১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

প্যারিস রিভিউ-এর সাথে নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের আলাপচারিতা

“আমি যেন মাটির গন্ধ অনুসরণ করা এক শিকারি কুকুর। তবে আমি শুধু একটি পথ খুঁজি না, খুঁজি নানা পথ। আমার কাছে ধারণাগুলোরও আকৃতি আছে। যখন অনুভব করি যে দুটি ভিন্ন বিষয় বা লেখকের মধ্যে একই ধরনের আকৃতি রয়েছে, তখন বুঝতে পারি যে তাদের একত্র করা সম্ভব। ”

প্যারিস রিভিউ-এর সাথে নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের আলাপচারিতা

ছবি: রয়টার্স-এর সৌজন্যে

বিনয় বর্মন বিনয় বর্মন

Published : 12 Oct 2026, 09:33 PM

Updated : 12 Oct 2026, 10:04 PM

২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন কানাডার লেখক অ্যান কারসন। তিনি মূলত কবি, কিন্তু কবিতা ছাড়াও তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন ও অনুবাদ করেছেন। কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ জুন, টরন্টোতে। তিনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদি সাহিত্য ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকেই পিএইচডি করেন। অধ্যাপনা করেছেন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর লিখিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- শর্ট টকস (১৯৯২), প্লেইন ওয়াটার: এসেজ অ্যান্ড পোয়েট্রি (১৯৯৫), গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড (১৯৯৫), অটোবায়োগ্রাফি অব রেড (১৯৯৮), মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স (২০০০), ইকোনমি অব দ্য আনলস্ট (২০০২), ডিক্রিয়েশন (২০০৫), নক্স (২০১০), অ্যান্টিগনিক (২০১২), দ্য অ্যালবার্টিন ওয়ার্কআউট (২০১৪), ফ্লোট (২০১৬), নর্মা জাঁ বেকার অব ট্রয় (২০১৯), দ্য ট্রোজান ওমেন (২০২১), রং নর্মা (২০২৪)। নোবেলের পূর্বে তিনি অন্যান্য অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- গাগেনহাইম ফেলোশিপ (১৯৯৫), ল্যানান পুরস্কার (১৯৯৬), পুশকার্ট পুরস্কার (১৯৯৭), ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ (২০০০) এবং গ্রিফিন কবিতা পুরস্কার (২০০১), টি. এস. এলিয়ট কবিতা পুরস্কার (২০০২), গভর্নর জেনারেল’স লিটারারি অ্যাওয়ার্ড (২০২০), প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড ফর লিটারেচার (২০২০)। বর্তমান সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন উইল এইটকেন এবং এটি প্রকাশিত হয়েছিল দ্য প্যারিস রিভিউতে, ২০০৪-এর শরৎ সংখ্যায়। সাক্ষাৎকারটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন বিনয় বর্মন।

অনুবাদ: বিনয় বর্মন

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আমি আপনার “স্টাঞ্জাস, সেক্সেস, সিডাকশন্স” কবিতাটি দিয়ে শুরু করতে চাই। সেখানে একটি পংক্তি আমাকে পড়ার মাঝখানে থামিয়ে দেয়: “আমার ব্যক্তিগত কবিতা একটি ব্যর্থতা।” কথাটি আমার মধ্যে দুটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। আপনার কাছে ব্যক্তিগত কবিতা মানে কী? আর আপনি কি সত্যিই একে ব্যর্থতা মনে করেন, নাকি এটি নিছকই কবিতার বক্তার অনুভূতি?

কারসন: আমার মনে হয়, বিভিন্ন কবিতায় ব্যক্তিসত্তার বিভিন্ন মাত্রা থাকে। কোনো কবিতার অবস্থান আমার থেকে অনেক দূরে, আবার কোনোটি একেবারে কাছে। সাধারণত আমি যা ওদের দিয়ে বলাতে চাই, কাছের কবিতাগুলো কিন্তু তার ধারকাছ দিয়েও যায় না। কথাটি আমার নিজের ক্ষেত্রে যেমন, কবিতার বক্তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: উদাহরণ হিসেবে “দ্য গ্লাস এসে”-র কথা ধরুন। এখন ফিরে তাকালে কি একে ব্যক্তিগত কবিতা বলে মনে হয়? আপনি কি একে ব্যর্থতা বলে মনে করেন?

কারসন: আমি এক উচ্চতর স্তরে ঘোরাফেরা করেছি এবং গভীরভাবে কিছু বিষয় বুঝে নিতে চেয়েছি। আমার মনে হয়, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও আবেগগত বাস্তবতা লিপিবদ্ধ করার ক্ষমতা আমার আছে। জীবনের শারীরিক ও আবেগিক অনুভূতি কেমন, তার একটি বিশ্বাসযোগ্য বহিরাবরণ আমি নির্মাণ করতে পারি। কিন্তু “দ্য গ্লাস এসে” লেখার সময় আমি আরও একটি কাজ করতে চেয়েছি, যা আমি ঠিকমত করতে পারিনি। তা হলো, জীবনের অনুভূতি প্রকৃত অর্থে বুঝে ওঠা। এমন কাজ আদৌ কীভাবে করা সম্ভব, তা-ও জানি না। তবে ভার্জিনিয়া উলফ কিংবা জর্জ এলিয়ট পড়লে পাঠশেষে এক ধরনের উপলব্ধির সুগন্ধ থেকে যায়। মনে এমন একটি অনুভূতি তৈরি হয় যে, গল্পের চরিত্রগুলোর সঙ্গে পাঠক কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে এবং সেই অভিজ্ঞতাটি বুঝতে পেরেছে। নিজের লেখার কথা ভাবলে আমি তেমন অনুভব করি না।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: এর কারণ কি এই, বিষয়টি এখনো আপনার চলমান ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ?

কারসন: তা হতে পারে। কিন্তু এসব বিষয়ের বিচার আমরা কখনো কি সঠিকভাবে করতে পারি?

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনার কাছে এটি ব্যর্থতা মনে হলেও পাঠকদের কাছে তো সফল হতে পারে?

কারসন: আমার তা-ই মনে হয়। আবেগগত বাস্তবতার বহিরাবরণকে ধরে রাখার প্রচেষ্টা অন্যদের জন্য উপকারী। এটি তাদের মনে ধাক্কা দেয়, চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে, এবং তারা নিজেরাই উপলব্ধির চেষ্টা করে। কিন্তু আমার মনে হয়, আমি নিজে এখনো সেই চিন্তাপ্রক্রিয়াটি শেষ করতে পারিনি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: “স্টাঞ্জাস, সেক্সেস, সিডাকশন্স” কবিতায় আরেকটি পঙ্‌ক্তি আছে—“আমি অসহনীয় হতে চাই।” লেখক হিসেবে আপনাকে প্রকাশ করার জন্য আমার কাছে বাক্যটি যথার্থ ও তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়।

কারসন: আমার মনে আছে, বাক্যটি অন্ধকারের মধ্যে হিমবাহের মতো আমার দিকে ধেয়ে এসেছিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন দক্ষিণ মেরুর দিকে এগিয়ে চলা একটি জাহাজ। হঠাৎ অন্ধকারের মধ্য থেকে একটি হিমবাহ প্রচণ্ড বেগে এগিয়ে এল, আর আমি বাক্যটি ধরে ফেললাম। মানুষের ওপর আমার যে প্রভাব আছে, কিংবা যে প্রভাব সৃষ্টি করতে চাই, বাক্যটি যে তার যথার্থ প্রকাশ—এটি বুঝতে পেরে আমি খুশি। কিন্তু কেন এমন হয়, তা ঠিক জানি না।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনি একবার বলেছিলেন, ‘অসহনীয়’ শব্দটি আপনি অধিবিদ্যাগত অর্থে ব্যবহার করেছেন।

কারসন: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। শারীরিক অর্থে তো তা হতে পারে না, যদি না আমি ঘুরে ঘুরে মানুষকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতে থাকি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: কিছু কিছু দিন তো এমন হয়ই।

কারসন: ধারালো জিনিস দিয়ে আঘাত! সত্যি বলতে, এ কারণেই আমি বক্সিং ক্লাসে যাই—এসব দক্ষতা শেখার জন্য। তবে, যেমন বলা হয়, সেটা আসলে ছায়ার সঙ্গে লড়াই করা মাত্র।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: সেখানে আপনি সত্যিই কাউকে আঘাত করতে পারেন না?

কারসন: না, কাউকে আঘাত করা হয় না।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: কিন্তু কাউকে আঘাত করার কথা প্রায়ই ভাবেন?

কারসন: বক্সিং ক্লাসে, হ্যাঁ। সে কারণেই তো যাই। মনে মনে কাউকে আঘাত করতে চাই, ব্যাপারটা বিস্ময়কর বটে। সাধারণত যাদের আমরা আশা করি, তারা নয়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: যাদেরকে আঘাত করতে চান, আপনার প্রশিক্ষক কি তাদের নাম উচ্চারণ করতে উৎসাহ দেন?

কারসন: না, তবে ধারণাটি ভালো।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আমার প্রশিক্ষক এমন করতেন। আমার ক্লাসে বেশির ভাগই নারী। তাঁরা “জর্জ”, “ফ্রেড”, “টম” বলে চিৎকার করে। আমিও সেই পরিবেশে যোগ দিয়ে চিৎকার করে বলি, “পিয়ের!” মুহূর্তের জন্য সবাই থেমে যায়। তারপর ক্লাসের সবাই একসঙ্গে “পিয়ের” বলে চিৎকার করতে শুরু করে। আমরা বেশ কিছুক্ষণ পিয়েরকে মারার অভিনয় করি।

কারসন: বেশ ভালো তো! তবে অসহনীয় হওয়া থেকে সচরাচর এমন দলবদ্ধ আনন্দের জন্ম হয় না। এটি বরং নিঃসঙ্গ একটি কাজ। অসহনীয় হওয়ার প্রকৃত অর্থ কী, তা আমি জানি না। তবে আমার মনে হয়, মানুষের ওপর আমার প্রভাবের একটি দিক হলো, তাদের এমন এক প্রান্তসীমায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে তারা একই সঙ্গে ব্যক্তি বা লেখার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং প্রায় প্রকাশিত হতে যাওয়া কোনো সত্যের সামনে ভীত হয়ে পড়ে। সত্যটি যেন প্রকাশিত হতে চলেছে, কিন্তু কখনোই সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয় না।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: এক ধরনের তীব্র আলোকচ্ছটা?

কারসন: হ্যাঁ, আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তার পেছন থেকে আসা এক ধরনের তীব্র আলো। মনে করুন, আমি মঞ্চে দাঁড়ানো ছোট্ট একজন অভিনেতা। আমার পেছন থেকে ভয়ংকর উজ্জ্বল আলো এসে পড়ছে। মানুষ তা অনুভব করে। আমি নিজে আলোটি অনুভব করি না, কিন্তু সেটি আমার পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বলে সচেতন থাকি। মানুষের মুখে আমি উদ্বেগের সঙ্গে অন্য একটি অনুভূতির মিশ্রণ দেখতে পাই। আমার মনে হয়, এ কারণেই কখনো কখনো মানুষ আমাকে কিছুটা ভৌতিক বা রহস্যময় মনে করে। কারণ এই তীব্র আলোর সঙ্গে মিশে আছে শিশুসুলভ এক আকর্ষণ, যা মানুষকে নিরস্ত্র করে দেয়। ফলে তাদের দুটো অনুভূতির সঙ্গেই মোকাবিলা করতে হয়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: কিন্তু এই আলোটি আসলে কী?

কারসন: আমি জানি না। এটি একেবারে গভীর আতঙ্ক। বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মানুষকে শেষ পর্যন্ত একাই মৃত্যুর সামনে দাঁড়াতে হয়। জীবনের বিভিন্ন সময়ে আপনি এ কথা ভাবেন। অথচ সুখি হওয়া, বন্ধু তৈরি করা এবং সময় কাটানোর জন্য আপনার যে ছোট ছোট প্রচেষ্টা—সেগুলোর সঙ্গে এই সত্যটির কোনো অর্থপূর্ণ সমন্বয় ঘটানো যায় না।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: সবাই কি এই তীব্র আলো নিজের সঙ্গে বহন করে? নাকি আপনার পেছনে এটি বেশি স্পষ্ট?

কারসন: আমার মনে হয়, সবার জন্য এটা সত্য। প্রত্যেকে একে আড়াল করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন উপায় ব্যবহার করে। কোনো এক কারণে আমি একে আড়াল করার উপায় কম পেয়েছি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনার কি মনে হয়, এই অনুভূতি আপনার মধ্যে সব সময়ই ছিল? আপনার শৈশব কেমন ছিল? আমি জানি, আপনাকে অনেক জায়গায় থাকতে হয়েছে।

কারসন: আমার বাবা ব্যাংকার ছিলেন। কানাডার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাংকারদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয়, কারণ ব্যবস্থাপকদের প্রতি তিন বছর অন্তর বদলি করা ব্যাংকের নীতি। এর উদ্দেশ্য হলো তাদের বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা দেওয়া। এতে ব্যাংকের উপকার হয়, কিন্তু পরিবারের বারোটা বাজে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: তাহলে প্রতি তিন বছর পরপর আপনাকে নতুন স্কুলে যেতে হতো?

কারসন: মোটামুটি তা-ই। আমার মনে হয়, এতে আমার টিকে থাকার দক্ষতা বেড়েছিল। একদিনের কথা মনে আছে। আমরা বাড়ির উঠান থেকে গাড়ি নিয়ে বের হলাম। আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে হাত নাড়ছিলাম। জানতাম, তাদের সঙ্গে আর কখনো দেখা হবে না। তখন মনে মনে বলেছিলাম, পরেরবার কোথাও গেলে আর বন্ধু তৈরি করব না। বন্ধুত্বের তো কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তখন থেকেই আমার মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার, দরজা বন্ধ করে দেওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: পরের শহরে গিয়ে নতুন বন্ধু তৈরি করেননি?

কারসন: করেছিলাম, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও সতর্কভাবে। মনের অন্তত অর্ধেক অংশ সব সময় ভাবত, আমি এখান থেকে চলে যাব; এই সম্পর্ক স্থায়ী হবে না। বৌদ্ধধর্মের দৃষ্টিতে এটি একটি ভালো মানসিকতা। আমি যদি বৌদ্ধ হতাম, তাহলে এই মনোভাব আমার জন্য খুব সহায়ক হতো। কিন্তু বাস্তবে আমি শুধু দুঃখি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: বৌদ্ধ হলে আপনি জ্ঞানপ্রাপ্তির পথে অনেক দূর এগিয়ে যেতেন।

কারসন: তার পরিবর্তে আমি দৃঢ়ভাবে জ্ঞানপ্রাপ্তি এড়িয়ে চলেছি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: এবার প্রাচীন গ্রিস নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। আপনি কি হাইস্কুলে প্রথম গ্রিক ভাষা শেখা শুরু করেছিলেন?

কারসন: হ্যাঁ, ত্রয়োদশ শ্রেণিতে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: তখনই কি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই ভাষা আপনার জীবন বদলে দেবে?

কারসন: হ্যাঁ, সঙ্গে সঙ্গেই। মিসেস কোয়ান আমাকে গ্রিক শেখাতেন। তিনি পোর্ট হোপের হাইস্কুলে আমাদের লাতিন ভাষার শিক্ষক, তবে গ্রিকও জানতেন। আমি গ্রিক ভাষায় আগ্রহী জানতে পেরে তিনি আমাকে শেখানোর প্রস্তাব দেন। দুপুরের খাবারের বিরতিতে সেই পাঠ চলতো।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: স্কুলে কি গ্রিক ভাষার আলাদা ক্লাস ছিল না?

কারসন: না। আমি ছাড়া আর কেউ আগ্রহী ছিল না। আমরা একসঙ্গে স্যাফোর কবিতা পড়তাম, আর সেই অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ বিপ্লবাত্মক। পৃথিবীর সব ভাষা আমি জানি না। হয়তো সংস্কৃত ও চীনা ভাষা জানলে আমার চিন্তা ভিন্ন হতো। কিন্তু গ্রিক ভাষার মধ্যে এমন কিছু আছে, যা অন্য যে-কোনো আধুনিক ভাষার তুলনায় শব্দের গভীরে প্রবেশ করে। গ্রিক পড়ার সময় মনে হয়, শব্দ কীভাবে কাজ করে, তার একেবারে শিকড়ে পৌঁছে গেছি। ইংরেজি ভাষায় আমরা যেন গাছের ওপরের দিকে, ডালপালার মধ্যে অবস্থান করি এবং এদিক-ওদিক লাফিয়ে বেড়াই। গ্রিক শেখা ছিল এক ধরনের নতুন সত্যের উন্মোচন। এখনো গ্রিক ভাষা আমাকে একইভাবে বিস্মিত করে। এটি এমন এক আশ্রয়স্থলের মতো, যা সব সময় স্বাগত জানায়। অদ্ভুত, কিন্তু আন্তরিক।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: অনেকে বলেন, প্রাচীন গ্রিকরা আসলে আমাদের সমসাময়িক। আপনি কি একমত?

কারসন: প্রাচীন বিষয়ের সঙ্গে আধুনিক বিষয়ের সরাসরি প্রাসঙ্গিকতা আমি খুব বেশি খুঁজে পাই না। সত্তরের ও আশির দশকে, যখন আমি পড়াশোনা করছিলাম এবং শিক্ষকতা করছিলাম, তখন একটি প্রবণতা ছিল। বলা হতো, ধ্রুপদি সাহিত্য অধ্যয়নের উদ্দেশ্য হলো প্রাচীন যুগের মধ্যে আধুনিক জীবনের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে বের করা। এমন কোর্স তৈরি করা হতো, যাতে শিক্ষার্থীরা বিশ্বাস করতে পারে যে প্রাচীন গ্রিকদের অধ্যয়ন করেই আধুনিক জীবন সম্পর্কে যা জানা দরকার, সব শেখা সম্ভব। বলতে গেলে, এটি এক বিচিত্র ধারণা। গ্রিকদের আকর্ষণীয় করে তোলে এই বিষয়টি যে, তাদের বিশাল এক অচেনা জগতে আমরা পরিচিতির ছোট ছোট ঝলক দেখতে পাই। তাঁদের বিশ্বাস, পৃথিবী সম্পর্কে তাদের ধারণা এবং জীবনের প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় আমাদের কাছে অদ্ভুত ও দুর্বোধ্য ঠেকে। সেই অপরিচিতির ভেতরেই পরিচিতির ক্ষুদ্র ঝলকগুলো দেখা যায়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: অর্থাৎ, এই গভীর অপরিচিত জগৎটি সম্পর্কে আপনি জানতে চান। সেটি আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক কি না, তা এখানে মূল বিষয় নয়।

কারসন: গ্রিকদের সম্পর্কে একটি বিষয় আমি বুঝতে পারি। তারাও অচেনাকে বুঝতো এবং তার মূল্য দিতো। দেবতা ডায়োনিসাস এই নীতিরই প্রতীক। এমন কিছুর মুখোমুখি হওয়া, যা এতটাই ভিন্ন যে তা আপনাকে আপনার নিজের সত্তা থেকে বাইরে ঠেলে দেয়, অথচ সেই অবস্থাতেও আপনি নিজের মধ্যেই থাকেন। আপনি নিজের সঙ্গে অন্য একজনের মতো সম্পর্ক স্থাপন করেন। গ্রিকরা একে বলত এক্সটেসি বা আত্মসীমা অতিক্রমের উন্মত্ত উপলব্ধি। এই ধারণাটি গ্রিকরাই তৈরি করেছিল। একই সঙ্গে তারা আমাদের সামনে এর বাস্তব উদাহরণও রেখে গেছে। যদিও প্রাচীন গ্রিকদের প্রতি আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো তাদের কাজে লাগানোর আধুনিক প্রবণতার ফল। কে বলতে পারে? আমরা সব সময় গ্রিকদের দিকে তাকাব এবং আমাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নির্ধারণ করার চেষ্টা করব। কিন্তু আমরা নিজেদের ও তাদের উভয়ের বাইরে কোনো তৃতীয় স্থানে দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে পারব না।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: কোনো সুন্দর নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে?

কারসন: এমন কোনো নিরপেক্ষ অবস্থান নেই।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: অনেকেই জানেন না যে আপনি লেখার পাশাপাশি একজন দৃশ্যশিল্পীও। আপনি বই তৈরি করেন—কখনো একজন ব্যক্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট বই। আমার মনে আছে, একবার আমরা অন্টারিওর গ্রামাঞ্চল দিয়ে যাচ্ছিলাম। চারদিকে সবকিছু সাদা। একসময় আপনি দূরের দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, “আমি আগে ওখানে থাকতাম।” আমার মনে হয় জায়গাটি ছিল পোর্ট হোপ। বাইরে তাকিয়ে ভেবেছিলাম, সেখানে তো কেউ থাকত বলে মনে হয় না। চারদিক খাঁ-খাঁ। এরপর আপনি আমাকে একটি সাদা বই দিয়েছিলেন, যা আপনি আপনার ভাই মাইকেলের মৃত্যুর পর তৈরি করেছিলেন।

কারসন: এখান থেকে টরন্টো যাওয়ার ট্রেনে উঠলে পোর্ট হোপ অতিক্রম করার সময় আমার সব সময় অস্বস্তি হয়। আমার পরিবার সেখানে ছয়-সাত বছর বাস করেছিল। আমার বাবা-মা প্রায় পনেরো বছর এবং আমার ভাইও বিভিন্ন সময় সেখানে ছিল। বইটি আমার ভাইকে নিয়ে লেখা বলে সেই জায়গার সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সেটি এমন একটি জায়গা, যেখানে আমাদের সবার জীবন ভেঙে পড়েছিল। না, কথাটি হয়তো একটু বেশি কঠোর হয়ে গেল। বরং বলা যায়, সেখানে আমার ও আমার ভাইয়ের কৈশোরের সমাপ্তি ঘটেছিল। সেটি ছিল জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: তাহলে ভাইয়ের শোক প্রকাশের উপায় হিসেবেই আপনি বইটি লিখেছিলেন?

কারসন: হ্যাঁ। আমার ভাই মারা যাওয়ার সময় তার সঙ্গে আমার বাইশ বছর দেখা হয়নি। সে আমার কাছে রহস্যময় একজন মানুষ ছিল। অন্য একটি দেশে তার আকস্মিক মৃত্যু হয়। তার জীবনের বিচ্ছিন্ন অংশগুলো একত্র করে এমন কিছু তৈরি করার প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম, যা একটি সীমার মধ্যে ধারণ করা যায়। এই অর্থে বইটি একটি বিলাপ—এমন একজন মানুষকে কোনো কিছুর মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা, যাকে মৃত্যুর পর আর স্পর্শ করা বা কাছে পাওয়া যায় না।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: বইটি কি ধ্রুপদি বিলাপকবিতার ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছিল?

কারসন: হ্যাঁ। এটি রোমান কবি ক্যাটুলাসের একটি কবিতার ওপর ভিত্তি করে লেখা। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর কবি। ক্যাটুলাস যখন ইতালিতে বাস করতেন, তখন ট্রয়ে তাঁর ভাই মারা যান। ক্যাটুলাস এশিয়া মাইনরের ট্রয়ে গিয়ে ভাইকে সমাহিত করেন এবং তাঁকে নিয়ে একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটিতে একটি পুনরাবৃত্ত পংক্তি রয়েছে: “আওয়ে আৎকোয়ে ওয়ালে”—অর্থাৎ, “অভিবাদন এবং বিদায়।” আমার বইয়ে আমি প্রথমে কবিতাটির মূল পাঠ ছাপিয়েছিলাম। এরপর সেটিকে ভেঙে ফেলি। সম্প্রতি একটি প্রবন্ধ পড়েছি, যেখানে টি. এস. এলিয়টের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে: “কবিতা হলো বিরামচিহ্ন।” এরপর জাক লাকাঁর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছিল: “আমরা প্রজ্ঞার জন্য কবিতার কাছে যাই না; বরং প্রজ্ঞাকে ভেঙে ফেলার জন্য যাই।” কথাটি আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছিল। তাই বইটিতে আমি ক্যাটুলাসের কবিতাটিকে ভেঙে প্রতিটি পাতায় একটি করে শব্দ রেখেছিলাম। বাম পাশে ছিল লাতিন শব্দ এবং তার আভিধানিক অর্থ। ডান পাশে ছিল আমার ভাইয়ের জীবনের স্মৃতির একটি খণ্ড, যা পাতার বাম পাশের শব্দটির সঙ্গে সম্পর্কিত। যেখানে আভিধানিক অর্থের সঙ্গে স্মৃতির মিল ছিল না, সেখানে আমি অর্থ পরিবর্তন করেছি। কিছুটা অপ্রামাণিক উপাদানও ঢুকিয়ে দিয়েছি। কিন্তু এতে পাতার দুই পাশের মধ্যে সংযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে পুরো বইটি একদিকে কবিতাটির অনুবাদের গল্প বলে, অন্যদিকে আমার ভাইয়ের জীবন সম্পর্কে স্মৃতিকেও ভেঙে নতুনভাবে সাজায়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনি পারিবারিক ছবিও ব্যবহার করেছিলেন, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু ছবির পেছনের দৃশ্যগুলো। কেন?

কারসন: আমি দেখেছিলাম, আমাদের পারিবারিক ছবির সামনের অংশগুলো একেবারেই সাধারণ। কিন্তু পেছনের দৃশ্যগুলো রহস্যময় এবং নানা অর্থে পূর্ণ। তাই আমি ছবিগুলোর পটভূমি কেটে নিয়েছিলাম। বিশেষ করে সেই অংশগুলো, যেখানে সামনের মানুষের ছায়া রহস্যজনকভাবে পেছনের দৃশ্যের ওপর পড়ে। পটভূমিগুলোর মধ্যে অনেক সত্য লুকানো। আমি মাইকেলের চিঠির কিছু অংশ, চিঠির প্রকৃত কাগজের টুকরো, তার চিঠির উত্তরে আমার মায়ের লেখা কিছু অংশ, রং, প্লাস্টিক, স্ট্যাপল এবং অন্যান্য সাজসজ্জার উপকরণও বইয়ের ডান পাশে ব্যবহার করেছি। বাম পাশের পাতাগুলোকে প্রাচীন চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কারণ বইটি একটি পুরোনো রোমান কবিতাকে কেন্দ্র করে তৈরি। তাই পাতাগুলো চায়ে ভিজিয়ে রেখেছিলাম। এতে পাতায় রহস্যময় সেপিয়া রঙের আভা তৈরি হয়েছিল।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: পুরোনো ও ক্ষয়প্রাপ্ত জিনিসের প্রতি আপনার আকর্ষণ কেন?

কারসন: বাহ্যিক অবয়বের ক্ষেত্রে নিখুঁত হওয়ার চেয়ে কিছুটা অসম্পূর্ণতা বেশি আকর্ষণীয়। কবিতার ক্ষেত্রে একটি পরিচ্ছন্ন পাতার চেয়ে চায়ের দাগযুক্ত একটি পাতা বেশি আকর্ষণীয়। কারণ চায়ের দাগ সেখানে ইতিহাসের একটি স্তর যোগ করে। এটি ইতিহাসের প্রতি এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি। প্রাচীন গ্রিকদের লেখা আমাদের কাছে তো ভাঙাচোরা অবস্থায়ই পৌঁছেছে। আমি সেটিকে পছন্দ করি। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে তৈরি প্যাপিরাসের পাতার কথা ভাবুন। সেগুলোর অনুলিপি করা হয়েছে, কয়েকশ বছর ধরে মমির চারপাশে মোড়ানো ছিল। পরে সেগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে, জাদুঘরে রাখা হয়েছে, নয়জন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি সেগুলো জোড়া লাগিয়েছেন, আবার জাদুঘরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে, পরে বের করে ছবি তোলা হয়েছে এবং বইয়ে ছাপানো হয়েছে। এই সব স্তর একত্রে আরও বেশি জীবনের অর্থ তৈরি করে। নিজের জীবনেও আপনি এমন কিছু তৈরি করতে পারেন। পোশাকের দাগের মতো সাধারণ বিষয়ও ইতিহাসের অংশ।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: বইটি তৈরি করে কি আপনি আপনার ভাইকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন?

কারসন: না। আমার মনে হয় না, এটি আমার বোঝার ক্ষমতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলেছিল। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আরেকটি ব্যর্থতা বলা যায়। শেষ পর্যন্ত আমি বুঝতে পেরেছি, শোকের উদ্দেশ্য কাউকে বুঝে ওঠা নয়। বিলাপের উদ্দেশ্যও তা নয়। কেউ মারা গেলে আমাদের কাছে যে কুৎসিত বিশৃঙ্খলা পড়ে থাকে, তার মধ্য থেকে সুন্দর কিছু তৈরি করাই বরং এর উদ্দেশ্য। আমরা চাই সেই বিশৃঙ্খলাকে সুন্দর করে তুলতে। আমার কাছে সুন্দর করে তোলার অর্থ হলো এমন একটি বস্তু তৈরি করা যা দেখতে আকর্ষণীয় ও সুন্দর।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনি ‘বস্তু’ শব্দটি ব্যবহার করলেন, যা আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। আপনার কবিতাগুলো কবিতার চেয়ে বস্তুর মতো বেশি অনুভূত হয়। মনে হয়, সেগুলো কোনো চিত্রকর্মের মতো নির্মিত।

কারসন: হ্যাঁ, এমন বস্তু যার ভেতর দিয়ে আপনি ভ্রমণ করতে পারেন। আমার মনে হয়, কবিতার কাজই এমন হওয়া উচিত। প্রাচীনরা মিমেসিস বা অনুকরণ বলতে সম্ভবত এটাই বোঝাতেন। তারা যখন কবিতা নিয়ে আলোচনা করেন, তখন মিমেসিস বলতে এমন একটি ক্রিয়াকে বোঝান যা বাস্তবে পাঠকের ওপর প্রভাব ফেলে। কেউ কেউ মনে করেন, এর অর্থ হলো কবি কোনো ঘটনার ছবি তুলে রাখেন এবং খাতার পাতায় সেই ঘটনার নিখুঁত বিবরণ তুলে ধরেন। কিন্তু আমার মনে হয়, বিষয়টি তা নয়। একটি কবিতা যখন সফল হয়, তখন সেটি মনের একটি চিন্তাকে খাতার পাতায় ধরে রাখে। পাঠক যখন কবিতাটির সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তাকেও সেই চিন্তার ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। তার মন সেই ক্রিয়াকে পুনরাবৃত্ত করে এবং আবার সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। এটি নিজের চিন্তার ভেতর দিয়ে, চিন্তা করার একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। ফলে কবিতার শেষে পৌঁছানোর সময় আপনি আর আগের মানুষটি থাকেন না। আপনি সেই পরিবর্তন অনুভব করেন।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: অর্থাৎ, এটি লেখক ও পাঠক উভয়ের জন্যই একটি ক্রিয়া।

কারসন: হ্যাঁ, ঠিক তাই। তারা কৃত্রিমভাবে এই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। লেখক অনেক আগেই কাজটি করেছেন, কিন্তু পাঠক যখন কবিতার ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন তার মনে হয়, তিনি যেন অন্য একজনের মনের সঙ্গে একই ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: প্রথম কখন আপনার মনে হয়েছিল যে আপনাকে এই কাজটি করতেই হবে? কখন লেখালেখি শুরু করেছেন?

কারসন: দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ের একটি ঘটনা মনে আছে। আমাদের একটি খামারবাড়ি ও পশুপাখি নিয়ে ছবি আঁকতে বলা হয়েছিল। শিক্ষক বলেছিলেন, চাইলে ছবির সঙ্গে একটি গল্পও লিখতে পারি, যাতে ছবির ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সেটি ছিল আমার জন্য একটি বড় উপলব্ধির মুহূর্ত। ছবি ও গল্পকে একত্র করা। আমার প্রথম কবিতার বই “শর্ট টকস”-এর শুরুতে শুধু শিরোনামসহ কিছু আঁকা ছবি ছিল। পরে আমি শিরোনামগুলো একটু বিস্তৃত করি। ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, কেউই ছবিগুলোর প্রতি তেমন আগ্রহী নয়। তাই শিরোনামগুলো আলাদা করে ফেলি। তখন সেগুলো বক্তৃতার ছোট ছোট অংশের মতো হয়ে যায়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: ট্রাউট মাছ নিয়ে কবিতাটির সঙ্গে মূলত ট্রাউট মাছের ছবিও ছিল?

কারসন: কবিতাটিতে একজন মাছশিকারির ছবি ছিল। বাড়িতে আমার কাছে সেই মূল পাণ্ডুলিপিটি রয়েছে, যেখানে সব আঁকা ছবি আছে। কেউ কখনো আমার আঁকা ছবি পছন্দ করেনি। আমার মনে হয় না, আমি খুব ভালো আঁকতে পারতাম। লেখার মতো সমান সময় যদি ছবি আঁকায় দিতে পারতাম, তাহলে হয়তো উৎকর্ষ আসতো। কিন্তু ছবি আঁকা বেশি ভীতিকর। এতে নিজেকে আরও বেশি প্রকাশ করতে হয়। ছবি আঁকার মধ্যে নিজেকে আড়াল করা যায় না।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আমি সব সময় ভেবেছি, লেখালেখি আপনার প্রধান কাজ বলে ছবি আঁকাকে আপনি অবসর কাটানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন।

কারসন: না, তা নয়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: তাহলে লেখালেখিই কি আপনার অবসরের কাজ?

কারসন: তুলনা করলে তাই। লেখালেখি এক ধরনের খেলা। ছবি আঁকা অনেক বেশি উন্মুক্ত, একেবারে নগ্ন হয়ে পড়ার মতো। ভয়ংকরভাবে নগ্ন। তবে সব সময় মনে হয়েছে, যদি নিজেকে প্রতিদিন ছবি আঁকতে বাধ্য করতে পারতাম, তাহলে আরও ভালো মানুষ হতে পারতাম। এটি আমাকে এমন সততা ও নিষ্ঠার দিকে নিয়ে যেত, যেখান থেকে আমি অন্যথায় সরে যাই। ছবি আঁকার সময় আমি খুব আনন্দও পাই। এমনকি বিষণ্ণতায় ভরা মাইকেলের বইটি তৈরি করার সময়ও আমি খুব সুখি অনুভব করেছি। মনে হয়েছে, আমি পরিপূর্ণতা অর্জন করছি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: লেখার সময় কখনো এমন অনুভূতি হয় না?

কারসন: না, খুব কমই। হয়তো এক মুহূর্তের জন্য হয়, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে নয়। একটি বস্তু তৈরি করার মতো লেখালেখি আমার সমগ্র সত্তাকে একত্রিত করে না।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: তাহলে লেখেন কেন?

কারসন: কোনো বিষয় সম্পর্কে আমি কী ভাবি, তা জানার জন্য লিখি। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনি কীভাবে লেখেন, সে সম্পর্কে কিছু বলবেন?

কারসন: আমি তিনটি আলাদা ডেস্কে কাজ করি। প্রতিটি ডেস্কে আলাদা একটি প্রকল্প খোলা থাকে। একটি একাডেমিক কাজের জন্য, একটি সাহিত্যিক লেখালেখির জন্য এবং একটি শিল্পকর্মের জন্য। আমি অনিয়মিতভাবে এগুলোর কাজ করি। কখনো এক ঘণ্টার মধ্যে তিনটি ডেস্কেই বসি। এগুলো একে অপরকে প্রভাবিত করে এবং এক কাজ থেকে অন্য কাজের মধ্যে নতুন ধারণা সঞ্চারিত হয়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: তাহলে এটি দৈনন্দিন রুটিনের চেয়ে বেশি।

কারসন: আমি বলব, দিনের শুরুতে একটি রুটিন আছে। প্রতিদিন সকালে উঠে হাঁটতে যাই। ফিরে এসে চা ও নাশতা তৈরি করি। এরপর এক ঘণ্টা পড়াশোনা করি। এখন আমি প্রুস্তের “উন আমুর দে সোয়ান” পড়ছি, অভিধান সঙ্গে নিয়ে। তারপর ডেস্কে বসি। শুরুতে রুটিন থাকলেও পরে কাজের ধরনটি অনেক বেশি প্রবহমান হয়ে ওঠে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: অনুপ্রেরণার বিষয়টি কীভাবে কাজ করে? কী ধরনের বিষয় আপনাকে লেখার দিকে ঠেলে দেয়?

কারসন: বিশেষ কিছু দৃশ্য বা ছবি আমার চিন্তা ও লেখার সূচনা করে। উদাহরণস্বরূপ, “দ্য গ্লাস এসে” শুরু হয়েছিল আমার মায়ের বাড়ির কাছে বরফে জমে যাওয়া একটি নালা থেকে। আমার মনে হয়, সেই দৃশ্যটি কবিতার মধ্যেও রয়েছে। কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বা দৃশ্যমান বিষয় থেকে একটি ধারণার জন্ম হয়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: শব্দ, গন্ধ কিংবা বাসে কারও মুখে শোনা কোনো কথাও কি আপনাকে প্রভাবিত করে?

কারসন: অবশ্যই। বাসে শোনা বাক্য কিংবা স্বপ্নে শোনা কথা থেকেও। কখনো স্বপ্নের মধ্যে একটি বাক্য শুনি এবং ঘুম থেকে উঠে সেটি লিখে রাখি। সাধারণত সেগুলো অর্থহীন হয়, কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়, সেগুলো অন্য একটি জগতে প্রবেশের চাবি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনার লেখায় এমন সব বিষয়ের মধ্যে সংযোগ দেখা যায় যেগুলোকে পৃথিবীর অন্য কেউ হয়তো কখনো একসঙ্গে ভাবতেও পারে না।

কারসন: কোন বিষয়গুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি হবে, তা আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আপনি কে, এবং পৃথিবীর সঙ্গে কীভাবে আপনার মিথস্ক্রিয়া ঘটে, সেটিই এর পেছনে কাজ করে। কিন্তু আপনি কীভাবে সেই সংযোগ তৈরি করেন, তা আপনার মনের প্রকৃতি প্রকাশ করে। সংযোগ তৈরির পদ্ধতির মধ্যেই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিহিত।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: “ইকোনমি অব দ্য আনলস্ট” লেখার সময় আপনি কীভাবে সিমোনিদেসের সঙ্গে পল সেলানের সংযোগ তৈরি করলেন? সিমোনিদেস ছিলেন সমাধিলিপি-রচয়িতা এবং অর্থের বিনিময়ে কবিতা লেখা প্রথম দিকের কবিদের একজন। আর পাউল সেলান তাঁর বহু শতাব্দী পরের কবি।

কারসন: আমি কী কী দেখেছিলাম, তার তালিকা দিতে পারি। কিন্তু সেটিই যে তাদের একত্র করার কারণ, তা নয়। এমন ব্যাখ্যা পরে তৈরি করা হবে। আমি তাদের দৈবক্রমেই একত্র করেছিলাম। আর এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আকস্মিকভাবে কিছু ঘটে যাওয়া আমার কাছে গ্রহণযোগ্য। আমার কাছে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর, যখন দেখি সিমোনিদেস ও পাউল সেলান একই সময়ে আমার ডেস্কে উপস্থিত, তখন আর কী করি! আমি কী করব, তা নির্ভর করে সেই সময় পর্যন্ত আমার জীবনের সব চিন্তা এবং তখন আমি কে, তার ওপর। সিমোনিদেস ও সেলারির মধ্যেও সংযোগ তৈরি হতে পারত। তাতে কিছু যায় আসে না। গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমি সেই সংযোগ থেকে শিল্পকর্ম তৈরি করতে পারি কি না। একদিকে বিষয়টি সম্পূর্ণ খেয়ালিপনা বলে মনে হয়, অন্যদিকে চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে আমার একান্ত নিজস্ব প্রকাশও এতে ঘটে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: তাহলে আপনি দুটো বিষয় ভালোভাবে জানেন, যতক্ষণ না অস্পষ্ট সংযোগগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে?

কারসন: হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমার মনে হয়, আমি যেন মাটির গন্ধ অনুসরণ করা এক শিকারি কুকুর। তবে আমি শুধু একটি পথ খুঁজি না, খুঁজি নানা পথ। আমার কাছে ধারণাগুলোরও আকৃতি আছে। যখন অনুভব করি যে দুটি ভিন্ন বিষয় বা লেখকের মধ্যে একই ধরনের আকৃতি রয়েছে, তখন বুঝতে পারি যে তাদের একত্র করা সম্ভব।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: এই সংযোগ তৈরি করার পর কীভাবে সিদ্ধান্ত নেন, সেটি কবিতা হবে নাকি গদ্য?

কারসন: তা বলা মুশকিল। আমি একে সিদ্ধান্ত বলব না। বরং এক ধরনের ঘ্রাণশক্তির সাহায্যে পথ খুঁজে নেওয়া।

(চলবে)