Published : 20 Jul 2025, 09:41 PM
শেষবারের মত নিহর দেহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে এলেন চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান। দীর্ঘদিনের স্মৃতিময় প্রাঙ্গণ থেকেই সহকর্মী আর শিক্ষার্থীদের অশ্রুজলে বিদায় নিলেন তিনি।
রোববার সকাল ১০টা ৭মিনিটে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হামিদুজ্জামান খান। তিনি ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন তার স্ত্রী চিত্রশিল্পী আইভি জামান।
বিকেল পৌনে ৪টায় যখন এই শিল্পীর মরদেহ চারুকলা প্রাঙ্গণে আনা হয়, চারদিকে তখন অশ্রুজলে বেদনাবিধূর পরিবেশ। কেউ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, আবার কেউবা নীরব দাঁড়িয়ে থাকেন মরদেহের পাশে। আড্ডা-আলাপেও হামিদুজ্জামান খানের বর্ণাঢ্য শিল্পী জীবনের নানা প্রসঙ্গ উঠে আসে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক ও চিত্রশিল্পী রশীদ আমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভাস্কর্য শিল্পকে নাগরিক পরিসরে অনেক বেশি সমাদৃত করেছেন হামিদুজ্জামান খান। তার কাজের দুটি দিক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একটি হল মুক্তিযুদ্ধের প্রতি যে কমিটমেন্ট। ‘জাগ্রতবাংলা’, ‘সংশপ্তক’, ‘বিজয় কেতন’ আর ‘স্বাধীনতা চিরন্তন’, এর মত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বহু ভাস্কর্য গড়েছেন। তিনি আজন্ম মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কমিটেড থেকে শিল্পচর্চা করেছেন।

“তার কাজের আরেকটি দিন হল- তিনি একাধারে চিত্রশিল্পী এবং ভাস্কর। সাধারণত ভাস্কর্য চর্চায় যারা যুক্ত, তারা কমই ছবি আঁকেন। হামিদুজ্জামান খান চিত্রশিল্প এবং ভাস্কর্য, উভয় মাধ্যমেই সাফল্য দেখিয়েছেন। এছাড়াও শিল্পের নানা শাখায় তিনি কাজ করেছেন। বহুমুখিতার জন্যই তাঁকে বিশেষভাবে আমাদের মনে রাখতে হবে।”
হামিদুজ্জামান খান ভাস্কর্যের পাশাপাশি জলরঙ, তেলরঙ, অ্যাক্রিলিক, স্কেচ মাধ্যমে সমানতালে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ভাস্কর্যে তার প্রিয় বিষয় ছিল পাখি। ঢাকার বুকে ব্রোঞ্জ ও ইস্পাতের তৈরি বেশ কিছু পাখি তার শিল্পী সত্তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
অসুস্থ হওয়ার আগের সপ্তাহেও হামিদুজ্জামান খান ফুল নিয়ে সিরিজ ছবি আঁকছিলেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন শিল্পীর ঘনিষ্ঠজন আলোকচিত্রী মোহাম্মদ আসাদ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্যার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগের শুক্রবারও ফুল নিয়ে কয়েকটা ছবি আঁকছিলেন। এর মধ্যে ১০টা ছবি তিনি এঁকেছিলেন; ৬টা ছবি এখন আমার কাছে আছে। আর ৪টা শুকানোর জন্য স্যারের বাসাতেই রয়েছে। স্যার বলতেন, তুমি যা দ্যাখো তা আঁকলেই হয় না। হৃদয় দিয়ে যা দ্যাখো, তা আঁকতে হয়।
“স্যার ‘মাকেট’ নিয়ে একটা বড় পরিসরের প্রদর্শনী করার পরিকল্পনা করছিলেন। ‘মাকেট’ হল ভাস্কর্যের ছোট আদল। শত শত ‘মাকেট’ স্যারের সংগ্রহে ছিল। স্যার চেয়েছিলেন, এগুলো নিয়ে প্রদর্শনী করতে।”

আসাদ বলেন, “তিনি সবশেষ ভাস্কর্যটি করেছিলেন কুমিল্লায় মেঘনা গ্রুপের শিল্পাঞ্চলে। সেখানে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রি’ নামে একটি বড় ভাস্কর্য করেছেন। এছাড়া স্যারের নতুন বইও প্রকাশ হয়েছিল কয়েক মাস আগে। শারীরিকভাবেও সুস্থই ছিলেন। কিন্তু হুট করে ডেঙ্গু, নিউমোনিয়া থেকে স্যার চলে গেলেন না ফেরার দেশে।”
হামিদুজ্জামান খানকে শ্রদ্ধা জানাতে এসে মুক্তিযোদ্ধা, চিত্রশিল্পী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারক আলভী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কাজ করতে করতে যে একজন শিল্পী নিজেকে কতটা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন, সেটি হামিদুজ্জামান খান দেখিয়েছেন। তিনি অনেক কাজ করেছেন, কাজ করতে করতেই তিনি হামিদুজ্জামান খান হয়ে উঠেছেন। তার মত এত বিপুল কাজ এক জীবনে কম শিল্পীই করতে পারে।”
ষাটের দশকে আর্ট কলেজে পড়তে এসে হামিদুজ্জামান খানের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার স্মৃতিচারণ করেন চিত্রশিল্পী বীরেন সোম।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনার সাথে আমার পরিচয় তো সেই আর্ট কলেজে পড়ার সময়। ১৯৬৮ সাল হবে। আমরা একই হলে থাকতাম, আমি ৩ নম্বর রুমে, আর উনি ৬ নম্বর রুমে। এরপর থেকে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তার সম্পর্কে আমি শুধু বলব, শিল্পীদের মধ্যে যে কজন ভালো মানুষ আছেন, তিনি তাদের অন্যতম। আর্ট কলেজে আমার দুই বছরের সিনিয়র ছিলেন। কিন্তু বন্ধুর মতই ছিলাম। প্রচুর কাজ করেছেন হামিদুজ্জামান খান। এই কাজই তাকে বড় শিল্পীতে পরিণত করেছে।”
শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ায় হামিদুজ্জামানকে গত ১৫ জুলাই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তার বয়স হয়েছিল ৭৯।

হামিদুজ্জামানের স্ত্রী আইভি আশা করেছিলেন, নিউমোনিয়া খানিকটা নিয়ন্ত্রণে এলেই এই শিল্পীকে আইসিইউ থেকে সাধারণ কেবিনে দেওয়া হবে। কিন্তু সব ছেড়ে অনন্তলোকে পাড়ি জমালেন শিল্পী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন আজহারুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গুণী শিল্পীদের স্মরণ করে চারুকলা নানা রকম সেমিনার, অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। হামিদুজ্জামান খানকেও চারুকলা অনুষদ নানাভাবে স্মরণে রাখবে।”
চারুকলার ডিন বলেন, “হামিদুজ্জামান খান একই সাথে চিত্রক এবং ভাস্কর, এটা বিরল। শিল্পের দুটো জায়গাতেই তিনি অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছেন।”
উড়ে গেল ইস্পাতের পাখি, ভাস্কর হামিদুজ্জামানের চিরবিদায়
ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান আইসিইউতে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের অধ্যাপক মলয় বালা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হামিদুজ্জামান খান যেমন বড় শিল্পী, তেমন বড় মনের মানুষও। তাকে কখনোই আমি রেগে যেতে দেখিনি। ছোটদের সাথেও তিনি যে সম্মান দেখিয়ে কথা বলতেন, তা থেকে আমরা শিখতাম। বাংলাদেশের শিল্পকলা চর্চায় তার যে অবদান, তা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং এজন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।”
ভাস্কর হামিদুজ্জামান খানের ভাতিজা পিয়ারো খান জানান, চারুকলা অনুষদ থেকে এই শিল্পীর মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে বাদ আছর তার জানাজা হয়।
রাতে হামিদুজ্জামান খানের মরদেহ কিশোরগঞ্জের কটিয়াদির সহশ্রামে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই শায়িত হবেন তিনি।
চারুকলা অনুষদে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান ভাস্কর্য বিভাগের চেয়ারম্যান নাসিমুল খবির ডিউক, শিল্পী জামাল আহমেদ, ফরিদা জামান, জয়নুল আবেদিনের ছেলে ময়নুল আবেদিন, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চোধুরী, গ্যালারি কায়ার প্রধান গৌতম চক্রবর্তী, শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক প্রদ্যুত কুমার দাশসহ অনেকে।
এছাড়া বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, সমকাল শিল্পী গোষ্ঠী, ঢাবি ভাস্কর্য বিভাগ, শান্তা মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে।

হামিদুজ্জামান খানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, থিয়েটার পত্রিকা ক্ষ্যাপাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন।
হামিদুজ্জামান খান ১৯৪৬ সালের ১৬ মার্চ কিশোরগঞ্জের সহশ্রাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি ১৯৬৭ সালে বাংলাদেশ কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে চারুকলায় স্নাতক ডিগ্রি নেন। শুরুতে জলরঙের চিত্রকর্মের জন্য খ্যাতি পেলেও পরে মন দেন ভাস্কর্যে। ১৯৭০ সালে ঢাকা চারুকলার ভাস্কর্য বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা হামিদুজ্জামানকে আটক করলেও পরে তিনি ছাড়া পান।২৭ মার্চ ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকায় তিনি অসংখ্য মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
যুদ্ধের নৃসংশতা এবং মানুষের অভাবনীয় দুর্দশা তাকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। সে কারণে স্বাধীনতার পর প্রথম দুই দশকে তার অধিকাংশ ভাস্কর্যের বিষয় ছিল মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৭২ সালে ভাস্কর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে তিনি ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ নির্মাণে কাজ করেন। জয়দেবপুর চৌরাস্তায় এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় নির্মিত প্রথম ভাস্কর্য।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে সার কারখানায় ‘জাগ্রতবাংলা’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সংশপ্তক’, ঢাকা সেনানিবাসে ‘বিজয় কেতন’, মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন প্রাঙ্গণে ‘ইউনিটি’, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে ‘ফ্রিডম’, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘স্বাধীনতা চিরন্তন’, আগারগাঁওয়ে সরকারি কর্মকমিশন প্রাঙ্গণে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’, মাদারীপুরে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ হামিদুজ্জামান খানের অন্যতম বহিরাঙ্গণ ভাস্কর্য।
তবে তার শিল্পী সত্তার আরেক রূপ ধরা দিয়েছে ইস্পাত আর ব্রোঞ্জে গড়া পাখির ভাস্কর্যে। আশির দশকে বঙ্গভবনের প্রবেশপথে ফোয়ারায় স্থাপিত তার ‘পাখি পরিবার’ ভাস্কর্যটি প্রশংসা কুড়ায়। গুলশানের ইউনাইটেড ভবনের প্রবেশপথে তার ‘পাখি’র বিমূর্ত উড়ান আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে তার ‘শান্তির পাখি’ অন্য এক আকাঙ্ক্ষার কথা বলে।
এক জীবনে হামিদুজ্জামান খান দুইশর মত ভাস্কর্য গড়েছেন। তার একক প্রদর্শনী হয়েছে ৪৭টি।
হামিদুজ্জামান খান ২০০৬ সালে শিল্পকলায় অবদানের জন্য একুশে পদক পান। ২০২২ সালে বাংলা একাডেমি ফেলো নির্বাচিত হন।