Published : 10 Sep 2025, 11:48 AM
চিন্ময় গুহর গদ্য সর্বদাই কাব্যবিধৌত এক পলি দিয়ে গড়া যার শব্দপুঞ্জ থেকে বেরিয়ে আসে সবুজ রক্তের ক্লোরোফিল। এই গদ্য সুগন্ধী, শ্যামলিম, ইন্দ্রিয়জ। এই গদ্য ব্যাকরণের নির্ধারিত সংজ্ঞাকে লঙ্ঘন করে নিজের মুক্তিকে এমনভাবে নিশ্চিত করতে চায় যেখানে কবিতার সঙ্গে বিভেদরেখা বিলুপ্তপ্রায়। অর্থাৎ তাঁর গদ্য চিরকালই ছিল কাব্য-অভিসারী। এই কারণে তাঁর গদ্যে আমরা শুনতে পাই কবিতার সঙ্গে অবিরাম বিশ্রম্ভালাপ। এই প্রণয়মাধুর্য তাঁর গদ্যের এক লক্ষণতিলক। চিন্ময় গুহ এবার, বলা যায়, গদ্যের পরিযায়ী প্রদক্ষিণের এক অবকাশে, প্রবেশ করেছেন কবিতার নির্জন কুটিরে। এখানে আর গদ্যের আড়াল নেই; এখানে তার নিজের সঙ্গে নিজেরই এক নগ্ন সাক্ষাত। এই সাক্ষাতেরই স্বগত রূপ পাথরের ফণা ও ঈশ্বর। এবারেই তাঁর কবি রূপে সরাসরি আত্মউন্মোচন, কিন্তু এরও আছে পূর্ব ইতিহাস যা কবির নিজের কন্ঠে ধ্বনিত হলো এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সূত্রে: “কোনও এক হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্রের নীচে নিজেকে গভীর মমতায় কবিতার কাছে উৎসর্গ করেছিলাম।” তবে এই ‘উৎসর্গ’ ছিল প্রবন্ধের দ্বারা ব্যাহত, সুপ্ত এবং অশংত বিলুপ্ত, কিন্তু বিলম্বে হলেও সেই ‘লুপ্তপূজাবিধি’র মন্ত্র নিয়ে ফিরে এসেছেন সম্প্রতি। যদিও, গদ্যের পরশু হাতে আমাদের পরশুরাম তিনি, তিনি সেই যোদ্ধা ঋষি, যিনি আগাছার আগ্রাসন থেকে গদ্যের কোঙ্কণ ও মালাবারকে রক্ষা করেছেন।
কিন্তু কবিতায় তিনি ভিন্ন এক ভ্রমণের চিহ্ন এঁকেছেন। এই ভ্রমণ প্রায়শই পরাবাস্তব ‘রক্তরেণু’তে রঞ্জিত। শব্দগুচ্ছ ভরে যায় ‘নক্ষত্রের অগ্নিকণা’য়:
চুল্লির ভেতর যে শুয়ে আছে সে এক ধুলোর মানুষ,
চুল্লির ভেতর সুর, চুল্লির ভেতর অতলতা,
জলে ভেসে যায় নীলচঞ্চু মাছ
ও মাছিরা। (‘ভীষণ আমার, রুদ্র আমার’)

পাথরের ফণা ও ঈশ্বর নামক কাব্যগ্রন্থে চিন্ময় বাংলা কবিতার সাধারণ স্বভাববৈশিষ্ট্য থেকে এমন এক দূরত্ব রচনা করে নিয়েছেন যেখানে বাস্তবের বহুকৌণিকতা ধরা দেয় অনুষঙ্গের এমন এক অবাস্তব বিন্যাসের মাধ্যমে যা প্রায়শ পিচ্ছিল, অস্পর্শময় কিন্তু সবটা মিলিয়ে প্রতীকি ইশারায় ঠাসা। কালের ক্লেদ, সময়ের দীর্ঘশ্বাস, জীবনের বিলাপ ও বেদনার নারকীয় অভিজ্ঞতাসমূহ বিচ্ছুরিত হয় ‘রক্তঘুম’, ‘কৃষ্ণগ্রীব শকুন’, ‘হাড়পঞ্জরের কান্না’র মতো শব্দবন্ধে। কোনো কোনো কবিতায় ফ্রঁসিজ পোঁজ বা আঁরি মিশো কিংবা রনে শার-এর তীর্যক আলো চিন্ময় গুহর অনুভূতিকে আল্পনাময় করে তুলেছে। ফরাসি ও ইংরেজি কবিতার কাছে তাঁর কাব্যঋণ অনস্বীকার্য, কিন্তু এই ঋণকে তিনি সৃষ্টিশীলতা দিয়ে সুদে আসলে খাটিয়ে নিয়েছেন। কোনো কোনো কবিতায় তিনি পরাবাস্তববাদী স্বরযোজনায় অপূর্ব সব বাকপ্রতিমার স্রষ্টা হয়ে উঠেছেন।
পাকস্থলির অযুত গহ্বর থেকে অরণ্য পাখির কলস্বর। (‘ভীষণ আমার, রুদ্র আমার’)
নক্ষত্রের আগুন থেকে বৃষ্টি পড়ছে, (সূর্যাস্তমদির)
এসো , জলকণা থেকে বিদ্যুতবাহিত লালা,
….
শুধু হাড়ের ভেতর থেকে রোদ এসে পড়েছে উঠোনে। ( পাথরের ফণা ও ঈশ্বর)
‘অস্থিঘর’ নামক কবিতাটি টানা গদ্যে এমন এক আত্মখনন যেখানে সমষ্টির যাতনাকে শুষে নিয়ে একক এক ব্যক্তিস্বর হয়ে উঠেছে। স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নে ঘেরা এক আত্মজাগরণ এবং একই সঙ্গে আত্মউন্মোচনও। এই কবিতার প্রতিটি বাক্য কল্পনার অগ্নিশিখায় প্রজ্জ্বলিত হয়ে আছে:
সাদা চাদরে ঢাকা আমার অস্থিঘর। রক্তনীল লতাগুল্মের ছায়ায় কে তাকে খোঁজে?
এত আর্তনাদ সেখানে জমে আছে যে মাঝরাতে জল থেকে ধোঁয়া ওঠে।
….
মাঝরাতে রক্তাক্ত জানলাগুলো সোজা হয়, ডানা মেলে ওপরে ওঠে, বৃত্ত তৈরি
করে, তারপর বালিকাঁকড়ার মতো ছড়িয়ে পড়ে। স্নায়ুজ্যোৎস্নার মৃদু আলোয়
আমি দেখি তারা চোখের পলকে রঙ বদলাচ্ছে। কখনও গোলাপি, কখনও বেগুনি।
একটা সুক্ষ্ণ সুর বাজছে কোথাও, নারীঠোঁটের পাটাতন খোলা। তার উরুজল
জানলা পেরিয়ে কোন দিগন্ত ছুঁয়েছে।
হাজার বছরের আর্তনাদ থেকে উঠে আসা আমার জানলাগুলো ক্রমশ আয়তনে
ছোটো হয়, তারপর দেখা যায় না এমন কয়েকটি বিন্দু, যেন বিন্দু বিন্দু ঘাম। ( অস্থিঘর)
চিন্ময় গুহ অবাস্তব বাকপ্রতিমা নির্মাণে এতটাই কুশলী এক শিল্পী যে পাঠককে তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাতে আটকে রাখতে পারেন। কিন্তু এই গ্রন্থ কেবল পরাবাস্তবধর্মী কবিতার সংকলন নয়, এতে আছে ভিন্ন মেজাজের এমন কিছু কবিতা যেগুলো আখ্যানধর্মিতা আর সাহিত্যের অভিজ্ঞান থেকে উচ্ছ্রিত। যেমন ‘আজি বিজন ঘরে, মৃত্যুকুয়াশায়’, ‘ঋদ্ধিমানের বিষন্ণতা’ এবং ‘তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে’। এই কবিতাগুলোয় চিন্ময় গুহ কিছু দুঃসাহসী পরীক্ষা করেছেন যা বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে এমনভাবে আর কাউকে করতে দেখা যায়নি। ‘আজি বিজন ঘরে’ কবিতাটি শুরু হয়েছে এভাবে:
“কত ভস্মগর্ভ দিনরাত্রির চক্রব্যূহ পার হয়ে আমি এক বিশ্রুত রক্তিম বৃত্তের নীচে শুয়ে আছি। এই বৃত্তই কি তবে পৃথিবী? তার চারপাশে লাল আভা। সময়ের আগুনঢেউ এসে পুড়িয়ে দিচ্ছে আমার হাড়।” চার পৃষ্ঠার এক দীর্ঘ কবিতায় তিনি নিজের উপলব্ধির পাশাপাশি শেক্সপিয়রের ট্যাম্পেস্ট ও টাইটাস এন্ড্রোনিকাস, কিং লিয়ার ও হ্যামলেট নাটক থেকে বিভিন্ন চরিত্রের প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি সরাসরি ইংরেজিতে বিনুনির মতো পেঁচিয়ে এক অভূতপূর্ব বিন্যাস তৈরি করেছেন। বলা বাড়তি হবে না যে, এতে আছে জীবনানন্দেরও কাব্যচূর্ণের উপস্থিতি। যেন কবিতা, নাট্য আর প্রবন্ধ—এই তিন প্রবাহের এক ত্রিবেণী সঙ্গম। যদিও এই ধরনের কবিতা পাঠককে দ্বিভাষিক হওয়ার দাবী জানায়। তবে আজকের ভাষিক বাস্তবতায়, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এই দাবীর বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তবু, বাস্তবতা যাই থাকুক না কেন পরীক্ষা হিসেবে এই কবিতাগুলোর অভিনবত্ব অনস্বীকার্য। ‘তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে’ কবিতায় মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্ককে সাহিত্যিক ও দার্শনিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে স্পিনোজা, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেক্সপিয়রের উক্তিকে আত্মস্থ করে চিন্ময় গুহ নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে হাজির করেন। এই কবিতাগুলোর মাধ্যমে চিন্ময় তাঁর গদ্যসত্তার সাথেও যেন এক প্রচ্ছন্ন সম্পর্কের ইশারা বজায় রেখেছেন। এই কবিতার একটি অংশ চিন্ময় গুহর কবিসত্তার এক কেন্দ্রীভূত ও পরিশ্রুত রূপে অসামান্য স্পর্শঘন হয়ে উঠেছে: “ওরা কেন জলে রয়েছে জানো? জলের বিস্ময়! ওই সবুজ পাতা, শালুক ফুল! অনন্তকাল বাঁচতে চায় বলে।” এই অংশটুকু পড়তে পড়তেই মনে পড়ে গেল কাল আর স্থানের ভিন্ন দ্রাঘিমা থেকে উঠে আসা বোর্হেসের সেই উচ্চারণ: “স্পিনোজা ভাবতেন যে, সমস্ত বস্তুরাশি সর্বাবস্থায় তার সত্তার অনুরূপ হয়ে উঠতে চায়, পাথর চিরকালই পাথর হতে চায়, আর বাঘ চায় বাঘ হতে,” ( Borges and I) বোর্হেসের সঙ্গে চিন্ময়ের সাদৃশ্য এখানে বিষয়ে নয়, বরং দার্শনিক অভিপ্রায়ে। বাঘ কিংবা পাথর চিরকাল অপরিবর্তিত রূপে থাকতে চায়। কিন্তু চিন্ময় গুহর সবুজ পাতা ও শালুক ফুল চায় চিরকাল বেঁচে থাকতে। চিন্ময় গুহ যেন একইভাবে অনন্তের সাথে যুক্ত করে দিলেন পাঠকের স্নায়ুতন্ত্রীকে। এত সহজভাবে, এবং এত মিতভাষ্যে বাঁচার ব্যাকুলতাকে তিনি তুলে ধরেছেন যে জীবনের জন্য এক গভীর মমতাবোধকেই তা জাগ্রত করে। কোনো উপমা নেই, নেই চিন্ময় গুহর স্বভাবসুলভ চিত্রকল্পের অঞ্জলি, কিন্তু হিমেনেসের নগ্ন কবিতার অনাভরণ অথচ গহনস্পর্শী উচ্চারণের মতোই এই বাক্যগুলো মায়াঘন সারল্যে অনন্তপিপাসাকে জাগিয়ে দেয়। জল, শালুক ফুল, সবুজ পাতা ও বিস্ময় যেন জীবনের অন্তহীন হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষাকে বিশাল করে তুলেছে ওই ছোট্ট পরিসরে। এমন এক আকুলতাকে তিনি তুলে ধরেছেন যা সরল হয়েও কুহকী, যা স্থির শান্ত হয়েও স্বতশ্চল প্রবাহের এক বীজ।
কবি চিন্ময় গুহকে অভিনন্দন জানাই তাঁর এই কাব্যগ্রন্থের জন্য। আজ তাঁর জন্মদিন, তাঁকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও আলিঙ্গন।