ১৯৩০-এ। ভাস্কর হিসেবে তিনি সবচেয়ে সক্রিয় ছিলেন পাকিস্তান জামানায়। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় একদশক আগে ১৯৬১ সালে তিনি জন্মভূমি ত্যাগ করেন এবং কার্যতঃ আর ফিরে আসেন নি। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি কখনো আসেন নি বলেই জনশ্রুতি যদিও সম্প্রতি তাঁর এক আত্মীয় বর্তমান লেখকের নিকট দাবী করেছেন ১৯৭৩ বা ১৯৭৪-এ তিনি কয়েক দিনের জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন– এ তথ্য যাচাইয়ের দাবী রাখে। নভেরা আহমেদ ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে যান। আর স্বদেশসহ বিভিন্ন দেশ ঘুরে ১৯৭১ থেকে তিনি ফ্রান্সে বসবাস করতে শুরু করেন। ২০১৫ সালের ৫ মে মৃত্যু অবধি তিনি ফ্রান্সেই বসবাস করেছেন। উপযুক্ততা থাকা সত্বেও কেন তিনি ফ্রান্সের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন নি তা' প্রশ্নযোগ্য।


বাংলাদেশের খুব কম মানুষই নভেরা আহমেদকে সশরীরে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। যারা দেখেছেন তারা আর তেমন কেউ বেঁচে নেই (জুন ২০২০)। নভেরা আহমেদকে যারা ঘনিষ্টভাবে দেখেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর, অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শিল্পী আমিনুল ইসলাম, হাসনাত আব্দুল হাই, রেহমান সোবহান প্রমুখ। এরা তরুণ ভাস্কর নভেরা আহমেদকে কাছে থেকে দেখেছেন, তার কাজ অভিনিবেশ সহকারে প্রত্যক্ষ করেছেন। এদের কারো কারো সঙ্গে নভেরার অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল যাদের মধ্যে রেহমান সোবহান অন্যতম। হাসনাত আব্দুল হাই নভেরাকে উপলক্ষ করে উপন্যাস লিখেছেন যারা প্রচ্ছদ নাম "নভেরা" (প্রকাশকাল ১৯৯৪)। সৈয়দ জাহাঙ্গীর, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আমিনুল ইসলাম নভেরার জীবনযাপন ও ভাস্কর্য নিয়ে মন্তব্য করেছেন; কিন্তু তাতে নভেরা আহমেদের ধারাবাহিক জীবনালেখ্য রচনার কাজ আদৌ সহজ হয়ে আসে না।
নভেরার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও স্বামী গ্রেগোয়া দ্য ব্রুনস ২০১৮-তে ঢাকায় এসেছিলেন, সে সময় তিনি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে বক্তৃতা করেন এবং একাধিক ভিডিও সাক্ষাৎকার প্রদান করেন যা থেকে তাদের দাম্পত্য জীবন ফ্রান্সনিবাসী নভেরা আহমেদের জীবন ও কর্ম ইত্যাদি সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু ষাট দশকে নভেরার পাকিস্তানে অবস্থান, সত্তর দশকের শুরুতে ব্যাংককে অবস্থান, এমনকি ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত কালপর্বে তার অবস্থান ও তৎপরতা নিয়ে যথেষ্ট তথ্য এখনো পর্যন্ত জানা নেই।
আনা ইসলাম নভেরার পুরো জীবনের ওপরই আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন। তবে নভেরার দীর্ঘ প্যারিস জীবনের ওপর তিনিই প্রথম বিশদ আলোচনা করেছেন। তবে যে বিষয়টি তার নজর এড়িয়ে গেছে বলে প্রতীয়মান তা এই যে ১৯৭১-২০১৫ এই দীর্ঘ প্যারিস জীবনে শিল্পী হিসেবে নভেরা নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়েছিলেন। কালেভদ্রে এক আধটি ভাস্কর্য করছেন, দু'-একটি ছবি আঁকছেন এ পর্যন্তই। যে প্রচণ্ড শিল্পোস্পৃহা ও উদ্দীপনা প্রত্যক্ষ হয় তরুণী নভেরার জীবনে, তা যেন ফ্রান্সে অভিবাসন নেয়ার পর অকস্মাৎ, দ্রুত অবসিত হয়েছিল। হঠাৎই যেন নভেরা রহস্যময়ী হয়ে উঠেছেন, বাংলা বলা ভুলে গেছেন, ফ্রেঞ্চও শিখছেন না। মানুষ জেনেছে তার মৃত্যু হয়েছে।
গ্রন্থের শেষভাগে ১১৯-১২০ পৃষ্ঠায় সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জী সংযোজন করা হয়েছে। এটি খুবই উপকারী একটি সংযোজন যা সংশোন ও সম্প্রসারণের দাবী রাখে। ১৯৬০ এ বিপরীতে লেখা হয়েছে 'আগস্ট মাসে ৭৫টি ভাস্কর্য নিয়ে প্রথম একক প্রদর্শনী'। কিন্তু এ প্রদর্শনী কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা বাদ পড়ে গেছে। একই বৎসর নভেরা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ছিলেন এবং ঐ বৎসরই (বা পরের বৎসর ১৯৬১-তে) লন্ডনের শল্যচিকিৎসক তার ক্যান্সারাক্রান্ত জরায়ু অপসারণ কওে — এ তথ্যটিও যোগ করার মতো।

নভেরার জীবনে গ্রেগোয়া দ্য ব্রুন্সের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। মসিউ দ্য ব্রুন্স সম্পর্কে অনেক তথ্য যোগ করেছেন আনা ইসলাম যা অন্য কোনো সূত্রে লভ্য নয় (পৃ. ৯৬-৯৭)। জীবনপঞ্জীতেও লেখা উচিৎ ১৯৬৪ তে তাদের প্রথম পরিচয়ের কথা, ১৯৭৩ এ গ্রেগোয়ার সঙ্গে মোটর দুর্ঘটনার কথা, ১৯৮৫তে তাদের পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার কথা, ২০০৫-এ প্যারিসে দীর্ঘ অবস্থানের ইতি টেনে ৬৭ কিলোমিটার দূরে শাঁতমেল গ্রামে নিজস্ব বাড়ীতে স্থানান্তরের কথা ইত্যাদি। ১৯৫৭ এর বিপরীতে লিখেছেন 'শহীদ মিনার নির্মাণপর্ব' কিন্তু নকশার তারিখ ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮ (পৃ. ১০)। ১৯৯৭ সালে লেখিকার সঙ্গে নভেরা আহমেদের প্রথম দেখা হয় — এ বিষয়টিও যোগ করা যেতে পারে (এ সময় ভাস্করের বয়স ৬৭)।
আনা ইসলাম একটি মূল্যবান কাজ করেছেন শহীদ মিনারের নকশা বিষয়ে নভেরা'র বক্তব্য গ্রহণ ক'রে। মিনারের মধ্য স্তম্ভটি আনত মাতৃমুখ বলেই এতকাল দেশের অনেক শিল্পবোদ্ধা ইন্টারপ্রিট ক'রে আসছেন: পাশের স্তম্ভগুলো দন্ডায়মান চার সন্তান। এ কথা শুনে নভেরা বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন কারণ তিনি বোধিবৃক্ষ তলে উপবিষ্ট বুদ্ধের উত্থিত, কিছুটা আনত, করতলকে শান্তির প্রতীক হিসেবে শহীদ মিনারে প্রতিফলন করতে চেয়েছিলেন (পৃ: ১১৩)।

৪.
'নভেরা — বিভুঁইয়ে স্বভূমে' গ্রন্থটিতে নভেরা আহমেদের জীবন সম্পর্কে যেমন আলোকপাত আছে তেমনি শিল্পকর্ম সম্পর্কেও আনা ইসলাম আলোচনা করেছেন। এই গ্রন্থে নভেরা আহমেদের করা অনেক ভাস্কর্যের ও অধিকাংশ চিত্রকর্মের ফটো সংযোজন করেছেন। আশা করি ভবিষ্যতের কোনো গবেষক নভেরা আহমেদের সকল ভাস্কর্য (যেগুলোর হদিশ আছে) ও চিত্রকর্মের তালিকা প্রণয়ন করবেন।


ভাস্কর হিসাবে নভেরা আহমেদের যে কোনো আলোচনায় হেনরি মুর ও বারবারা হেপওয়ার্থের নামোল্লেখ প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। আনা ইসলাম লিখেছেন, '(নভেরা আহমেদ) বিমূর্ত শৈলীর মোহে আবিষ্ট হয়েছিলেন লন্ডনে পাঠকালে। প্রভাবিত এবং প্রাণিত হয়েছিলেন হেনরি মুর, বারবারা হেপওয়ার্থের কাজে। প্রথম মুক্তাঙ্গন ভাস্কর্য 'গরু এবং দুটো ফিগার'– গড়নে গঠনে হেনরি মুরের ভাস্কর্যের ছায়া। পুতুলপ্রতিম মানুষী অবয়ব আর গরুর দেহসংস্থানের আয়তনিক বিভাজনে ভারসাম্য রক্ষা করে মাঝের বৃত্তাকার ফাঁকগুলো। আবার এক অখণ্ড বহুপুঞ্জের বৃত্তাকার ফাঁক বা স্পেসটুকু তৈরি করে ভিন্নতর ফর্ম। বৃত্তাকার গীতল স্পেসে চলে আলো-ছায়ার খেলা। কাজের বহিরঙ্গের প্রেরণা পাশ্চাত্যের, কিন্তু অন্তরের দাবি দেশজ লোকায়ত স্পৃহা।'। 'অন্তরের দাবি দেশজ লোকায়ত স্পৃহা'–এ কথার ব্যাখ্যা আনা ইসলাম দেন নি। নভেরা ইসলাম কোথাও এমতরূপ স্পৃহার কথা বলেন নি। তবে আরও কেউ কেউ মনে করেন নভেরার কাজে পাশ্চাত্যের অংকনরীতি ও ভারতীয় ঐতিহ্যের সংশ্লেষ রয়েছে।

আনা ইসলাম লিখেছেন, "বিষয়বৈচিত্র্য, উপাদান এবং প্রয়োগগুণে প্রতিটি ভাস্কর্য ছিল চারুচৈতন্যের সাবলীল নির্মিতির স্বাক্ষর। পাশ্চাত্যের আধাবিমূর্ত ভাস্কর্যশৈলীর শ্বাস নিয়ে আশ্রয় খুঁজে নেন লোককলার অনাবিল বিন্যাসে। ফ্যামিলি, গরু ও দুটো ফিগার, সিটেড ফিগার, দি লং ওয়েট, শান্তি, ফাউন্টেন ফিগার, মা ও শিশু কাজগুলোতে অবয়বের ত্রিমাত্রিক গড়নের সঙ্গে লোকশিল্পের ব্যাকরণ-সূত্র মিলিয়েছেন। সিটেড ফিগার– ভঙ্গি প্রাচ্যদেশীয় নারীর হাঁটু ভাঁজ করে উপবিষ্ট প্রতিমা।"– বিদগ্ধ পাঠক এই নিরেট সাংবাদিকী মন্তব্যের অতিরিক্ত ব্যাখ্যা দাবী করতে পারেন।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সংগ্রহে নভেরা আহমেদের ৩৯টি ভাস্কর্য ছিল। ২০১৬ তে আরও একটি সংগ্রহ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও আণবিক শক্তি কমিশনে রয়েছে নভেরার কাজ। এসবই ষাট দশকের প্রথমভাগের মধ্যে করা। প্যারিস জীবনের কাজ সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের কোনো ধারণা নেই। ২০১৪ তে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় নভেরার অতীতালেখ্য যাতে প্রদর্শিত হয় মাত্র ১২ ভাস্কর্য ও ৩০টি চিত্রকর্ম। এ প্রদর্শনী দেখেছেন আনা ইসলাম। তিনি লিখেছেন, "প্রদর্শনীর কাজগুলো ছিল বিমূর্ত আধা-বিমূর্ত ধাঁচের। ধাতুর পাত বাঁকিয়ে, পিটিয়ে, ঢালাই করে নির্মাণ করেছেন ভাস্কর্যের শরীর। ধাতুর জমাট স্তব্ধতাকে ভেঙে যে বিনির্মাণ, তাতে স্পষ্ট ভাস্করের মননের তাপ ও সৌন্দর্য। ব্রোঞ্জ ছাড়াও উপকরণ হিসেবে কাজগুলোতে ব্যবহার করেছেন মেটাল শিট বা ধাতুর পাত। ঝালাইকৃত বা ওয়েলডেড এবং স্টেইনলেস স্টিল।"

আনা ইসলাম ঝালাই করা আয়রনের রডে নির্মিত 'দম্পতি' (১৯৬৯) শীর্ষক কাজটির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখেছেন, "(এটি) ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার নারী-পুরুষের মুখোমুখি দেহাবয়ব। রূপের সংক্ষিপ্তকরণ এবং অনাবশ্যক অনুপুঙ্খ বর্জন করেছেন। গ্রাম-বাংলার হাঁস-মুরগি বা মাছ ধরার পলোর রৈখিক গড়ন তাঁর কাজে ছায়া বিস্তার করে, যা প্রান্তিক সংস্কৃতির গেরস্থালি জীবনচিত্রের উপকরণ। সরল, কিন্তু সুলভ-প্রদর্শন-স্পৃহা নয়। বিন্যাসের প্রয়োগ জ্ঞান, পারঙ্গমতা ও শ্রমে পূর্ণ সৃষ্টি।"
তিনি ১৯৭০ এ ব্যাংককে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত ভাস্কর্যসমূহের ওপরও মন্তব্য লিখেছেন। তার ভাষায়: "ব্যাংককের কাজে ছিল সারল্য (Simplification), ন্যূনতমতা (Minimality) এবং যথাযথতার বিষয়টি। সংক্ষেপায়ন ও সরলায়নে বিমূর্ত নির্মাণে মৌলিকতা। ধাতু, সিমেন্ট মাধ্যম ভিন্নতায় সৌন্দর্যের শক্তি আর শিল্পবিন্যাসের এক আশ্চর্য সমন্বয় নভেরার কাজ। ষাটের দশকের অবয়বধর্মী ভাস্কর্যে আইডিয়া আর আকারের ব্যবধানে, নির্মাণের ভঙ্গি বৈচিত্র্যে যুক্ত হয় ফর্মের দৃঢ়তা। বিবর্তন বা রূপান্তরের এই বাঁকে নিষ্প্রাণ গঠনের অনুসারী না হয়ে প্রতিপাদ্য বিষয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন নাট-বল্টু বা ঝালাই করা অংশ যা উন্মুক্ত, প্রকাশ্য। ভাস্কর্যগুলোর সৌন্দর্যের লুব্ধ আবেশ ব্যাহত হয় না। পরস্পরবিরোধী উপাদানের সমন্বয় এবং সাম্যের অনায়াস প্রয়োগ দক্ষতা নভেরার কাজের বৈশিষ্ট্য।"


৫.
ষাটের দশকেই ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি অল্প কয়েকটি ছবি এঁকেছিলেন নভেরা আহমেদ। প্যারিস জীবনে আরো কিছু ছবি আঁকেন নভেরা। পাসপোর্টের দরখাস্তে নিজের পরিচয় লিখতেন 'ভাস্কর ও চিত্রকর'। কিন্তু তিনি যে ছবি এঁকেছেন, তিনি ছবি আঁকেন– এই তথ্যটি সুপ্রচারিত কোনো তথ্য ছিল না। ২০১৮ পর্যন্ত তাঁর আঁকা কোনো ছবি বাংলাদেশে কারো সংগ্রহে ছিল না। তাঁর চিত্রকর্মের সঙ্গে কারো পরিচয় ছিল না। মৃত্যুর কিছু আগে ২০১৪-তে প্যারিসে তাঁর শিল্পকর্মের একটি রেট্রোস্পেকক্টিভ অনুষ্ঠিত হয় যার ক্যাটালগে নভেরা আহমেদের আঁকা তেতাল্লিশটি ছবির প্রতিচিত্র মুদ্রিত হ'লে নভেরা আহমেদের চিত্রকর পরিচয়টি আলোচনায় স্থান ক'রে নেয়। পাদটীকা হিসেবে ব'লে রাখা যায় : ঐ ক্যাটালগের জন্যে নভেরা আহমেদ যে চিত্রকর্মটির সামনে দাঁড়িয়ে ফটো তুলেছিলেন সেটি ধ'রে ছবির সংখ্যা চৌচল্লিশ।

আনা ইসলামের গ্রন্থে এ ছবিগুলোর অনেকগুলো মুদ্রিত হয়েছে যা দেখে বাংলাদেশের মানুষ চিত্রকর নভেরার সঙ্গে পরিচিত হবেন। এ ছবিগুলোতে একদিকে অঁরি মাতিস অন্য দিকে পল সেযানের প্রভাব লক্ষণীয়। বলা দরকার যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি যথাযথভাবে মুদ্রিত হয় নি যার মধ্যে রয়েছে 'হিউম্যানিতে'(মানবতা)। গ্রন্থের ২০৯ পৃষ্ঠায় এই চিত্রকর্মটি আধাপৃষ্ঠা নিয়ে ছাপানো হয়েছে। নভেরা আহমেদ 'হিউমানিতে' এঁকেছিলেন ১৯৯৫-এ। আনুমানিক সাড়ে ছয় গুণন সোওয়া চার ফুট ক্যানভাসে অঙ্কিত এ ছবিটি পরিমাপে বৃহত্তম। এ ছবি সমুদ্র উপকূলে সমবেত একগুচ্ছ মানব-মানবীর গল্প। সকলেই দীঘলকান্তি, নগ্ন। দূরস্থ দৃশ্যপটে প্রশস্ত লালচে আকশের নিচে সমুদ্রের নীলাভ বিস্তৃতি; অগ্রভাগে তামাটে বালুকাবেলা। দীর্ঘ কুন্তলরাজি নারীকে পৃথক করেছে পুরুষ থেকে। অভিমানী এক নারী চলে গেছে দূরে, জলের ভেতরে তার পা, যেন নিঃশর্ত কোনো অভিমানে সে সমুদ্রের কাছে আত্মবিসর্জ্জনে উদ্যত; পেছনেই তার পুরুষ। আর বামে, দূরে, অন্যান্য সঙ্গী-সঙ্গিনীরা যারা ব্যাকুল হয়ে আহবান করছে ফিরে আসার জন্যে। ওরা ভয়ার্ত; ওরা শঙ্কিত। বাতাসের সুড়ঙ্গ দিয়ে ওদের আর্ত চিৎকার শীষ কেটে যায়; এডভার্ড মুঙ্খের 'স্ক্রিম'-এর কথা মনে পড়ে। নভেরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ 'হিউমানিতে'–এটি সেন্টারস্প্রেড স্টাইলে দু' পাতা জুড়ে ছাপার দাবী রাখে। বুকডিজাইনার তারিক সুজাত নিজ চোখে ছবিটি দেখলে এ ভুলটি হতে দিতেন না।

২৪৩ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে নভেরা আহমেদের জীবনের সম্ভবতঃ শ্রেষ্ঠতম চিত্রকর্ম 'নারী এবং মৃত পাখি'। এ ছবিতে নারীর বাম বাহু থেকে ঝুলে আছে দু'টি শিকার। নারী নগ্ন। তার বাম হাত থেকে ঝুলছে রক্তাক্ত শিকার, মৃত। নারীর চোখে অদ্ভূত দৃষ্টি। এই দৃষ্টি ইন্ট্রিগ করে। এ দৃষ্টি আতঙ্ক না অনুতাপের তা সহসা স্পষ্ট হয় না। এটি ছবি মাত্র নয়; এ ছবি ধারণ করছে কোনো একটি গল্প যা দর্শককে কল্পনা ক'রে নিতে হবে। মৃত বেলে হাঁস কীসের প্রতীক তা' চিন্তার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকবে। অসামান্য এ ছবিটির নাম রাখা যেতে পারে 'শিকার'। আরেকটি অসামান্য ছবি ২৪০ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত 'তিন প্রজ্ঞাময়ী'। উল্লিখিত 'শিকার' এর সমরূপ, থিম্যাটিক্যালি, যেন একই সিরিজের অংশ। আমার বিশ্বাস 'হিউমানিতে', 'তিন প্রজ্ঞাময়ী' ও 'শিকার'-এর মতো ছবিগুলি নভেরা আহমেদকে অমর ক'রে রাখবে।

৬.
২০০৯ সালে শিবু কুমার শীল নভেরার জীবন যাপন ও শিল্পকর্ম সম্পর্কে অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর মন্তব্য করেছিলেন, "… নভেরার শিল্পীজীবন এক অর্থে খুব ট্র্যাজিক এবং যে কোনো শিল্পী যেকোনো সংবেদনশীল মন নভেরার জীবনকাহিনি পড়লে বা জানলে অভিভূত হবেন; হওয়াটা স্বাভাবিক, যেমন কিনা আমরা ভ্যান গখের, পল গগ্যাঁর জীবনকাহিনি জানলে বা পড়লে অভিভূত হই– সেই একই অর্থে। একজন মানুষ তো আরেকজন মানুষের এই স্ট্রাগল, বিভিন্ন ধরণের লড়াই, শিল্পী হওয়ার জন্যে লড়াইগুলো জানলে অভিভূত হবেনই। সেটা স্বাভাবিক, আমিও হই।"

কিন্তু আমার মনে হয় নভেরা আহমেদের শিল্পীজীবন এই অর্থে ট্র্যাজিক নয় কারণ তার জীবনের সংগ্রাম আর তার শিল্পকর্ম পরস্পর একসূত্রে গাঁথা নয়। বরং তার জীবনের ট্র্যাজেডি তীব্রস্বরে আর্তনাদ করে ওঠে যখন আমরা দেখি প্যারিসনিবাসী নভেরা আহমেদ অকস্মাৎ কেবল নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে রহস্যময়ী হয়ে ওঠেন নি, একই সঙ্গে তার শিল্পীসত্তা বহুলাংশে সংকুচিত, নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন? কী ঘটেছিল নভেরার জীবনে যা তাকে দ্রুত অবসিত করে দিয়েছিল?– এ নিরুত্তর প্রশ্ন আমাদের বারবার ধাওয়া করে। আনা ইসলামের এই অসাধারণগ্রন্থের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ঐ নিরুত্তর প্রশ্নটি আবারও সোচ্চার হয়ে ওঠে।