Published : 27 Jul 2024, 11:35 PM
আধুনিক মানুষ সংশয়ী, সংশয়তাড়িত তার মনের পরিধি। ফলে নিজের বৃত্ত থেকে সে বেরিয়ে আসতে পারে না। কখনো কখনো মনে হয় তাকে মুখোশ-মানুষ। বিপুল বিদ্যাবুদ্ধি অর্জনের পরও মনে হয় তিনি ফাপা মানুষ, আধুনিকমনস্ক হয়েও পশ্চাৎপদ। কিন্তু এমনও কেউ কেউ আছেন স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। অহেতু নিজের মেধা, মনীষা ও বিদ্যাবুদ্ধি ঢেলে দেননি অপাত্রে, কখনো যাননি আদর্শ ও বিশ্বাসের বাইরে। বরং সাধকের মতো নিজের নিভৃতে একান্তভাবে উপভোগ করছেন সৃষ্টিশীলতা। ড. সেলিম সারোয়ার তেমনি একজন অনুকরণীয় সৃষ্টিশীল মানুষ। সময় যখন আত্মবিকারে বেসামাল তিনি তখন নিজের অতুল অবদানকে পর্যন্ত প্রকাশে বিব্রত। এই বিব্রত বোধের কারণ কি একান্তভাবেই ব্যক্তিগত, না অন্যকিছু? সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বলতে চাই, সেলিম সারোয়ারসহ ষাটের দশকের এমন তিনজন কবির ব্যাপারে আমি জানি, তারা খ্যাতির মধ্যগগন থেকে হঠাৎ দূরে চলে গিয়েছিলেন নয়তো আড়ালে। যেন বোর্হেসের এই কথা মনে রেখেই তাঁদের স্বেচ্ছাপলায়ন: ‘এই হচ্ছে ভালোবাসা হয় আমাকে পালাতে হবে নয়তো লুকাতে’। আরও একটা কারণে তাঁদের মধ্যে মিল খুঁজে পাই। সৃজন অতুল হোক সম্ভার সামান্যই। সেলিম সারোয়ারের প্রকাশিত গ্রন্থ তিনটি এবং পশ্চিমা সাহিত্যতত্ত্বের ওপর মূল্যবান কিছু প্রবন্ধ, যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। তিনটি গ্রন্থের মধ্যে একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘বেজে ওঠো, মাতাল মল্লার’ (২০০৭ সালে প্যাপিরাস থেকে প্রকাশিত)। অপর দু’টি গ্রন্থ বাংলা একাডেমি থেকে তাঁর বহুল প্রশংসিত অসামান্য অনুবাদ গ্রন্থ ‘উইলিয়াম শেক্সপীয়রের সনেট সমগ্র’ ও ‘শেক্সপীয়রের নির্বাচিত সনেটগুচ্ছ’। সেলিম সারোয়ার নিজেই দাবি করেন এ অনুবাদ গ্রন্থ তাঁর সেরা সাহিত্যকীর্তি। তাঁর সমসাময়িক অপর দুই কবি হচ্ছেন কাশীনাথ রায় ও নূরুল হক। তিনজনের মধ্যে নূরুল হক বয়সে বড়। নূরুল হক সব্যসাচী লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দের আলোচিত টানা গদ্যে লেখা কবিতাগ্রন্থ ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ নিয়ে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সাহিত্য ছোটকাগজ ‘সমকাল’-এ একটি ছোট আলোচনা লিখেই চমকে দিয়েছিলেন সাহিত্যবোদ্ধাদের। ৭০ দশকের আলোচিত সাহিত্য ছোট কাগজ ‘নাগরিক’-এ সম্পাদক, কবি ও রবীন্দ্র-গবেষক ডা. আহমদ রফিক তাঁর সম্পাদকীয়তে আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, শামীম আজাদসহ যে পাঁচ জন কবিকে নতুন ধারার কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন নূরুল হক তাঁদেরই একজন। অথচ হঠাৎ দৃশ্যপট থেকে আড়ালে চলে যান এবং ২০০৭ সালে ‘নিরন্তর’ থেকে প্রকাশিত ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’ কাব্যগ্রন্থ দিয়ে আবার ফিরে আসেন কবিতার কাফেলায়। অস্তিত্ববাদ ও প্রচন্ড দেশপ্রেম তাঁর কবিতার মূল সূরচেতনা। সমকালীন এমন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে তিনি কলম ধরেননি। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি নতুন ধারার কবি হিসাবে গণ্য। তাঁর ভিতর ছিলো গানের মর্মখোলা এক বাউলের বাস। তাঁর আর্তিঝরা ছোট ছোট কবিতাগুলো বাশোর হাইকুর মতো সহজ এবং ভাববহুল। ফলে প্রবলভাবে রাজনৈতিক সচেতন কবি নূরুল হক আমাদের কাছে ‘আধুনিক মরমী কবি’ বলে চিহ্নিত। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক (২০০৫ সালে সরকারি ইডেন কলেজের বাংলা বিভাগীয় প্রধান হিসেবে অবসর নেন) নূরুল হকের গ্রন্থ সংখ্যা এই তিনজনের মধ্যে একটু বেশি- আট থেকে নটি। কাশীনাথ রায় তাঁর ‘আশ্চর্য বলেই’ কবিতা দিয়েই নজরে চলে আসেন চল্লিশের দশকের কবি অগ্রজ আবদুল গনি হাজারীর। তিনি তাঁর মধ্যে দেখতে পান সম্ভাবনার জ্যোতি। সানন্দে বরণ করতে গিয়ে তাই বলেই ফেলেন ‘আমাদের সর্ব কনিষ্ঠ কবি’। ষাটের শেষ ভাগে সাহিত্য গগনে কাশীনাথ রায়ের উদয় ছিল এমনই দীপ্তিময়। কাব্যচেতনা ও শৈলীতে ঐতিহ্যলগ্ন হয়েও তিনি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে দ্যুতিমান। স্বাগত জানান তাঁকে কণ্ঠস্বর কান্ডারি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। দেখতে পান তাঁর মধ্যে নতুন এক কাব্যবোধের উদ্ভাসন। দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর অস্থির সামাজিক বাস্তবতার আলোকে তাঁর কবিতাও হয়ে ওঠে বিপন্ন কালের জবানি। সে-ছবি আরও মূর্ত, আরও ধ্রুপদী রূপ নেয় তাঁর সমিল ছন্দে লেখা ‘ডিভাইন কমেডি’ নামের একমাত্র কাব্যনাটকে। এ নাটকে তিনটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে যে বোধ তিনি আমাদের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন তা তাঁর সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দর্শনে দীপিত। তবে শুধু কবিতায় কেন? দেশকালমনস্ক গল্প এবং মননশীল প্রবন্ধেও তিনি অসাধারণ। কিন্তু তাঁর প্রতিভাস্পর্শে আমাদের আলোকিত করতে করতেই এক পর্যায়ে চলে যান দৃষ্টির কিছুটা আড়ালে। আমরাও সাময়িকভাবে বঞ্চিত হই তাঁর অমূল্য সৃজন থেকে। তাঁর মাত্র দুটি কবিতাগ্রন্থ ‘জীবনানন্দ দেখুন’ (ভাষা চিত্র) ও ‘আমি যাহা দিতে পারি’ (খেয়া)। কাশীনাথ রায় ও সেলিম সারোয়ার দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে বিশ্বমানের গুণী অধ্যাপক। নিজ ছাত্র কায়সার হক ইংরেজিতে কবিতা লিখে ও অনুবাদ সূত্রে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন, ফখরুল আলম কালজয়ী ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাস ও ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ অনুবাদ করে আলোচিত ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত এবং একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত তাঁর আরেক ছাত্র সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ভিন্ন ধারার কথাসাহিত্যিক হিসেবে দেশে সুপ্রতিষ্ঠিত। তাতে তাঁর গর্বে মন ভরে যাওয়ারই কথা। সেখানে নিজের ব্যাপারে তাঁর কেন এই নিস্পৃহতা? তার একটি কারণ হতে পারে উদয়ের পথে ঝলক দেখিয়েই ক্যারিয়ারের কথা ভেবে স্বেচ্ছায় প্রবাসে চলে যাওয়া এবং দীর্ঘ ৩০ বছর অধিক কাল স্বেচ্ছা-নির্বাসনে থেকে মূলস্রোতে ফিরতে না পারার অনিশ্চয়তা অথবা একটি দুর্বোধ্য কালের ভেতর ঢুকে পড়া যেখানে বইছে গোত্র বিভক্তির হাওয়া, চলছে উচ্চকে তুচ্ছ, তুচ্ছকে উচ্চ করার প্রবণতা এবং অসন্তোষ প্রকাশের দুরন্ত সাহস নেই, চলছে চরম আপোষকামিতা। যেখানে রাজনৈতিক হীনমন্যতায় জাতীয় মননের প্রতীক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত দেউলিয়া সেখানে আত্মজিজ্ঞাসায় নিজের মধ্যে তাঁর এই প্রশ্ন উঠতেই পারে: লিখব, কিন্তু কার জন্য লিখব? কেন লিখব? অথচ তিনি ছিলেন আন্দোলন-সংগ্রাম মুখর এবং শিল্প-সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সময় ষাটের তুখোড় এক কবি। ছাত্রাবস্থা থেকে পূর্ণ যৌবন অবধি সময়কালের মধ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ, প্রেম ও নস্টালজিয়া সবকিছুই ছুঁয়ে আছে তাঁর কবিতা। আছে তাঁর মধ্যে একটা বিষয় নির্ণয়, আছে একটা সমীকরণ এবং অক্ষর, মাত্রা ও স্বর- তিনটি ছন্দের চালই আছে তাঁর কবিতাগুলোয় অর্থাৎ তিনি যে একজন উজ্জ্বল পরিণত কবি। তা নিয়ে দ্বিরুক্তির অবকাশ নেই। অস্তিত্বের অনুরণন, বাকভঙ্গি ও বিষয়-বিন্যাস এবং দ্যোতনায় তাঁর কবিতার মধ্যে উৎসুক পাঠক হয়তো শামসুর রাহমানের নিঃশ্বাস খুঁজে পাবেন কিংবা ভাবতে পারেন তাঁরই কবিতার প্রতিধ্বনি তথা ‘মাউথস্পীচ’ তা সত্ত্বেও তিনি জীবন জিজ্ঞাসা ও কাব্য বিশ্বাসে স্বমহিমায় বিকশিত। প্রেম, দ্রোহ, সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার ভেতর তাঁর কবিতা নতুন এক স্ফূরণ, নতুন এক দিকদর্শন এবং অবশ্যই গীতল ও সংরাগী।
কবিতা কি? কী তার মায়াবী জাল? কী তার অনুরণন, অন্তর্বেদন? আর সেখানে কবির ভূমিকাই বা কী? কবি সেলিম সারোয়ার তাঁর দীর্ঘ ‘মেনিফেস্টো’ কবিতায় তুলে ধরেছেন তারই অকপট ফিরিস্তি এবং সেই নির্মল ইশতেহারের উপসংহারে টেনেছেন চূড়ান্ত এক নির্ণয় রেখাও। তাঁর মতে, ‘কবিতা হচ্ছে এক অলোক-সামান্যা ভার্জিন/ প্রতিটি সঙ্গম শেষে কুমারীত্ব ফিরে আসে যার’। অর্থাৎ অফুরান তার জ্যোতির্ময়তা। প্রশ্ন হচ্ছে, তুমি তাকে কতোটা গ্রহণে সক্ষম? এটা অবশ্যই আত্মঘাতী প্রেম, নিষিদ্ধ ফলের মতোই তীব্র তার আকর্ষণ। কবি তার জন্যই চির বিদ্রোহী। স্বেচ্ছায় অন্তর্গত রক্তক্ষরণে অভ্যস্ত। নইলে ‘স্বগত সন্ধান’ কবিতায় কেন তিনি বলবেন,
তোমাকে ডাকবো ভেবে বুক ভরে টেনেছি বাতাস,
চকিতে গির্জার সেই বিশাল দরোজা
শয়তানের ঠোঁটের মতো খুলে গিয়ে
তোমাকে নিয়েছে শুষে প্রবল তৃষ্ণায়।
অনুরূপ বেদনার্ত আর্তি শুনি তাঁর ‘শুনেছি যা কিছু নীল’ কবিতার শেষ চার পংক্তিতেও:
শুধু তার অবজ্ঞার শীতল ছোবলে
যদি হয় বিষে নীল আমার জীবন,
আমার পৃথিবী জ্বলে নীল হলাহলে,
তার ঠোঁটে ভালোবাসা তোলে না কম্পন।
তাঁর ‘পরকীয়া’ শিরোনামের কবিতাটি আরও আবেদনময়, আরও অসাধারণ।
বেদেনী লো মন্তরে তোর নামা আমার বিষ
রক্তে বাজে তীব্র বাঁশি কালনাগিনীর শিষ,
বুকে দহন, তৃষ্ণা গলায় জ্বলছে অহর্নিশ।
... ... ... ... ...
বেদেনী তোর কৃষ্ণ ত্বকে উষ্ণ নোনা স্বাদ,
কালো দোজখ-লালস্বর্গের পরাবাস্তববাদ,
সান্দ্র, কুটিল ভাঁজে ভাঁজে গভীর মৃত্যু ফাঁদ।
প্রেমের কবিতায় সেলিম সারোয়ার যে অনন্য সাধারণ তার জ্বলন্ত নজির তাঁর ‘বিশাখা বসাক’ শিরোনামের কবিতাটি:
দিলে সায় বংশালের তন্বী শ্যামা বিশাখা বসাক,
সত্তর হাজার হুরী বেহেস্তে বিষণ্ণ ফিরে যাক।
আঁজলায় উচ্ছ্বলে যদি ও চুলের উষ্ণ অন্ধকার,
নির্দ্বিধায় ছেড়ে দেবো চন্দ্রালোক লক্ষ পূর্ণিমার।
যদি জোটে এই ঠোঁটে ও দাঁতের নিবিড় দংশন
বঞ্চিতেরা নিয়ে যাক সাম্রাজ্য, মুকুট, সিংহাসন।
করতলে এলে তার স্তনের যমজ পেলবতা,
ছুঁড়ে দেবো দু-গোলার্ধ, চন্দ্র-সূর্য, স্বর্গ-অমরতা।
যদি গলে সে কুমারী অন্তরঙ্গ এ ঠোঁটের স্তবে,
পৃথিবী পুষ্পিত হোক প্রলয়ের অগ্নি উৎসবে।
এই যে প্রেম ও তার তীব্রতা সেই হচ্ছে কবিতা যার কাছে তুচ্ছ স্বর্গ, হুরপরী, সাম্রাজ্য, সিংহাসন ও রাজমুকুট।
সেলিম সারোয়ারের কবিতা, তা যে কোনো বিষয় নিয়েই হোক না কেন বর্ণনার লীলাভাষ্যে আবেদন যেমন জাগায় তেমনি তার অন্তর্গত সরোবরে অবগাহনেও প্রলুব্ধ করে। তাঁর প্রতিটি কবিতার মধ্যেই রয়েছে সেই আকর্ষণ, সেই ব্যঞ্জনা, যেন কবিতা নয়, অন্নপূর্ণা।
তাঁর সাহিত্য-বৈভবের শেষ স্টেশন তাঁর অনুবাদ। অনুবাদে তাঁর স্বকীয়তা যে কারো জন্যেই ঈর্ষণীয়। কারণ, ইতোমধ্যে স্পষ্ট আমাদের অনুবাদ সাহিত্য কতটা দূর্বল, কতটা অগম্য ও অস্পষ্ট। এটা যে বিষয়ের গভীরে পৌঁছুতে না পারা এবং তার নির্যাস গ্রহণে অক্ষমতা তা নিয়ে যথারীতি লোকমুখে বলাবলি শুরু হয়েছে। ফলে কোন বিষয়ের ওপর ঝরঝরে অনুবাদ সহজ নয়। গুটি কতকের মত সেই অসাধ্য সাধন করেছেন কবি সেলিম সারোয়ার। ইংরেজি সাহিত্যে গভীর জ্ঞান ও অতলগামিতার কারণেই ‘উইলিয়াম শেক্সপীয়রের সনেট সমগ্র’ ও ‘শেক্সপীয়রের নির্বাচিত সনেটগুচ্ছ’-এর ঝরঝরে ও কাব্যিক অনুবাদ সম্ভব হয়েছে তাঁর পক্ষে। সম্ভব হয়েছে সাহিত্য পিপাসু বোদ্ধা ও বিদগ্ধ মহলের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন। শুধু কি তাই? সনেটের উৎস ও অনুবাদ নিয়ে তাঁর তুলনামূলক ব্যাখ্যাও বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। অনুবাদকের কাজ যখন রচনাকার ও পাঠকের মধ্যে একটা জানালা খুলে দেয়া সেখানে কখনও কখনও ফুটে উঠতে পারে অনুবাদকের নিজের প্রতিবিম্বও। সেই সতর্কতা রক্ষা করে প্রধান অন্তরায় বিষয়ের মূলানুগতা এবং ভাষাশৈলীর জটিলতা অতিক্রম করেই সেলিম সারোয়ারকে সম্পন্ন করতে হয়েছে এই অনুবাদকর্ম। যেহেতু শেক্সপীয়রের কাব্য ও নাটক দু’য়েরই ভাষা rhetoric এবং কথ্যরীতির সমন্বয়ে তৈরি স্থিতিস্থাপক মাধ্যম। তাঁর মধ্যে রয়েছে চৌকষ অলঙ্কার ও বাস্তব কথকতা। কী বিষয় কী ভাষা গভীরে গিয়ে জটিল গ্রন্থি উন্মোচন করেই সেলিম সারোয়ার সেরেছেন এই মহাযজ্ঞ। বিষয় সম্পর্কে চমৎকার ফুটনোট দিয়ে পাঠকের জন্যে আরও সহজবোধ্য করে দিয়েছেন। যদিও শেক্সপীয়রের এইসব সনেটগুচ্ছের মর্মকথা প্রেমের নগ্নবিহার, প্রবঞ্চনা এবং ব্যভিচারের মতো ঘটনাও বিধৃত। ‘শেক্সপীয়রের নির্বাচিত সনেটগুচ্ছ’ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ১৫২টি সনেট। তা থেকে প্রথম ৩টি সনেট (ইংরেজি-বাংলা পাশাপাশি) তুলে ধরা হলো।
০১
From fairest creatures we desire increase,
That thereby beauty's rose might never die,
But as the riper should by time decrease,
His tender heir might bear his memory:
But thou, contracted to thine own bright eyes,
Feed'st thy light's flame with self-substantial fuel,
Making a famine where abundance lies,
Thyself thy foe, to thy sweet self too cruel.
Thou that art now world's fresh ornament,
And only herald to the gaudy spring,
Within thine own bud buriest thy content,
And, tender churl, mak'st waste in niggarding:
Pity the world, or else this glutton be,
To eat the world's due, by the grave and thee.
চাই বংশবৃদ্ধি তার সৃষ্টিলোকে যা সুন্দরতম
যাতে চিরজীবী হয় লালিত্যের গোলাপ অম্নান,
সময়ের তাপে যদি ঝরে আদি রূপ অনুপম,
তরুণ সন্তান রবে স্মৃতির জীবন্ত অভিজ্ঞান:
মগ্ন তুমি মুগ্ধচোখে নিজেরি সৌন্দর্য নিরীক্ষণে,
নিজেকে জ্বালিয়ে করো ক্ষয় আত্মপ্রেমের শিখায়,
ঘটাও দুর্ভিক্ষ যেথা পূর্ণ ডালা অপর্যাপ্ত ধনে,
নিজেরি বিরুদ্ধে শত্রু সেজে করো নিষ্ঠুর অন্যায়।
তুমি, যে এখন এই বিশ্বের উজ্জ্বল অলঙ্কার,
রঙে রাঙা বসন্তের বার্তাবাহী একমাত্র দূত,
অস্ফুট কুঁড়িতে রাখো সমাহিত নিজ সারাৎসার,
দয়ার্দ্র নির্দয়, হও অপচয়ী কার্পণ্যে অদ্ভুত।
দাও প্রেম ধরণীকে, কিংবা গেলো পাপিষ্ঠ ক্ষুধায়
পৃথিবীর প্রাপ্য স্বত্ব সর্বগ্রাসী কবরের প্রায়।
০৭
Lo in the orient when the gracious light
Lifts up his burning head, each under eye.
Doth homage to his new-appearing sight,
Serving with looks his sacred majesty;
And having climbed the steep-up heavenly hill,
Resembling strong youth in his middle age,
Yet mortal looks adore his beauty still,
Attending on his golden pilgrimage :
But when from highmost pitch, with weary car
Like feeble age he reeleth from the day,
The eyes (fore duteous) now converted are
From his low tract and look another way
So thou, thyself outgoing an thy noon,
Unlooked on diest unless thou get a son.
ওই পূর্বাচলে দেখো রাজকীয় আলোর আভাস
ওঠালে প্রোজ্জ্বল শির, সর্ব চোখ নিম্নে ধরণীর
শ্রদ্ধায় প্রণাম করে সে রূপের প্রথম প্রকাশ,
অনুগত দৃষ্টি মেলে সাধে তুষ্টি সে দৈবশক্তির;
করে আরোহণ সূর্য আকাশের উচল পর্বত,
তেজী তরুণের মতো জ্বলে তার রূপ মধ্যদিনে
তখনো মর্তের চোখ করে তার পূজা মুগ্ধবৎ,
স্বর্ণময় তীর্থপথে হয় অনুগামী পথ চিনে;
কিন্তু যদি উচ্চতম শৃঙ্গ থেকে ক্লান্ত রথ তার,
জরায় দুর্বল, আসে দ্রুত নেমে ছেড়ে দিবালোক,
সরায় অন্যত্র ছিল ভক্তজন যারা পূর্বেকার
তার নিম্ন-গমনের দৃশ্য থেকে অন্যদিকে চোখ।
যেহেতু আগতপ্রায় শীর্ষ হতে তোমার প্রস্থান
যাবে অস্ত অগোচরে জন্ম যদি না দাও সন্তান।
০৯
Is it for fear to wet a widow's eye
That thou consum'st thyself in single life?
Ah! if thou issueless shalt hap to die,
The world will wail thee like a makeless wife;
The world will be thy widow and still weep,
That thou no form of thee hast left behind,
When every private widow well may keep
By children's eyes, her husband's shape in mind :
Look what an unthrift in the world doth spend
Shifts but his place, for still the world enjoys it,
But beauty's waste hath in the world an end
And kept unused the user so destroys it:
No love towards others in that bosom sits
That on himself such murd'rous shame commits.
হবে অশ্রুভারানত বিধবার চোখ এই ভয়ে
তাহলে কি বেছে নিলে অবক্ষয়ী কুমার জীবন?
যদি তুমি নিসঃন্তান নাও ঠাঁই মৃত্যুর আশ্রয়ে,
ক্রন্দসী ঝরাবে অশ্রু সঙ্গিহীনা বিধবা যেমন।
তোমার বৈধব্যে-রিক্ত ধরা হবে বিলাপে সরব
যে তোমার রূপবাহী নেই কেউ বেঁচে পৃথিবীতে;
রাখে মনে পতিহীনা বিগত পতির অবয়ব
দেখে তার প্রতিচ্ছবি সন্তানের কোমল দৃষ্টিতে।
দেখো বুঝে অপচয়ে সম্পদের হয়না বিলয়,
স্থানান্তর ঘটে শুধু, লাগে তবু পৃথিবীর ভোগে;
সুন্দরের বিনষ্টিতে ঘটে বিশ্বে চিরস্থায়ী ক্ষয়,
রূপাধিকারীর ভুলে লুপ্ত রূপ বিনা উপযোগে।
নেই কারো প্রতি প্রেম সে হৃদয়ে নিষ্ঠুর বিলাসে
যে কিনা নিজেকে হানে লজ্জাকর অন্ধ আত্মনাশে।
তিনটি সনেটেরই অন্তর্বয়ন ভাষণ : পুরুষ শৌর্যবীর্যের অধিকারী, বীরভোগ্যা আর নারী তার ভোগ বিলাসের মাধুরী। সন্তান জন্মদান ছাড়া তার আর কোনো অবদান নেই, নেই বিনোদন। তবে এমনই কাব্যিক দ্যোতনা সনেটগুলো পড়ে মনেই হয় না এগুলো অনূদিত, মনে হয় কবির নিজেরই কবিতা, স্ব-প্রণীত। আর এই মুন্সিয়ানার জন্যই তাঁর অনুবাদ গ্রন্থটি তাঁকে নিয়ে গেছে দৃষ্টান্তের অনন্য উচ্চতায়। শুধু একজন উজ্জ্বল কবি ও অনুবাদকই নন তিনি, একজন উঁচু মাত্রার প্রাবন্ধিকও। আর সেইসব প্রবন্ধের গভীরে ডুব দিলে দেখা যাবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে ভেতরে ভেতরে তিনি অসাধারণ এক সাহিত্যতাত্ত্বিকও।
১৯৪৮ সালে মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে জন্ম নেয়া এই গুণী শিক্ষাবিদ, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক ১৯৭২ সালে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে ইংরেজি বিভাগে তারুণ্যদীপ্ত প্রতিভাবান প্রভাষক হিসাবে তাঁর শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু কলেজে যোগ দিয়েই ডাক পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন তিনি। তারপরেই চলে যান দেশের বাইরে। বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে দেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ থেকে ইংরেজি বিভাগের প্রধান হিসাবে অবসর নেন। তিনি ১৯৮৩ সালে কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি থেকে পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর থিসিসের শিরোনাম ছিল Apocalyptic Imagery in W. B. Yeats, T. S. Eliot, Robert Lowell and Allen Ginsberg । তাঁর সহধর্মিনীও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরে যান। একমাত্র কন্যাও শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত এবং কর্মসূত্রে বিদেশে অবস্থান করছেন। বর্তমানে অবসর জীবনে তিনি উনিশ ও বিশ শতকের বাঙালি মানসের ওপর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক হেজিমনির অভিঘাত বিচার সংক্রান্ত একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রণয়নে নিয়োজিত।