Published : 15 Jun 2026, 06:15 PM
অর্থবছরের শেষ সময়ে সম্পূরক বাজেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয়ের অনুমোদন নেওয়ার প্রচলিত প্রক্রিয়া নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য।
তাদের বক্তব্য হলো, সরকার আগে ব্যয় সম্পন্ন করে পরে সংসদের অনুমোদন চাইছে, ফলে সংসদের কার্যকর নজরদারি ও অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা অনেকটাই ‘আনুষ্ঠানিকতায়’ সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসে।
এদিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সম্পূরক বাজেটের ২৫টি মঞ্জুরি দাবির ওপর ভোট শুরু হয়।
স্পিকার বলেন, এসব দাবির বিপরীতে ২০ জন সংসদ সদস্য ৩০৪টি ছাঁটাই প্রস্তাবের নোটিস দিয়েছেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে ২৭টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ বাড়ানো হয় ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। একই সময়ে ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বরাদ্দ কমানো হয় ৫৯ হাজার ৩৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
‘এই প্র্যাকটিস বন্ধ হওয়া দরকার’
সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনার শুরুতেই ঢাকা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন খরচের পর অনুমোদন নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, “সম্পূরক বাজেটের উপরে যে খরচ করে এর পরে অনুমোদন নেওয়া— এই প্র্যাকটিসটা আমার মনে হয় বন্ধ হওয়া দরকার। এটা দেশের জন্য, দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হবে।”
পরিকল্পনা বিভাগের মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনায় পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমানও একই ধরনের প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, সংবিধানের ৯১ অনুচ্ছেদের আওতায় সরকার অতিরিক্ত ব্যয় করে পরে তা সম্পূরক বাজেট হিসেবে সংসদে অনুমোদনের জন্য আনে।
“তিনি খরচ করবেন, তারপরে এটা রাবার স্ট্যাম্পের মতো সম্পূরক বাজেট হিসেবে সংসদে পেশ করা হবে। আমাদের পাস করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।”
মার্চে কেন নয়?
সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯-এর প্রসঙ্গ তুলে নাজিবুর রহমান বলেন, আইনে সংশোধিত বাজেট ‘যথাসম্ভব’ মার্চ মাসের মধ্যে পেশ করার কথা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন,, “‘যথাসম্ভব’’এই শব্দটার অপব্যবহার করে সম্পূরক বাজেট কখনোই মার্চ মাসে দেওয়া হয় না।”
কেন মার্চ মাসে সম্পূরক বাজেট আনা হলো না, সেই ব্যাখ্যা সরকারের দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
“মার্চ গেল, এপ্রিল গেল, মে গেল; দুইটা মাসেও সম্পূরক বাজেট দিতে ব্যর্থ হলো। জুন মাসে এসে সম্পূরক বাজেট দিল।”
একই সঙ্গে আইনে ‘যথাসম্ভব’ শব্দটি রাখার যৌক্তিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ করেন তিনি।
‘আগে অনুমোদন, পরে খরচ’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনায় বাগেরহাট-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আবদুল আলিম বলেন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে সম্পূরক বাজেটের প্রয়োজনই পড়ত না।
তিনি বলেন, “আগে খরচ, তারপরে অনুমোদন, এই রীতি চালু হয়েছে। আমি আপনার মাধ্যমে এই মহান সংসদে উত্থাপন করতে চাই, আগে অনুমোদন, তারপরে খরচ।”
তার মতে, অর্থবছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ায়।
সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, খরচের আগে সংসদের অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে সংসদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হতো।
“আমিও বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রীয় খরচ যা কিছু, সেটা আগেই সংসদে অনুমোদন নেওয়া উচিত। তবে নানা কারণে এটা হয়তো সম্ভব হয় না।”
স্পিকার বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই সম্পূরক বাজেট একই পদ্ধতিতে পাস হয়ে আসছে এবং এটি এক ধরনের সংসদীয় রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।
“প্রত্যেকটি আইটেম খরচের আগে যদি সংসদে অনুমোদন নেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে ভালো হতো। সংসদের সার্বভৌমত্ব আরও দৃঢ়তর হতো। ভবিষ্যতের জন্য সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করে দেখতে পারি।”
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, মার্চ মাসে সম্পূরক বাজেট দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়, কারণ অর্থবছরের শেষ দিন পর্যন্ত ব্যয় অব্যাহত থাকে।
তিনি বলেন, “মার্চের পরে এপ্রিল, এপ্রিলের পরে মে এবং তারপরে জুন। জুন মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত টাকা খরচ হয়। কাজেই সম্পূরক বাজেট কখনোই মার্চ মাসে দেওয়া যাবে না। এটা দিতে হবে জুন মাসে।”
সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতেই কোন কোন মন্ত্রণালয়ের দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব আলোচনা হবে, তা নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নূরুল ইসলাম বলেন, “জাতীয় স্বার্থে যদি আমরা একত্রিত হই, এটার দোষের কিছু নেই।”
সময় বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন
ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত রাখার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন বিরোধী সদস্য।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, বাইরে এমন বার্তা যাওয়া উচিত নয় যে বিরোধী দল আলোচনা ছাড়াই সবকিছু মেনে নিচ্ছে।
“আমরা বিরোধী দল হিসেবে এখানে ভূমিকা রাখতেছি। আমরা জনগণের জন্য কথা বলতেছি।”
জবাবে স্পিকার বলেন, সব সদস্যকে বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হলে বাজেট অধিবেশন কয়েক মাস ধরে চলতে হবে। সংসদীয় কার্যক্রম সচল রাখতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তিনি জানান, বিরোধী দলের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে, বাকি দাবিগুলো সরাসরি ভোটে নিষ্পত্তি করা হবে।
সংবিধানের ৮৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়যুক্ত ব্যয় আলোচনা করা গেলেও তা ভোটের আওতাভুক্ত নয় বলে মন্তব্য করেন স্পিকার।