Published : 10 Oct 2025, 02:12 PM
হরি কুনজরুর নেয়া লাসলো ক্রাসনাহোরকাই -এর এই সাক্ষাতকারটি The Yale Review সাময়িকীতে ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। বিডিআর্টস-এর পাঠকদের জন্য এটি ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা করেন প্রাবন্ধিক অনুবাদক বিপাশা চক্রবর্তী। বি.স.
শেষবার আমার সাথে যখন লাসলো ক্রাসনাহোরকাই-এর দেখা হয়, তখন তিনি আমার প্রতি অনুরাগের কথা প্রকাশ করেন। স্বীকার করতে হবে, তিনি তাঁর অনন্য গদ্যশৈলী সম্পর্কে আলংকারিক মন্তব্য করছিলেন, এবং আমরা একটি আর্ট গ্যালারির দর্শকদের সামনে কথা বললেও, আমার সেটা ভালো লেগেছিল।
ক্রাসনাহোরকাই অসাধারণ সাহিত্যকর্মের রচয়িতা; তাঁর সাহিত্যকর্ম তাঁকে হাঙ্গেরির অন্যতম বিশিষ্ট লেখকদের একজন করেছে এবং বারবার নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত করেছে। তিনি হাঙ্গেরির চলচ্চিত্রনির্মাতা বেলা তার-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছেন। তাদের যৌথ প্রচেষ্টা লেখকের প্রারম্ভিক রচনাগুলোর বিষন্ন, অস্তিত্ববাদী আবহকে বিশ্বজুড়ে সিনেমাপ্রেমীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
তাঁর গল্পগুলো প্রায়শই একক অবিচ্ছিন্ন বাক্যে গঠিত, যাতে অসীম নমনীয়তার ছোঁয়া পায়। সেই বাক্যগুলো জটিল দার্শনিক চিন্তা থেকে শুরু করে পার্থিব হাস্যরস পর্যন্ত বিস্তৃতভাবে ধাবিত হয়। তাঁর ধারণা অনুযায়ী ভালোবাসার মতো গভীর অনুভূতিকে ছোট ছোট বাক্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি বলেছেন, "পূর্ণবিরাম ঈশ্বরের জন্য আছে।" তাঁর দীর্ঘ, অবিচ্ছিন্ন বাক্য গঠনের কারণে পাঠককে সিদ্ধান্ত বা চূড়ান্ত ব্যাখ্যার বদলে চলমান অভিজ্ঞতার মধ্যেই রাখা হয়; তাই তিনি পূর্ণবিরামকে দেবত্বের দায়িত্ব বলে দেখেন।
তিনি লেখায় গভীর মানবতাবাদ দেখান। এটি পুরনো আধুনিকতাবাদী 'চেতনার ধারা'র খণ্ডিত অন্তরঙ্গতা নয়; বরং এটি বিশ্বের প্রতি একটি সর্বব্যাপী কৌতূহল, যা পাঠককে বইয়ের স্রোতে টেনে নিয়ে যায়।
ক্রাসনাহোরকাই ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরিতে জন্মগ্রহণ করেন। ভ্রমণে অক্ষমতা তাঁর প্রাথমিক কর্মজীবনে ছায়া ফেলেছিল (গোয়েন্দা পুলিশ তাঁর পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করেছিল।)। তাঁর উপন্যাসগুলো—যেমন Sátántangó ও The Melancholy of Resistance—প্রায় অসহনীয় এক শ্বাসরুদ্ধকর আবহ তৈরি করে।
লৌহ যবনিকা পতনের পরে তিনি এমন এক হালকা ভাব অনুভব করেন, যা Seiobo There Below-এর মতো রচনায় প্রতিফলিত হয়; সেখানে তিনি এশীয় শিল্প ও দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন, বিশেষত বৌদ্ধ চিন্তার সঙ্গে। তাঁর সাম্প্রতিক উপন্যাস Herscht 07769-এ বাখকে জার্মান নব্য-নাজিবাদের বিপরীতে সাজানো হয়েছে। তিনি সদ্য The Yale Review-এ “An Angel Passed Above Us” শিরোনামে একটি গল্প প্রকাশ করেছেন, যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধে কাদা-ভরা ট্রেঞ্চগুলোকে প্রযুক্তিগত বিশ্বায়নের অলীক প্রতিশ্রুতি সঙ্গে বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছে।
ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের সপ্তাহে আমি (হরি কুনজরু) ইমেলের মাধ্যমে ক্রাসনাহোরকাইয়ের সঙ্গে কথা বলি; কথোপকথনটি দৈর্ঘ্য এবং স্বচ্ছতার কথা বিবেচনা করে সম্পাদন করা হয়েছে।
হরি কনজরু: আপনার গল্প "An Angel passed above us" ইউক্রেনের প্রেক্ষাপটে লেখা। ইউক্রেনের যুদ্ধ আপনার জন্য কী অর্থ বহন করে? একজন ইউরোপীয়, একজন হাঙ্গেরীয়, দীর্ঘ সময় জার্মানিতে থাকা একজন হিসেবে এই সংঘাত সম্পর্কে আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, সেটি জানতে ইচ্ছে করে।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: প্রথম বিশ্বযুদ্ধই মূলত আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে?! আমার কী মনে হয়?!
এটা আমাকে আতঙ্কে ভরিয়ে দেয়। হাঙ্গেরি ইউক্রেনের একটি প্রতিবেশী দেশ। এবং অরবান(Orbán) শাসনব্যবস্থা একটি অভূতপূর্ব অবস্থান নিচ্ছে - হাঙ্গেরির ইতিহাসে যা প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এর আংশিক কারণ, এখন পর্যন্ত, আমরা সর্বদা আক্রমণের শিকার এবং হেরে যাচ্ছিলাম, এবং বাকি আংশিক কারণ আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি যে হাঙ্গেরির রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই বিষয়ে তথাকথিত নিরপেক্ষতার কথা বলবে! রাশিয়ানরা যখন কোনও প্রতিবেশী দেশ আক্রমণ করে তখন কীভাবে কোনও দেশ নিরপেক্ষ থাকতে পারে? তারা কি প্রায় তিন বছর ধরে ইউক্রেনীয়দের হত্যা করেনি? "এটি একটি অভ্যন্তরীণ স্লাভিক বিষয়" বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?!—যেমনটা হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী বলেছেন?! মানুষকে যখন হত্যা করা হচ্ছে তখন এটা কীভাবে অভ্যন্তরীণ বিষয় হতে পারে? আর কথাটা এমন এক দেশের নেতা বলছেন, যে দেশ ইতিহাস জুড়ে ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হয়েছে। অন্যান্য আক্রমণকারীদের মধ্যে রাশিয়ানরাও রয়েছে। এবং এই রাশিয়ানরাই ঠিক সেই একই রাশিয়ান।
এই হাঙ্গেরীয় শাসনব্যবস্থা একটি মানসিক রোগের মামলা। এর পিছনে যে-অমানবিক হিসাব-নিকাশটা রয়েছে তা এরকম: হয়তো তারা আমার মেয়েকে আগেই মেরে ফেলেছে, তবুও আমি সেটাই মেনে নেব যদি এতে করে তারা আমার মাকে হেনস্থা না করে। কিন্তু তারা সেই নারীর ক্ষতি করবে। তারা দুজনকেই মেরে ফেলবে। এটা বোঝা কি এত কঠিন?
হরি কুনজরু:“An Angel Passed Above Us” গল্পটি কাদা-ভরা ট্রেঞ্চে মৃত্যু পথযাত্রী দুই ব্যক্তির কাহিনি অনুসরণ করে; তাদের মধ্যে একজন অন্যজনকে প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের চমক দেখিয়ে দেয়ার এক ধরনের রূপকথা বলছে। সেই রূপকথা এবং দু’জন মৃত্যুর মুখে থাকা মানুষের বাস্তবতার মধ্যে তীব্র বৈপরীত্য রয়েছে। দ্রুত অগ্রসরমান বিশ্বকে ঘিরে যে প্রযুক্তিগত আশাবাদের সুর গল্পটিতে আছে, সেটিকে কার্যত খাটো করে দেয়। আপনি কেন এই দুটি উপাদান একসাথে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন, একটু বলুন।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমার চোখের সামনে এক নোংরা, নরকীয় যুদ্ধ উন্মোচিত হচ্ছে। পৃথিবীটা এতে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে; আমি এতে অভ্যস্ত হতে পারব না। মানুষের মানুষকে হত্যা করাকে আমি মেনে নিতে পারি না। হয়তো আমি নিজে কোনো মানসিক রোগী। এসবই ঘটছে যখন কিনা ডিজিটাল জগতে ভবিষ্যতচিত্র এমন এক অঙ্গীকারকে তুলে ধরছে যেখানে দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতি শীঘ্রই আমাদের একটি সুন্দর নতুন পৃথিবীতে নিয়ে যাবে। এটা পুরোপুরি পাগলামি। একদিকে একেবারে বিশ শতাব্দীর মতো একটি যুদ্ধ লেগে আছে, অন্যদিকে কেউ বলছে আমরা শীঘ্রই মঙ্গলগ্রহে যাচ্ছি। আমি চাই পুতিন ও তাঁর অনুরাগীরাই প্রথম যাত্রী হোক।
হরি কুনজরু: আপনার গল্পকথক যে-ব্যাপারটিতে বেশি জোর দেয় তাহলো “সে ভবিষ্যতের ব্যাখ্যাকারী নয় , বরং ঘটনা, তথ্য ও ধারাগুলোর ব্যাখ্যাকারী।” সে “মহাজাগতিক স্তর” এবং ব্যক্তিগত “মনস্তাত্ত্বিক স্তর” অস্বস্তি বোধ করে। সে সামাজিক স্তরটাই বেশি পছন্দ করে। এই ধরনেন অভিজ্ঞতামূলক(empirical) তথ্যভিত্তিক জ্ঞানের চেয়ে “ভবিষ্যত” সম্পর্কে জ্ঞানটা অধিকতর আধ্যাত্মিক বা অধিবিদ্যক কিছু?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: এটা বেশ অস্বস্তিকর প্রশ্ন। সর্বোপরি, এই লেখায় ঘটনাগুলি কোনও সাধারণ প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত হয়নি; বরং, একজন আহত মানুষ আরেকজন, মারাত্মকভাবে আহতকে জীবিত রাখার চেষ্টা করছে আশার কথা বলে - একটি সুন্দর নতুন পৃথিবীর কথা বলে যেখানে সবকিছু হবে অন্য রকম, যেখানে সবকিছুই হবে চমৎকার। একটি মৌলিক মানবিক প্রবৃত্তি তাকে অন্যকে সান্ত্বনা দিতে প্ররোচিত করে। তাদের অন্য কোন আশা নেই, এমনকি যিনি ডিজিটাল ভবিষ্যতের গল্প বলছেন তিনিও জানেন যে তিনি কেবল সময়ের জন্য অপেক্ষা করছেন, আশা করছেন যে তাদের সহযোদ্ধারা তাদের জন্য ফিরে আসবে - যদিও অন্যজনের মতোই, সেও জানে তাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি অসম্ভব। সুতরাং, এই ভাষণের কোন আধ্যাত্মিক বা আধিভৌতিক মাত্রা নেই; আসলে, এটি গভীরভাবে বাস্তবসম্মত এক ব্যাপার: নিরর্থক আশার পরামর্শ দিয়ে আরও গুরুতর আহত মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা।
হরি কুনজরু: এই প্রেক্ষাপট — একটি নৃশংস পার্শ্ববর্তী যুদ্ধে প্রথম সারি — আপনার লেখায় কোনোভাবে পরিচিত। আমি জানি সণ্টাগ আপনাকে “প্রলয়ের উৎকৃষ্ট শিল্পী” হিসেবে অভিহিত করেছেন, এবং সেই বিবরণ আপনার রচনায় স্পষ্ট। তবে যদি আপনার লেখার বিষয় হয় প্রলয়ের অভিজ্ঞতা, তাহলে তা হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা বলে মনে হবে না; বরং তা ধীর এবং ক্ষয়িষ্ণু কিছু বলে মনে হবে। ভবিষ্যতের সাথে আমাদের সম্পর্কটা তাহলে কী? এসবই কি তাহলে সময়ের শেষ? নাকি আমরা মহাপ্রলয়ী ঘটনার পরে বাস করছি?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: নিউ টেস্টামেন্টের শেষ বিচারের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে, সর্বনাশ কোনো একক ঘটনা নয়। সর্বনাশ একটি প্রক্রিয়া যা বহুদিন ধরেই চলছে এবং বহুদিন চলবে। সর্বনাশ এখনই চলছে; এটি একটি চলমান বিচার।
আমরা নিজেদেরকে কেবল ভবিষ্যতের সাথে গুলিয়ে ফেলছি; আশা সবসময়ই ভবিষ্যতের অংশ। কিন্তু ভবিষ্যত কখনো আসেনা; তা সব সময় কেবল আসার কথা হিসেবে থেকে যায়। কেবল যা এখন আছে, সেটাই বাস্তব।
আমরা অতীত সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলতে পারি না, কারণ আমরা যাকে অতীত বলি তা আসলে অতীতের একটি গল্প মাত্র। বাস্তবে বর্তমানও এক ধরনের গল্প; তাতে অতীতের গল্প ও ভবিষ্যতের গল্প—দুটোই মিশে থাকে, যেগুলো সম্পূর্ণরূপে কখনো ঘটবে না। তবু অন্তত আমরা যা ‘বর্তমান’ হিসেবে জীবনযাপন করছি তা বাস্তব এবং কেবল সেটাই আছে। নরক ও স্বর্গ—উভয়ই পৃথিবীর মধ্যেই বিরাজমান, এবং সেগুলো এখন এখানেই বর্তমান; এগুলোর জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। তবুও আমরা নিজেদের সান্ত্বনা দিতে আশার কথা বলি।
হরি কুনজরু: আপনি শিল্প নিয়ে প্রচুর লিখেছেন, বিশেষত Seiobo There Below-এ । ভবিষ্যতে শিল্পের ভূমিকা কী — ভবিষ্যত কল্পনা করা আর তা বাস্তবে আনা — এসব ক্ষেত্রে শিল্পের কী অবদান আছে? শিল্পের মধ্যে কি কোনো রকম উদ্ধারকারী বা মোক্ষদায়ক শক্তি রয়েছে?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: শিল্প মানবজাতির অসাধারণ প্রতিক্রিয়া; এটি আমাদের নিয়তিকে অনুভূতির প্রতি আমাদের উত্তর। সৌন্দর্য আছে। তা এমন এক সীমানার ওপরে অবস্থিত যেখানে আমরা নিয়মিত থমকে যাই; আমরা সৌন্দর্যকে আকড়ে ধরা বা স্পর্শ করার জন্য আর এগোতে পারি না — কেবল সেই সীমানা থেকে তাকিয়ে বলি, হ্যাঁ, দূরে সত্যিই কিছু আছে। সৌন্দর্য একটি নির্মাণ; এটি আশা ও উচ্চতর শৃঙ্খলার এক জটিল সৃষ্টি।
হরি কুনজরু: আমরা আগেও কথা বলেছি যে সাহিত্যিক চরিত্ররা লেখকদের মাধ্যমে পৃথিবীতে উপস্থিত হয়ে কিভাবে অস্তিত্ব লাভ করে। দ্য প্যারিস রিভিউ-এর এক সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন, “তথাকথিত চিরন্তন কল্পকাহিনীর প্রতিটি চরিত্র সাধারণ মানুষের মধ্য দিয়েই এসেছে। এটি একটি গোপন প্রক্রিয়া, তবে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত যে এটি সত্য।” আপনি কি এ বিষয়ে বিশদে বলতে পারেন?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: কেবল সাধারণ মানুষই বিদ্যমান। এবং তারা পবিত্র।