Published : 24 Mar 2026, 10:43 AM
নোবেল সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত হাঙ্গেরীয় ঔপন্যাসিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই আজ বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য নাম। তাঁর দীর্ঘ বাক্য, জটিল গদ্য, গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান এবং ভাষার ছন্দময় প্রবাহ তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত করেছে। নোবেল অর্জনের পর তাঁর পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়েছে । তিনি হয়ে উঠেছেন সমকালীন সাহিত্যের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
তবে এই সাক্ষাৎকারের প্রেক্ষাপট একটু আগের। ২০১৭ সালে তাঁর উপন্যাস Baron Wenckheim’s Homecoming হাঙ্গেরিতে প্রকাশিত হয় এবং তিনি মর্যাদাপূর্ণ এগন পুরস্কার অর্জন করেন। সেই সময়েই হাঙ্গেরীয় সাহিত্যপত্রিকা Litera তাঁকে নিয়ে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন তিনজন সাহিত্য-সংস্কৃতি কর্মী । তারা হলেন গ্যাব্রিয়েলা নাগি, লাজোস ইয়ানোশি, এবং গ্যাবর মেসজারোস। পরবর্তীতে এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন অস্টিন ওয়াগনার।
এই আলাপচারিতায় ক্রাসনাহোরকাই কথা বলেছেন নানা বিষয়ে ।সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি । পশ্চিম বার্লিনে কাটানো সময়ের অভিজ্ঞতা। মঙ্গোলিয়া ও চীন ভ্রমণের স্মৃতি। তাঁর উপন্যাসের চরিত্রদের পক্ষ থেকে লেখার জন্য আসা তীব্র তাগিদ। ভাষা ও সংগীতের পারস্পরিক সম্পর্ক, বিশেষ করে জ্যাজ সঙ্গীতের স্বাধীনতা ও বেপরোয়া ভাব এসমস্ত আলোচনা উঠে এসেছে এখানে।
আমার দৃষ্টিতে মনে হয়েছে এই সাক্ষাৎকার শুধু একটি কথোপকথন নয়, বরং লেখকের অন্তর্জগতের এক বিরল জানালা। এখানে আমরা দেখি কীভাবে ভাষা, সঙ্গীত, চরিত্র এবং অভিজ্ঞতা মিলেমিশে ক্রাসনাহোরকাইয়ের গদ্যকে গড়ে তোলে। তাঁর বক্তব্যে যেমন ব্যক্তিগত স্মৃতি, তেমনি রয়েছে সাহিত্য ও শিল্পের গভীর তত্ত্ব।
বাংলা ভাষার পাঠকের কাছে এই অনুবাদিত সাক্ষাৎকার তাই হয়ে উঠতে পারে এক নতুন অভিজ্ঞতা। যেখানে ইউরোপীয় আধুনিকতার জটিলতা ও মানব অস্তিত্বের প্রশ্ন মিলেমিশে যায় আমাদের নিজস্ব পাঠ-অভিজ্ঞতার সঙ্গে। সাক্ষাতকারটি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন প্রাবন্ধিক অনুবাদক বিপাশা চক্রবর্তী।

লায়োশ ইয়ানোশি: আপনি সম্প্রতি এগন পুরস্কার পেয়েছেন। তার আগে মর্যাদাপূর্ণ বুকার পুরস্কারও পেয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে এক বড় অর্জন। এইসব পুরস্কারের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন জাগে: আপনার মতো একজন চিন্তাশীল ও অন্তর্মুখী মানুষ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সৃজনশীল জীবন যাপন করছেন —যদিও পুরোপুরি আড়ালে নন, আবার জনসমক্ষে খুব বেশি দৃশ্যমানও নন। এই হঠাৎ আলো, এই বিপুল প্রশংসা কি সামলানো কঠিন হয়ে উঠেছে? এর ফলে নতুন যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, সেগুলো কি আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে? আপনাকে কি নিজের গতি বা ভঙ্গি বদলাতে হয়েছে, নাকি আপনি স্বাভাবিকভাবেই এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই মানিয়ে নিয়েছি, কারণ এসব আমার জীবনযাত্রায় বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলেনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর এই ঝলমলে স্বীকৃতির ইতিহাস আসলে আরও পুরোনো। প্রথম বই প্রকাশের পর থেকেই আমি প্রায় সবসময়ই কোনো না কোনো স্বীকৃতির ভেতরে ছিলাম।
এক সময় হাঙ্গেরীয় সাহিত্যে বড় পরিবর্তন হচ্ছিল। বিষয়টি পুরস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বরং ১৯৯৩ সালের দিকে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। হাঙ্গেরীয় সাহিত্য সমালোচকদের একাংশ যেন হঠাৎ আমার বইগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। এখন পেছনে তাকিয়ে মনে হয়, তারা আমাকে সাহিত্যিক মূলধারা থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এতে বরঞ্চ উপকারই হয়েছিল, তখন আমি বেশিরভাগ সময় বিদেশে বসবাস ও কাজ করছিলাম। ফলে হাঙ্গেরীয় সাহিত্যের অভ্যন্তরীণ পুনর্বিন্যাসে আমার সরাসরি উপস্থিতি ছিল না। আমি যখন নতুন বই নিয়ে দেশে ফিরলাম, ততদিনে উত্তেজনা অনেকটাই শান্ত হয়ে গিয়েছিল।
নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তন ঘটতে থাকে।পাঠকেরা তখন আর আগের মতো সাহিত্য সমালোচকদের মতামত দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছিল না। নতুন প্রজন্ম উঠে আসছিল, পুরোনো প্রজন্ম আরও যুক্তিসঙ্গত হচ্ছিল।ফলে পাঠক ও সমালোচকদের একটি বড় অংশ আমার লেখার ধরনের প্রতি ক্রমশ আগ্রহী হয়ে ওঠে।
অবশ্য সবাইকে আমাকে ভালোবাসতে রাজি করাতে পারিনি। তবে একটা সময় বুঝতে পারি, এই প্রত্যাখ্যান আসলে সাহিত্য প্রতিযোগিতা আর তার অংশগ্রহণকারীদের প্রসঙ্গেই সীমাবদ্ধ। আমি নিজে কখনোই সেই প্রতিযোগিতার অংশ ছিলাম না। আমি কোনো ক্রীড়াবিদ নই। আমি কেবল যে কাজটি করছি, তাতেই মনোযোগী থাকি। তাই কোনো সমালোচক যদি আমার পক্ষে রায় না দেন, কিংবা অপছন্দের ইঙ্গিত দিয়ে আমাকে ভীত করতে চান, তাতে আমি বিচলিত হই না।
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: কিন্তু এতে তো একজনের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ, তবে কেবল সেই লেখকের মনোযোগই বিঘ্নিত হয়, যিনি ভুলভাবে নিজের পেশাকে চিহ্নিত করেছেন। কারণ একজন প্রকৃত লেখক জানেন, তিনি কবিতা বা গদ্য ছাড়া আর কিছুই করতে পারবেন না। তিনি লেখাকে নিজে বেছে নেননি; বরং তিনি সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছেন যে তিনি জন্মগতভাবেই একজন কবি বা লেখক। এমন লেখক ভালোভাবেই জানেন, এটি কোনো পছন্দের বিষয় নয়। যেমন বলা হয়, শো-বিজনেসের জন্য মানুষের জন্ম হতে হয়।
অবশ্যই অনেকেই এভাবে ভাবেন না। তারা মনে করেন, অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই তাদের একটি পছন্দ আছে। আর দুর্ভাগ্য তাদের জন্য, যখন তারা সাহিত্যজীবন বেছে নেয়। তখন তারা হয়ে ওঠে অসুখী ও অশান্ত, নির্ঘুম মানুষ ও মদ্যপ ঝগড়াটে; সহজ কথায়, তারা পুরস্কার আর বৃত্তির প্রতি অতিসংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
তারা অনেক বেশি সুখী হতো যদি এই বৃত্তি এড়িয়ে গিয়ে এমন কোনো ক্ষেত্রে মনোযোগ দিত যেখানে সাফল্য ও ব্যর্থতাই কার্যকলাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। এতে হতাশা অনেক কম হতো, নিজের ও আশেপাশের মানুষের দুঃখও কম হতো। কারণ একজন অসুখী মানুষ তার চারপাশের মানুষের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আর জীবনের আরাম তো আলাদা কথা। ওই ধরনের পেশায় কাজের সময় ফুরোলেই দরজা বন্ধ, ট্যানিং স্যালন তো চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে না।
অর্থাৎ কবিতা বা গদ্যের জগতে ‘অফ ডিউটি’ নেই, লেখক চব্বিশ ঘণ্টাই লেখক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাকে সবসময় নাটকীয় কিছু করে দেখাতে হবে। বরং তার সৃষ্টিকর্ম একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ার অংশ যা মাঝে মাঝে জনসমক্ষে আসে। জীবন এভাবে অবিরাম চলতে থাকে, তা প্রকাশিত হোক বা না হোক। পুরস্কার এই প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে না। তা আনন্দ দেয়, কিছুটা সুরক্ষা দেয়, অথবা পাঠকের মনোযোগ পাওয়ার আরেকটি সুযোগ করে দেয়।
লয়োশ ইয়ানোশি: আপনার সাক্ষাৎকার সংকলন Doesn’t Ask, Doesn’t Answer (‘Nem kérdez, nem válaszol’)-এ যখন আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হয় কীভাবে আপনি একটি বই লিখতে অনুপ্রাণিত হন, কীভাবে সৃজনপ্রক্রিয়া আঁকেন এবং জীবন্ত করেন, তখন আপনি বলেন যে সবসময় কিছু একটা আপনার নজর কাড়ে, আর সেই মুহূর্ত থেকেই মনের ভেতরে কিছু কাজ করতে শুরু করে। Baron Wenckheim’s Homecoming–এর ক্ষেত্রে সেই সূত্রটা কী ছিল? কীভাবে লেখার চাকা ঘুরতে শুরু করল?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমার ক্ষেত্রে একটি বই সাধারণত তার প্রথম বাক্য দিয়েই শুরু হয়। War and War–এর শুরু আমার কাছে এখনও স্মরণীয়। সেখানে প্রথম বাক্যটি যেন এক ধরনের হঠাৎ আবিষ্কার। আমার মাথার ভেতর সারাক্ষণ হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ বাক্য ঘুরতে থাকে। ঠিক যেন কম্পিউটারের পর্দার ওপর দ্রুত চলমান লাইনের মতো।
তাদের মধ্যে হঠাৎ কোনো একটি বাক্য আমার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে। সেই বাক্যটি হয়তো তুচ্ছ কোনো বিষয় হতে পারে, আবার বড় কোনো ঘটনার সঙ্গে যুক্তও হতে পারে। মূলত সেই ঘটনাটিই আমার মনোযোগ কেড়ে নেয়। আমার মনের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা হাজার হাজার বাক্যের মধ্যে আমি তখন সেই নির্দিষ্ট বাক্যটি ধরার চেষ্টা করি, একটি রূপালি চুলের গোছা টেনে বের করার মতো। এটা মোটেও সহজ কাজ নয়। আমার আঙুলগুলো বেশ আনাড়ি; দ্রুত সেই সুতো বা বাক্যের শুরুটা টেনে ধরতে হলে দক্ষতা দরকার।
Baron Wenckheim’s Homecoming–এর প্রথম বাক্যটি কী ছিল, তা আমার একদম মনে নেই। আমি সত্যিই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছি না। হয় আমি মনে করতে পারছি না, অথবা আদৌ কোনো শুরু ছিল না। কখনো কখনো একটি বিষয় শুরু হয় কোনো শুরু ছাড়াই।
লয়োশ ইয়ানোশি: আপনার লেখায় যেমন শক্তিশালী, জীবন্ত চিত্র ফুটে ওঠে আপনি যখন দীর্ঘ, বাঁকানো সুরের মতো আবেগময় ধারায় এগিয়ে যান, তেমনি ভাষার ঘূর্ণিপাকের মধ্যে পাঠককে নিমজ্জিত করেন। মনে হতে পারে কোনো ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি তার ভাষা খুঁজছে। কিছু একটা আপনাকে ছুঁয়ে যায়, আর সেই অনুভূতিটা যখন বাক্যের আকার নেয়, তখন অমনি সবকিছু সচল হয়ে ওঠে। 
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: বিষয়টা মোটেও এমন নয় যে কোনো ঘটনার পর আমি তার জন্য ভাষা খুঁজতে থাকি। কারণ আমার কাছে ভাষার বাইরে আর কিছু নেই। অথবা বলতে পারি, যদি কিছু থাকে, আমি তা জানি না। তবে এর মানে এই নয় যে আমি যা নিয়ে কথা বলি না, তা বাস্তবে নেই।
গ্যাবর মেসজারোস: এই বইয়ে রসিকতা ও ব্যঙ্গ যে গল্পের মূল কথাকে আরও জোরালো করেছে, তা আমাকে খুব ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। যেমন, শুরুতেই একটি দৃশ্য আছে যেখানে অধ্যাপক কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে গুলি চালান: এটি বেশ মজার। এই গল্পে যে ধরনের ব্যঙ্গাত্মক রসিকতা আছে, তা আমি আপনার আগের বই Satantango বা The Melancholy of Resistance-এ পাইনি। অনেক বছর আগে পড়েছিলাম, তখন সেভাবে তা চোখে পড়েনি। তবে এখন যদি আবার পড়ি…
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: …তাহলে হয়তো এবার আপনি খুঁজে পাবেন। তবে সেখানে সরাসরি কোনো ভাষাগত হাস্যরস নেই। এখানে যা ভাষায় ফুটেছে, তা Satantangoতেও লুকিয়ে আছে, কেবল গল্পের পরিস্থিতির আড়ালে।
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: আমি বিষয়টাকে কেবল বিদ্রূপাত্মক বলব না, বরং এটাকে ব্যঙ্গাত্মক বলা ভালো; দুটোর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। এখানে লেখক, বর্ণনাকারী, পাঠক, সবাইকেই মূল বিষয় থেকে একটি দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: একদম ঠিক। আর হয়তো লক্ষ্য করেছেন, এই রসবোধ, ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ, উপন্যাসের মজার অংশগুলো প্রায় সব চরিত্রের দুর্বলতাকে প্রকাশ করতে সাহায্য করছে। এই বইয়ে কোনো একতরফাভাবে খারাপ বা পাপী মানুষ নেই। আবার একতরফাভাবে পুরোপুরি ভালো মানুষও নেই। তারা একে অপরকে তাদের নিজের চোখে দেখছে; কোনো ঊর্ধ্বতন বা অলৌকিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। হয়তো এ কারণেই চরিত্রগুলো এত মানবিক, প্রাণবন্ত।
লয়োশ ইয়ানোশি: একদম! এখানে Satantango-এর জগতের প্রতিধ্বনি আছে। আমি আপনার লেখায় এক ধরনের নির্ণায়ক সাহিত্যিক ভঙ্গি দেখতে পাচ্ছি, যা এই বইয়ের চরিত্রগুলোকে প্রায় সমান করেছে। এর মধ্যে সমান্তরালতা আছে ।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমি এটাকে ‘ভারসাম্য’ বলব।
লয়োশ ইয়ানোশি: ঠিক তাই। আপনার আগের বইয়ে যে মর্যাদা বা উঁচু-নিচু ভেদাভেদ থাকত, তা এখানে ভেঙে পড়েছে। আর এটাই এই জগত ও ভাষাকে ব্যঙ্গাত্মক করেছে…
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: …এবং বহুস্বরিক।
লয়োশ ইয়ানোশি: চরিত্রগুলো একে অপরকে কতটা পরিপূরক করে? আপনি কতটা আগে বুঝতে পারেন যে এই চরিত্র এখন প্রস্তুত, আর এই দীর্ঘ বক্তব্য মনোলগ সম্পূর্ণ হয়েছে?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: ওহ, লয়োশ, আপনি একদম অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছেন। আমি এসব চরিত্র নিজের মতো বানাইনি। যদি এতক্ষণ আমি মজা করে থাকি, এখন আর করছি না। এখান থেকে আমাদের আলোচনা একটি গম্ভীর দিকে মোড় নেবে। এতক্ষণ যদি কিছুটা রসিকতা করে থাকি, এখন এই আলোচনা সিরিয়াস।
ঠিক তাই, আর অন্যভাবে নয়। আমি বলতে পারি না কোথায় আমি হস্তক্ষেপ করেছি। আমার মনে হয় না এটা অতিরঞ্জন হবে যদি বলি যে আমার একমাত্র ভূমিকা ছিল বাক্যগুলো কাগজে লিখে রাখা। তবে আমি পুরোপুরি পাগল নই; বইটি আমারই লেখা, এ কারণেই শিরোনামের ওপরে আমার নাম আছে।
একই সাথে, নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, এখানে কোনো প্রকৃত গল্প নেই, যদিও পদ্ধতিগতভাবে পরোক্ষ ভাষা কিছুটা গল্প বলার মতো ব্যবহৃত হয়েছে। বাস্তবতা হলো, চরিত্রগুলোই বইয়ের মূল বুনন তৈরি করেছে, আর আমার কাজ ছিল শুধু বাক্যগুলো ঠিক যেমন তারা চেয়েছে, তেমনভাবে কাগজে আনা। তাদের অস্তিত্ব জড়িয়ে ছিল, তাই আমি যত্নসহকারে, নিখুঁতভাবে বাক্যগুলো ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। তারা চেয়েছিল উপন্যাসে প্রতিফলিত হতে, আলোয় আসতে, একটি নির্দিষ্টভাবে, অন্যভাবে নয়।
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: তো এই চরিত্রগুলো কি সত্যিই রক্ত-মাংসের মতো বাস্তব?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ, এখন হয়েছে! কেন? আপনি কি বিশ্বাস করেন রাশকোলনিভ একটি কাল্পনিক চরিত্র? এমন সিরিয়াস? গুরুতর আলোচনায় নিশ্চয়ই আপনি মজা করতে চাইবেন না?
লয়োশ ইয়ানোশি: পরিষ্কার করতে চাই, প্রশ্নের আসল উদ্দেশ্য সেটি ছিল না, বরং…
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: লং লিভ ফ্রি আমেরিকা! অ্যান্ড লেডি লিবার্টি!
লয়োশ ইয়ানোশি: আমি নিশ্চিত যে Satantango রচনার সময় হাঙ্গেরিতে এই উপাদানগুলো তৈরি ও উপস্থাপন করার ধরন এবং আজকের হাঙ্গেরিতে, Baron Wenckheim’s Homecoming-এর সময় এটি করার ধরনে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। এখানে আপনার জীবন কেমন? চারপাশে যা ঘটছে, তা আপনি কীভাবে দেখছেন? কারণ বারবার বইটি সূক্ষ্মভাবে সেই জগতকে উন্মোচন করে, যেন এক ধরনের জলছাপ।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ, আমার মধ্যে পরিবর্তন এসেছে, নিঃসন্দেহে বড় ধরনের। আমার জীবনযাত্রা এবং এক স্থানে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত থাকার ধারণা আমূল পাল্টে গেছে। যখন আমি Satantango লিখছিলাম, সেটা ছিল ৭০-এর দশকে, প্রকাশের অনেক আগে, তখন আমি বিশ্বাস করতাম আমি হাঙ্গেরীর মরুভূমিতে চিরতরে আটকে আছি। আমি কখনোই এমন জায়গায় পা রাখব না, যেটা নিয়ে আমরা আজ আলোচনা করছি। আমি ভৃত্যদের মধ্যে বসবাস করতাম। নিজেও ছিলাম ভৃত্য, নামহীনদের একজন, আর সেই কষ্ট ছিল স্বাভাবিক। সর্বোপরি, ততোটাই স্বাভাবিক যে ভালো হওয়া সম্ভব ছিল না। আমরা কেবল সবচেয়ে সস্তা পানশালায় যেতাম।
অবশ্য এই বিভ্রান্তিকর বহুবচনটি পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে। আসলে আমি সেই পরিবেশের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইনি। কারণ যখনই আমি এই দুর্গন্ধযুক্ত, ভাঙাচোরা পানশালায় ঢুকতাম, সর্বদা অন্তত একজন চিৎকার করে বলত: “আরে ধুর, যীশু খ্রীষ্ট, তুমি এখানে কি করছো?" তবে তারা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বের করে দিত না। তাছাড়া, আমি তখন শান্ত স্বভাবের এক যুবক, মদে ডুবে থাকা, আর যেহেতু বারে আগে টাকা দিতে হতো, আমি দিতাম যতক্ষণ বহন করতে পারতাম। তাই আমাকে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়নি, একটি ব্যতিক্রম ছাড়া।
কিন্তু এখন, আমি আর কখনো এমন পানশালায় পা রাখব না। আমি সেখানে আর থাকি না, আমার পানীয় এখন আর বিয়ার কিংবা কেভার্ট মদ নয়। আমি আর একা থাকি না, আমি যেখানে যাই না কেন, আবিষ্কার করি আমি সর্বত্র একই। আমার চারপাশের পৃথিবী আর আমার নয়, সবকিছুই আমার কাছে অচেনা।
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: একটি ব্যতিক্রমের কথা বলছিলেন?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আপনি কি পানশালার কথা বলছেন? হ্যাঁ, আমি ওই তিনটি শব্দের উপর এত জোর দিতে চাইনি, তেমন কিছু করারও দরকার ছিল না। যা ঘটেছিল তা হলো, মদ্যপানের সময় আমি সাধারণত ঝগড়ায় জড়াই না, কিন্তু একবার কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েছিলাম। যদিও আমি নিশ্চিত ছিলাম আমি ঠিক আছি, তবুও ট্রাকচালকে ভরা এক জায়গায় আমাকে চলে যেতে বলা হলো এবং তা বেশ কঠিনভাবে। আমার মনে নেই, ঝগড়াটা ঠিক কী নিয়ে হয়েছিল বা কার সঙ্গে হয়েছিল। যাই হোক, এরপর আর কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি, তাই এখানে কোনো বড় গল্প নেই যার জন্য আমার গভীর কোনও দুঃখবোধ থাকতে হবে।
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: আমি তো ভাবছিলাম, অন্তত একটা জম্পেশ হাতাহাতি দিয়ে গল্পটা শেষ হবে!
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: হাতাহাতি? আমি? ওহ, কখনোই না। যদি কিছু করি, তবে বরং গুলি করব। বাদ দাও, আমরা যেন কী নিয়ে আলাপ করছিলাম? ও, হ্যাঁ, স্যাটানটাঙ্গো আর আজকের পৃথিবী। আসলে পার্থক্যটা বিশাল। আমার জীবনটাকেই ধরুন উদাহরণ হিসেবে, হাঙ্গেরিকে বাদ দিন। বেচারা দেশটা চারদিক থেকে অভিশপ্ত। শুরু করা যাক এই সত্য দিয়ে যে আমি হাঙ্গেরি ছেড়েছি। এর জন্য আমি মিকলোশ মেসোয়োই ধন্যবাদ জানাই। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, আমি যদি হাঙ্গেরিতে থেকে যাই যা আমি ছাড়তে চাইনি, আর যদি ছাড়তামও, তবে এমন কোথাও যেতাম আদৌ যার অস্তিত্ব ছিল না। তাহলে আমি নিজেকে শেষ করে ফেলতাম। আর তিনি এর জন্য দায়ী হতে চাইলেন না। তাই তিনি চেষ্টা করলেন আমাকে বের করে আনার। বিকল্প কম থাকায়, তিনি একমাত্র উপায় বেছে নিলেন: পশ্চিম বার্লিনে একটি আর্ট স্কলারশীপ। আর আমি তা পেলাম, যেতে পারলাম, আর সেই মুহূর্ত থেকে আমার জীবন বদলে গেল।
সেটিই ছিল আমার প্রথমবার পশ্চিমে যাওয়া। সেটিই ছিল আমার প্রথমবার রাজনৈতিক স্বাধীনতা অনুভব করা, যদিও তখনও জানতাম না সেটি আসলে কী।
স্বাধীনতার প্রশ্ন উঠলে, সেই বিশেষ অতিসেনায়িত শহরে বারবার উপলব্ধি করতাম, যদি এটিই স্বাধীনতা হয়, তবে আমি সবসময়ই সেই স্বাধীনতার ভেতরেই বাস করেছি। অন্যদের কাছে, পশ্চিম বার্লিন ছিল এই স্বাধীনতার ছোট, বিপজ্জনক একটি দ্বীপ। যেখানে কেবল আমি ছাড়া সবাই প্রাচীরের মাঝে নিজেকে বন্দি মনে করত এবং অবরোধাতঙ্কে ভুগত। আমি এই ঘিরে থাকা সুরক্ষায় আনন্দিত ছিলাম। আর যখন তারা দেয়াল ভাঙতে শুরু করল, আমি স্থানীয়দের চমকে দিয়ে ছুটে গেলাম দেখতে তারা কী করছে, আমি তাদের অনুরোধ করলাম: “দয়া করে, এটা ভেঙো না, ভেঙো না।”
সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা পঞ্চাশ কিলোর মতো ওজনের এক লম্বা চুলওয়ালা, বাঁকানো পিঠের হাঙ্গেরীয় লেখক, বলছিল: “তোমরা কি বুঝতে পারছ না যে এই দেয়াল আমাদের রক্ষা করছে?” আমার মনে হচ্ছিল, আমাকে দেয়ালে আটকানো হচ্ছে না বরং মন্দকে আটকানো হচ্ছে।
যখন আমি হাঙ্গেরিতে ফিরে এলাম, আমার জীবন সঙ্গে সঙ্গে ওলটপালট হয়ে গেল। ব্যক্তিগত জীবনও, কারণ পশ্চিম বার্লিনের জীবন আমার পরিবারকে বদলে দিয়েছিল। তারা পশ্চিম বার্লিনের জীবন চালিয়ে যেতে চেয়েছিল, আমি চাইছিলাম সেই পুরোনো জগতে ফিরতে, ভৃত্যদের মধ্যে। এটি আমার পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি মিৎসুবিশি চালাতে চাইনি, ৪৫ বর্গমিটারের অ্যাডোব বাড়ির চেয়ে বড় বাড়িও চাইনি। আমি জেদ করেছিলাম সবকিছু যেন আগের মতোই থাকে, অর্থাৎ কিছুই থাকবে না, শুধু স্বাধীনতা থাকা, যা আমার আগেও ছিল, কারণ এটি বাইরের পরিস্থিতির উপর নির্ভর করত না।
আমি একই সস্তা মদ আর বিয়ার চাইতাম একই ছোট্ট পানশালায়, কিস বেকে-তে, কিন্তু তারা বলল, তাদের কাছে বিয়ার নেই, শুধু হাইনেকেন আর হুইস্কি। তাই জীবন আগের মতো চালানো গেল না, শুধু বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া। কারণ আমি পালিয়ে বেড়াতাম, এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতাম, তবে এবার হাঙ্গেরির ভেতরে নয় বরং বিদেশে। তারপর ১৯৯০ সালে, নিছক কাকতালীয়ভাবে আমি দূর প্রাচ্যে গিয়ে পড়লাম, যা আমাকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ বদলে দিল। তবে মনে হয় এটা আমি আপনাকে আগেই বলেছি, তাই না? আপনি আর তিবর’কে, নাকি সেন্টলাসলোতে সেই আলোচনায় আপনি ছিলেন না?

গ্যাব্রিয়েলা নাগি: না, ওটা লিটারার সাক্ষাৎকার ছিল কিন্তু আমি সেখানে ছিলাম না।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই : আচ্ছা, যাই হোক। ঘটনাটা হলো, ১৯৯০ সালের এক সুন্দর গ্রীষ্মের বিকেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধু আমাকে ফোন করে বলল, “এত দেরিতে জানাচ্ছি বলে দুঃখিত, তবে কেন আগে ফোন করতে পারিনি, সেটা তুমি বুঝবে।” ছেলেটা আমার চেয়ে একেবারে ভিন্ন বিষয়ে আগ্রহী ছিল, তাই ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলা যাবে না। তবু তার সোজাসাপটা স্বভাব, ভদ্রতা আর চরিত্রের দৃঢ়তার জন্য তাকে আমি ভীষণ পছন্দ করতাম। তার নাম লায়োশ কোরমেন্দি। তার একটি সমাজবাস্তবতামূলক রচনা আতিলা যোজেফ সার্কেল (JAK)-এর একটি পুস্তিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সে ছিল কারচাগের কুমান বংশোদ্ভূত ছেলে আর নিজেকে কুমান বলতে সে ভীষণ গর্ব বোধ করত।
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: যখন (JAK)- জেএকে পুস্তিকাগুলো কমলা রঙের ছিল, যদি ঠিক মনে করে থাকি।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ, কমলা রঙেরগুলোই, একেবারে শুরুর দিককার। আমরা কখনো বন্ধু হয়ে উঠিনি। কারণ সে মদ পান করত না। ফলে আমাদের সঙ্গে পানশালায় যেত না। আর তখন যারা মদ ছুঁত না, তাদের আমি সহ্যই করতে পারতাম না প্রায়। মানুষ মদ ছাড়া কীভাবে টিকে থাকে, সেটা আমার বোধগম্য ছিল না। অথচ সে দিব্যি পারত।
সেই গ্রীষ্মের সুন্দর বিকেলে ফোনে সে বলল, আমাকে এভাবে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত, কিন্তু উলানবাতারে চেঙ্গিস খানের ওপর দশ দিনের এক সম্মেলনে সে যাচ্ছে, আমি কি সঙ্গে যেতে আগ্রহী? আমি একদম না ভেবেই বললাম, অবশ্যই। এমন প্রস্তাবে না বলা যায় না।
আর ঠিক সেইভাবেই, বিমানটি উলানবাতারের বিমানবন্দরের দিকে ধাবিত হতে শুরু করল। যেখানে অবতরণ বলে কিছু নেই, আছে শুধু পতন। তাই আমরা উলানবাতারে পতন করেই পৌঁছালাম, আর মুহূর্ত থেকেই আমার ভেতরে মৌলিকভাবে কিছু বদলে গেল।
সেখানে অনেক কিছু ঘটেছিল । তার সামান্য অংশ লিখেছি ‘দ্য প্রিজনার অব উর্গা’/The Prisoner of Urga -তে। কিন্তু মজার অংশগুলো বাদ দিয়েছিলাম। যেমন সেই তথাকথিত ‘হোটেল’-এর অভিজ্ঞতা। ভেড়ার ভয়ঙ্কর গন্ধ, চর্বির গন্ধে পুরো জায়গা ভাসত। একটা ট্রাক এসে কাঁচা মাংস ফেলে দিত ফুটপাথে, সেখানেই কেটে কেটে হোটেলের রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে এক ফাঁকে নিয়ে যাওয়া হতো। চর্বির গন্ধ দেয়াল, কাপড়, বাতাস সবকিছুর গায়ে লেগে থাকত। অবিশ্বাস্য এক জায়গা ছিল সেটা।
রুশ সেনারা তখন দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল, কিন্তু পুরনো কমিউনিস্ট নেতৃত্ব তখনও ক্ষমতায় ছিল। সবকিছু এলোমেলো, অস্থির। বিকেল পাঁচটার পর রাস্তায় বেরোনো বিপজ্জনক। কারণ তখন প্রায় প্রত্যেক মঙ্গোলই বেসামাল মাতাল। আর মাতাল মঙ্গোল মানুষ হালকা ব্যাপার নয়। শক্তিশালী, ভয়ঙ্কর। তারা আমাদের মারতে চাইত কি না জানি না। কিন্তু তারা রুশ সৈন্যদের মেরেছে, আর যে কেউ রুশ সৈন্যের মতো দেখতে হলেই মেরেছে। আর মাতালের চোখে যে তাদের মতো নয়, সে-ই রুশ।
বিদেশি তারা চেনে না। কয়েকবার দিব্যি দিনের আলোতে ঘোড়ায় চেপে আমাদের দিকে ধেয়ে এসেছে। তাদের ধারণা, ক্যামেরা মানেই গুপ্তচর। “ক্যামেরা নিয়ে কী করছ? গুপ্তচর!” নতুন পৃথিবীতে মানিয়ে নেওয়া স্থানীয়রা এই পুরোনো ধ্যানধারণায় আটকে থাকা লোকদের থামাতে পারত না।
অবশ্যই বিষয়টা এত সহজ ছিল না। জটিলতা বোঝাতে মানে: আমাদের প্রথমে বুদাপেস্টে ফিরে যেতে হয়েছিল, তারপর আবার উলানবাতারে উড়ে গিয়ে সেখান থেকে ট্রেনে বেইজিং যেতে হয়েছিল। যাই হোক, হঠাৎ আমরা বেইজিংয়ে উপস্থিত হলাম। আমরা বসেছিলাম বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিথিশালায়। কীভাবে পৌঁছেছিলাম তা আর মনে নেই। আমি মানচিত্র খুলে বললাম, “লায়োশ, এখানে বুদাপেস্ট, এখানে বেইজিং, আর এখানে গুয়াংঝো। চল গুয়াংঝো যাই।” আর হঠাৎ আমরা গুয়াংঝোতে উপস্থিত হলাম।
ফিরে এসে দেখলাম, পৃথিবী আর সসীম বা বন্ধ মনে হচ্ছে না। উন্মুক্ত, অসীম, অশেষ। নিজেকে বোঝাতে চেয়েছিলাম, রঙ আলাদা, কিন্তু মানুষ তো একই। ‘দেখার কিছু নেই’, পুলিশ যেমন ভীড় সরাতে বলে থাকে। কিন্তু তা নয়। বুঝলাম, আমার ধারণার চেয়ে অনেক বেশি ‘জগৎ’ বিদ্যমান।
আমি আমার নিজের জগৎকে দেখলাম,একজন ইউরোপীয় শিক্ষায় বেড়ে ওঠা মানুষ হিসেবে, যে বিশ্বাস করত মহাবিশ্ব আছে, স্বর্গ আছে, পৃথিবী আছে। কেপলার ও কোপার্নিকাসের আগে পৃথিবীকে কেন্দ্র ধরে সবকিছু দেখা হতো, পরে সূর্যকেন্দ্রিক ধারণায় বদলে গেল। ইউরোপে চারটি ঋতু, চীনে দুটি। এরপর আসে নানা দার্শনিক প্রশ্ন, বহুঈশ্বরবাদ ও একেশ্বরবাদ, মিথ ও অতীন্দ্রিয়তা, আর তারপরে মহান ফরাসি বিপ্লব।
আমি চীনকে দেখলাম, এই প্রাচীন সাম্রাজ্যকে। তাদেরও ছিল আকাশ, পৃথিবী, ঋতু। এখানে দুটি, ওখানে চারটি ঋতু। তাদেরও ছিল দার্শনিক প্রশ্ন, বহুঈশ্বরবাদ ও একেশ্বরবাদ, মিথ ও অতীন্দ্রিয়তা। তাদেরও ছিল জিউস, ইয়াহওয়ে, যিশু। তাদেরও ছিল প্লেটো, এরিস্টটল, হেরাক্লিটাস। আর শেষে বারবার ফিরে আসা মাও’এর মতো একনায়ক, যে একই কথা বলত যা মহান ফরাসি বিপ্লব বলেছিল। অর্থাৎ প্রশ্নগুলো একই ছিল, কিন্তু উত্তরগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন!
আমি ভাবলাম,এটা কীভাবে সম্ভব? যদি এটা সম্ভব হয়, তবে সবকিছুই সম্ভব।
আমার জীবন বদলে গেল। শুধু এজন্য নয় যে আমি আর আমার ছোট্ট পানশালায় ফিরতে পারিনি, বা তারা আর কেভের্ত লিকার ও বিয়ার পরিবেশন করত না, বরং এজন্য যে আমি শিখলাম একই প্রশ্নের একাধিক উত্তর থাকতে পারে। অর্থাৎ শুধু একটি জগৎ নয়, অনেকগুলো জগৎ বিদ্যমান। আর এর মানে এই নয় যে ভিন্ন কোনো জগৎ নেই। অতীন্দ্রিয় জগতে যা ঘটে, তা একজন ইউরোপীয় বা উত্তর আমেরিকান মানুষের তুলনায় একজন চীনা মানুষের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ।
প্রথমত, তাদের ঈশ্বরের প্রতি কোনো বিশ্বাস নেই, আছে কেবল কুসংস্কার। আর সবসময়ই এমন ছিল। তারা আসলেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল যখন লি বাই মারা গেলেন এবং তাঁকে তাওবাদী সাধু করা হলো। তারা সেটি খুব উপভোগ করেছিল এবং আজও করে। যদিও সেই নীল পর্বতের রাজ্যে বসে থাকা সাধু নয়, বরং তাঁর আগের জীবন: লি বাইয়ের মদে ভেজা, কল্পনাপ্রবণ, উঁচু জীবন, যা তাঁকে নীল পর্বতের রাজ্যে চিরস্থায়ী আসনে পৌঁছে দেয়।
অথবা ধরুন চীনের গুয়ানইন পূজা। আমাকে বলতে হবে এটি আধুনিক, কালো বিড়ালের পূজার মতোই। গুয়ানইন হলো অবলোকিতেশ্বর, করুণার বোধিসত্ত্ব, যিনি তাদের সংস্কৃতিতে নারী। ১৯৯০-এর দশক থেকে, মাও-এর শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এবং আংশিকভাবে দেং শিয়াওপিং-এর পর, তিনি ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। আমি বেইজিংয়ে এক অবিশ্বাস্য ধনী ব্যবসায়ী মহিলার সঙ্গে দেখা করেছিলাম, যার তিন মিলিয়ন ডলারের হীরাখচিত জিপে রিয়ারভিউ মিরর থেকে একটি সোনার গুয়ানইন মূর্তি ঝুলছিল, ধীরে, রাজকীয় মর্যাদায় দুলছিল। আজও সেটি সেখানে ঝুলে আছে, নরমভাবে দুলছে। যাই হোক, এটি সেন্ট ফ্রান্সিসের বিশ্বাসের সঙ্গে তুলনীয় নয়, যদিও দুজনেই বিদ্যমান।
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: এত অভিজ্ঞতার পরও আপনি কীভাবে আবার হাঙ্গেরীয় বাস্তবতাকে নিয়ে এত বিস্তৃত একটি বই লিখলেন? আমি হয়তো সরলীকরণ করছি, পুরোপুরি ঠিকও বলছি না, কিন্তু আপনার দেখা-বোঝার পরিপ্রেক্ষিতে কেন সেটা আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমি এই বইটি হাঙ্গেরীয় বাস্তবতা নিয়ে লিখিনি। এতে হাঙ্গেরীয় জগৎ এসেছে, তার মানে শুধু এই যে গল্পটা যেখানে ঘটছে, যা ঘটছে, যে প্রেক্ষাপটে ঘটছে, আর যে জীবনেরা এই বইয়ে আসতে চেয়েছিল, তাদের অবস্থান আমি অস্বীকার করার কোনো কারণ দেখিনি।
লয়োশ ইয়ানোশি: ঠিক আছে, কিন্তু আমরা তো এখনও একই সৃষ্টিজগতের ভেতরেই আছি। স্যাটানটাঙ্গো’র প্রসঙ্গ আসাটাও স্বাভাবিক, কারণ ব্যারন ওয়েঙ্কহাইমের হোমকামিং-ও বারবার সেটির দিকে ইঙ্গিত করে। মনে হয়, আপনার ভেতরে এখনো একটা প্রবল তাগিদ কাজ করে কোনো কিছুকে নতুন করে ভেবে দেখার, আরেক রূপে চেনার, যেখান থেকে আপনার জীবনকর্ম বা জীবনযাত্রার শুরু সেই জায়গা থেকে অনেক দূরে। একদিকে, এই বই যেন সেই পুরোনো জগতের উপাদানগুলোকে অন্য চরিত্র, অন্য কাঠামোয় আবার ফিরিয়ে আনে। অন্যদিকে, এটি অনিবার্যভাবে সেই সময়ের লেখক-চিন্তাকেও প্রতিফলিত করে। আমার মনে হয়, এতে দৃষ্টিভঙ্গিরও একধরনের সংশোধন।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমি এটিকে সংশোধন বলতে চাই না…
লয়োশ ইয়ানোশি: তাহলে বলা যায়, সংশোধন নয়, বরং সরিয়ে দেওয়া?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: যখন আমি স্যাটানটাঙ্গো লিখছিলাম, তখন আমার মনে হয়েছিল পৃথিবী ঠিক তেমনই, যেমনটা হাঙ্গেরি থেকে দাঁড়িয়ে আমি দেখছি। বেলা তার উনিও তাই ভাবতেন, আমিও। তারপর যখন চলচ্চিত্রের ধারণা এলো, তখনও কেউই ভাবিনি আমরা হাঙ্গেরি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র বানাচ্ছি। আমাদের ধারণা ছিল, আমরা বিশ্ব নিয়ে চলচ্চিত্র বানাচ্ছি। আমরা বুঝতে পারিনি। আর বুঝবই বা কীভাবে যে আমরা আসলে পৃথিবীর একটি দৃষ্টিভঙ্গি দিচ্ছিলাম, পৃথিবী নিজেকে নয়, যা প্রশ্নাতীত ও অখণ্ড।
এখন সেটা আর সম্ভব নয়। একদিকে, আমি নিজেই এখন একাধিক জগৎ দেখি, কেবল একটি নয়। অন্যদিকে, বিষয়টা আর আমার নয় যে আমি এসে কিশোরসুলভ রায় দিয়ে চলে যাব। বরং বিষয়টা এই উপন্যাসের চরিত্রদের: অধ্যাপক, ব্যারন, মারিকা, সজোলনোকের দান্তে এবং অন্য সবাই, যারা যেন নিজেরাই জন্ম নিতে চেয়েছে, মঞ্চে উঠতে চেয়েছে এবং নিজেদের যেভাবে দেখতে চেয়েছে, সেভাবেই প্রকাশ পেতে চেয়েছে। এই উপন্যাসের যদি কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে থাকে, তবে সেটাই।
এটিকে চাইলে এমনও বোঝা যায়, একটি সদয় গম্বুজের মতো, যা স্যাটানটাঙ্গো, দ্য মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স, আর ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার-এর ওপর বিস্তৃত হয়ে আছে; তাদের আচ্ছাদন দিচ্ছে, আবার নতুন অর্থও দিচ্ছে।
লাজোস ইয়ানোশি: সাটানট্যাঙ্গো এক অর্থে রোমান্টিক বই।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: রোমান্টিক? হয়তো। যদি রোমান্টিকতা বলতে আমরা বুঝি নিৎশে শুমানের বদলে শুবের্টকে শুনছেন, বা ওয়াগনারের বদলে শুবের্ট।
লাজোস ইয়ানোশি: আপনি কি মনে করতে পারেন, কখন থেকে স্যাটানটাঙ্গোর জগৎ আপনার ভেতরে ঢুকতে শুরু করেছিল? লোকসংগীত দল আসে আর তারা সাটানট্যাঙ্গো নাচে… এই সংকুচিত স্তরগুলোর মধ্যে এক ধরনের ফাইবারবোর্ডের গুণ আছে, অত্যন্ত সংকুচিত স্তরের টেক্সট…
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ, প্লাইউডের মতো।
লাজোস ইয়ানোশি: আমি জানতে চাই, কখন আপনি সেই আহ্বানে সাড়া দিলেন। কখন শব্দগুলি আপনাকে বইয়ের জগতে উপস্থিত করতে বলল? কারণ Satantango থেকে Baron Wenckheim’s Homecoming পর্যন্ত এত শক্তিশালী ও সরাসরি, অথচ সূক্ষ্ম রেফারেন্স আপনার কাজে সাধারণত দেখা যায় না।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: ঠিক তাই। এমন সরাসরি উপায়ে না। আমি সবসময় এই “গ্রেট ডোম স্টোরি” লিখতে চেয়েছিলাম। আমি নিজে পরিকল্পনা করিনি, কিন্তু ব্যারন, অধ্যাপক, দান্তে, মারিকা, স্থানীয় বাহিনী, পুলিশ প্রধান – তারা ভাষার মাধ্যমে অস্তিত্বে আসার জন্য সবসময় আমার উপর চাপ সৃষ্টি করত। তারা আংশিকভাবে সবসময় দ্য মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স, ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার, এবং অন্যান্য লেখায় উপস্থিত ছিল। অবশেষে তারা এখানে মঞ্চে এল।

লাজোস ইয়ানোশি: তাহলে তারা সবসময়ই সেখানে ছিল?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ। স্পষ্টভাবে বলতে, আমি ছয় বছর আগে Baron Wenckheim’s Homecoming লেখা শুরু করি। কিন্তু এটি আমার মনে ছিল স্যাটানটাঙ্গো’র পর থেকেই। উদাহরণস্বরূপ, যখন হ্যালিক্সের ছেলে আসে, আমি তার বাবার কথা ভুলতে পারি না। আমরা হঠাৎ নিজেদেরকে সারকাদের মালবাহী স্টেশনের নাইট শিফটে পাই, আনন্দে মাতাল, যেখানে হ্যালিক্স জুনিয়র, প্রবীণ হ্যালিক্সের ছেলে, দাঁড়িয়ে আছে তার বাবার জিনগত উত্তরাধিকার নিয়ে, আর একই সঙ্গে ইতিমধ্যেই বৃদ্ধ; অবশ্যই সাটানট্যাঙ্গো ‘র কথা মনে পড়ে, তার বুনো নাচ, যখন বাবা আর ছেলে দুজনেই বলে, “চুপ, সবাই শুনো, আমি দেখাবো হ্যালিক্স আসলে কে। আপনি এটা মনে করতে পারছেন?
লাজোস ইয়ানোশি: হ্যাঁ।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: সে একই কাজ করে। একই গতিতে। কিন্তু পুরোপুরি একই নয়।
গ্যাবর মেসজারোস: আপনি বলছেন অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু মৌলিক কাঠামো একই। যে যুবক দেশ ছাড়তে পারে না, তার বন্ধু আছে, মদ্যপান করে, আমাদের মতো পাবে আসে না। এটি সাটানট্যাঙ্গো বা আজকের জগৎ থেকে আলাদা নয়।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: একেবারে ঠিক। এখন বেলা তারের প্রসঙ্গ উঠে আসে। যদি সে এখানে থাকত, বলত, কিছুই বদলায়নি। দেশের সারাংশ একেবারেই বদলায়নি। এটাই সারাংশের প্রকৃতিঃ অপরিবর্তনীয়।
গ্যাবর মেসজারোস: ব্র্যান্ডের নামগুলো আমার কাছে নতুন আর আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা...
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: ব্র্যান্ডের নাম বদলায়। কিন্তু বোতল থেকে টান দিয়ে পান করার কারণ সবসময় একই থাকে। আমরা সম্প্রতি স্যাবলচ কাউন্টিতে গিয়েছিলাম, আর হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারলাম, আমরা অন্য জায়গাতেও লক্ষ্য করেছি, এমনকি বুদাপেস্টের বাইরের জেলাগুলোতেও যদি ভবনগুলোর সাইনবোর্ড খুলে ফেলো, লেবেল সরিয়ে দাও, ব্র্যান্ডের লোগো মুছে দাও, তাহলে দৃশ্যটা মোটেও বদলায় না। যেন আপনি আবার জানোস কাদারের আমলে ফিরে গেছেন। এমন জায়গা অনেক আছে, দেশের বেশিরভাগ অংশই যেন এমন। ভ্রমণে বের হলে দেখবেন।
আপনি কি বুদাপেস্টের ২৬, ২৭, ২৮ নম্বর জেলাগুলো চেনেন? সেখানকার হাউজিং প্রজেক্টগুলো ভেঙে পড়ছে। শুধু হাভানা হাউজিং এস্টেট নয়। রাস্তা, দোকান, ওয়ার্কশপ- সবকিছু। সত্তরের দশক থেকে এত সময় পেরিয়ে গেছে। অথচ বাইরে থেকে দেশটাকে বদলে দেওয়ার মতো নতুন নির্মাণ হয়েছে খুব সামান্য। ভয়াবহভাবে সামান্য। আর এটা তো কেবল বাইরের চেহারা।
গ্যাবর মেসজারোস: আর যখন আপনি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের কথা বলেন, তখন কী বোঝাও?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: উল্লেখযোগ্যভাবে কী বদলেছে? আমি। আমি বদলেছি। অনেকটাই। এখন আর আমার মধ্যে আগের সেই উন্মাদনা নেই। ধরুন, এখন আমি আর কোনও কিছু নিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে লিখতে পারব না। সুরও বাঁধতে পারব না সেইভাবে। পারবই না। আমি খুব বেশি দেখেছি। খুব বেশি অভিজ্ঞতা হয়েছে। এমন অনেক ব্যবস্থা, অনেক পরিস্থিতি দেখেছি, যেগুলো একে অপরের সঙ্গে অদ্ভুত ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে আছে। আর নড়েও না। সবচেয়ে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা ভারতের। কিন্তু সে কথা থাক। আমি শুধু একটা সতর্কবার্তা দেব। কেউ ভারতে যেও না। কেউ না। একেবারেই না। যে ভারতে যাবে, সে সব হারাবে। সাবধান করে দিলাম।
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: আমরা কি এটাকে এভাবেই ঝুলিয়ে রাখব? কারণটা জানা যাবে না?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: হাজার হাজার বছর ধরে এমনই চলছে। এমনই চলবে। যদি তোমার জর্জ হ্যারিসন চাই, ইংল্যান্ডে যাও। যদি তোমার সবচেয়ে তরুণ শঙ্কর চাই, ইংল্যান্ডে যাও। যদি তোমার গান্ধীর মূর্তি চাই, জুরিখে যাও। যদি তোমার ভারতীয় গণিত চাই, অক্সফোর্ডে যাও। যদি তোমার বুদ্ধ চাই, কোথাও যেও না। আমি মজা করছি, জানি। কিন্তু না করলে কাঁদতে হতো।
মানুষের, এমনকি অমানুষেরও অস্তিত্বের একটা অপরিবর্তনীয় গঠন আছে। সেটা বদলায় না। আমার জানা পৃথিবীর ক্ষুদ্র অংশের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি ভারতই সেই জায়গা, যেখানে এই সত্যটা একেবারে কাছ থেকে দেখা যায়। খুব কাছ থেকে। আর ভাবো তো, এমন লোকও আছে যারা দুবার ভারতে গেছে! দুবার! একবার গিয়েই তো সব দেখার কথা, তাহলে আবার কেন যাবে? নাকি তারা আদৌ যায়নি? যে একটু সংবেদনশীল, তার সেখানে গেলে রক্ষা নেই। আর আত্মা তো সবারই আছে।
লাজোস ইয়ানোশি: বইয়ের প্রচ্ছদে বারবার ফিরে আসা খিলানগুলো দেখা যায়, অনেকটা অধ্যাপকের পুনরাবৃত্ত চরিত্রের মতো। যেন কাউকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার আপনার আগের কথার আলোকে দেখলে, হয়তো তাকে অধস্তনও করা হয়েছে। অধ্যাপক চরিত্র, যিনি একই সঙ্গে অধীরভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন, আবার অধিবিদ্যাগত অর্থ ও আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ। তিনি সাটানটাঙ্গোর ডাক্তার, আবার দ্য মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স-এর মি. এস্তর মনে হয় এখানে এমন এক সাংস্কৃতিক সমালোচনা কাজ করছে, যা ইউরোপীয় ইতিহাস, মানব সংস্কৃতির পুরোটা ছুঁয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যেন ভয়কেই নির্ণয় করে।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আপনি আবার অনেক দূরে চলে গেলেন। এ রকম কথা বলতে গেলেই সবাই সীমা ছাড়িয়ে যায়।
আমরা সবসময় ভুল করি। খুব দ্রুত বিয়ার ঢাললে যেমন হয়। মগ ভরে ওঠে ফেনায়। যদিও বাভারিয়ায় অনেক মানুষ মনে করে এভাবেই বিয়ার মগে ভরতে হয়।
লাজোস ইয়ানোশি: হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাই ক্যান্টরের ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি হলো সেই মনোলগ পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুনরাবৃত্ত উপাদান, যার কথা আমি বলছি, আর এখন আমি এই প্রতিচ্ছবিকে দেখি আরও তিক্ত ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে, যেন এক ধরনের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দেওয়া।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: তাহলে আপনি পরিষ্কারই দেখছেন! অনেক বেশি মোহভঙ্গ হয়েছে। এই চরিত্রের আগের দুই আগের দুই সংস্করণ, ডাক্তার আর মি. এস্তর, অধ্যাপকের ভেতরে আংশিকভাবে বেঁচে আছে। এখানে এক ধরনের বীরত্ব আছে…
লাজোস ইয়ানোশি: একে আমরা রোমান্টিসিজম বলি।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: বরং এটাকে নিটশে-সুলভ বিভ্রমভঙ্গ বলি, যারা শর্তসাপেক্ষে মোহমুক্ত।
অধ্যাপক এমন নন। তিনি শর্তমুক্তভাবে নিজের হিসাব-নিকাশ সেরে ফেলেছেন। বিশ্বের সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গে। তিনি নিজের প্রতি কোনো করুণা দেখান না।
পিটার বালাসা অন্তত মুখে মুখে ডাক্তার বা মিস্টার এজটারের ক্ষেত্রে যা প্রশংসা করেছেন, আমরা শিক্ষিত ইউরোপীয়রা, যারা শিক্ষা মূল্যায়ন করি, তাদেরও এই অবস্থানই নিতে হবে। শিক্ষার বাহক হিসেবে যে চুক্তিটি আছে তা মানতে হবে। আমি পিটারের সঙ্গে একমত।
কিন্তু অধ্যাপকের মধ্যে এটি নেই। কোনো চিহ্নও নেই। যদি কখনো মনে হয় যে তাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে, তিনি তাদের উপহাস করতেন। তাদের নিখুঁতভাবে উৎখাত করতেন। অধ্যাপক ডাক্তার এবং মিস্টার এসতরের বীরত্বকে মৃত্যু পর্যন্ত উপহাস করতেন। এবং তার তা করার যথেষ্ট কারণও আছে, এখনও আছে।
লাজোস ইয়ানোশি: এই চরিত্রটি নিয়ে আপনার গদ্যের ভাবনা কি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আপনি ভাবতেও পারেননি তার কোনো বিতর্কযোগ্য বিরোধিতা থাকতে পারে?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: এখানে আমার মনে হয়নি। যদি আপনি তার যুক্তি অনুসরণ করেন, এটা আসলেই মাথায় আসে না।
গ্যাবর মেসজারোস: এই হিসাব-নিকাশের বিষয়।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ, কিছুটা তাই।
গ্যাবর মেসজারোস: এটা আগুনে ঘি ঢালার মতো…
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: ঠিক তাই।
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: পুরো উপন্যাসটিকে কি সঙ্গীতের কাঠামো দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল? অথবা কখন এটি সঙ্গীতের আকার নিয়েছিল?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: ওহ, না। এখানে কিছুই পরে ঠিক করা হয়নি। উপন্যাসটি কোথা থেকে এসেছে বা বইয়ের ইঞ্জিন হঠাৎ কখন জীবনে গর্জে উঠল-এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না। তবে আমি বলতে পারি, সত্যিই বলেছি, আমার জন্য সবকিছু সবসময় শুরু থেকেই শুরু হয়।
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: “পেশার কিছু গোপন রহস্য” নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: অবশ্যই! আমরা কি ফেরেশতাদের কথা বলছি?
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: না। আমি আপনার বর্ণনাশৈলীতে মুগ্ধ হয়েছি, তাই আমি জানতে চাই এটি কীভাবে গড়ে উঠল। আমি মনে করি পলিফনি (বহুস্বরতা) আপনার কাজের সাধারণ বৈশিষ্ট্য নয়; গল্প একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে শুরু হয়, কিন্তু আমরা অনেক পরে জানতে পারি কে কথা বলছে, অথবা আমরা শুরুতেই এমন ঘটনার কথা জানতে পারি যা পরে ঘটেছে আর তারপর অন্য চরিত্রের কাছ থেকে শুরুটা জানতে পারি। বলা যায়, আপনি পাঠকের প্রতি নির্মম, পাঠককে অবিশ্বাস্যভাবে কঠিন পরিশ্রম করান।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: তাই নাকি? নিষ্ঠুর হওয়ার আমার কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। তবে হ্যাঁ, আমি জানি অনেকেই লিখেছেন বা বলেছেন যে এটি পড়া কঠিন, কিন্তু তা সার্থক। ঠিক যেমন একজন নারী, যাকে আমরা ভয় পাই।
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: এটা লেখকের পছন্দ, আপনি কি ভান করতে পারেন না যেন অন্য কিছু আপনার হাতকে পথ দেখাচ্ছে?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: অবশ্যই পারি, বিশ্বাস করো। অন্তত, আমি তাই করি। আমি শব্দের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। মনে হতে পারে আমি শব্দ বেছে নিই, কিন্তু তা সত্য নয়। সবসময় ঠিক একটি শব্দই মনে আসে, একেবারেই নির্ভুলভাবে, আর অন্য কোন শব্দ তার জায়গা নিতে পারে না। আমি এটিকে আর কীভাবে বর্ণনা করব, যে কিছু আমার হাতকে পথ দেখাচ্ছে?
একটি উদাহরণ দেই। ব্যক্তিগতভাবে, কেবল নিজের জন্য আমি ক্রমাগত সঙ্গীত লিখি এবং তাৎক্ষণিকভাবে বাজাই। গত দশ থেকে পনেরো বছরে আমি প্রধানত বারোক যুগের ক্লাসিক সঙ্গীতের থিমগুলো ব্যবহার করেছি - বাখ, হ্যান্ডেল ইত্যাদি। আমি সাধারণত এগুলো লিখে রাখি না, শুধু বাজাই। মাঝে মাঝে রেকর্ড করি, কিন্তু পরে ভুলে যাই। সময় এগুলোকে মুছে দেয়। যখন আমি হ্যান্ডেল ও বাখ থেকে মুক্তি পাই, যেন কুকুর শৃঙ্খল ছিঁড়ে মুক্ত হলো, তখন ইম্প্রোভাইজেশন শুরু হয়। তখন মনে হয় আমি নিজের ইচ্ছায় বাদ্যযন্ত্র থেকে এই সুরগুলো বের করছি, কিন্তু একটি সুরও আমার নয়।
সর্বোপরি, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। যা জানি না, তা করতে পারি না। আমাদের প্রজন্মের সবাই কিছুটা গিটার বাজাতে পারে। সি মেজর, এফ মেজর, জি মেজর, এ মাইনর, ই মেজর, ডি মাইনর বাজাতে পারলেই আমরা ভাবি আমরা গিটার বাজাতে পারি। আমরা আসলে এভাবেই শিখি। যেমন রোমা সঙ্গীতজ্ঞরা বেহালা শেখে। তারা সঙ্গীততত্ত্ব জানে না, স্বরলিপি পড়তে পারে না, তবু তারা বাজাতে জানে। কিন্তু এই ধরনের কর্ড-নির্ভর শেখার মধ্যে একটা সীমাবদ্ধতা আছে। এতে আমাদের মনে হয়, গিটার বাজানোর এটাই যেন একমাত্র উপায়।
আর বেশিরভাগ সময় মানুষ সেখানেই থেমে যায়। এর বাইরে আর এগোয় না।
এইভাবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গীত উৎপাদন ক্ষমতাকে সীমিত করে, আর বিকাশের সম্ভাবনা বন্ধ করে দেয় যা সময়ের সঙ্গে আমার ক্ষেত্রে বদলেছে, কারণ আমি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে আরও স্তরযুক্ত সঙ্গীত কাঠামো তৈরি করতে শিখেছি। আমি যে বাদ্যযন্ত্রের প্রেমে পড়ি, সেটিই কিনে ফেলি…
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: আপনি কোন বাদ্যযন্ত্র বাজান?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমি অনেক ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজাই, ক্রেটান লায়ার থেকে শুরু করে জাপানি ও ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র পর্যন্ত। মূলত পিয়ানো, গিটার, আর গির্জার অর্গান বাজাই। তবে অ্যাকর্ডিয়ন আর হারমোনিকা বাজিয়ে খুব আনন্দ পাই। তবে হারমোনিকা বাজানো খুবই কঠিন…
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: আর কি শুধু আপনার কাছের মানুষরাই আপনি বাজান তা শুনতে পারে?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: এমনকি তারাও না। কেউ আমার কাছে ঘনিষ্ঠ বলেই আমি তাদের বিশ্বাস করি, তা নয়। আমি বলতে চাই, এটা অন্যদের জন্য বোঝা হতে পারে। কেউ কাছের হলেও সবকিছু ভাগ করা সবসময় ভালো নয়। আমাদের অন্যের সংবেদনশীলতার প্রতি বিবেচনাশীল হতে হয়। আমি মনে করি না যে আমি আমার সততার মাধ্যমে ভালোবাসা প্রমাণ করতে পারি, বরং তা করতে হয় কৌশল দিয়ে। আর ‘কৌশল’ মানে আত্মসংযম। তাই আমি কিছু বিষয় নিয়ে মিথ্যা বলি বা অস্পষ্ট রাখি। যেমন, কেউ কখনো এমন আবেগপূর্ণ সঙ্গীত সরাসরি দেখায় না। মাঝে মাঝে দেখানো ঠিক আছে। কিছু রাতে আমি আমার স্ত্রীকে ফোন করি আর তাকে নতুন কিছু বাজিয়ে শোনাই কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে কাঁদিয়ে ফেলি। আমার এক মেয়ে, বেচারা, পরিবারের সবচেয়ে সংবেদনশীল, সম্প্রতি আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, যদিও সে সবসময় গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে তার বাবার লেখা সুন্দর জিনিসগুলো দেখে, আর তার বাবাও সবসময় সেগুলো তাকে দেখিয়েছেন, তবু সে চায় তার বাবা যেন দয়া করে তাকে পিয়ানোর জন্য লেখা জিনিসগুলো না দেখা । কারণ সেগুলো সবসময় তাকে কাঁদিয়ে ফেলে। কারণ সেগুলো এত সুন্দর, কিন্তু খুবই দুঃখময়। এটাই সঙ্গীত । সঙ্গীত নিজেই বাজে এবং মানুষ তার মধ্যে ডুবে থাকে।
অনেকদিন ধরে আমি জন ম্যাকলাফলিনের কথা বিশ্বাস করিনি, যিনি আমাকে চমকে দিয়ে বলেছিলেন যে ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের অবস্থান জটিলতার শীর্ষে নয়, বরং জ্যাজ তা। আমার কিশোর বয়সে আমি একজন পেশাদার জ্যাজ সঙ্গীতশিল্পী ছিলাম। আমি টাকার জন্য একটা জ্যাজ ত্রয়ীতে পিয়ানো বাজাতাম, কারণ আমি প্রশিক্ষিত পিয়ানোবাদক ছিলাম । যেমন আমাদের অনেকেই দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সঙ্গীত স্কুলে পড়েছিল। যদিও আমার বাবা-মা আমার এমন দারিদ্র্যপূর্ণ অবস্থায় কিশোর বয়স কাটানো মেনে নেননি। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি কেন ম্যাকলাফলিন মনে করতেন জ্যাজ হলো সঙ্গীত জটিলতার শীর্ষে। জ্যাজ হলো সবচেয়ে সমৃদ্ধ এবং জটিল উপায়ে একজনের নিজেকে প্রকাশের মাধ্যম। তারপর যখন আমি শেষমেশ সেই বারোক সঙ্গীত থেকে জ্যাজে ঢুকে যাই, তখন হঠাৎ বুঝতে পারি তিনি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন। ধ্রুপদী সঙ্গীত বা অন্য সব সঙ্গীতে যা ছিল না। সেটা হলো স্বাধীনতা, বেপরোয়াপনা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
অবশ্যই, অনেকেই বলতে পারেন বাখের মধ্যে স্বাধীনতা নেই, এমনটা বলা ভুল। কিন্তু ম্যাকলাফলিন যা বলেন, তা আকর্ষণীয়, না কি? বাখের আছে ৮, ১৪, ৬৪-শিহরণ জাগানো নিয়মতান্ত্রিকতা আর অনন্য বৈচিত্র্যতা। কিন্তু তবুও, ম্যাকলাফলিনের ধারণা সংক্রামক। সম্প্রতি আমি আবার ফিরে গেছি আমার কিশোর বয়সের প্রিয় সঙ্গীতজ্ঞদের কাছে, বিশেষ করে থেলোনিয়াস মঙ্কের কাছে।
গ্যাব্রিয়েলা নাগি: আমাদের রাইটার্স সিনেমা সিরিজের জন্য আপনি তাকে বেছে নিয়েছেন এটা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ, সে সবসময় আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার মাধ্যমেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে পাগল হওয়া মানে দুটি জিনিস নয়। এর মানে এই নয় যে পাগলামি এবং প্রতিভা একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত, আর এর মানে এই নয় যে পাগলদের গুরুত্ব সহকারে নেওয়া যায় না।
বেলা তারের মতে, পাগলদের গুরুত্ব সহকারে নেওয়া যায় না। যদি আপনি সেটা করেন তাহলে তা তাদের পাগলামির প্রতি অপমান। আমরা পাগলদের ক্ষতি বা শোষণ করি না, কারণ তাদের প্রতি করুণা এবং কৌশল প্রয়োজন।
মঙ্ক সবসময় দিগন্তে ছিলেন। সূর্য তার জন্য ক্রমাগত অস্ত যাচ্ছিল। তারপর এলো মাইলস ডেভিস, জন কোলট্রেন, আর্ট ব্লেকি, ম্যাক্স রোচ। শেষ দুজন ড্রামার, বিশেষ করে বি-বপ এবং হার্ড বপ যুগের। ব্লেকি এমনকি থেলোনিয়াস মঙ্কের সাথে একটি রেকর্ডও করেছেন।
এটি অনেক বাধা দূর করল। আমি বুঝতে পারলাম যে কোনো দেয়াল নেই। জ্যাজে, আমার নতুন আবিষ্কারে আমি এক ধরণের বুনো স্বাধীনতা উপভোগ করছিলাম। এটি ভাষার উপরও প্রভাব ফেলেছে। আমার মনে হয় ভাষা এবং সঙ্গীতের একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ আছে। এটা কোনো মৌলিক চিন্তা নয় ।কিন্তু আমি এই সাধারণ শিকড়কে মৌলিক অভিজ্ঞতা হিসেবে অনুভব করি, আর সেখান থেকেই কিছু শিখি।
গ্যাবর মেসজারোস: আচার-অনুষ্ঠানে?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমরা এটিকে সঠিকভাবে কোনো নাম দিতে পারি না। যখন আমরা খুব গভীরভাবে অনুশীলন করি, তখন আমরা অনুভব করতে পারি সেই সাধারণ শিকড় কী ছিল। আর হ্যাঁ, সম্ভবত, হ্যাঁ, মনে হয় এই উপাদানটি সত্যিই আচার-অনুষ্ঠানে আছে, সেই পুনরাবৃত্তিমূলক বাধ্যবাধকতা অথবা অভিব্যক্তিতে।