Published : 20 Feb 2026, 07:51 PM
‘ব্যবহারে বোঝা যেত না তিনি এত বড় লেখক, নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারতেন’-এই কথাগুলো সদ্য প্রয়াত সাহিত্যিক শংকরকে নিয়ে বলেছেন তার সতীর্থ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।
কলকাতার সংবাদমাধ্যম ‘সংবাদ প্রতিদিন’কে শীর্ষেন্দু বলেছেন শংকরের মৃত্যুতে তিনি শোকাতুর। সমসাময়িক লেখককে হারিয়ে মন খারাপ আরেক পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়েরও।
তার ভাষ্য, শংকরের মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য জগতে একটা ‘বিরাট ফাঁক তৈরি হল’।
শংকর চলে গেছেন শুক্রবার দুপুর পৌনে ১টা নাগাদ। আনন্দবাজার লিখেছে, নানা শারীরিক সমস্যা নিয়ে দিন পনেরো আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বর্ষীয়ান এ সাহিত্যিক। হাসপাতালেই মারা যান শংকর। চৌরঙ্গী, সীমাবদ্ধ এবং জন অরণ্যের মত উপন্যাস উপহার দিয়ে দুই বাংলার সহিত্যকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। তার পারিবারিক নাম ছিল মণিশংকর মুখোপাধ্যায়; এ সাহিত্যিকের বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।
শীর্ষেন্দুর কথায় জানা গেল, শংকর তার খুব ভালো বন্ধু ছিলেন।
৯১ বছর বয়সী শীর্ষেন্দু বলেন, “অসাধারণ এই মানুষটির আজ প্রয়াণ ঘটল। তিনি আমার চেয়ে বয়সে একটু বড়। লেখক জীবনের শুরু থেকেই তাকে চিনি। একজন আদ্যন্ত ভদ্রলোক, ভালো মানুষ। সবচেয়ে বড় ব্যাপার এত বড় লেখক, তার ব্যবহারে কখনও বোঝা যেত না। নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারতেন। “
শংকরের ‘কত অজানারে’, ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’, ‘চৌরঙ্গী’ শীর্ষেন্দুর পছন্দের উপন্যাস।
“এ ছাড়া তার কত লেখাই তো আছে, যেগুলো মন ছুঁয়েছে বার বার।“
শীর্ষেন্দু বলেন, সারাজীবনই ভীষণ সক্রিয় ছিলেন শংকর। ইদানিং তেমন লিখছিলেন না।
“তবে বইমেলায় বসে ওই একটা দৃশ্য, সত্যিই ভুলতে পারি না এখনও। দে’জ পাবলিকেশনের সামনে বই সাজিয়ে বসতেন। সেখানে পর পর সই দিয়ে যেতেন।
“এত উৎসাহ তিনি ছাড়া আর কারও মধ্যে পাওয়া সম্ভব নয়। পাঠকের প্রতি তার এই দায়বদ্ধতা শেখার মত বিষয়। একজন শুভানুধ্যায়ী ও বন্ধুকে হারালাম। সবচেয়ে বড় কথা বাংলা সাহিত্যে বিরাট এক শূন্যতা সৃষ্টি হলো। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও প্রণাম।”
সাহিত্যে তোপ দেগেছিলেন প্রথম লেখা থেকেই
তার কাছাকাছি বয়সের সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় বলেন, শংকর অনেক বছর ধরে তিনি এই বঙ্গের পাঠক-পাঠিকাকে সমৃদ্ধ করে এসেছে। বহু ধরনের লেখা, কাহিনী, চিন্তাভাবনা, নাটকীয়তার নানা উপাদান দিয়ে তিনি সবাইকে সমৃদ্ধ করতেন।
আক্ষেপ ঝরিয়ে সঞ্জীব বলেন, “একটা যুগকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন তিনি। হঠাৎ, এ ভাবে চলে গেলেন মানুষটা?
“একটা শূন্যতা যে তৈরি হলো এ কথা অস্বীকার করা যায় না। ইতিমধ্যেই তো অনেকেই চলে গিয়েছেন। বাংলা সাহিত্য ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে যে বৈচিত্র, যে আনন্দ সাহিত্যের মাধ্যমে তিনি বিতরণ করতেন, তা ভোলার নয়।”
শংকরের সঙ্গে হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল সঞ্জীবের।
তিনি বলেন, “আমায় খুবই স্নেহ করতেন মানুষটা। একটা সময়ে প্রতিদিন সকালে ফোন করতেন। তার কথোপকথন শুরুর একটা স্টাইল ছিল। বলতেন, ‘আমি কি মহামান্য সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলছি?’ সেই সময়ে আমায় কিছু উপদেশও দিতেন। লেখাকে খেজুর রসের সঙ্গে তুলনা করতেন। বলতেন, জিরেন কাঠের রস হল সবচেয়ে ভালো। তাই গুচ্ছের লেখা লিখলে রস পাতলা হয়ে যায়। তাই ধীরে ধীরে লিখবে। পরবর্তীকালে আমার যারা শুভানুধ্যায়ী, তাঁরাও এ কথা বলেছেন বহুবার।”
শংকরের সাহিত্যগুণ নিয়ে সঞ্জীবের ভাষ্য, “সাহিত্য জগতে তোপ দেগেছিলেন প্রথম লেখা থেকেই। এমন সাফল্য দিয়ে এই জগতে এন্ট্রি খুব কমই হয়। গত বছর বইমেলায় শেষ দেখা। ভেবেছিলাম এ বারও হয়তো যেতে পারবেন। কিন্তু যার যখন দিন ফুরোবে, তখন তো চলে যেতেই হবে।”
শংকর জন্মেছিলেন যশোরে
১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের যশোর জেলায় জন্ম শংকরের। আইনজীবী বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই কলকাতায় চলে আসেন। বসবাস করতে থাকেন হাওড়ায়। সেখানেই শংকরের বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া। তার সাহিত্যচর্চার শুরুও সেখান থেকেই।
কৈশরেই পিতৃহীন শংকরকে সংসারের জোয়াল টানতে কখনও কেরানির কাজ করেছেন, করেছেন হকারিও। আর সেই সূত্রেই কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নায়েল ফ্রেডারিক বারওয়েলের অধীনে চাকরি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই লেখেন ‘কত অজানারে’।
১৯৫৫ সালে শংকরের প্রথম এই উপন্যাস প্রকাশের পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বাংলা সাহিত্য পেল এক নতুন সাহিত্যিককে। তবে তাকে প্রকৃত জনপ্রিয়তা দিয়েছিল ‘চৌরঙ্গী’। শাজাহান হোটেলের সুখ-দুঃখের সেই আখ্যান শংকরকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়।
১৯৬৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্র শংকরের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। এই সিনেমায় মহানায়ক উত্তম কুমারের অভিনয় আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে একে একে তার কাছ থেকে বাঙালি পাঠক পেয়েছে ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’, ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’, ‘সম্রাট ও সুন্দরী’, ‘চরণ ছুঁয়ে যাই ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’সহ আরও বহু গল্প উপন্যাস।
শংকরের কয়েকটি উপন্যাস নিয়ে সিনেমা তৈরি হয়েছে। পিনাকিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় চৌরঙ্গী’ ছাড়াও কিংবদন্তি লেখক নির্মাতা আঁকিয়ে সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেছিলেন ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’।
এছাড়া পরিচালক ঋত্বিক ঘটক শংকরের উপন্যাস ‘কত অজানারে’ নিয়ে সিনেমা করার কথা ভাবলেও সে কাজ শেষ হয়নি।
কিশোর সাহিত্যেও তার ছাপ ছিল। শারদীয়া আনন্দমেলাতে ‘পিকলুর কলকাতাভ্রমণ’ নামের অণু-উপন্যাসটি দিয়ে তিনি কিশোর সাহিত্য শুরু করেন। পরে আবার এই লেখাটির নাম পাল্টে হয় ‘খারাপ লোকের খপ্পরে’। এর সঙ্গে আরও দু’টি লেখা নিয়ে 'এক ব্যাগ শংকর' নামে প্রকাশিত হয়।
১৯৯৩ সালে ঘরের মধ্যে ঘর’ উপন্যাসের জন্য শংকর পেয়েছেন বঙ্কিম পুরস্কার, ২০২১ সালে পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। ২০২২-এ এবিপি আনন্দ তাকে ‘সেরার সেরা বাঙালি’ সম্মান প্রদান করে।