Published : 11 May 2026, 08:38 PM
রবীন্দ্রসাহিত্যের গবেষণার জন্য অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ এবং রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় শিল্পী বুলবুল ইসলাম চলতি বছর বাংলা একাডেমির ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ পেয়েছেন।
সোমবার বিকালে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক ও মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এদিন সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করে বাংলা একাডেমি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে মোহাম্মদ আজম বলেন, “রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র-বিপুল সৃষ্টিজগত আমাদের বিস্মিত করে, বিশ্লেষণের পরিসরও তৈরি করে। আমাদের সমকালে অন্ধ রবীন্দ্র-ভক্তি ও রবীন্দ্রবিরোধিতার যে প্রাবল্য দেখা যায়, উভয়ই সাহিত্যবিচারের জন্য ক্ষতিকর।
“আমরা আশা করি, আজকের সেমিনারের মত নানা আলোচনা-পর্যালোচনায় রবীন্দ্রনাথকে সাম্প্রতিকতম জ্ঞানকাণ্ডের আলোকে মুক্ত দৃষ্টিতে অবলোকন ও আবিষ্কারের পথরেখা খুঁজে পাব।”
অনুষ্ঠানে ‘রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কথাসাহিত্যিক প্রশান্ত মৃধা।
তিনি বলেন, “যদি রবীন্দ্রনাথের একটি গদ্যের বইয়ের নাম করতে হয়, যেখানে রবীন্দ্রনাথ প্রশ্নাতীতভাবে আলাদা, সে ক্ষেত্রে তার সেরা যে কোনো উপন্যাসের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ‘গল্পগুচ্ছ’।
“ভাষার অসাধারণত্ব ও সৌন্দর্য যেভাবে ‘ঘরে-বাইরে’, ‘নৌকাডুবি’ ও ‘গোরা’য় ধরা পড়ে, তা হয়ত ‘গল্পগুচ্ছ’তে পড়ে না, কারণ প্রতিটি গল্প আলাদা। কিন্তু যদি পুরো ‘গল্পগুচ্ছ’কে একটি উপন্যাস-পাঠ কল্পনা করে নেওয়া যায়, তাহলে এটি রবীন্দ্রনাথের যে কোনো গদ্যগ্রন্থের চেয়ে সমৃদ্ধ।”
প্রশান্ত মৃধা বলেন, “প্রতিটি ভিন্ন পাঠে এক-একটি গল্পের স্বাদ বদলে যায়। ‘গল্পগুচ্ছ’ পড়াও যায় যে কোনো জায়গা থেকে। ভাষার অসাধারণ স্বচ্ছতা ও সৌন্দর্যের কারণে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি উপন্যাসও একইভাবে পড়ে ওঠা সম্ভব।
“যে কথাসাহিত্যিকের লেখা দ্বিতীয়বার ফিরে পড়া যায়, পড়তে হয় কিংবা পড়ার প্রয়োজন পড়ে, অনেকেই তাকে বড় লেখক মনে করেন। কিন্তু যার গোটা পঞ্চাশেক গল্প ও অন্তত পাঁচটি উপন্যাস প্রতিবার পড়ার সময়ে বাক্যেরও অর্থান্তর ঘটে, নতুন মনে হয়, তিনি মহৎ কথাসাহিত্যিক।”
এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিস এবং কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক রায়হান রাইন।
পরে চলতি বছরের বাংলা একাডেমির ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’প্রাপ্ত দুজনের হাতে পুষ্পস্তবক, সনদ, সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি জানিয়ে নৃপেন্দ্রলাল দাশ বলেন, “বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র পুরস্কার-প্রাপ্তি জীবনের অনন্য অর্জন। রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করে তাকে অন্বেষণ করে চলেছি; এ অন্বেষণের শেষ নেই কোনো, আছে আনন্দধারায় অনন্ত অবগাহন। এই পুরস্কার প্রাপ্তিতে আমার দায়িত্ব বেড়ে গেল, আমাকে আরও ভালো লিখতে হবে।”

বুলবুল ইসলাম বলেন, “আমি যখন বাংলা একাডেমি থেকে ফোন পাই, তখন হঠাৎ হাওয়ায় যেন ভেসে আসা ধ্বনির মত মনে হয়েছে। আমার এরকম আশা ছিল না যে এমন একটি পুরস্কার আমার কাছে আসবে। বাংলা একাডেমির পুরস্কারটি আমি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে দেখি। কারণ আজকাল অনেক পুরস্কারই নানা ভাবে পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলা একাডেমি খুব যত্ন করে, অনেক গবেষণা করে তারপর এই পুরস্কারটি দিয়ে থাকে।”
বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, “রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্য সৃষ্টির এত বছর পেরিয়ে আজও সমান প্রাসঙ্গিক। কথাসাহিত্যে নিজস্ব রূপরীতি অন্বেষণ ও আবিষ্কারের পাশাপাশি জনমানুষের জীবনকে সার্থকভাবে ধারণ করতে পেরেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
“তার সমস্ত সৃষ্টিকর্মের মূলে প্রণোদনা ছিল মাটিবর্তী মানুষ। ছোটোগল্প ও উপন্যাসে তিনি স্বদেশ ও বিশ্বচেতনাকে নতুন মাত্রা দান করেছেন।”
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন সংগীতশিল্পী লাইসা আহমদ লিসা এবং ফারহিন খান জয়িতা। রবীন্দ্রকবিতার আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী নাসিম আহমেদ।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির সহপরিচালক ড. মাহবুবা রহমান।