Published : 12 Oct 2025, 01:33 AM
Tuskar Rock Press থেকে লাসলো ক্রাসনাহোরকাই-এর গল্পের একটি সংকলন The World Goes On শিরোনামে ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে একাধিক অনুবাদক অংশগ্রহণ করেছেন। এখানে অনূদিত গল্পটি ২০১৩ সালে প্রকাশিত ওট্টিলি মুজলেট-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন কবি ও অনুবাদক বিনয় বর্মন। পুরো গল্পটি যদিও একটি মাত্র বাক্যে রচিত, কিন্তু বাংলাভাষার পাঠকদের বোধগম্যতার স্বার্থে অনুবাদ বাক্যাংশগুলোকে খণ্ড খণ্ড বাক্যে ভাগ করে নিয়েছেন। বাংলা ভাষায় নানান রকম যতিচিহ্নের ব্যবহারে দীর্ঘ বাক্য রচনার রীতি প্রায় নেই বলে মূল লেখকের বাক্যের যতিচিহ্নকে বাংলায় খানিকটা বদলে নিয়ে সরল বাক্যে তর্জমা করতে হয়েছে। বি.স.
অনুবাদ: বিনয় বর্মন
আমাকে জায়গাটা ত্যাগ করতে হবে। জায়গাটা কোনোভাবেই থাকার উপযোগী নয়। জায়গাটা অসহ্যরকম শীতল, বিষণ্ণ ও অন্ধকার। এখান থেকে পালাতেই হবে। সঙ্গে সুটকেস নিতে হবে, দুটো সুটকেস। সবকিছু সুটকেসে ভরতে হবে। তারপর ছুটতে হবে মুচির কাছে। জুতোর তলা ঠিক করতে হবে। এ পর্যন্ত কতবার যে জুতোর তলা বদলেছি। একজোড়া উত্তম বুটজুতা লাগবে। সুটকেস আর বুটজুতা সম্বল করে বেরিয়ে পড়তে হবে। এটাই প্রথম কাজ। এর জন্য সক্ষমতা দরকার। আমরা ঠিক কোথায় আছি তা নির্ধারণের জন্য বাস্তবিক জ্ঞান দরকার। কেবল দিকবুদ্ধি নয়, কিংবা নয় কোনো হৃদয়ের গভীরে বসে থাকা রহস্যজনক বস্তু। এই জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা সঠিক দিক নির্দেশনা পাবো। আমাদের বোধবুদ্ধি থাকতে হবে। এটা হাতে দিকনির্দেশ যন্ত্র থাকার মতো। যন্ত্রটি আমাদের সাহায্য করবে। এই মুহূর্তে আমরা একটি বিশেষ স্থানে আছি। একটি পথসন্ধিতে। জায়গাটা অসহ্যরকম শীতল, বিষণ্ণ ও অন্ধকার। ভয়ঙ্কর। জায়গাটা ত্যাগ করতে হবে। এখানে কেউ থাকতে পারে না। এই স্যাঁতসেতে অন্ধকারে কেবল একটিই ভাবনা: পালাও। এখনি। অন্যকিছু ভাবার দরকার নেই। পিছনে তাকাবে না। কেবল নির্ধারিত পথে সামনে এগিয়ে যাবে। দৃষ্টি সামনে, সঠিক পথে, নিবদ্ধ। এই পথ নির্ধারণ কোনো কষ্টকর কঠিন কাজ নয়। যদি না এটা প্রতীয়মান হয় যে আমাদের জ্ঞান ও বোধবুদ্ধি বেদনা ও মরনশীলতার মধ্য দিয়ে সমন্বয়বিন্দু খুঁজে বের করার সময় হঠাৎ বলে ওঠে: “সাধারণ পরিস্থিতি”। এর অর্থ হলো এখান থেকে আমাদের অন্য কোথাও যেতে হবে। আমরা বলতে পারি, এই দিকটা অথবা এর বিপরীত দিকটা সঠিক। আবার কিছু “অসাধারণ পরিস্থিতি” আছে যেখানে আমাদের মূল্যবান জ্ঞান ও বোধবুধি জানিয়ে দেয় যে আমরা যে পথটি বেছে নিয়েছি সেটি ভাল। সামনে এগিয়ে যাও, এই পথে। বিপরীত পথটিও ভাল, সে পথেও যেতে পারো। এভাবেই চলৎনিশ্চলতা তৈরি হয়। এখানে একটি লোক, তার হাতে সুটকেস ও পায়ে নতুন শুকতলাযুক্ত বুটজুতা। সে যদি ডানে যায়, তবে কোনো ভুল হবে না। যদি বামে যায়, তাতেও ভুল হবে না। বাস্তব বোধ অনুযায়ী বিপরীত দুটি পথই সঠিক। এর কারণও আছে। কারণটি হলো পথনির্দেশক বাস্তবিক জ্ঞান এখন আকাঙ্ক্ষার নির্দেশে কাজ করছে। এজন্য “ডানে যাও” যেমন সঠিক, “বামে যাও”ও সঠিক। আকাঙ্ক্ষার নিরিখে দুটো দিক দূরবর্তী স্থান নির্দেশ করে, এখান থেকে সবচেয়ে দূরের স্থান। যেখানে যাওয়াটা বাস্তবিক জ্ঞান, বোধ বা আকাঙ্ক্ষার নির্দেশে ঘটে না। ব্যক্তির চাওয়া কেবল দূরদূরান্তে যাওয়া নয়, বিপুল প্রতিশ্রুতির দেশেও যাওয়া। সেখানে সে নিস্তব্ধতার দেখা পাবে। এটাই আসল ব্যাপার। আকাঙ্ক্ষিত স্থানে এই লোকটার নিস্তব্ধতা দরকার। তাকে চেপে ধরা অবর্ণনীয় নির্যাতক, বেদনাময়, বিকারগ্রস্ত কোলাহল থেকে রক্ষা পাবে সে। সে বর্তমান অবস্থার কথা ভাবে, যাত্রারম্ভের কথা ভাবে, এখন যেখানে আছে তার কথা ভাবে। তাকে এখান থেকে পালাতে হবে। কারণ জায়গাটা অসহ্যরকম শীতল, বিষণ্ণ, অন্ধকার ও ভয়ঙ্কর। কিন্তু এই মুহূর্তে তার নড়ার উপায় নেই। তার ভেতরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। সে উপলব্ধি করে তার হাতপা বাঁধা। এরজন্য দায়ী তার বাস্তববোধ যা একইসঙ্গে দুটি বিপরীত পথের দিশা দেয়। তাকে বলে, এ পথ ত্যাগ করো। কিন্তু কিভাবে একসঙ্গে দুটো বিপরীত পথ ত্যাগ করা যায়? এই প্রশ্ন থেকেই যায়। সে ঘাটে বাঁধা ভাঙাচোরা নৌকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তার হাতে সুটকেসের বোঝা। সে বৈরি পৃথিবীতে নিশ্চলভাবে একদিকে যাত্রা শুরু করে। কোনদিকে, সেটা কোনো বিষয় নয়। এটা যে-কোনো দিক হতে পারে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরও সে এতটুকু টলছে না। বৈরি পৃথিবীতে তার ভ্রমণ শুরু হয়েছে। বাস্তবে সে স্থির, মূর্তির মতো, কিন্তু তার নুয়ে পড়া শরীর এগিয়ে চলে। সবদিকেই তার দেখা মেলে। দিনে তাকে দেখা যায় উত্তরে। সে আমেরিকায় পরিচিত, এশিয়ায় পরিচিত। ইউরোপ এবং আফ্রিকাতেও। সে পাহাড়পর্বত নদীনালা পেরিয়ে যায়। রাতেও সে হাঁটা থামায় না। মাঝে মাঝে থেমে ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নেয়। কিন্তু সে ঘুমের মধ্যেও পশুর মতো, সৈনিকের মতো, কিঞ্চিৎ জেগে থাকে। সে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে না, কারো দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকে না। লোকজন তাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কী করছো? এরকম পাগলের মতো উদাস দৃষ্টি নিয়ে কোথায় চলেছো? বসে একটু বিশ্রাম নাও, চোখ বন্ধ করো। আজকের রাতটা এখানে থেকে যাও। কিন্তু লোকটা বসেও না, বিশ্রামও নেয় না। সে চোখও বন্ধ করে না, রাতও কাটায় না। কোথাও সে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করে না। সে বলে, যদি সে আদৌ কথা বলে, আমাকে পথ চলতে হবে। কোথায় যাবে তা জিজ্ঞেস করা সময়ের অপচয় মাত্র। সে কখনো কাউকে জানায় না কোথায় যাচ্ছে। মুশকিল হলো একটু আগেও সে যা জানতো এখন তা জানে না। হাতে ভারী দুটি সুটকেস নিয়ে সে বৈরি পৃথিবীতে এগিয়ে চলে। সে এগিয়ে চলে বটে, কিন্তু আদতে তার ভ্রমণ কোনো ভ্রমণই নয়। পথে তার কোনো ভ্রমণ হয় না। সে যেন এক করুণ প্রেতাত্মা যাকে কেউ ভয় পায় না। বাচ্চারাও নয়। মন্দিরে তার নাম উচ্চারিত হয় না যাতে সে শহর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। সে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়, আর পথিকেরা তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। কারো কারো চোখেমুখে বিস্ময়, আরে, এই লোকটা আবার এখানে! কারণ তাকে বারবার দেখা যায়, আমেরিকা ও এশিয়ায়, ইউরোপ ও আফ্রিকায়। মানুষের ধারণা, সে কেবল চক্রাকারে ঘুরছে। ঘড়ির দ্বিতীয় কাটার মতো সারা পৃথিবী চক্কর দিচ্ছে। প্রথম প্রথম কেউ কেউ আগ্রহ নিয়ে তাকাতো, কিন্তু দ্বিতীয়, তৃতীয় অথবা চতুর্থবার দেখার পর সকলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। লোকজন আর প্রশ্ন করছে না, থাকতে বলছে না, কিংবা তাকে বাসায় ডেকে নিয়ে আপ্যায়ন করছে না। তারা হয়তো নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করেছে, হচ্ছেটা কী! নিশ্চিত তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। কারণ ঘড়ির কাটার মতো সে কিছু নির্দেশ করে না। তার কোনো তাৎপর্য নাই। পৃথিবীর কাছে সে মূল্যহীন। সে চলছে, কিন্তু পৃথিবীর কাছে তা কোনো গুরুত্ব বহন করে না। এক সময় কেউ আর তাকে লক্ষই করলো না। সে হারিয়ে গেলো, মনে হয় বাষ্প হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেলো। পৃথিবীর কাছে সে অস্তিত্বহীন। মানুষ তাকে ভুলে যায়, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সে বাস্তবে অনুপস্থিত। অক্লান্তভাবে সে আমেরিকা এশিয়া আফ্রিকা ইউরোপ ঘুরে বেড়াতে থাকে। তার সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্ক ভঙ্গুর। ক্রমে সে বিস্মৃত, অদৃশ্য হয়ে যায়। আর এভাবেই সে পুরোপুরি একা হয়ে পড়ে। আর তখন থেকেই সে লক্ষ করে, জায়গায় জায়গায় অবিকল তার মতো দেখতে মানুষ। মাঝে মাঝে সে তাদের মুখোমুখি হয়েছে, মনে হয়েছে আয়নায় তারই প্রতিবিম্ব। প্রথমে সে চমকে উঠেছে, দ্রুত সেই অঞ্চল ত্যাগ করেছে। তারপর ধীরে ধীরে সে তাদের কথা ভুলে যেতে থাকে। সে আর তার অবিকল অবয়বের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার অন্য অবয়বের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে এটাও পরিস্কার হয় যে তাদের সুটকেসগুলোও তার নিজের মতো। তাদেরও তার মতো বাঁকা পিঠ। সবকিছু একই রকম। সুটকেসের বোঝা নিয়ে হাঁটা, এ-রাস্তায় ও-রাস্তায় টেনেহেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া। তারা যেন রেপ্লিকা। বুটগুলোও একই রকম, নতুন লাগানো শুকতলাসহ। একবার দোকানে পানি খেতে গিয়ে সে লক্ষ করেছে, তাদের জুতার শুকতলাগুলো তার জুতার মতোই উৎকৃষ্ট। এটা দেখে তার রক্ত হিম হয়ে যায় যে হলভর্তি সমস্ত লোক ঠিক তারই মতো দেখতে। সে তাড়াতাড়ি ঢোক গিলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে। সেই শহর আর দেশ ছাড়ে। তারপর থেকে সে কোথাও যাচ্ছে না। তার ধারণা যে-কোনো জায়গায় সে তাদের দেখা পাবে। সে তাদের এড়িয়ে চলতে চায়। সে একা হয়ে যায়। তার ঘোরাঘুরি শেষ হয়। এরপর থেকে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। তার মনে হয়, নিজেকে গোলকধাঁধায় বন্দি করলে সে তাদেরকে এড়াতে পারবে। আর তখন থেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু হয়। সে অপ্রত্যাশিত জায়গায় অপ্রত্যাশিত সময়ে ঘুমাতে থাকে। সংক্ষিপ্ত হালকা ঘুম। কিন্তু সে ঘুমালে প্রতিবারই একই স্বপ্ন দেখে। খুঁটিনাটি সব এক। তার চোখের সামনে ভাসে বিশাল ঘড়ি, বা চাকা, অথবা কোনো ঘুরন্ত কর্মশালা। ঘুম থেকে জেগে সে বুঝে উঠতে পারে না, সে ওরকম কোনোকিছুর সামনে কীনা। সে ঘড়ি, চাকা বা কর্মশালার মধ্যে প্রবেশ করে। মধ্যিখানে দাঁড়ায়। সারাজীবনের অবর্ণনীয় ক্লান্তি নিয়ে সে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে। যেন তাকে কেউ গুলি করেছে। সে বহুতল ভবনের মতো চূরমার হয়ে ভেঙে পড়ে। সে একপাশে কাত হয়ে পড়ে। সে শুয়ে থাকে যেন শেষ পর্যন্ত মৃত পশুর মতো ঘুমাতে পারে। স্বপ্নটা বারবার ফিরে আসে। সে এদিক-সেদিক তাকায়, তবু স্বপ্ন তাকে ছাড়ে না। স্বপ্নের মধ্যে একই খুঁটিনাটি। তার অন্যকিছু দেখা দরকার। সে ঘুরছে আর ঘুরছে, মনে হয় শত শত বৎসর ধরে। সে চিরকাল ঝুলে আছে। মাথা তুলে দেখে, এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। দুই হাতে দুই সুটকেস। পায়ে নতুন শুকতলা লাগানো বুট। জুতা আকারের মাটির টুকরার সঙ্গে সে গেঁথে আছে। এখান থেকে তার নড়ার সম্ভাবনা নেই। চিরকাল তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। একইসঙ্গে দুই দিকে তার হাতপা বাঁধা। সময়ের সমাপ্তি পর্যন্ত সে দাঁড়িয়েই থাকবে। এটাই তার গৃহ। এখানেই তার জন্ম। একদিন এখানেই তার মৃত্যু হবে। এই গৃহে সবকিছু শীতল ও বিষণ্ণ।