নাজমিন মর্তুজার ‘অদৃশ্য রাজদণ্ড’
শহরের সমস্ত বৃক্ষ আজ
পাতার বদলে সংবাদপত্র ফলায়,
আর বাতাস
কোনো অদৃশ্য রাজদণ্ডের ছায়ায়
নীরবে তার গোপন শোক বয়ে যায়।
আমি দেখি,
নদী তার জলের কাছে
কোনো কৈফিয়ত রাখে না,
তবু প্রতিটি ঢেউয়ের শরীরে
ডুবে থাকে একটি করে নির্বাসন।
কোনো কোনো ঘর
রাত্রির কাছে মাথা নত করে,
কোনো কোনো জানালা
চাঁদের মুখে কালো কাপড় বেঁধে দেয়।
আর আমি
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
মুখ থেকে একে একে খুলে ফেলি সমাজের দেওয়া যত নাম।
কপালের ভাঁজে
যে শুকনো নদী,
চোখের নিচে অনিদ্রার কৃষ্ণপক্ষ,
বুকের গোপন কুঠুরিতে
যে অগ্নিবীজ বহুকাল ধরে নিদ্রিত,
সেখানেও রাজনীতি জন্ম নিলো ধীরে।
আমি দেখেছি
ক্ষুধা কোনো পতাকার নিচে দাঁড়ায় না, রক্ত কোনো মুদ্রার মূল্য বোঝে না, মৃত শিশুর কপালে
কোনো রাষ্ট্রের সিলমোহর থাকে না।
তবু মানুষ মানুষের বুকের ওপর
অদৃশ্য সীমান্ত এঁকে যায়।
একদিকে সূর্য,
অন্যদিকে তার ছায়া।
একদিকে অন্নের থালা,
অন্যদিকে অনাহারের দীর্ঘ রাত্রি।
একদিকে উৎসবের আলো,
অন্যদিকে নামহীন অন্ধকারে
একজন মায়ের নিঃশব্দ বসে থাকা।
বহুবার সেই অন্ধকারের কাছে ফিরি
সেখানে কোনো মিছিলের আলো নেই, কোনো মঞ্চ নেই,
কোনো শ্লোগান নেই। কোন দাবী দাওয়া নেই।
শুধু একটি সময়ের প্রদীপ
নিজের ক্ষুদ্র শিখা দিয়ে
রাত্রির মুখ পরীক্ষা করছে।
আমি প্রদীপের কাছে বসে ভাবি,
মানুষের ইতিহাস কি তবে
এমনই একটি প্রদীপ?
যতবার অন্ধকার তাকে নিভিয়ে দিতে চায়
ততবার সে নিজের ভেতর থেকে
আরও সামান্য আগুন তুলে মাথা উঁচু করে
দাঁড়ায়?
আজকাল আর
পতাকার দিকে তাকাই না,
রাজদণ্ডের দিকে তাকাই না।
সামাজিক মানদন্ডের দিকেও না
কেবল মানুষকে দেখি
কার হাতে এখনও মাটি লেগে আছে, কার চোখে এখনও নদী বেঁচে আছে,
আর কার বুকে অন্যের কান্নার জন্য
একটুখানি অবকাশ আছে।
কারণ সভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন রাজনীতি
সম্ভবত কোনো সিংহাসনে বসে নেই।
সে লুকিয়ে আছে
একটি রুটির অর্ধেক ভাগে,
একটি নারীর না বলা প্রতিবাদে,
একজন পিতার নত হয়ে যাওয়া কাঁধে, একটি শিশুর ঘুমের ভেতর,
আর সেই মানুষের হৃদয়ে
যে এখনও অন্য মানুষের রক্তকে
নিজের রক্ত বলে চিনতে পারে।
সেখানেই আমার দেশ
সেখানেই আমার নির্বাসন
সেখানেই আমি নির্বাসিত।
আমার সমস্ত কবিতা
রক্তবীজ থেকে মানুষ হওয়ার অপেক্ষায়।
