Published : 14 Aug 2025, 01:07 PM
নব্বই দশকের শুরুতে যতীন সরকার বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অসাধারণ একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তা ছাপা হয়েছিল ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে। ব্রডশিটের পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে ছিল সেই লেখা। লেখাটি শুরু হয়েছিল মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘পাখি সব করে রব’ পদ্যের দুটো পঙক্তির—“রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে, শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে”—উদ্ধৃতি দিয়ে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘রাখাল’ বালক আর ‘শিশু’ যে এক ব্যাপার নয়, এক ব্যাপার ছিল না, এক ব্যাপার যে হলো না, কেন হলো না, সেসব কথাই ছিল ওই প্রবন্ধে।
ওই পত্রিকায়ই ওই সময় আরো একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন যতীন সরকার লোকসাহিত্য নিয়ে। যে লেখাটিতে তিনি বাংলা কবিতার মূলধারা বলে লোকসাহিত্যের ধারাটিকেই চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন খুব উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই। সপ্তাহান্তে ওই লেখাটির সূত্র ধরে একটি প্রতিক্রিয়া-নির্ভর লেখা লিখেছিলেন সম্ভবত লোকসাহিত্য গবেষক অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলাম। যতীন সরকার পরে আবার সেটির জবাবও লিখেছিলেন একই সাময়িকীতে। ওই লেখাগুলোর মাধ্যমেই লেখক ও পণ্ডিত হিসেবে যতীন সরকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জেগে ওঠে আমাদের একেবারে প্রথম কৈশোরে।
১৯৯২ সালের দিকে (সম্ভবত) যতীন সরকারের সঙ্গে প্রথম দেখা। আমি তখন গ্রামে থাকা তরুণ। তাঁর লেখা পড়ে একটা চিঠি লিখেছিলাম। তিনি সেটার জবাবও দিয়েছিলেন। পরে কর্মস্থল ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে একদিন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাই। সেদিন তাঁর আচরণ ছিল অত্যন্ত স্নেহের, কিন্তু শিক্ষকসুলভ মৃদু শাসনেরও। তাঁর কাছে যাওয়াটা ছিল নিতান্ত আবেগের বশে এবং ব্যক্তিগত হতাশার কারণে। পরে যতবার সেদিনের কথা মনে হয়েছে ততবার আমি নিজে নিজে লজ্জা পেয়েছি। তিনি অবশ্য সেদিনের সেই দেখা হওয়ার কথাটা ভুলেই গিয়েছিলেন।
২০০৭ সালের পর একবার তাঁর একটা ভিডিও সাক্ষাৎকার নিতে গেলাম। তখন ছোটভাইতুল্য একজনকে সঙ্গে নিলাম ক্যামেরার কাজ করার জন্য। সাক্ষাৎকারের সেই ভিডিও এবং সেই ছোটভাইকে আজও আর পাইনি। পরে অবশ্য যতীন সরকারের আরেকটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেটি ছিল লেখ্যমাধ্যমের জন্য। ওই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে একটি লেখা তৈরি করেছিলাম। যেটি তখন ছাপা হয়েছিল গুণীজন নামের একটি ওয়েব পোর্টালে। যতীন সরকার সংক্রান্ত অনেক তথ্যই বহুদিন ধরে সেই লেখা থেকে ধার করেছে বিভিন্ন অনলাইন; এখনও করে। লেখাটি পরে স্বপন ধরের ‘জলদ’ পত্রিকায় ছাপাও হয়েছিল।
যতীন সরকারের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল নেত্রকোনায় তাঁর বাড়ি ‘বানপ্রস্থে’ এক আয়োজনে। তখন তাঁর আর্থ্রাইটিসের বাড়াবাড়ি চলছে। হাঁটাচলা করতে পারেন না বলতে গেলে। যে কারণে তাঁর বাড়ি বানপ্রস্থের আঙ্গিনায় আমরা সেই আয়োজন করি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ছিল সেই আয়োজন। কোরিয়ান সাহিত্যের অনুবাদ নিয়ে প্রকাশনা সংস্থা ‘উজানে’র সেই আয়োজনে তিনি ছিলেন সভাপ্রধান। সভাপতি হিসেবে আলোচনার বদলে অনেকগুলো কবিতা পড়েছিলেন আমার অনুবাদ করা ‘কো উনের কবিতা’ গ্রন্থ থেকে। নিজ থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনেকগুলো কবিতা পড়েন সেদিন তিনি। সারা জীবন সাধারণ মানুষের পক্ষে ছিলেন, সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেছেন, সাধারণ মানুষের সংগ্রামে ছিলেন। ‘কো উনের কবিতা’ থেকে বেছে বেছে মানুষের সংগ্রামের পক্ষের, মানুষের আত্ম-অনুসন্ধানের পক্ষের কবিতাগুলোই পড়েছিলেন তিনি।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের লোকজন জানেন, দারুণ বক্তৃতা করতেন তিনি। বক্তৃতা শুরু করলে যে তিনি ঘণ্টাখানেক মুগ্ধ করে রাখবেন তা আমরা আগে থেকেই জানতাম। যে কারণে সাহিত্য অঙ্গনের দুষ্টু তরুণরা অনেক সময় ঘণ্টাখানেকের জন্য সভাস্থলের পাশে কোনো চায়ের স্টলে চলে যেতাম। সেখানে চা খেতে খেতে আর আড্ডা দিতেও আমরা অবশ্য এক কান পেতে রাখতাম তার বক্তৃতার দিকে।
প্রচুর হাসি ও আনন্দের জোগান থাকত তাঁর বক্তৃতায়। এমনকি আড্ডা দেওয়ার সময়ও অনেক বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুক করতেন তিনি। নিজে হাসতেন প্রচুর, অন্যকেও হাসাতেন। যতীন সরকার ছিলেন সমাজতন্ত্রী, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী, নিজেকে তিনি বলতেন ‘কমিউনিস্ট’, মজা করে তার অর্থ করতেন, ‘কমিউনিস্ট’ মানে ‘কম অনিষ্টকারী’। নিজেকে ‘কষ্টলেখক’ বলতেন তিনি। নিজের এই রসিকতায় নিজেই হাসতেন। গল্প, কবিতা ও উপন্যাসের বাইরে যে লেখালেখির জগৎ, সেই জগতের বাসিন্দা হওয়ার কারণে প্রচুর অধ্যয়ন, গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কষ্ট ও পরিশ্রম করে লেখালেখি করতে হয় বলেই তিনি নিজেকে বলতেন ‘কষ্টলেখক’।
এখনকার স্বনামধন্য এক কথাসাহিত্যিক একবার গেলেন ময়মনসিংহ শহরে। রাতে যতীন সরকারের সঙ্গে আড্ডার ব্যবস্থা হলো বর্তমান সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের বাসায়। সেখানে ওই কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর উপন্যাস ‘প্রদোষে প্রাকৃতজনে’র প্রসঙ্গ তুলে কথা বলা শুরু করলেন। প্রদোষ কথাটার অর্থ তখনও তিনি জানতেন না। ভেবেছিলেন ‘প্রদোষ’ মানে ‘ভোর’ বা ‘ঊষা’। যতীন সরকার তাঁর বিখ্যাত হাসি দিয়ে জানিয়ে দিলেন যে ‘প্রদোষ’ মানে ‘সন্ধ্যা’ বা ‘গোধূলি’।
যতীন সরকারকে একবার কেউ একজন নাকি প্রশ্ন করেছিলেন, “স্যার, আপনি কি মনে করেন আপনি সৎ? হা হা হা করে হাসতে হাসতে তিনি বলেছিলেন, “কেমনে বলব, আমার সামনে তো কেউ একশ কোটি টাকা রাখে নাই, আর আমিও তো ওই টাকার সামনে নিজেকে বসিয়ে পরখ করে দেখি নাই।”
নিজের পরিবার নিয়ে মজা করে তিনি বলতেন, “আমাদের পরিবার হলো একটা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। নিজে হিন্দু, ভাইয়ের স্ত্রী বৌদ্ধ এবং ছেলের বৌ খ্রিস্টান হওয়ার কারণে তিনি বলতেন কথাটা।

সপরিবারে সদ্যপ্রয়াত লেখক যতীন সরকার
পারিবারিক ও সামাজিক কারণে লেখালেখির জন্য নিজেকে গুছিয়ে নিতেও যতীন সরকারের দেরি হয়েছে। দেরি হয়েছে বাংলাদেশের রাজধানীকেন্দ্রিক লেখালেখির মঞ্চে উদ্ভাসিত হতেও। তাঁর লেখালেখি সবার নজরে আসতে থাকে প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সে। প্রতিদিন লিখতেন তিনি। কম লিখতেন। কিন্তু প্রতিদিনই লিখতেন। প্রথম দিকে তিনি বলতেন, “প্রতিদিন এক প্যারা করে লিখি। আশি বা একশ শব্দ। তবে, তা প্রতিদিন।”
ঘরোয়া আড্ডায়, অনানুষ্ঠানিক কথাবর্তায় হুমায়ুন আজাদের প্রসঙ্গ উঠলে যতীন সরকার কখনো কখনো ক্ষেপে যেতেন। হুমায়ুন আজাদ তাঁকে ‘থার্ড ক্লাস’ বলেছিলেন। এই বিষয়টি তিনি ভুলতে পারেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্য পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। তখন হুমায়ুন আজাদ নাকি বলেছিলেন, “আমার ডিপার্টমেন্টে থার্ড ক্লাস কাউকে নেওয়া হবে, এটা আমি মানতে পারব না।”
যতীন সরকারকে যতদিন দেখেছি, ততদিন দেখেছি ধুতি ও পাঞ্জাবিতে। এটিই ছিল তাঁর শিক্ষকতা এবং সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতার পোশাক। বিশেষত নব্বই দশকের পরে বাংলাদেশের শহরে তো নয়ই, মফস্বলেও সচরাচর কাউকে এই পোশাক পরতে দেখা যেত না। আমার মনে হয় কিছু কারণে হিন্দু পুরুষদের পোশাকে পরিবর্তনটা এসেছে। একটা বিশ্বায়ন এবং বৈশ্বিক পুঁজিবাদের কারণ, আরেকটা কারণ, স্থানিক ধর্মীয় সংখাগরিষ্ঠদের সঙ্গে সহাবস্থানের পরোক্ষ চাপ, আরেকটা কারণ সংখ্যালঘুদের মানিয়ে নেওয়ার কৌশল। যতীন সরকার কোনো কারণেই কিন্তু তাঁর এই পোশাক ছাড়েননি, পোশাকটিকে তাঁর ব্যক্তিত্বের অংশ করে নিয়েছিলেন।
যতীন সরকারের চারটি বই আমার ব্যক্তিগত পাঠের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু দর্শন’, ‘বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য’, ‘জালালগীতিকা সমগ্র’ (সম্পাদনা) এবং ‘আমার রবীন্দ্র অবলোকন’। ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু দর্শন’ বইটিতে আত্মজৈবনিক বয়ানে তিনি তুলে ধরেছেন পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু এবং বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস। রাজধানী ঢাকায় বসে ঢাকাবাসীর চোখ দিয়ে নয়, বরং প্রান্তে বসে প্রান্তের এক প্রাজ্ঞজনের চোখ দিয়ে তিনি দেখেছেন পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু ও বাংলাদেশকে। রাজা ও সম্রাটের খেয়ে-পরে ইতিহাস লেখা আর নিম্নবর্গের অবস্থান থেকে ইতিহাস লেখার যে পার্থক্য সেই পার্থক্যের জায়গা থেকেই বিশিষ্ট এই বই। বাংলাদেশের লোক-ঐতিহ্যের দিকে গভীর অভিনিবেশ ছিল তাঁর। সেই অভিনিবেশ থেকে যে পর্যবেক্ষণ সেগুলো নিয়েই তাঁর রচনা ‘বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য’সহ লোকসাহিত্য বিষয়ক নানা বইপত্র। লালনের পর বাংলার বাউলসাধকদের মধ্যে যাঁদেরকে সবচেয়ে উঁচু আসন দেওয়া দরকার তাঁদের একজন জালালউদ্দিন খাঁ। ‘জালালগীতিকা সমগ্র’ তিনি শুধু সম্পাদনাই করেননি। বস্তুবাদিতা ও ইহলৌকিকতার জায়গা থেকে যতীন সরকারের জীবনে ও বয়ানে জালালউদ্দিন খাঁ ছিলেন অবিরাম অনুষঙ্গ। ‘আমার রবীন্দ্র অবলোকন’ গ্রন্থে তিনি যেভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দেখেছেন সেটি, এক কথায়, অনন্য।
যতীন সরকার ৮৯ বছর বয়সে চলে গেলেন (১৩ আগস্ট ২০২৫)। তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল নেত্রকোনার এক গহীন গ্রামে। কেন্দুয়া উপজেলার চন্দ্রপাড়া গ্রামের পাশে ছিল রামপুর বাজার। রামপুর বাজারকে তিনি বলতেন ‘পৃথিবীর জানালা’। ওই জানালা দিয়েই শৈশবে চল্লিশের দশকের পৃথিবী দেখতে শুরু করেছিলেন তিনি। তাঁর জীবনের মধ্যভাগ কেটেছে ময়মনসিংহ শহরের ব্রাহ্মপল্লীতে এবং শেষজীবন আবার নেত্রকোনা শহরে। নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের লোকজনের সত্যিকারের দিশারী ও জীবনগুরু হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহের মানুষের মতো ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার মানুষের ‘বাঘা যতীন’ ছিল না, কিন্তু ‘বাগ্মী যতীন’ ছিল, যাঁকে ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের লোকজন মাথায় তুলে রাখত। যে জীবন তিনি যাপন করে গেলেন সেটি প্রজ্ঞাবানের জীবন, নিতান্ত সাধারণ সে জীবন, কিন্তু অত্যন্ত অসাধারণ।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এক আয়োজনে যতীন সরকারের বাড়িতে বাদিক থেকে নিবন্ধের লেখক ষড়ৈশ্বর্য মুহাম্মদ ও যতীন সরকার
ময়মনসিংহ শহরে ব্রাহ্মপল্লীতে তাঁর ছোট্ট বাসায় যাঁরা গিয়েছেন তারা জানেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বোঝাপড়া’ কবিতার দুই লাইন সেই বাসায় দেয়ালে ঝোলানো ফ্রেমে বাঁধাই করা ছিল—“মনেরে আজ কহ যে, ভালো মন্দ যাহাই আসুক, সত্যেরে লও সহজে।” সত্যেরে তিনিও সহজভাবেই নিয়েছিলেন। জীবনের শেষ বছরগুলো আর্থ্রাইটিসে ভোগার সময় নয় শুধু, সারা জীবনই তিনি সহজ জীবনের আরাধনার মধ্য দিয়ে গেছেন।
ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে গুরুতুল্য ভক্তি করতেন যতীন সরকার। তিনি বলতেন, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছুকে দেখার এবং লেখার দীক্ষা তিনি পেয়েছেন ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছ থেকে। এই ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার। ভারতে প্রথম পাভলভীয় পদ্ধতিতে মনোরোগ চিকিৎসা শুরু করেন তিনি। সম্পাদনা করতেন ‘মানবমন’ পত্রিকা।
মনোবিজ্ঞানী ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের—“রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন বেঁচে ছিলেন”—এই উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ বয়সে এসে প্রায়ই একটি কথা বলতেন যতীন সরকার—“আমি বেঁচে নেই, জীবিত আছি মাত্র।” ডেইলি স্টার পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারেও তা বলেছেন তিনি। কথাটি বলতেন এ কারণে যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর আশি বছরের জীবনে যতদিন বেঁচেছিলেন ততদিনই সক্রিয় ও সৃষ্টিশীল ছিলেন। যতীন সরকার যদিও বলতেন ‘আমি বেঁচে নেই’, তারপরও তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সক্রিয় ও সৃষ্টিশীলই ছিলেন। ধীরেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথকে মনে করতেন ‘অনন্ত অনুপ্রেরণা’; রবীন্দ্রনাথকে ছোট না করেও বলা যায়, যতীন সরকারও ছিলেন এবং থাকবেন আমাদের চেনাজানা শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদদের মধ্যে ‘একজন অনন্ত অনুপ্রেরণা’ হয়ে।
যতীন সরকার একবার একটা বক্তৃতায় বলেছিলেন, “গতাসূনগতাসূংশ্চ নানুশোচন্তি পণ্ডিতাঃ।” জাতীয় প্রেসক্লাবে তাঁরই এক সহকর্মীর শোকসভায় এই বক্তৃতাটা দিয়েছিলেন তিনি। বহু বছর হয়ে গেছে তাঁর ওই বক্তৃতা আজও ভুলতে পারি না নানা কারণে। সংস্কৃত ভাষাটা যতীন সরকার খুব ভালো জানতেন, তা বোঝা যেত তিনি যখন সংস্কৃত থেকে প্রবাদের মতো করে উদ্ধৃতি টানতেন। বাংলাদেশে তার মতো সংস্কৃত জানা লোক এখন বোধ হয় আর নেই। থাকবে কেন? সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতের তো খুব প্রয়োজনও নেই।
যতীন সরকারের মৃত্যুতে গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের সেই শ্লোকটি আবার বলব তাঁর স্নেহধন্যদের উদ্দেশে, তাঁর প্রিয়জনদের উদ্দেশে, তাঁর পরিজনদের উদ্দেশে—“অশোচ্যানন্বশোচস্ত্বং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ ভাষসে। গতাসূনগতাসূংশ্চ নানুশোচন্তি পণ্ডিতাঃ।” অর্থাৎ, “তুমি প্রাজ্ঞের মতো কথা বলছ, অথচ যে বিষয়ে শোক করা উচিত নয়, সে বিষয়ে শোক করছ। যাঁরা যথার্থই পণ্ডিত তাঁরা কখনও জীবিত অথবা মৃত কারও জন্যই শোক করেন না।”
যতীন সরকার তাঁর জীবন পূর্ণ করেছেন আয়ুতে, অধ্যায়নে, প্রশ্নে ও অনুসন্ধানে। যে জীবনে কোনো আফসোস থাকে না। এই জীবনের জন্য কোনো শোক থাকে না, থাকে শুধু শ্রদ্ধা, থাকে শুধু অম্লান স্মৃতি, যে স্মৃতি ক্রমশ উজ্জ্বল হতে থাকে, হতে থাকে জীবন্ত, হয়ে উঠতে থাকে মরে যাওয়া ব্যক্তির ব্যক্তিত্বেরই এক ইহলৌকিক নতুন সত্তা। সেই সত্তাই আমাদের মাঝে রেখে গেলেন আমাদের প্রিয় যতীন সরকার। অর্থাৎ, সহজ করে বললে বলতে হয়, অনেকে তো মরে গেলে হারায় কিংবা ভূত হয়ে যায়, তিনি মরে গিয়ে হারিয়ে যাননি, ‘ভূত’ হননি, হয়েছেন ‘ভবিষ্যৎ’।