Published : 29 Apr 2026, 03:07 PM
জেরার ল গ্যুইক ফরাসি ভাষার এই সময়ের অগ্রণী কবি। জন্ম ১৯৩৬ সালের ১১ জুন পারীতে। তাঁর পরিবারটি ব্রতাইনের রেদনের বাসিন্দা ছিল। বাবা চাকুরি করতেন La Régie Autonome des Transports Parisiens, RATP তে। ফলে ল গ্যুইকের শৈশব কেটেছে পারী ও রেদনেতে। পারীর কলেজ লাভোয়াজিয়েতে পড়াশোনার সময় ফরাসির শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন কবি মরিস ফমব্যরকে। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ সাল অবধি ব্যবসায়িক কাজে আফ্রিকা মহাদেশের নানা দেশে বসবাস করেছেন। প্রথম কবিতার বই Que la mer vienne (সমুদ্র আসুক) প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে। কাজ করেছেন সাহিত্যের নানা শাখায়। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৬০টি। তাঁর Poème De L'île Et Du Sel (দ্বীপ ও লবনের কবিতা) বইটি এই সময়ের ফরাসি কবিতায় এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। প্রায় পনেরোটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে ল গ্যুইকের কবিতা। কবিতার জন্য পেয়েছেন Prix Alfred-De-Musset (১৯৭৭), Prix Antonin-Artaud (১৯৮০), Grand Prix International du Mont-Saint-Michel (১৯৮৬) সহ বহু সম্মাননা। ১৯৬৯ সাল থেকে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন ব্রতাইনে।
জেরার ল গ্যুইক-এর এই সাক্ষাতকারটি কবি ও অনুবাদক আহমেদ সজীব গ্রহণ করেছেন ২০২৫ সালের জুনে ফরাসি ভাষায়। বিডি আর্টস-এর পাঠকদের এটি অনুবাদক কর্তৃক বাংলায় রূপান্তরিত হলো। বি. স.
আহমেদ সজীব: ল গ্যুইক, এই সময়ের ফরাসি কবিতায় আপনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন কবি। আপনার প্রথম কবিতার সংকলন 'সমুদ্র আসুক’ প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৫৮ সালে। তাহলে আমরা বলতে পারি, আপনি কবিতা লিখছেন প্রায় ৬৭ বছর ধরে। প্রথমেই আমি জানতে চাইব: কবিতা বিষয়টি কী আপনার কাছে?
জেরার ল গ্যুইক: যখন বিশ বছর বয়সে প্রথম কবিতা লিখি তখন আমি বুঝতে পারিনি, কবিতা আমাকে সারাজীবন সঙ্গ দিয়েছে। কবিদের মতো কবিতারও অনেক সংজ্ঞা আছে। তবুও বলবো, কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। আমার কাছে কবিতা কী তোমাকে বলছি: কবিতা হল এমন কিছু যা অন্য কোনোভাবে বলার সাহস করা যায় না।
আহমেদ সজীব: আপনার জন্ম পারীতে এবং শৈশবে আপনি কয়েক বছর সেখানে কাটিয়েছেন। কিন্তু আপনার কবিতায় আমরা পারী সম্পর্কে তেমন কিছুই শুনি না। শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে, আমার মনে হয় পারী কবি ল গ্যুইকের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলেনি।
জেরার ল গ্যুইক: হ্যাঁ, আমি পারীতে জন্মগ্রহণ করেছি এবং আমার পুরো শৈশব সেখানেই কাটিয়েছি, যতদিন না আমি বিশ বছর বয়সে সামরিক চাকরিতে চলে যাই, গ্রীষ্মের ছুটিগুলোতে ব্রতাইনে ঘুরে বেড়িয়েছি। পারী শিশুবান্ধব শহর নয়। আমি সেখানে অসুখী ছিলাম না, তবে আমি সুখীও ছিলাম না। আমি চলাফেরার স্বাধীনতা, প্রকৃতির উপস্থিতি- এইসব কিছুর অভাব অনুভব করেছি।
আহমেদ সজীব: আপনার বাবা পারীর La Régie autonome des transports parisiens, RATP-তে চাকুরি করতেন। এখনকার সময়ের মতো, তখনও RATP তে চাকুরি করা খুব মর্যাদাপূর্ণ ব্যাপার ছিলো। বাবাকে নিয়ে আপনার বিশেষ কোনো স্মৃতি আছে?
জেরার ল গ্যুইক: আমার বাবা পেশায় একজন গম মিলের মালিক ছিলেন, যেমন তাঁর বাবা এবং দাদা, ইত্যাদি। ল গ্যুইকরা ১৭ শতক থেকে পিতা-পুত্র মিলিতিভাবে বিনা বাধায় গম মিলের মালিক হিসেবে কাজ করে আসছে। আমার বাবা ভার্সাইতে সামরিক চাকরি করতেন, তারপর পারীতে চলে আসেন, যেখানে তিনি RATP-তে (তখনকার দিনে La Société des transports en commun de la région parisienne, TCRP নামে পরিচিত ছিলো) বাস চালক হিসেবে কাজ করেন। আমার বাবা এমন একজন মানুষ ছিলেন যার সামাজিক কিংবা পেশাদার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিলো না। আমি অবশ্যই তাঁর কাছ থেকে এটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি।
আহমেদ সজীব: ১৯৪০ সালে, জার্মানরা রেদনে’তে পৌঁছায়। সেই সময়ের বালক জেরার লে গুইক সম্পর্কে জানতে চাই। আর রেদনে’র উপর জার্মানদের আগমনের কী প্রভাব পড়েছিল?
জেরার ল গ্যুইক: জার্মান আগ্রাসনের মুখোমুখি হয়ে, আমার মা ব্রতাইনে তার পরিবারের কাছে ফিরে আসেন। আমার বয়স তখন চার বছর, তাই সেই সময়ের কথা খুব ভালভাবে মনে করতে পারছি না। যখন প্রথম জার্মান সৈন্যরা রেদনে’তে পৌঁছায়, তখন সবাই লুকিয়ে পড়ে কারণ তারা খুব ভয় পেয়েছিল। বলা হতো যে সৈন্যরা পুরুষদের হত্যা করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, শিশুদের অপহরণ করছে... আগ্রাসনের মুখোমুখি হলে সর্বত্র একই প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
আহমেদ সজীব: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিশেষ কিছু আপনার মনে পড়ে?
জেরার ল গ্যুইক: যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে, আমি আর আমার মা পারীতে ফিরে আসি। আমার বাবা, যিনি ফরাসি সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক ছিলেন, কয়েক মাস পর আমাদের সাথে যোগ দেন। পারীর বাসিন্দারা, বড় বড় শহরের সব বাসিন্দার মতো, ক্ষুধার যন্ত্রণায় ভুগছিল। আমরা ভাগ্যবান ছিলাম যে আমাদের ব্রতাইনের পরিবার, যারা কৃষক ছিল, আমাদের জন্য খাবারের পাঠিয়েছিল।
আহমেদ সজীব: আমার মনে হয় ১৯৫৭ সালে আপনার সাথে কবি মাক্স আলাউর বন্ধুত্ব হয়। মাক্স আলাউর কোনো প্রভাব পড়েছিলো আপনার কবিতার উপর?
জেরার ল গ্যুইক: আমরা যে সেনানিবাসে ছিলাম, সেই নজোঁ-ল-রথ্র্যো'র ব্যারাকে ম্যাক্স আলাউর সাথে আমার দেখা হয়েছিল। আমাদের বিছানাগুলো বিশাল ডরমিটরিতে পাশাপাশি ছিল যেখানে আমাদের বয়সী আরো প্রায় ত্রিশ জন তরুণ থাকত। আমাদের মধ্যে দ্রুত বন্ধুত্ব এবং হৃদ্যতা গড়ে ওঠে, যদিও আমরা শারীরিক, সামাজিক এবং বৌদ্ধিকগতভাবে- প্রতিটি দিক থেকে আলাদা ছিলাম। তিনি কখনো আমার লেখালেখিতে কোনো প্রভাব ফেলেননি। আমি তাকে মহান লেখকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম যারা আমার বন্ধু ছিলেন: লুই গিয়্যুম, জর্জ পেরোস, অঁরি তমা এবং শার্ল ল কানথ্রেক।
আহমেদ সজীব: ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ সাল অবধি, আপনি আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন, কিন্তু আপনার কবিতায় আফ্রিকা সম্পর্কে খুব বেশি কিছুই লিখেন নি। আপনি কি সচেতনভাবে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছেন?
জেরার ল গ্যুইক: আমি দশ বছর ধরে ইকোয়াটোরিয়াল আফ্রিকায় বাণিজ্যিক কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছি। এই সময়ে বিভিন্ন ফরাসি ম্যাগাজিনে কবিতা লিখেছি এবং আমি নিজেও সংকলন প্রকাশ করেছি। এই সময়কালের একটি লেখাও সংগ্রহে না রাখার জন্য আমার দুঃখ হয়। এমনকি আমি এই সম্পর্কে ভাবিওনি। এটা আমার জন্য এক বিরাট ক্ষতি। আমি যখন কঙ্গোর পোয়াঁত-নোয়ারে পৌঁছাই, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর।

কবি জেরার ল গ্যুইক-এর সাথে অনুবাদক ও সাক্ষাতকার গ্রহিতা আহমেদ সজীব
আহমেদ সজীব: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফরাসি কবিতায় আমরা এক বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করি। সেই সময়ের অনেক কবি তাদের কবিতাকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে জীবনের জয়গান হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। জীবনের পথে এক নতুন স্বপ্নের মতো।
জেরার ল গ্যুইক: আমি তাত্ত্বিক নই, কিংবা একজন অগ্রগামী কবিও নই। আমি সবসময়ই সাধারণ মানুষের সাথে যুক্ত ছিলাম, যদিও আজ আমার প্রকৃত সামাজিক পরিবেশ লেখক, কবি এবং চিত্রশিল্পীদের মাঝে আবদ্ধ। আমি সঙ্গীতজ্ঞও নই; তারা এক ভিন্ন জগতের, যাদের আমি চিনি না।
আহমেদ সজীব: পূর্ববর্তী শতাব্দীর তুলনায় এই শতাব্দীতে ফরাসি কবিতা আমূল বদলে গেছে। তমা ভিন্যু, সিসিল ক্যুলোঁ, পাওলা পিগানির কবিতার সাথে অঁদ্রে ব্রতোঁ, লুই আরাগঁ, অথবা রনে শারের কবিতার কোনো উল্লেখযোগ্য সংযোগ আমরা দেখতে পাই না। হ্যাঁ, কবিতা সবসময়ই আলো-আঁধারির খেলা ; দশক থেকে দশকে পাল্টে যায় কবিতার চেহারা ও সংজ্ঞা। কিন্তু আমার মনে হয় আজকের ফরাসি কবিতা কেবল ব্যক্তিগত জীবনের দিকেই ঝুঁকে আছে...
জেরার ল গ্যুইক: তুমি ঠিক বলেছো। আমরা যে কবিতাকে "প্রতিদিনের কবিতা" বলি সেই কবিতাই লিখা হচ্ছে এখন। কোনো দ্বিধা ছাড়াই, সম্ভবত আমি নিজেও এই ধরনের কবিতার অনুশীলন করি।
বৌদ্ধিক ও দার্শনিক কবিতার মাঝে আমি খুব স্বস্তি বোধ করি না।
আহমেদ সজীব: আপনার সময়ের ব্রতাইনের গুরুত্বপূর্ণ কবি কারা? আমি জেভিয়ে গ্রাল, য়্যুজেন গিইঅভিক, পাওল কেইনেগ, ইভোঁ ল মেন এবং জর্জ পেরোসের কবিতা পড়েছি। আমার মনে হয় বিশ্ব কবিতার সাথে তুলনা করলে, য়্যুজেন গিইঅভিক বিশ্বব্যাপী কবিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন কণ্ঠস্বর...
জেরার ল গ্যুইক: অন্য সকলের উপরে, আমি য়্যুজেন গিইঅভিক এবং জর্জ পেরোসকে স্থান দেই। জর্জ পেরোস ব্রতাইনের ছিলেন না। তুমি যাদের কথা বলেছো, তাদের মধ্যে এই দুজন লেখককে আমি সত্যিই পছন্দ করি।
আহমেদ সজীব: গদ্যের বই 'আমার দোকানের জর্নাল' এ আপনি লিখেছেন- 'গিইঅভিক, আমাকে গাড়িতে করে র্যুই দ্যুবোয়ায় তার বাসা থেকে র্যুই পল ফখতে নিয়ে গিয়েছিলো, যেখানে অঁরি তমা থাকেন। মাত্র কয়েক পা দূরে। আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে গিইঅভিকই গাড়ি চালাবেন, তাই গাড়ি চালানোর সময় আমি কিছুটা অনিরাপদ বোধ করছিলাম। তখন নভেম্বর ছিল এবং আমরা কোট পরেছিলাম। ভক্সভাগেনের কক্সিনেল মডেলটি খুব একটা প্রশস্ত ছিল না, তাই একসাথে আমাদের খুব চাপাচাপি করতে হয়েছিলো, আমার মনে হয়েছিল যেন গিইঅভিক তাঁর পেট দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন।'
আপনার এবং গিইঅভিকের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন ছিল?
জেরার ল গ্যুইক: গিইঅভিক পারীতে থাকতেন, আমি ব্রতাইনে। সময়ে সময়ে আমাদের দেখা করার সুযোগ হতো। আমি তাঁর কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম; তিনি খুব ভালো গল্পকার ছিলেন। আমরা একই প্রজন্মের ছিলাম না, কিন্তু আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেটা কোনো বাধা ছিল না। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী হিসেবে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ছিল, কিন্তু আমার আরও অনেক বেশি শ্রদ্ধা ছিল কবি গিইঅভিকের প্রতি। আমার শ্রদ্ধা ভালোবাসায় পূর্ণ ছিল। যারা কবিতায় আমাদের মধ্যে আত্মীয়তা খুঁজে পেয়েছিলেন তাদের উত্তরে তিনি বলতেন, 'গিইঅভিক, ল গ্যুইক, একই ছন্দ, কিন্তু এখানেই শেষ'। আমার উপর অবশ্যই তাঁর প্রভাব ছিল, তবে মন্দ কোনোকিছুর চেয়ে ভালো কোনোকিছুর দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ভালো।
আহমেদ সজীব: ব্রতাইনের একজন অগ্রগণ্য শিল্পী রনে ক্যেরে। আপনি আপনার কবিতায় যেভাবে ব্রতাইনের জনজীবনের কথা ফুটিয়ে তুলেছেন, রনে ক্যেরেও ব্রতাইনকে একইভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন রঙের আঁচড়ে। আমি দেখেছি, তাঁর অধিকাংশ কাজের মূল বিষয়ই ব্রতাইন। আপনার কবিতার মতো, রনে ক্যেরের চিত্রকলাও আমাকে ব্রতাইন বিষয়ে আগ্রহী করে তুলেছে।
জেরার ল গ্যুইক: জর্জ পেরোসের মতো রনে ক্যেরেও দ্যুয়ারনেনেতে থাকতেন। আমরা মাঝেমধ্যে ক্যাম্পার বা দ্যুয়ারনেনেতে দেখা করতাম। তার চিত্রকর্ম আমার খুব পছন্দের ছিল। তার ব্যক্তিত্ব ছিলো কঠিন প্রকৃতির, খুবই রাজনৈতিক, যা আমি পছন্দ করি না। দ্যুয়ারনেনের স্থানীয় রাজনীতি নিয়ে তাঁকে সব সময় ব্যস্ত থাকতে দেখেছি।
আহমেদ সজীব: আচ্ছা, এবার আবারও আপনার বিষয়ে ফিরে আসি। কোনো বিশেষ ঘটনা কি আপনাকে কবি হতে অনুপ্রাণিত করেছে?
জেরার ল গ্যুইক: আমি বিশেষ কোনও ঘটনা খুঁজে পাচ্ছি না। পারীর কলেজ লাভোয়াজিয়েতে আমার প্রধান এবং ফরাসি ভাষার শিক্ষক ছিলেন কবি মরিস ফমব্যর, যিনি কবি হিসেবে সেই সময়ে খুবই পরিচিত ছিলেন। তিনি কখনও আমাদের সাথে কবিতা নিয়ে কথা বলতেন না, বিশেষ করে তাঁর নিজের কবিতা নিয়েও। তিনি আমাদের মাঝে পাঠ্যসূচির কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতেন।
আহমেদ সজীব: আপনার ছোটবেলার স্বপ্ন কী ছিল? কবি হওয়া নাকি অন্য কিছু? যেমন আমি সবসময় বৈমানিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম।
জেরার ল গ্যুইক: শৈশবে আমি কখনো কবি হওয়ার স্বপ্ন দেখিনি, বিশেষ করে কবি হওয়ার কথা মাথায়ই আসেনি। আমি সাইক্লিস্ট অথবা বক্সার হতে চাইতাম। আর কৈশোরে চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম।
আহমেদ সজীব: কবি লিওপোল্দ সেদার সেঁঘর সৌন্দর্যের কারণে আপনার কবিতার ভাষা পছন্দ করতেন। আমার কাছেও, আপনার কবিতার ভাষা আপনার দশকের অন্য যেকোনো কবির থেকে অনেক আলাদা। নিজস্ব অভিব্যক্তিকে সকলের অভিব্যক্তি করে তোলার এক অসাধারণ ক্ষমতা আপনার আছে। উদাহরণস্বরূপ, 'Les Seins Primevères' তে দেখতে পাই: আমি তোমাকে দিয়েছিলাম আমার দুহাত/ তখনো নীরব,
আর আমার হৃদয় / যা মুক্ত করতে পারত পুরো পৃথিবীকে।
জেরার ল গ্যুইক: আমার লেখা সম্পর্কে মন্তব্য করা আমার পক্ষে খুবই কঠিন, প্রায় অসম্ভব। আমি কিছুক্ষণ আগে যেমন উল্লেখ করেছি, আমি তাত্ত্বিক নই। শার্ল ল কানথ্রেক লিখেছেন যে আমি সঙ্গীত ছাড়াই একজন কবি। তবুও আমি এই সঙ্গীতটি আমার কানে এবং নিজের ভিতর শুনি এবং আমি তা প্রকাশ করার চেষ্টা করি।
আহমেদ সজীব: ১৯৮২ সালে, একই বছরে আপনার বাবা ও মা পরলোকে গমন করেন। মাকে নিয়ে আপনার 'মায়ের কাছে লেখা চিঠি'র মতো কবিতা আমি খুব বেশি পড়িনি। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত 'Les Bateaux En Bouteille' কবিতার বইয়ে এই কবিতাটি সংকলিত হয়েছে। আপনি কি এই কবিতাটি ১৯৮২ সালেই লিখেছিলেন?
জেরার ল গ্যুইক: তোমাকে উত্তর দিতে আবারও পড়ছি এই কবিতাটি, এটি লিখেছিলাম আমার মায়ের মৃত্যুর পরে, উনাকে আমি খুবই ভালোবাসতাম, যেমন পৃথিবীর সব শিশু তাদের মায়েদের ভালোবাসে। আমি এটা আমার স্ত্রী লুসির জন্যও লিখতে পারতাম, যিনি পনেরো বছর আগে মারা গেছেন। লুসি আমার কাছে অনেক কিছু ছিল, এবং এখনো আছে। এই কবিতাটি যখন আমি আবার পড়ি, তখন আমার মনে হয় আমার মায়ের চেয়েও বেশি লুসির কথা রয়েছে কবিতাটিতে। কবিতাটি দুই মহিলাকেই সম্বোধন করা যেতে পারে। এই লেখাটি আমাকে কাঁদিয়ে দেয়। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম লেখাটির কথা।
আহমেদ সজীব: 'দ্বীপ ও লবণের কবিতা' প্রায় ১৫টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক সুপারিশকৃত পাঠ্যতালিকায়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, এই সময়ের যেকোনো কবিতার বইয়ের জন্য যা খুবই বিরল।
জেরার ল গ্যুইক: এটা অপ্রত্যাশিত ছিল। এবং অযোগ্যও বটে। কিন্তু আমি এতে খুব গর্বিত হয়েছিলাম। আমি সবসময় 'উজ্জ্বল দিকগুলো' নিজের কাছেই রেখেছি। আমি বরাবরই এমন। লোটো বিজয়ীরা কখনোই বিজয়ের কথা প্রকাশ করে না। আমি কবিতার লোটোর সাথে একই আচরণ করি।
আহমেদ সজীব: 'দ্বীপ ও লবণের কবিতা'য় দ্বীপটি আমার কাছে সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত একটি পৃথিবী বলে মনে হয়। এখানে প্রতীকবাদ, পরাবাস্তবতা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সরাসরি বর্ণনা রয়েছে। আমি 'দ্বীপ ও লবণের কবিতা'কে ব্রতাইনের জীবন সম্পর্কে একটি অনন্য আধুনিক মহাকাব্য বলে মনে করি।
জেরার ল গ্যুইক: ওয়েসঁ দ্বীপে, যেখানে আমি কয়েকদিন ছিলাম, সেখানে আমি আমার নোটবুকে লিখেছিলাম: 'এখানে ঘরগুলো প্রেসবিটারির মতো'।সবগুলো পাথরের তৈরি, শক্ত এবং একই নকশার ছিল। এই ছোট্ট বাক্যটি পরবর্তীতে লেখা সব কবিতার সূচনা বিন্দু হয়ে উঠে। যখন আমি লেখা শুরু করতাম, ক্যাম্পারে যেখানে আমি থাকতাম, প্রতিবার যখনই আমি নিজেকে 'এখানে' শব্দটি বলতাম, তখনই আমার সামনে ছবিগুলো ভেসে উঠত। চিরতরে অদৃশ্য হওয়ার আগে আমাকে কেবল কাগজে সেগুলো সংগ্রহ করতে হত। আমি যেন এক জাদুর ছাপের নিচে ছিলাম। আমি রাতে ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে লিখতে শুরু করতাম।
আহমেদ সজীব: কবিতার মতো, আপনি প্রচুর গদ্যও লিখেছেন। আমরা কি এটিকে কবিতা থেকে এক ধরণের বিরতি হিসেবে উল্লেখ করতে পারি?
জেরার ল গ্যুইক: আমার গদ্যগ্রন্থগুলি আমার কবিতার সাথে মিশে আছে, কিন্তু সমস্ত কবিতা থেকে 'ধুয়ে ফেলা'। আমি কাব্যিক গদ্যকে ঘৃণা করি। সেটা না হয় কবিতা, না হয় গদ্য।