১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

হুয়ান রামন হিমেনেস-এর কবিতা

হুয়ান রামন হিমেনেস বিশ্বাস করতেন—কবিতা আত্মার সবচেয়ে স্বচ্ছ আলো, যেখানে শব্দের চেয়ে নীরবতার সংগীত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্পেনের আন্দালুসিয়ার ছোট শহর মোগের-এ ১৮৮১ সালের ২৩ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া এই কবি আধুনিক স্প্যানিশ কবিতাকে এক নতুন সংবেদনশীলতা ও স্বচ্ছ ভাষার দিকে নিয়ে যান।

লায়লা ফারজানা লায়লা ফারজানা

Published : 13 Mar 2026, 06:28 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:09 PM

ভূমিকা

হুয়ান রামন হিমেনেস বিশ্বাস করতেন—কবিতা আত্মার সবচেয়ে স্বচ্ছ আলো, যেখানে শব্দের চেয়ে নীরবতার সংগীত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্পেনের আন্দালুসিয়ার ছোট শহর মোগের-এ ১৮৮১ সালের ২৩ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া এই কবি আধুনিক স্প্যানিশ কবিতাকে এক নতুন সংবেদনশীলতা ও স্বচ্ছ ভাষার দিকে নিয়ে যান।

তাঁর কাব্যদর্শনের কেন্দ্রে ছিল “poesía pura” বা নির্মল কবিতার ধারণা—এক ধরনের কবিতা যা অলংকারের চেয়ে অনুভূতির স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দেয়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Platero y yo একটি গদ্যকবিতার বই, যেখানে একটি ছোট গাধা প্লাতেরোকে কেন্দ্র করে স্মৃতি, প্রকৃতি ও মানবিকতার কোমল কাব্যিক জগৎ নির্মিত হয়েছে।

১৯৫৬ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। জীবনের শেষ পর্ব তিনি কাটিয়েছেন পুয়ের্তো রিকোতে; সেখানেই ১৯৫৮ সালের ২৯ মে তাঁর মৃত্যু হয়।

হিমেনেসের কবিতা আজও মনে করিয়ে দেয়—সত্যিকারের কবিতা কখনও উচ্চকণ্ঠ নয়; তা নীরবে জ্বলে ওঠা এক স্বচ্ছ আলো।

আমি নই আমি

আমি আমি নই।

আমি সেই জন—

যে আমার পাশে হাঁটে, অথচ আমি তাকে দেখি না।

কখনো কখনো তার কাছে পৌঁছাই,

কখনো আবার সম্পূর্ণ ভুলে যাই।

আমি কথা বললে

সে নীরব থাকে।

আমি ঘৃণা করলে

সে মৃদু হেসে ক্ষমা করে।

আমি যেখানে নেই

সে সেখান দিয়ে হেঁটে যায়।

আর আমি যখন মরে যাব—

সে তখনও দাঁড়িয়ে থাকবে।

সাগরেরা

আমার মনে হচ্ছে আমার নৌকাটি

ঐ গভীরে কোথাও ধাক্কা খেয়েছে—

কোনো বিশাল কিছুর সঙ্গে।

কিছুই ঘটেনি!

কিছুই না…

নীরবতা…

ঢেউ…

কিছুই কি ঘটেনি?

নাকি এর মধ্যেই ঘটে গেছে সব —

আর আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি নীরবে

কোনো এক নতুন জীবনে?

রাত্রির প্রতীক্ষায় পথ

রাতের অপেক্ষায় পথ—

সবই এখন ইতিহাস আর নীরবতা।

পথের ধারের গাছগুলো

আকাশের পাশে ঘুমিয়ে।

আর সেই আকাশ বিষণ্ন বেগুনি—

এপ্রিলের সুন্দর আকাশ,

তারাদের মৃদু আলোর ইঙ্গিতে  রাঙা

বেগুনি আকাশ।

জানালার শিকের ওপারে বাতিগুলো জ্বলছে।

বন্ধ দরজার সামনে একটি ক্রন্দনরত কুকুর।

মসৃণ আকাশে পাক খাওয়া 

কালো বিড়াল …

আহা! সেই হলুদ বাতি—অন্ধ শিশুদের শান্তি,

বিধবাদের স্মৃতিকাতরতা,

মৃতদের উপস্থিতি!

এপ্রিলের সেই সন্ধ্যাগুলোতে— 

তারাদের মুখোমুখি আমাদের বলা 

সেইসব না ফেরা গল্প!

দূরের ঐ ছোট গ্রামগুলোর

মৃদু গুঞ্জনের ভেতর দিয়ে 

অন্ধকার নেমে আসছে এখন—

বিস্তৃত, মধুর, শান্তির অন্ধকার—

কবিতা

আমি যেন এক অস্থির শিশু,

যাকে পৃথিবীর উৎসবের ভেতর থেকে 

হাত ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—

আমার দৃষ্টি 

বিষণ্নভাবে আটকে যাচ্ছে

বিভিন্ন জিনিসগুলোর দিকে…

আর কী গভীর দুঃখে আক্রান্ত হচ্ছি আমি—

যখন তারা আমাকে ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে 

তাদের থেকে!

কে জানে কী ঘটছে

প্রতিটি ঘণ্টায় ওপারে কি ঘটছে—

কে জানে?

কতবার ঐ পাহাড়ের আড়ালে

হয়েছে সূর্যোদয়!

কতবার দূরে জমে ওঠা উজ্জ্বল মেঘেরা ছিল

বজ্রের সোনালি দেহ!

আর গোলাপটি ছিল বিষ।

তলোয়ারটি দিয়েছিল জীবন।

আমি ভেবেছি ফুলে ভরা তৃণভূমি—

অথচ পথের শেষে, নিজেকে খুঁজে পেয়েছি

কর্দমাক্ত জলাভূমিতে।

আমি ভেবেছি মনুষ্যত্ব মহান—

অথচ নিজেকে আবিষ্কার করেছি

ঐশ্বরিকতায়।

সমুদ্র গোলাপ

চাঁদের শুভ্রতা সমুদ্রকে সমুদ্র থেকে নিয়ে

আবার সমুদ্রেই ফিরিয়ে দেয়—

অদ্ভুত সৌন্দর্যে।

নির্মল, শান্ত শক্তিতে

জয় করে নিয়ে চাঁদ

সত্যকেই বাধ্য করে

নিজেকে প্রতারণা করতে—

যেন সে-ই সম্পূর্ণ সত্য,

চিরন্তন, একাকী—

যদিও তা নয়।

হ্যাঁ।

ঐশ্বরিক সরলতা—তুমি বিদ্ধ করো

পরিচিত নিশ্চয়তাকে,

তুমি বাস্তবে প্রবিষ্ট করাও

নতুন এক আত্মা।

অপ্রত্যাশিত গোলাপ!

তুমি গোলাপকে গোলাপের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে—

গোলাপের কাছেই ফেরত দিতে পারতে।

গোলাপঝোপ

এ যেন মাটির সমুদ্র।

শীতের রোদে দক্ষিণের রঙেরা—

সমুদ্র আর উপকূলের

কলরবময় সঞ্চালন।

আগামীকাল—সমুদ্রে!

—বরং বলি, মাটির সেই সমুদ্র,

এখন সমুদ্রের দিকেই ধাবিত।

কাদিস নগরের প্রাচীরে

সমুদ্র বিশাল—

সবকিছুই যেমন,

তবু মনে হয় আমি এখনো তোমার সঙ্গে আছি…

খুব শীঘ্রই শুধু এই জলই 

আমাদের বিচ্ছিন্ন করবে—

জল, 

অস্থিরভাবে বদলে যাওয়া,

জল,

শুধু জল।

মোগের

মোগের। মা আর ভাইয়েরা।

ঘর—পরিষ্কার, উষ্ণ।

কী আলো, কী শান্তি

সেই সাদা কবরস্থানে!

এক মুহূর্তেই ভালোবাসা দূরে চলে যায়।

সমুদ্রের অস্তিত্ব থাকে না;

লালচে সমতল আঙুরক্ষেত

এখন পৃথিবী—

যেন শূন্যতায় কোনো উজ্জ্বল আলো,

এবং নড়বড়ে—

শূন্যে ভাসমান আলোর মতোই।

এখানে প্রতারিত হয়েছি বারবার!

এখানে মৃত্যুই একমাত্র সুস্থতা।

সেই আমার মুক্তির পথ—যাকে আমি এত করে চেয়েছি,

যে সূর্যাস্তের দিকে পালিয়ে যায়।

মোগের—যদি আমি পবিত্র হয়ে উঠে দাঁড়াতে পারতাম!

মোগের। ভাইয়েরা আমার।