জন্মশতবর্ষে নাসির আলী মামুনের আলোকচিত্রে শিল্পী সুলতান
মামুন এসব ছবি তুলেছিলেন গত শতকের সত্তর দশকের শেষ দুই বছর থেকে আশির দশকের শেষার্ধে, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৭ সাল। বেশির ভাগ ছবি সাদাকালোয় ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ তে নড়াইলে তোলা। এতো বছর পরেও সাদাকালোয় এমন প্রাণবন্ত ও ডিটেইল প্রিন্ট দেখে দর্শনদারীর চোখে বিস্ময় জাগে!
বাংলাদেশী কিংবদন্তী চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জন্মশতবার্ষিকী ছিল গত ১০ আগস্ট, ২০২৫ । বিশেষ এই দিনটি উদযাপনে ঢাকায় দু’টি অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। ৯ আগস্ট শনিবার বেঙ্গল গ্যালারিতে সুলতান জন্মশতবর্ষ উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে একটি আলোচনা অনুষ্ঠান হয়। ১০ আগস্ট থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত যশোর চারুপীঠ ও টেরাকোটার উদ্যোগে সুলতানভক্তদের সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে সপ্তাহব্যাপি অনুষ্ঠিত হয় সেমিনার, চিত্র প্রদর্শনী, সুলতানকে নিয়ে নানা লেখকের বই প্রদর্শনী ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর বড় আয়োজন।
আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুনের তোলা প্রখ্যাত শিল্পী সুলতানের ছবি নিয়ে ২২ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শনালয়ে ‘শতবর্ষে সুলতান' শীর্ষক একটি বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। এটি তাঁর ৬৫তম একক ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী, মামুন এই উদ্যোগটিকে তার শৈল্পিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক মনে করছেন। এবং এটি শুধুমাত্র একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী নয়, এটি নড়াইলের ভূমিপুত্র বিশ্ববরেণ্য শিল্পী শেখ মোহাম্মদ সুলতানের পরিণত বয়সের চিন্তাধারা, ছবি আঁকা, তাঁর দর্শন, জীবন-যাপন, বরেণ্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, সঙ্গীতকে ভালবাসা, বাউলদের সঙ্গে তাঁর সখ্য, বাঁশিতে সুর তোলা, শিশুশিক্ষা, প্রাণি ও প্রকৃতিপ্রেম এমন সবকিছু নিয়ে এক সম্পূর্ণ সুলতানকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের সহযোগিতায় বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরীর সঞ্চালনায় প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। বিশেষ অতিথি ছিলেন- বরেণ্য চিত্রকর মনিরুল ইসলাম, প্রখ্যাত সাংবাদিক-লেখক দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ও এইচএসবিসি বাংলাদেশের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাহবুবুর রহমান।
মামুন এসব ছবি তুলেছিলেন গত শতকের সত্তর দশকের শেষ দুই বছর থেকে আশির দশকের শেষার্ধে, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৭ সাল। বেশির ভাগ ছবি সাদাকালোয় ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ তে নড়াইলে তোলা। এতো বছর পরেও সাদাকালোয় এমন প্রাণবন্ত ও ডিটেইল প্রিন্ট দেখে দর্শনদারীর চোখে বিস্ময় জাগে! এই প্রদর্শনীতে এসব ছবি তোলার জন্য ব্যবহৃত ইয়াসিকা বক্স ক্যামেরাও দর্শকদের দেখার জন্য প্রদর্শনী হলে সযত্নে রাখা হয়েছে।
সেইকালে মামুন কিছু রঙিন ছবিও তুলেছিলেন। নড়াইলের ভূমিপুত্র সুলতানের প্রতিকৃতি, মাথায় সাদাকালো টুপি ঢাকা দিয়ে তাঁর প্রিয় পোষাক কালো আলখেল্লা, কালোপ্যান্ট পরে লালরঙের ঝোলা কাঁধে ঝুলিয়ে চিত্রানদীতে নৌকায় দাঁড়িয়ে থাকা পূর্ণ দেহের ছবি, নদীতীরে সাদা চাদর গায়ে জড়িয়ে থাকা ছবি, মুখখুলে হাসির ছবিতে দেখা যায় শিল্পীর কয়েকটি দাঁত নেই!
১৯৮৭ সালে তোলা রঙিন ছবিতে দেখা যাচ্ছে ঢাকার কলাবাগানের এক বাসায় ড. মফিজুর রহমান, শিল্পী কাজী আবুল কাশেম ও নাসির আলী মামুনের সঙ্গে সুলতান। কাজী মোতাহার হোসেন, কবি আবদুল কাদির, কবি আল মাহমুদ, সুলতানভক্ত লেখক- চিন্তক আহমদ ছফার সঙ্গে ভিন্ন তিনটি ছবিতে দেখা গেল সুলতানকে। কবি জসীম উদদীনের সঙ্গেও শিল্পীর ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ছিল। বৃটিশ আমল থেকে পাকিস্তান, সে আমল থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত খ্যাতনামা অনেক শিল্পী- সাহিত্যিক- সংস্কৃতিসেবী ও বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক ছিল, এসব ছবি তার প্রামাণ্য!
চলচ্চিত্রকার খান আতা, সাংবাদিক ফজলে লোহানীর সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির পর লাহোরপর্ব থেকে। ১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার আগে সুলতান লন্ডনে যান ওই বন্ধুদের ভরসায়। লন্ডনে নয় মাস ছিলেন, ওখানে কয়েকটি প্রদর্শনীতে অংশ নেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য- ১৯৫১ সালে আর্ট ইকুইটি লন্ডনের উদ্যোগে লেস্টার গ্যালারিতে আয়োজিত হয় একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী। দলগত সেই প্রদর্শনীতে পাবলো পিকাসো, সালভাদর দালি, ডাফি, পল ক্লি, অঁরি মাতিস প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে তাঁর আঁকা চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। প্রথম এশীয় চিত্রশিল্পী হিসেবে সুলতান এই বিরল খ্যাতি অর্জন করেন। লিস্টার গ্যালারি তাঁর একটি চিত্রকর্ম স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করে। তাঁর আঁকা সে সময়কার অন্যান্য ছবির হদিস পাওয়া যায় নি!
প্রদর্শনীর ছবিতে 'ক্যামেরার কবি' নামে পরিচিত আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের দৃষ্টিকোণ থেকে মফ:স্বল নড়াইলের প্রায় গ্রামীণ আবহে ধারণ করা শিল্পী সুলতানের বিরল এবং অন্তরঙ্গ দৃশ্য সম্বলিত দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে নিয়ে এক প্রকার স্থির ডকুমেন্টারি চিত্রিত হয়েছে। এছাড়াও মামুনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে মূল নেগেটিভ, সুলতানের হাতে লেখা চিঠি, ডায়েরি এন্ট্রি, অঙ্কন এবং অন্যান্য স্মারকসহ বরেণ্য শিল্পীর অনেকগুলো প্রতিকৃতিসমেত তাঁর আত্মমগ্নতার অভিব্যক্তি প্রদর্শিত হচ্ছে। এখানে সুলতানের বাঁশি বাজানোর একাধিক ছবি
উল্লেখ্য, এই শিল্পকর্মগুলির অনেকগুলি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে প্রদর্শিত হচ্ছে, যাতে বাংলাদেশের এই খ্যাতিমান চিত্রশিল্পীর অসাধারণ জীবনের কতক চিত্তাকর্ষক ঝলক প্রতিফলিত হয়েছে। যেমন- আমরা জানি সুলতান ছিলেন শিশুবান্ধব। শিশুশিক্ষার সঙ্গে প্রকৃতিপাঠকে তিনি গুরুত্ব দিতেন। প্রকৃতিপাঠের ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য ছবি আঁকাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন বলে তিনি যেখানেই গেছেন সেখানেই ছোটদের ছবি আঁকায় উদ্বুদ্ধ করতেন।
মামুনের তোলা একটি ছবিতে সহাস্য অবয়বের সুলতানের দু’পাশে অনেক শিশু, পেছনে নড়াইল জমিদার বাড়িখ্যাত ভিক্টোরিয় স্থাপত্যরীতির চমৎকার দ্বিতল ভবন, যা এখন আর নেই! জমিদারদের পরিত্যক্ত ওই ভবনে তিনি বাস করেছেন এবং ছোটদের ছবি আঁকা শিখিয়েছেন। ওই বাড়িতে আমিও গেছি ১৯৮২ সালে। আমাদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছেন রূপগঞ্জ হাটে। এই হাটে সুলতান হাঁটছেন এমন একটি ছবিও দেখা গেল এ প্রদর্শনীতে।
শিশুদের সঙ্গে আরও কয়েকটি ছবিতে শিশুপ্রেমী সুলতানকে তাদের কেন্দ্রেই দেখা যায়। আমরা উপলব্ধি করি আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল।
তাঁর জীবনী ঘেঁটে দেখতে পাই সুলতান এলাকার শিশুশিক্ষার জন্য তাঁর মামাবাড়ি চাঁচুরি পুরুলিয়ায় কৈলাস সিকদার নামে এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর পরিত্যক্ত বাড়ির জঙ্গল সাফ করে তিনি একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন! নাম দেন নন্দনকানন স্কুল অব ফাইন আর্ট। কিন্তু স্কুলটির নামকরণ ও শিক্ষণ পদ্ধতির বিষয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে মতভেদের জন্য তিনি ওই স্কুল এবং এলাকা ত্যাগ করেছিলেন!
কয়েকটি ছবির দিকে তাকালে দর্শক দেখতে পাবেন- নতুন সৃজন ভাবনায় নতমুখে যেন মাটির দিকে তাকানো গভীর আত্মনিমগ্ন প্রত্যয়ী শিল্পী সুলতানের প্রতিকৃতি তুলেছেন মামুন তাঁর অসামান্য ধ্যানে তুমুল দক্ষতার আত্মনিবেদনে! শ্রমজীবী মানুষের সৃজনধ্যান অর্থাৎ ইনারস্ট্রেন্থকে সুলতান তাঁর আঁকা ছবিতে তুলে ধরেছেন কৃষক- শ্রমিকের দেহকাঠামোকে মাসলময় শক্তিমানরূপে প্রকাশ করে। ফসলফলানো কঠোর পরিশ্রমী শীর্ণকায় কৃষক কিংবা উৎপাদক শ্রমিক ও তাদের পরিবার এমনকি গবাদিপশু সবার ভেতরকার প্রাণশক্তিকে তিনি চিত্রিত করেছেন হৃষ্টপুষ্ট, পেশিবহুল সুখী-সংগ্রামীজীবনের প্রতীক রূপে। এই শিল্পদর্শন ও তাঁর বিবাগীজীবন নিয়ে তিনি কিংবদন্তিতূল্য এক অসামান্য সৃজন-চরিত্র হিসেবে সবার চেনা। তাঁকে বুঝতে হলে তাঁর শিল্পদর্শনকে আগে বুঝতে হবে আমাদের।
সেই আশির দশকে নাসির আলী মামুনের তোলা ছবিগুলো পুরনো হয়নি, মনে হয় এসব যেন অতি সম্প্রতির ছবি! নড়াইলে গেলেই যেন আমরা পেয়ে যাব তার শ্রেষ্ঠ সন্তানটিকে!
মামুন বলেছেন- “প্রথমবারের মতো, আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহের জিনিসপত্র - যার মধ্যে রয়েছে তার তিনটি দাঁত, হাতে লেখা চিঠি, লেখা এবং অঙ্কনসহ ডায়েরির পৃষ্ঠা, অপ্রকাশিত স্কেচ এবং মূল নেগেটিভ- জনসাধারণের জন্য প্রদর্শন করা হচ্ছে।”
এই উপলক্ষ্যে, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এবং এইচএসবিসি বাংলাদেশ যৌথভাবে 'সিডিং দ্য সোল' শিরোনামে ১৬০ পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছে - এখানে সুলতানকে কেন্দ্রে রেখে মামুনের তোলা ছবিকে সম্পর্কিত করে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা লিখেছেন অধ্যাপক শাহমান মৈশান। মামুন নিজেও লিখেছেন। প্রদর্শনী হলের অভ্যন্তরে ছোট এক কক্ষে শিল্পী সুলতানের বাজানো বাঁশির শব্দ শুনে ঢুকে দেখি তিনি বাঁশি বাজাচ্ছেন, কথা বলছেন সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর সঙ্গে। সব মিলে শিল্পের সুলতানকে জানতে ও বুঝতে হলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ডকুমেন্টেড প্রদর্শনী। প্রতিদিন অনেক বিশিষ্টজন এসে দেখছেন, ছবি তুলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
'শতবর্ষে সুলতান' ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ৮টা পর্যন্ত (রবিবার ছাড়া) বেঙ্গল শিল্পালয়, বাড়ি ৪২, রোড ২৭, ধানমন্ডিতে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
