Published : 17 Dec 2025, 07:24 AM
দুই হাজার চব্বিশের পাঁচই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ‘স্বৈরাচার’ অথবা ‘ফ্যাসিস্ট’ নামে ডাকা বাংলাদেশ সরকারের পতনের পর সামগ্রিক যে লক্ষ্য অর্জনের কথা কল্পনা করা গিয়েছিল তাতে প্রবলভাবে উচ্চারিত ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের কথা! শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধবাদী সমালোচনায় কেন্দ্র-অনুষঙ্গ ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ব্যবসা’! সুতরাং অভ্যুত্থানকারীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্ব এমন অবমানিত হবে তা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের ধরনে একেবারেই বোঝা যায়নি! এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের বিজয় দিবসের ভোরের কথা মনে করতে গিয়ে কিছু কথা স্মৃতিতে ভেসে এলো। সেদিন যুদ্ধজয়ী বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল ছোট্ট এক প্রান্তিক গ্রামে দাঁড়িয়ে কিশোর আমি যে অস্পষ্ট ও বিমূর্ত রূপ দেখেছিলাম তাতে নিহিত ছিল ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ এমন এক বাংলাদেশ যেখানে আমরা আনন্দের সঙ্গে বাস করব! কিশোর বয়সে স্বাধীন রাষ্ট্রকল্পনা আমার মনে এমনই বিমূর্ত এক রূপ ছিল যা বড়জোর মোটা দাগে গণতন্ত্র মানবিকতা আইনানুগত্য বা সামগ্রিক অর্থে ন্যায্যতাকে মূর্ত করতে পারে। সেদিন থেকে পঞ্চান্ন বছর পরে আমাদের সেই বিমূর্ত কল্পনার দিকে কতটা আমরা এগিয়েছি এই প্রশ্ন মনে জাগে।
১৯৭১ সালের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধকে বার বার ফিরে দেখেছি। সেই বিমূর্তকে ফিরে দেখার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের যে মাত্রাগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল তা থেকে দশটিকে বেছে নিতে হলে হয়তো নিম্নরূপভাবে শিরোনামাঙ্কিত করা যাবে।
১. ‘জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ’ কী অর্থে?, ২. ‘জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের যুদ্ধ’, ৩. ‘রাজনৈতিক গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম’, ৪. ‘পলিটিক্যাল ডেমোসাইড ও গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ’, ৫. ‘ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই’, ৬. ‘সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের যুদ্ধ’, ৭. আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপট, ৮. ‘মানবাধিকার ও নৈতিক যুদ্ধ’, ৯. ‘জনগণভিত্তিক সশস্ত্র প্রতিরোধ ও গেরিলা যুদ্ধ’, ১০. ‘নতুন রাষ্ট্র কল্পনার যুদ্ধ’।

১. ‘জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ’ কী অর্থে?
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো থেকে বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। বৃটিশ শাসক গোষ্ঠী যে অর্থে ভারতবর্ষকে উপনিবেশ বানিয়েছিল তার সঙ্গে বাংলাদেশের দিক থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উপনিবেশ হয়ে পড়ার ধরন একটু ভিন্ন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ উপনিবেশবিরোধী হলেও এটিকে বলা যায় অন্তউপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে মরণপণ জাতীয় যুদ্ধ।
২. ‘জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের যুদ্ধ’
একই রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও পশ্চিম অংশ অর্থাৎ পশ্চিম-পাকিস্তান তার অপর অংশ পূর্ব-পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও জীবনযাপনের ওপর রাষ্ট্রীয় দমননীতি চালাচ্ছিল। এরই বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম চালিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এই যুদ্ধ। মোটা দাগে তাই বলা যায়, ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ও এর অনুকূল ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের চূড়ান্ত রূপ এই মুক্তিযুদ্ধ!
৩. ‘রাজনৈতিক গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম’
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বিজয়ীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার এক সর্বাত্মক সশস্ত্র প্রতিরোধ। তাই এটিকে ভোটের অধিকার রক্ষার ন্যায়যুদ্ধও বলা যায়!
৪. ‘পলিটিক্যাল ডেমোসাইড ও গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পরিকল্পিত গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী নিধন ও নারকীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতিমান পরিসংখ্যানবিদ আর. জে. রুমেলের ধারণায় এটি স্পষ্টতই ‘ডেমোসাইড’।
৫. ‘ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই’
পূর্ব-পাকিস্তানের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ, রাজস্ব বৈষম্য, শিল্পস্থাপনে অবহেলা, উন্নয়ন বৈষম্যের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল গভীর প্রতিক্রিয়া। তৎকালীন পশ্চিম-পাকিস্তান অর্থনৈতিক নিষ্কাশনের উপনিবেশ হিসেবে বিবেচনা করত পূর্ব-পাকিস্তানকে। মুক্তিযুদ্ধ তাই এর বিরুদ্ধেও সংগ্রাম!
৬. ‘সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের যুদ্ধ’
আইয়ুব-ইয়াহিয়া চক্রের সামরিক শাসনের রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর বিরুদ্ধে জনগণের সর্বস্তরের অংশগ্রহণ। তাই এটিকে শুধু সেনাবাহিনীর নয়, জনযুদ্ধ হিসাবেই বড় করে দেখতে হবে আমাদের। এমনকি এই যুদ্ধে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ মুক্তিযুদ্ধের বয়ানগুলোতে ক্ষীণ অবস্থায় থাকাকেও অতিক্রম করতে হবে!
৭. ‘আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপট’’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল বাঙালিদের যুদ্ধ বললে সীমিতকরণ হবে। আসলে এই যুদ্ধকে বিশ্বব্যাপী ঘটে চলা নানা যুদ্ধ যথা–শীতল যুদ্ধ, ভারত-সোভিয়েত সমর্থন, যুক্তরাষ্ট্র-চীন-পাকিস্তান অক্ষ—এই বৈশ্বিক শক্তিসংঘাতের ভেতরে সংঘটিত এক যুদ্ধ হিসাবেও দেখা যায়। তাই মুক্তিযুদ্ধকে কেবল ‘দেশীয় ঘটনা’ হিসাবে দেখা ত্রুটিপূর্ণ হবে বা অসম্পূর্ণ থাকবে!
৮. ‘মানবাধিকার ও নৈতিক যুদ্ধ’
নারী নির্যাতন, গণহত্যা, উদ্বাস্তু সংকটের (প্রায় এক কোটি শরণার্থী) বিরুদ্ধে নৈতিক ও মানবিক অবস্থানের দিক থেকেও মুক্তিযুদ্ধকে গভীরভাবে বিবেচনা করে দেখতে হবে আমাদের। ফলে এই যুদ্ধকে একই সঙ্গে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেওয়ারও যুদ্ধ বলা যেতে পারে।
৯. ‘জনগণভিত্তিক সশস্ত্র প্রতিরোধ ও গেরিলা যুদ্ধ’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র কিংবা সাধারণ গ্রামবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা মুক্তিবাহিনী ও গেরিলা কৌশল। বিশ্বজুড়ে অন্য রাষ্ট্রে আশ্রিত হয়ে প্রায় রাষ্ট্রবিহীন অবস্থায় থেকে যুদ্ধ পরিচালনার বিরল উদাহরণ বাংলাদেশের এই মুক্তিযুদ্ধ।
১০. ‘নতুন রাষ্ট্র কল্পনার যুদ্ধ’
পঁচিশ বছরের ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি রাষ্ট্রচিন্তার বিপরীতে ভাষা-সংস্কৃতি-ভূখণ্ডভিত্তিক রাষ্ট্র ধারণার প্রতিষ্ঠার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই যুদ্ধ! সেদিক থেকে দেখলে সর্বোপরি এটি রাষ্ট্রতত্ত্বের পুনর্গঠনেরই যুদ্ধ!
‘শেষকথা’
দুই হাজার চব্বিশ ও পঁচিশের বিজয় দিবস উদযাপনের লগ্নে অন্তর্বর্তী সরকার এবং দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ অথবা বলা যায় নেতৃত্বের অংশ ‘চেতনা ব্যবসা’র বিরুদ্ধতা কিংবা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ রাজনীতির পক্ষে রাজনীতির দোহাই দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বকে যেভাবে ক্রমশ ছোট করছে তাতে মনে হয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দর্শন তথা উদ্ভবকালে যে মূর্ত ও বিমূর্ত লক্ষ্যগুলো ছিল সেগুলো কিছুকাল পরে আর অনুভব করা যাবে না! বাংলাদেশের জনগণ একদিন যুদ্ধ করে যে রাষ্ট্র অর্জন করেছিল সেই রাষ্ট্রেই তারা বিজাতীয় হয়ে পড়বে; আর যে বিজাতীয় ভাবধারার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে তাদের এই অর্জন তা হবে নির্বাসিত!