Published : 28 May 2026, 10:29 PM
ওরাশিয়ো কিরোগা (৩১ ডিসেম্বর, ১৮৭৮ – ১৯ ফেব্রুয়ারী, ১৯৩৭)
মর্ডানিস্টদের বিদায় ও ভ্যানগার্ডিজমের উত্থানের সন্ধিক্ষণে লাতিন আমেরিকার ছোটগল্পের জনক কিরোগার আবির্ভাব। জঙ্গলের রহস্যময়তার প্রেক্ষাপটে মৃত্যুর ছত্রছায়ায় ফ্যান্টাসি ও জীবনের সহাবস্থানের এক অদ্ভুত অন্ধকারাচ্ছন্ন কথন তাঁকে সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দিয়েছে। উরুগুয়াইয়ের রাজধানী মন্তেভিদেওতে পড়াশোনা ও কর্মজীবনের শুরু। পরে বুয়েনোস আইরেস ও প্যারিসে কাটান কিছুকাল। তাঁর জীবন জুড়ে ছিল প্রিয়জনেদের মৃত্যুমিছিল। মিসিয়নের জঙ্গলের কাছে একা জীবন কাটিয়েছেন দীর্ঘদিন। শেষে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে থাকাকালীন বন্ধুর সাহায্যে আত্মহত্যা করেন। ১৯০১ সালে তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই ‘প্রবাল প্রাচীর’ (Los arrecifes de coral)। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গল্পগ্রন্থ – ‘অন্যের অপরাধ’ (El crimen del otro), ‘ভালোবাসা, উন্মত্ততা ও মৃত্যুর গল্প’ (Cuentos de amor, de locura y de muerte), ‘গলাকাটা মুরগি ও অন্যান্য গল্প’ (La gallina degollada y otros cuentos); উপন্যাস – ‘অতীতের প্রেম’ (Pasado amor) ইত্যাদি।
গত বছর জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় লোকগুলো এই গাছটা কেটেছিল। গাছটার গুঁড়ি এখন মাটির উপর লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। পরিষ্কারের জন্য আগুন লাগালে অন্য গাছগুলোর বাকল সব পুড়ে গিয়েছিল, কিন্তু এই গাছটা পোড়েনি। শুধু গুঁড়িতে একটা লম্বা পোড়া দাগ আগুন জ্বালানোর কথা বলছে।
এটা হয়েছিল গত শীতে। তারপর চার মাস কেটে গেছে। পরিষ্কার করা জায়গাটা খরায় নষ্ট করে দিল আর ছাইয়ের পতিত ভূমির মধ্যে কাটা গাছটা একভাবে পড়ে আছে। গুঁড়িটার গায়ে ঠেসান দিয়ে বসে আমিও নিশ্চল হয়ে পড়ে আছি। পিঠের কোথাও একটা শিরদাঁড়া ভেঙে গেছে। ভেঙে ওখানেই পড়েছি আমি। একটা শিকড়ে পা বেধে হতভাগ্য আমি ভূপাতিত। ঠিক যেভাবে পড়েছি সেভাবেই বসে আছি গুঁড়িতে হেলান দিয়ে – বলা ভালো হতচেতন হয়ে গেছি।
এক মুহূর্ত আগে থেকে একটা স্থির গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছি – মজ্জায় আঘাত লাগলে যেমন গুঞ্জন শোনা যায়। সেটা এখন চারপাশের সব কিছু ঢেকে ফেলছে। আমার নিঃশ্বাসটাও যেন ওর মধ্যে ভেসে যাচ্ছে।
এটা পরিষ্কার ও নিশ্চিত যে সেই মুহূর্ত থেকে আমি নিঃসন্দেহ হয়ে গেলাম আমার জীবন আর কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা, তারপরেই তা চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে।
এটা সত্যি। এই সত্যের মতো আর কোনও সত্য আমার মনে এমন চূড়ান্ত হয়ে দেখা দেয়নি। অন্য সব সত্যগুলো ভেসে যায়, নাচে বহুদূরে আমারই অন্য এক সত্তার অতীতে, যা এখন আর আমার অঙ্গীভূত নয়। আমার অস্তিত্বের এখন একটাই অনুভূতি, নৈঃশব্দের মধ্যে একটা বিরাট ধাক্কার মতো জ্বলজ্বল করছে যে আর এক মুহূর্ত বাদেই আমি মরে যাব।
কিন্তু কখন? কোন মুহূর্তে আর কত সেকেন্ডে জীবনের এই মরিয়া সচেতনতা এক শান্ত শবদেহে পরিণত হবে?
এই পরিষ্কার জমিতে কেউ আসে না; কোনও ঘরবাড়ি থেকে জঙ্গলের পথ এই দিকে আসেনি। লোকটা যে এখানে বসে আছে, যেমনভাবে গাছের গুঁড়িটা, যেটা ওকে ধরে আছে, বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দেবে সব বাকল ও জামা-কাপড়। তারপর সূর্য উঠে শুকিয়ে দেবে শৈবাল ও চুল, যতক্ষণ না জঙ্গল গজিয়ে উঠে সবকিছুকে অবলুপ্ত করে দেবে – গাছ ও ছাই, হাড় ও চামড়ার জুতো।
চারপাশের শান্ত প্রকৃতির মধ্যে কিছু নেই। একেবারে কিছুই নেই যা এই ঘটনার কথা চিৎকার করে জানাবে! বরং পরিষ্কার করা জায়গাটার গাছের গুঁড়ি আর কালচে ডালপালার মধ্যে দিয়ে, এখান থেকে বা ওখান থেকে, যে কোনও কোণ থেকেই দেখা হোক না কেন, সুন্দরভাবে দেখা যাবে লোকটাকে, ছাইয়ের উপর অথৈ মাধ্যাকর্ষণের টানে পেন্ডুলামের মতো যার জীবন শেষ হতে চলেছে।
এটাই সত্য। আর এই যে অন্ধকার একগুঁয়ে পশুপ্রকৃতি প্রতিহত করার চেষ্টা করছে আর মৃত্যুর ভয়ে কাতর হৃদপিন্ডের ধুকপুকানি ও নিশ্বাস তাদের জন্য আরও বেশি করে সত্য। কিন্তু যে সঠিক মুহূর্তটার জন্য জীবন লড়াই করছে, তার জন্য যে বন্য আতঙ্ক এবং এই প্রচন্ড মানসিক আলোড়ন যা রকেটের মতো ফেটে পড়বে আর সব কিছুর শেষে পড়ে থাকবে চিরদিনের মতো সোজা করে রাখা একটি প্রাক্তন মানুষের মুখ, তার কাছে এই সত্যের কি কোনও মূল্য আছে?
গুঞ্জন ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। এখন আমার চোখের উপর একটা ঘন কালো পর্দা নেমে আসছে। তার মধ্যে দিয়ে কিছু সবুজ রম্বসের মতো আকৃতি দেখতে পারছি। আর তারপরেই দেখতে পেলাম মরক্কোদের বাজারের হলুদ দরজা, যার একটা পাল্লা দিয়ে একদল তরতাজা সাদা ঘোড়া বাইরে পালিয়ে যাচ্ছে আর অন্যটা দিয়ে ঢুকছে গলাকাটা মানুষদের শোভাযাত্রা।
চোখটা বন্ধ করতে চাইছি, কিন্তু পারছি না। এখন হাসপাতালের একটা ঘর দেখতে পাচ্ছি। সেখানে চারজন ডাক্তার বন্ধু আমাকে বোঝাতে চাইছে যে আমি মারা যাচ্ছি না। নৈঃশব্দের মধ্যে সবকিছু দেখছি আর ওরা হাসিতে ফেটে পড়ছে, কেননা ওরা আমার চিন্তা বুঝতে পারছে।
- ‘তাহলে,’ ডাক্তারদের মধ্যে একজন বলল, ‘মাছির ছোট্ট খাঁচার চেয়ে বেশি প্রমাণ আপনার জন্য আর কিছু নেই। আমার একটা আছে।’
- ‘মাছি?’
- ‘হ্যাঁ,’ সে উত্তর দিল; ‘সবুজ রঙের অনুসন্ধানী মাছি। আপনি এটা অগ্রাহ্য করতে পারবেন না যে এই মাছিরা একটা প্রাণী মারা যাওয়ার অনেক আগেই তার দেহে পচনের গন্ধ পায়। এমনকি রুগী জীবিত থাকা অবস্থাতেই তারা আসে। তারা তাদের শিকার সম্বন্ধে নিশ্চিত। রুগীর উপর উড়ে বেড়ায়, কোনো তাড়াহুড়ো করে না। কিন্তু চোখ-ছাড়াও করে না। কেননা মৃত্যুর গন্ধ পেয়ে গেছে যে। এটাই সবচেয়ে চেনা পথ মৃত্যুর নিদান হাঁকার জন্য। এই কারণেই আমার কাছে কয়েকটা মাছি আছে যাদের গন্ধ শোঁকার ক্ষমতা দারুণ, সেই হিসাবেই বেছে নেওয়া আর বেশ সস্তাতেই আমি তাদের ভাড়া দিই। যেখানে তারা ঢোকে, শিকার একেবারে নিশ্চিত। যখন আপনি একা থাকবেন তাদেরকে আমি বারান্দায় রেখে খাঁচাটা খুলে দেব। যেটা একটা ছোট্ট কফিন। আপনার তখন কিছুই করার থাকবে না শুধু চাবির গর্তে চোখ রাখা ছাড়া। যদি একটা মাছি ঢোকে আর আপনি তার গুঞ্জন শুনতে পান তাহলে নিশ্চিত যে অন্যগুলোও আপনার কাছে যাওয়ার পথ খুঁজে নেবে। আমি খুব সস্তাতেই ওদের ভাড়া দিই।’
হাসপাতাল, সেই সাদা ঘরটা, ওষুধের তাক, ডাক্তার আর তাদের হাসি সব হঠাৎই উধাও হয়ে যায় একটা গুঞ্জনের মধ্যে..
আর অকস্মাৎ আমার মধ্যে চেতনা জেগে ওঠে: মাছি!
ওরা গুন গুন করছে। যখন থেকে পড়ে গেছি দেরি না করে ওরা চলে এসেছে। জঙ্গলের মধ্যে আগুনে অভ্যস্ত, আধোঘুমন্ত মাছিগুলো জানি না কীভাবে বুঝতে পারল যে কাছেই একটা শিকার আছে।
মাছিগুলো ওই বসে থাকা মানুষটার গায়ে সমাগত পচনের গন্ধ পেয়েছে। আমরা তাদের এই বৈশিষ্ট্য বুঝতে পারি না – সম্ভবত শিরদাঁড়ার মজ্জায় যেখানে ক্ষত হয়েছে সেখান থেকে গন্ধটা পেয়েছে। দেরি না করেই তারা চলে এসেছে। কোনও তাড়াহুড়ো না করে উড়ে বেড়াচ্ছে আর ভাগ্য তাদের ডিমের জন্য যে বাসা দিয়েছে তাকে মেপে নিচ্ছে।
ডাক্তার ঠিকই বলেছিল। এর চেয়ে ভালো ব্যবসা আর কিছু হতে পারে না।
কিন্তু এখন সেই মরিয়া প্রতিরোধ শান্ত হয়ে এসেছে এবং এক পবিত্র ভারহীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর মনে হচ্ছে না যে আমি মাটির একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আছি। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে পড়ে আছি এইখানে। মনে হচ্ছে আমার মধ্যে থেকে আমি ভেসে যাচ্ছি, যেমন ভেসে যাচ্ছে আমার জীবন, সূর্যের রোদ, সময়ের উর্বরতা। কাল ও স্থান থেকে মুক্ত আমি চলে যেতে পারি এখানে, সেখানে, এই গাছটার কাছে, ওই লতাগাছটার কাছে। আমি দেখতেও পারি অনেক দূর পর্যন্ত, বহু দূরের অস্তিত্ত্বের স্মৃতির মতো। এই গুঁড়ির কাছ থেকে আরও দূরে দেখতে পারি এক পুতুলের পলকহীন চোখ, একটা কাকতাড়ুয়ার কাচের মতো চোখ ও দৃঢ় পা। এই বিস্তৃত বনভূমির অন্তস্থল যাকে সূর্য গলিয়ে দিচ্ছে আর আমার চেতনাকে টুকরো টুকরো করে লক্ষ লক্ষ অণুপরমাণুতে ছড়িয়ে দিয়ে আমি উঠে দাঁড়াব আর উড়তে উড়তে...
আর আমি উড়ে যাচ্ছি আর সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে পড়ে যাওয়া গাছের গুঁড়িতে আড্ডা বসাচ্ছি সূর্যের আলোয় যা তার তাপ দিয়ে আমাদের এই সৃষ্টির অপরিহার্য নবীকরণ ঘটাবে।