Published : 22 Feb 2026, 12:08 PM
প্রয়াত সাহিত্যিক শংকর চেয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তার মরদেহ যেন হিমঘরে রাখা না হয়’; দাহ করতেও যেন বেশি সময় নেওয়া না হয়। এই নির্দেশনা তিনি দিয়ে গেছেন তার উইলে।
শংকরের উইলের কথা সামনে এনেছেন তার ছোট মেয়ে তনয়া বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কলকাতার দে’জ পাবলিশার্সের কর্ণধার শুধাংশু শেখর।
৯৩ বছর বয়সে শংকর চলে গেছেন শুক্রবার। তার পারিবারিক নাম ছিল মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। ‘চৌরঙ্গী’, ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জন অরণ্যের’ মত উপন্যাস উপহার দিয়ে দুই বাংলার সহিত্যকে তিনি করেছেন সমৃদ্ধ। বার্ধক্যের নানা জটিলতায় ভুগছিলেন শংকর, ছিলেন হাসপাতালে।
তার মৃত্যুর পর একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে তার মেয়ে তনয়া এবং ভাতৃপ্রতীম শুধাংশু শেখর ওই উইলের কথা বলেন। তারা বলেন, উইলে সাধারণভাবে দাহ করার কথা বলে গেছেন শংকর।
শংকরের মৃত্যুর দিনের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, তনয়া বলছেন, “উনি বলে গেছেন, উনার বডি যেন ঠাণ্ডা ঘরে না রাখা হয়। তাই আমরা অপেক্ষা করতে পারব না...। এখানে ওখানে না নিয়ে ঘুরে বাড়ি, তারপর দাহ করতে হবে। তাই আমাদের তার শেষ ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে হবে।”
শংকর তার শেষ ইচ্ছা পূরণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন দুই মেয়ের ওপর। বড় মেয়ে বিদেশে থাকেন। আর কোনো কারণে দুই মেয়ে তার মৃত্যুর সময়ে উপস্থিত না থাকলে তার মৃত্যু পরবর্তী কাজ সারতে এবং দাহ করার দায়িত্ব তিনি দিয়ে যান শুধাংশু শেখরের ওপর।
প্রকাশক সুধাংশু বলেন, “দেখুন শেষ জীবনে একটা উইল করে গেছেন উনি। সেখানে তিনি আমাকে বলে গেছেন যে ‘আমার মৃত্যুর পরে যেন আমাকে বেশিক্ষণ তোমরা আটকে রাখবে না এবং কোথাও ঠাণ্ডা ঘরে রাখবে না। আমার দুই মেয়ে যদি থাকে, তখন তারা কাজটি করবে। যদি দুজনই না থাকে, তাহলে তুমি আমাকে দাহ করে নেবে, মানে আমাকে কখনও ঠাণ্ডা ঘরে রেখে দিও না’।”
উইলে শংকর আরও বলে গেছেন, যদি তার মৃত্যু কলকাতার বাইরে হয়, তাহলে তার মরদেহ যেন শহরে ফিরিয়ে আনা হয়।
সুধাংশু বলেন, “উনি বলে গেছেন, ‘কলকাতায় ফেরত নিয়ে এসে আমার এই বান্ডেল রোডের বাড়ি থেকে যেখানে আমার মা এবং আমার স্ত্রীকে যেখানে দাহ করা হয়েছে সেখানেই যেন দাহ করা হয়’।”
শংকর জন্মেছিলেন যশোরে
১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের যশোর জেলায় শংকরের জন্ম। আইনজীবী বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই কলকাতায় চলে আসেন। বসবাস করতে থাকেন হাওড়ায়। সেখানেই শংকরের বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া। তার সাহিত্যচর্চার শুরুও সেখানেই।
কৈশোরেই পিতৃহীন শংকর সংসারের জোয়াল টানতে কখনও কেরানির কাজ করেছেন, কখনো করেছেন হকারি। আর সেই সূত্রেই কলকাতা হাই কোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নায়েল ফ্রেডারিক বারওয়েলের অধীনে চাকরি হয় তার। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই লেখেন ‘কত অজানারে’।
১৯৫৫ সালে শংকরের লেখা প্রথমএই উপন্যাস প্রকাশের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বাংলা সাহিত্য পেয়ে যায় এক নতুন সাহিত্যিককে। তবে তাকে প্রকৃত জনপ্রিয়তা দিয়েছিল ‘চৌরঙ্গী’। শাজাহান হোটেলের সুখ-দুঃখের সেই আখ্যান শংকরকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়।
১৯৬৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্র শংকরের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। এই সিনেমায় মহানায়ক উত্তম কুমারের অভিনয় আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে একে একে তার কাছ থেকে বাঙালি পাঠক পেয়েছে ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’, ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’, ‘সম্রাট ও সুন্দরী’, ‘চরণ ছুঁয়ে যাই ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’সহ আরও বহু গল্প ও উপন্যাস।
শংকরের কয়েকটি উপন্যাস নিয়ে সিনেমা তৈরি হয়েছে। পিনাকিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় চৌরঙ্গী’ ছাড়াও কিংবদন্তি লেখক নির্মাতা আঁকিয়ে সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেছিলেন ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’।
এছাড়া পরিচালক ঋত্বিক ঘটক শংকরের উপন্যাস ‘কত অজানারে’ নিয়ে সিনেমা করার কথা ভাবলেও সে কাজ শেষ হয়নি।
কিশোর সাহিত্যেও তার ছাপ ছিল। শারদীয়া আনন্দমেলাতে ‘পিকলুর কলকাতাভ্রমণ’ নামের অণু-উপন্যাসটি দিয়ে তিনি কিশোর সাহিত্য শুরু করেন। পরে আবার এই লেখাটির নাম পাল্টে হয় ‘খারাপ লোকের খপ্পরে’। এর সঙ্গে আরও দু’টি লেখা নিয়ে 'এক ব্যাগ শংকর' নামে প্রকাশিত হয়।
১৯৯৩ সালে ঘরের মধ্যে ঘর’ উপন্যাসের জন্য শংকর পেয়েছেন বঙ্কিম পুরস্কার, ২০২১ সালে পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। ২০২২-এ এবিপি আনন্দ তাকে ‘সেরার সেরা বাঙালি’ সম্মান দেয়।
পুরনো খবর
'চৌরঙ্গী' উপন্যাসের স্রষ্টা শংকরের জীবনাবসান
শংকরের প্রয়াণ: বাংলাসাহিত্যে বিরাট ‘শূন্যতা তৈরি হল’, শোকাতুর শীর্ষেন্দু-সঞ্জীব