Published : 23 Feb 2026, 02:08 PM
ফিরোজ আহমেদ একই সাথে রাজনীতিবিদ এবং লেখক। এমন রাজযোটক খুব কমই ঘটে দুখিনী বাংলায়। ফিরোজ তাই ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম তার চিন্তার তৎপরতাও। একুশে ফেব্রয়ারি(২১-০২-২০২৬) তাঁর একটি পোস্ট পড়ে বুঝতে পারলাম ফিরোজের চিন্তা কেবল ব্যতিক্রমই নয়, রীতিমত ইতিহাসনির্ভর। তবে সেই ইতিহাসনির্ভরতা একমুখী এক সংকীর্ণ পাঠের ফল। বাংলা ভাষায় ইদানীং কেন আরবি, ফারসি শব্দের ‘অনুপ্রবেশের’ ফলে বাংলার চেহারা ‘মিশাল’ রূপ ধারণ করছে, তার উত্তরে তিনি লিখেছেন:
“কেন বাংলা এই রকম? এর উত্তর ভারতচন্দ্র দিয়ে গেছেন বহু আগে।
“মানসিংহ-পাদশায় হইল যে বাণী।
উচিত যে আরবী পারসী হিন্দুস্তানী ॥
পড়িয়াছি সেই মত বর্ণিবারে পারি।
কিন্ত সে সকল লোকে বুঝিবারে ভারি ॥
না রবে প্রসাদ গুণ না হবে রসাল।
অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল ॥”
বাংলা ভাষা আজন্ম যাবনী মিশাল, প্রিয় জাত্যাভিমানী উদ্বিগ্ন শুদ্ধতাবাদীগণ। কিছু করার নাই।”
আমি ভাষার ব্যাপারে কখনোই শুদ্ধতাবাদী নই, থাকার কোনো যৌক্তিক বা ঐতিহাসিক কারণও দেখি না। পৃথিবীর একটি ভাষাও খুঁজে পাওয়া যাবে না যা নিজেকে বিশুদ্ধ বলে দাবী করতে পারে। ইংরেজি ভাষায় রয়েছে ফরাসি, ল্যাটিন ও নর্ডিক ভাষার প্রভাব। রোমান্স ভাষা থেকে উদ্ভূত স্প্যানিশ ভাষায় রয়েছে আরবি, বাস্ক, সেল্টিক ও জার্মানিক ভাষার প্রভাব। প্রতিটি ভাষাই অন্য ভাষার সংস্পর্শে এসে নিজেকে সমৃদ্ধ করে। এবং যে-ভাষা শুদ্ধতাপন্থী বা শুদ্ধতা বজায় রাখার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর, সেই ভাষা আসলে আত্মহত্যাকেই মেনে নেয়। আদিবাসী নৃগোষ্ঠীর ভাষাগুলো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত ভাষাগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত শুদ্ধ, কিন্তু এই শুদ্ধতা তাকে কখনো বড় ও প্রসারিত হতে দেয় না। না দেয়ার ফলে সে বনসাইয়ের মতো ছোট হয়ে থাকে। ভাষা নিজের অভিব্যক্তি বাড়ানোর জন্য যত পারে সে গ্রহণ করে। কিন্তু এই গ্রহণের দুটো প্রক্রিয়া আছে: এক.ঐতিহাসিক ঘটনা পরম্পরায় স্বাভাবিক নিয়মে, দুই. আরোপের মাধ্যমে, যেমনটা স্পেনীয় ও পর্তুগিজরা লাতিন আমেরিকায় নিজেদের ভাষা চাপিয়ে দিয়েছিল। ভারতচন্দ্র যে-সময়ে জন্মেছিলেন সেটা ছিল মুসলমান শাসিত এক সময়। ভারতবর্ষে মুসলমানদের শাসনের শুরু হয় ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ ঘুরির দিল্লি বিজয়ের মাধ্যমে। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে কুতুবুদ্দিন আইবেকের মাধ্যমে দিল্লির সালতানাত প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এর স্থায়ী ও সুসংগঠিত শাসন শুরু হয়। আর ভারতে ইংরেজ শাসনের সূচনা হয় ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে। তার মানে প্রায় সাড়ে পাঁচ শ’বছর প্রত্যক্ষ মুসলিম শাসনামল বজায় ছিল ভারতে। এর ফলে আরবি ফারসি ও তুর্কি বহু শব্দ বাংলায় প্রবেশ করেছে। মুসলিম শাসনের অবসানের পরপরই যে আরবি ফারসি সংস্কৃতি বা ভাষার চর্চা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তাও নয়। এবং সেই শব্দগুলো রাতারাতি উধাও হয়ে যায়নি। ইংরেজরা বহু বছর যাবৎ আইন ও শাসনের ভাষা হিসেবে বিজিতদের ভাষাটি অনুসরণ করেছিলো। ইংরেজরা ১৮৩৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজকার্য নির্বাহের জন্য ফারসি ভাষা ও আইন ত্যাগ করে বটে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে আরবি ফারসি থেকে সরে এলেও জনপরিসর থেকে এই ভাষাকে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি, হওয়া সম্ভবও ছিল না। জনসত্তা থেকে কোনো ভাষা, শব্দ ও সংস্কৃতিকে মুছে ফেলা অত সহজ না। ঘটনা হলো ভারতচন্দ্র যখন বেঁচে ছিলেন ততদিনে আরবি ফারসি শব্দগুলো বাংলা ভাষায় তাদের শেকড় চারিয়ে দিয়েছে বহুদূর পর্যন্ত। সেগুলো বাংলা ভাষার নাগরিকত্ব পেয়ে গেছে। সুতরাং সেসময়কার মানুষের এবং লেখকদেরও “ভাষা যাবনী মিশাল ॥” হবে এটা তো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতচন্দ্রের পর বাংলা ভাষার বিবর্তন ঘটেছে নানা রকম আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কারণে। সে সব শব্দের অর্থ বদলেছে অনেক। আমরা সেই শব্দগুলো কখনোই শব্দভাণ্ডার থেকে ফেলে দেবো না। তবে শব্দগুলো যেমন সময়ের চিহ্ন বহন করে, তেমনি তা রাজনীতিকেও বহন করে। আজকে ইনকিলাব, ইনসাফ, আজাদী, বা আরও যেসব আরবি ফারসি শব্দ ব্যবহৃত হচ্ছে তার পেছনে নিছক ভারতচন্দ্রীয় ‘যাবনী মিশাল’-এর নিষ্পাপ ঘটনা বিদ্যমান নয়, তার পেছনে খুবই সুক্ষ্ণ স্তরের একটা রাজনীতি আছে। বাংলাদেশ ৪৭ সাল থেকে বিভক্ত হওয়ার পর জাতিগত স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্ন যখন উঠলো তখন ভাষার আশ্রয়ে সেই স্বাতন্ত্র বা আত্মপরিচয় নির্মাণের অজুহাতে তৎপর হলেন আমাদের লেখক বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ।

যদি ভালোভাবে লক্ষ্য করা যায়, তাহলে দেখবো বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারায় বিপ্লবকে কেউ ‘ইনকিলাব’ বলে অভিহিত করেনি, স্বাধীনতা শব্দের পরিবর্তে কেউ ‘আজাদী’ শব্দ ব্যবহার করে নি। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে এই শব্দগুলো কারা ব্যবহার করতেন? করতেন প্রগতিবিরোধী সেই প্রতিক্রিয়াশীল পক্ষ যারা যাবনী মিশাল পুঁথিসাহিত্যের ভাষাকে আশ্রয় করতে বলতেন, আর অকাতরে আরবী ফারসি শব্দ ব্যবহারের সাফাই গাইতেন। অর্থাৎ প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রগতিশীলদের ভাষা ও শব্দ নির্বাচনই বুঝিয়ে দিত তাদের রাজনৈতিক আদর্শ ও ভিন্নতা। আমরা তো একসময় নামাজ রোজা বললেই বুঝতাম যে ওটা সালাতেরই অংশ, কিন্তু এখন কেবল নামাজ রোজা বললেই হবে না, তার পরিবর্তে সালাত ও সিয়াম বলতে হবে কিংবা বলার একটা প্রবণতা তৈরি করতে চাইছে। কে আমাকে সালাত বলতে পরামর্শ দিচ্ছে? দিচ্ছে সেই রাজনৈতিক আদর্শের লোক যারা এক সময় আমাদের ভাষার বিরুদ্ধে ছিল, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, এবং সর্বোপরি আমাদের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে ছিল। ষাটের দশকে প্রগতিবিরোধী তথা পাকিস্তানপন্থী যে-লেখক সমাজ ছিলেন তারা চেয়েছিলেন সাহিত্য এমন ভাষায় রচিত হোক যেখানে আরবি ফারসি শব্দের প্রাধান্য থাকবে। আর এই কারণে তারা পুঁথিসাহিত্যকে অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন সেই পরামর্শকদের একজন। “ তিনি বলেন, ‘পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যিক রেনেসাঁ আসবে এই পুঁথি-সাহিত্যের বুনিয়াদে।’ ওই সাহিত্য রচিত হবে কোন বাঙলা ভাষায়? তাঁর মতে, ‘সে সাহিত্যের ভাষায়ও হবে মুসলমানেরই মুখের ভাষা।’ অর্থাৎ তিনি আরবি-ফার্সি-উর্দু মিশ্রিত বাঙলা ভাষায় মুসলমানি বাঙলা সাহিত্য সৃষ্ট হবে বলে মনে করেন।”১

অর্থাৎ, নির্দোষ, অসাম্প্রদায়িক ও নিরীহ ভাষা বা শব্দকে আপনি রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে তার একটা চরিত্র আপনি দাঁড় করাতে পারেন। এবং এটা মোটেই বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার নয় যে সেই ষাটের দশকে যে-উদ্দেশ্যে এই কাজটি করা হয়েছিল, আজ ২০২৪ সালের পর সেই অভিন্ন উদ্দেশ্যে আরবি ফারসি শব্দকে ব্যবহার করতে চাইছে। গতকালই (২২-০২-২০২৬) জুলাই আন্দোলনের রূপকারদের একজন মাহফুজ আলম-এর পোস্টটা দেখলে এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং ধারাবাহিকতা সম্পর্কে আপনি আরও নিশ্চিত হতে পারবেন:
“ ভাষা নিশ্চল না। বদ্ধ কুঠুরিও না। যখন যে শব্দ দিয়ে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা সহজ স্বাভাবিক হবে, সেটাই চলবে। ভাষার দুয়ার খুলে দাও।” (ফেসবুক পোস্ট,
২২-০২-২০২৬)
ভাষা যে নিশ্চল না বা বদ্ধ কুঠুরিও না—এই কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু নিশ্চল বা বদ্ধ না-থাকার অজুহাত দিয়ে তিনি একটি ‘রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক’ উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইছেন সেটা তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেই দিয়েছেন। তাহলে বুঝাই যাচ্ছে যে শব্দের নিজের কোনো ধর্ম নেই, নেই অঞ্চলগত কোনো পরিচয়, কিন্তু তাকে ওই দুই পরিচয়েই আমরা হাজির করতে পারি যদি তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা শুরু করি। প্রশ্ন হলো, ভাষা এই উদ্দেশ্য ছাড়াই উপরোক্ত দুটো চেহারাই ধারণ করতে পারে কিনা। হ্যাঁ, পারে। কীভাবে পারে? একটা উদাহরণ দেয়া যাক। আমরা বাংলাদেশের লোক যখন জলের পরিবর্তে পানি বলছি তাতে করে এই পানি শব্দটি বাংলাদেশ এবং একই সঙ্গে মুসলমান সম্প্রদায়ের চিহ্ন নিয়ে সে আবির্ভূত হচ্ছে। যদিও পানি শব্দটি পশ্চিমবঙ্গ ব্যতীত ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও ব্যবহৃত হয়, কিন্তু সেটা অন্য ভাষায়। অন্যদিকে, বাংলাভাষী অঞ্চলে কেউ জল বললেই বুঝে নেবে হয় সে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক, নয়তো পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী। জল বা পানি বলার জন্য উভয় অঞ্চলেই এই দুই ভিন্ন সম্প্রদায়কে কেউ এসে শব্দটি চাপিয়ে দেয়নি, কিংবা ফরমান জারি করে প্রয়োগে বাধ্যও করেনি। কিংবা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উদ্দেশে প্রয়োগের ভিন্নতা সম্পর্কে কোনো পণ্ডিত বা বুদ্ধিজীবী এসে ব্যবস্থাপত্রও দিয়ে যায়নি। এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ঘটে আসছে শত শত বছর ধরে। এই অঞ্চলের বাংলা সাহিত্য রাজনৈতিক, সামাজিক এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মুসলমান হওয়ার কারণে যে পশ্চিমঙ্গ থেকে আলাদা হবে, অন্য ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে যে ভিন্ন চেহারা ধারণ করবে—এ ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু ভাষা বা শব্দের চলাচল ও ব্যবহার একটি জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন প্রয়োজনে স্বতঃস্ফূর্ত আচরণের অংশ হয়ে ওঠে। কোন শব্দকে বিশেষভাবে কেউ চাপিয়ে দিয়ে তাকে গণ-ব্যবহারের অংশ করে তুলতে পারেন না। আমাদের উপর ষাটের দশকে সেই চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে। সাহিত্যে এর প্রয়োগ তখন যারা করেছিলেন তারা কেউ যুগন্ধর প্রতিভার অধিকারী ছিলেন না যাদের প্রভাব সাধারণ জনগোষ্ঠীর উপরে পরবে। আবার এমন কেউ কেউ প্রয়োগ করেছিলেন যেমন সৈয়দ আলী আহসান, কিন্তু পরে সেই প্রয়োগ থেকে তিনি সরে এসেছিলেন। সেই সময়ে আজহারুল ইসলাম নামে এক কবি পাকিস্তানপন্থীদের আরবি ফারসি শব্দের বাহুল্যে রচিত সাহিত্য সম্পর্কে ‘কৈফিয়ত’ নামক এক কবিতায় বলেছিলেন:
মরুর দেশের ঢঙ্গে শুরু করে কেহবা বাঙলা লিখা
মওকা বুঝিয়া কেহ কেহ করে উর্দুরে আজি নিকা
….
অর্থ চিন্তা সবারি মাঝে খেলিতেছে মাস মাস
সাধে কি সকল লেখক করিছে বোগদাদী ভাষা চাষ। (মাহে-নও, ১৩৫৭,২:৫)২
ফিরোজ এক অদ্ভূত চিজ! ভারতন্দ্রের কথা বললেন, কিন্তু আজহারুল ইসলাম-কথিত উদ্দেশ্যটি সম্পর্কে কিছুই বললেন না। যে-কোনো শব্দের আবির্ভাবের যেমন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ থাকে, তেমনি শব্দের মৃত্যুর পেছনেও একই কারণ বিদ্যমান। ফিরোজ প্রায় তিনশ বছর আগের ভারতচন্দ্রে আরবি ফারসি ব্যবহারের উদাহরণ তুলে ধরলেন, কিন্তু কেন করেছিলেন আর এখন কেন সেইভাবে আর ব্যবহার করা সম্ভব নয়—সেই কারণগুলো তার চালাকির শাক দিয়ে ঢেকে রাখলেন। ভারতচন্দ্রের আরবি ফারসি শব্দের প্রয়োগের পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিল না। সেটা ছিল এক সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক স্বাভাবিক প্রকাশ। কিন্তু এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের কারণে শব্দগুলো আর আগের পটভূমিতে নেই। ভাষাবিজ্ঞানী ক্লোদ আগেজ ( Claude Hagege) শব্দের জন্মমৃত্যু বিবর্তন নিয়ে যা বলেছেন তা এই প্রসঙ্গে স্মরণ করাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না আশা করি: “Changes in societiy and economic relations cannot leave the lexicon intact, because words reflect cultures and ideas.”৩
আমরা লক্ষ্য করেছি ইনকিলাব ও আজাদিসহ আরও কিছু আরবি ফারসি উর্দু শব্দের ব্যবহার বিশেষ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও লেখক বুদ্ধিজীবীর মুখে আগস্টের পরে খানিকটা বেড়ে গেছে। গ্রামে কিংবা শহরে সাধারণ লোকজন কিন্তু রাজনৈতিক বিপ্লব বা আন্দোলনের পরিবর্তে ইনকিলাব বলছে না, কিংবা স্বাধীনতা বুঝাতে আজাদী শব্দও ব্যবহার করছে না। তাহলে কারা করছে? রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন লেখক বুদ্ধিজীবী রয়েছেন, যাদের লেজটি পড়ে আছে সেই ষাটের দশকের পাকিস্তানপন্থী অন্ধকার গুহার ভিতরে। তারা বাইরে বাইরে যতই অন্তর্ভূক্তিমূলক সংস্কৃতির দোহাই দিন না কেন, কিংবা সাবঅলটার্ন, পোস্ট কলোনিয়াল তাত্ত্বিক ধাপ্পাবাজি করুন না কেন, তা যে বিদ্যমান সংস্কৃতিকে সাম্প্রদায়িকতায় দুষিত করার লক্ষ্যে এসব করছেন তা এদের রাজনৈতিক আদর্শ থেকে অনেকটাই স্পষ্ট।
২৪ সালের আগস্ট-এ যে-অভ্যুত্থান ঘটেছে তা ইসলামপন্থী রাজনীতি ও ভাবাদর্শের লেখক-বুদ্ধিজীবীদের আত্মপ্রকাশ নতুন করে প্রসারিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। আমি এই সুযোগকে গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সাধুবাদ জানাবো অবশ্যই। কিন্তু আরবি ফারসি উর্দু শব্দ ব্যবহারের পেছনে তাদের উদ্দেশ্যেকে আড়াল করে রাখাটা হচ্ছে মোনাফেকি।
আমি নিজে কবিতায়, প্রবন্ধে এমনকি প্রয়োজনে অনুবাদেও আরবি ফারসি শব্দ ব্যবহার করি, কারণ কোনো শব্দকেই আমি সাহিত্যের জন্য পরিত্যক্ত মনে করি না। এমনকি পরিত্যক্ত শব্দকেও আমি ফিরিয়ে আনার পক্ষে, তবে তা যথার্থ, সুষম এবং নান্দনিক প্রয়োগের মাধ্যমে অবশ্যই। বাংলা ভাষার বহু কবির কবিতায়—ভারতচন্দ্রের পরেও—আরবি ফারসি শব্দের প্রযোগ ঘটে আসছে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু লেখকের হাতেও তা ঘটছে, তখন কিন্তু ওর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আমরা কখনো খুঁজতে যাই না। কিন্তু আগস্ট-পরবর্তী বিশেষ এক রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের পর যখন এই ধরনের শব্দের বাহুল্য নজরে পড়ছে এবং তার পক্ষে ওকালতিও দেখা যাচ্ছে, তখন এদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আর কোনো সন্দেহ থাকে না।
এদেরকে চেনা আরও সহজ হয়ে যাবে যদি লক্ষ্য করা যায় বাংলাদেশকে স্বাধীন করার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীনতাপূর্ব সময়কার শ্লোগান, বিবৃতি, ঘোষণা কিংবা মিছিলের ভাষা ও শব্দগুলো স্মরণ করা যায়। আমরা কখনো বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য ‘আজাদী’ বলিনি, বলেছি বাংলাদেশ ‘স্বাধীন’ কর। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আজাদীযোদ্ধা বলিনি। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে যত আন্দোলন হয়েছে সেগুলোকে আমরা, এমনকি মূলধারার পত্রপত্রিকাও কখনো ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদী’ বলে অভিহিত করেনি। তাহলে আজকে আমরা স্বাধীনতার পরিবর্তে ‘আজাদী’ শব্দটির প্রতি কেন পক্ষপাত দেখাতে চাইছি? ওই শব্দগুলো নিশ্চয়ই কোনো ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক পরিচয় নিয়ে জন্মগ্রহণ করেনি, কিন্তু আমরা শব্দগুলোর মধ্যে রাজনীতি ও সংকীর্ণবোধ ঢুকিয়ে এদেরকে দুষিত করেছি। সেই যে কবে সুকুমার রায় লিখেছিলেন: “গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ দিয়ে যায় চেনা।” হ্যাঁ, এদেরকেও আপনি শব্দ ও শব্দের প্রতি পক্ষপাত এবং ওকালতি থেকে চিনে ফেলতে পারবেন। ইনকিলাব, ইনসাফ, আজাদী ইত্যাদি শব্দগুলোতে আপত্তি এই জন্য নয় যে এগুলো আরবি ফারসি শব্দ। আপত্তিটা মূলত এর মধ্যদিয়ে সুনির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের প্রকাশ ও আধিপত্য বিস্তারের কারণে।
২.
বাংলা অঞ্চলকে প্রাচীন ও মধ্যযুগে বঙ্গ, বাঙলা, বাঙ্গালা, বঙ্গালাহ্ সহ নানা নামে অভিহিত করা হতো। ইউরোপিয়রা বেঙ্গল, বেঙ্গালা, বেঙ্গেলা, বাঙ্গালা ইত্যাদি নামে অভিহিত করেছে নানা সময়ে। তবে যে নামেই অভিহিত করে থাকুক কেন, ওই সবগুলো নামেরই উৎস হচ্ছে ‘বঙ্গ’ শব্দটি যা ইউরোপিয়ও নয়, আরবি ফারসিও নয়। যদিও বাঙ্গালাহ্ শব্দটি ফারসি রূপ ধারণ করেছে।
আর এই ফারসি রূপ লক্ষ্য করেই ইনকিলাবপন্থী বুদ্ধিজীবী ফারুক ওয়াসিফ মহান কিছু আবিস্কার করে বলেই ফেললেন: “ বাংলা শব্দটাই তো ফারসি! এখন?” হুম, তাহলে কী হবে এখন! খুবই চিন্তার ব্যাপার! বাংলাদেশকে তো আর বাংলা ভাষার সাথে সম্পর্কিত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে না! ইরান, তুরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশ। ফারুক ওয়াসিফ বাংলা অভিধানে আবিস্কার করেছেন যে ফারসিতে এই অঞ্চলকে ‘বঙ্গালাহ্’ বলা হয়েছে। এই কারণে তার কাছে মনে হয়েছে বাংলা বা বাংলাদেশ শব্দটাই নাকি ফারসি। বুজরুকি আর কাকে বলে! গোটা বাংলাদেশটাই আরবি বা ফারসি উপাদানে তৈরি—এরকম আবিস্কার করতে পারলে ফারুক ওয়াসিফরা ইউরেনিয়াম আবিস্কারের মতো মহার্য কিছু পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেতেন। ভাগ্যিস পরিস্থিতি ও বাস্তবতা তেমন নয়। ফারুক বামপন্থী হিসেবে পরিচিত হলেও তার মন পড়ে থাকে খুর্মা খেজুর নারঙ্গী বনে। কিন্তু তার জানা থাকা উচিত যে ‘বঙ্গালাহ’ শব্দটা ফারসি রূপ ধারণ করছে বটে কিন্তু বঙ্গদেশ বা বাঙলা বা বাঙ্গালার উৎস আরবিও নয়, ফারসিও নয়, ওর উৎস সংস্কৃত। ফারুক সেই উৎস সম্পর্কে নিরব, কিন্তু ওই শব্দের ফারসি রূপান্তরের ব্যাপারে খুবই সরব।

সংস্কৃত ও প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে ‘বঙ্গ’ শব্দটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘বঙ্গ’ থেকে ‘বাঙ্গালাহ’ বা ‘বাঙ্গালা’ শব্দের বিবর্তন ঘটে। ধারণা করা হয়, ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে এই অঞ্চলে বসবাসকারী দ্রাবিড় গোষ্ঠী ‘বঙ’ থেকে ‘বঙ্গ’ শব্দটি উদ্ভূত, এবং পরবর্তীকালে ফারসি ও অন্যান্য ভাষার প্রভাবে এটি ‘বাঙ্গালাহ’ বা ‘বাংলা’ রূপ ধারণ করে।
‘বঙ্গ’ শব্দটির সবচেয়ে প্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্বেদের ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে যা ৮০০ থেকে ৫০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে রচিত। সেখানে একটি পদে বলা হয়েছে: ‘বয়াংসি বঙ্গাবগধ্বশ্চেরপাদাঃ(২য়/১ম/১)”।৪ খৃষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দ থেকে খৃষ্টিীয় ৪৪০ অব্দের মধ্যে রচিত মহাভারতেও আছে এই বঙ্গ শব্দের উল্লেখ। “মহাভারতের প্রাসঙ্গিক শ্লোকটি হল:‘অঙ্গো বঙ্গঃ কলিঙ্গশ্চ পুন্ড্রঃ সুহ্মাশ্চতে সুতাঃ”৫
ইতিহাসবিদ আবদুল মমিন চৌধুরী বলেন, “আবুল ফজল ‘বাঙ্গালাহ’ নামের ব্যাখ্যা দিয়েছেন: ‘বাঙ্গালাহ’র আদিনাম ছিল ‘বঙ্গ’। প্রাচীনকালে এখানকার রাজারা ১০ গজ উঁচু ও ২০ গজ বিস্তৃত প্রকাণ্ড ‘আল’ নির্মাণ করতেন; এ থেকেই ‘বাঙ্গাল’ এবং ‘বাঙ্গালাহ’ নামের উৎপত্তি।”৬
তবে বাংলাদেশ বা বাংলা শব্দ দুটি যেহেতু আজ ওই ফারসি বানানে বা উচ্চারণে ‘বাঙ্গালাহ’ বলি না, তাই ওতে উল্লসিত হওয়ার বা গৌরববোধ করার কোনোই কারণ নেই। গৌরব যদি করতে হয় তবে মূল রূপ ও বিবর্তিত রূপের কারণে সংস্কৃত, ইউরোপিয় ও ফারসি-- সম্মিলিতভাবেই এই সবগুলোর জন্যই করা উচিত। তাছাড়া, ‘বাঙ্গালাহ’ শব্দটির আবির্ভাব বা উৎপত্তি ফারসি ভাষায় ঘটেনি, ওটি প্রথম সংস্কৃতে ‘বঙ্গ’ শব্দ রূপে আবির্ভূত হয়েছে, তারপরে ফারসিতে প্রবেশ করে তা তাদের উচ্চারণে বিকৃত হয়ে ‘বাঙ্গালাহ’ হয়েছে। সেই বিকৃত উচ্চারণ নিয়ে এত গৌরবেরও তো কিছু নেই।
উৎস:
১. ভাষা আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক পটভূমি, একত্রে ৫ খন্ড, সম্পাদনা: আতিউর রহমান, ইউপিএল, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০০, পৃ ৫
২. কবিতাটি উদ্ধৃত হলো ভাষা আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক পটভূমি, একত্রে ৫ খন্ড, সম্পাদনা: আতিউর রহমান,ইউপিএল, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০০, পৃ ১৫ থেকে।
৩. On the Death and Life of Languages, Claude Hagege, Yale University Press, 2009, P 31
৪. বাংলাদেশঃ বাঙালী, সম্পাদনা: মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, সাগর পাবলিশার্স, দ্বিতীয় মুদ্রণ ১৯৯১, পৃ ২০
৫. বাংলাদেশঃ বাঙালী, সম্পাদনা: মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, সাগর পাবলিশার্স, দ্বিতীয় মুদ্রণ ১৯৯১, পৃ ২১
৬. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, প্রধান সম্পাদক: আনিসুজ্জামান, বাংলা একাডেমি, ২০১৯, পৃ ৩