Published : 19 Feb 2021, 01:45 PM

নানা কারণে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলো ১৯৪০-এর দশক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিলো তার ঠিক আগে—১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। অবশ্য তখনই তার আঁচ লাগেনি ভারতবর্ষে। কিন্তু সমগ্র দেশে প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলো ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন। এই আন্দোলনকে আরও জোরদার করেছিলো গান্ধীজীর 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন (অগস্ট ১৯৪২)। সাম্প্রদায়িক হানাহানিও বঙ্গদেশের রাজনীতিকে জটিল করে তুলেছিলো। ১৯৪০ সাল থেকে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গড়ে তোলার যে-আন্দোলন শুরু হয়েছিলো, তা হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছিলো।
এ সময়ে শিক্ষিত হিন্দু যুবকদের বেকারত্বও একটা মস্তো সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। এর জন্যে হিন্দুরা সরকারকে দায়ী না-করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়কেই দায়ী করেছিলো। অথচ সরকারকেই দায়ী করার কথা। কারণ সরকার একটি আইন করেছিলো যে, সমান যোগ্যতা থাকলে হিন্দু প্রার্থীর বদলে মুসলমান প্রার্থীকে চাকরি দেওয়া হবে। সরকারের যুক্তি ছিলো এই যে, এর ফলে চাকরির ক্ষেত্রে হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে-পড়া মুসলমানদের বৈষম্য কমে আসবে।
তদুপরি, ১৯৪৩ সালের দ্বিতীয় ভাগে দেখা দিয়েছিলো এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। একে তেতাল্লিশের মন্বন্তর বলা হলেও, এই দুর্ভিক্ষ চলেছিলো ৪৪ সাল পর্যন্ত। বঙ্গদেশে এ রকমের ভয়ানক দুর্ভিক্ষ দীর্ঘকালের মধ্যে হয়নি। এই দুর্ভিক্ষের ফলে কতো লোক প্রাণ হারিয়েছিলো, তা থেকে এর তীব্রতা খানিকটা বোঝা যাবে। তখন বঙ্গদেশের লোকসংখ্যা ছিলো ছ কোটি। তার মধ্যে ২১ লাখ লোক এই দুর্ভিক্ষের ফলে প্রাণ হারায়। এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, এমন দুর্ভিক্ষ বঙ্গদেশে এর আগে হয়েছিলো ১৭৭০-এর দশকে। তার নাম ছিলো ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। সে দুর্ভিক্ষ হয়েছিলো প্রধানত ফসল ভালো হয়নি বলে। কিন্তু তেতাল্লিশের মন্বন্তর ছিলো পুরোপুরি মানুষের সৃষ্টি। কারণ ১৯৪১ সালের তুলনায় এ বছর ফসলের উৎপাদন শতকরা ন ভাগ বেশি হয়েছিলো।
এর আগে জাপানী সৈন্যরা বর্মা দখল করেছিলো। বিজয়ী জাপানীরা বঙ্গদেশের পুব দিক থেকে হামলা চালাতে পারে, এই ভয়ে ইংরেজ সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অংশত অকেজো করে দিয়েছিলো। সরকার যেসব ব্যবস্থা নিয়েছিলো, তার মধ্যে ছিলো বিশেষ করে বরিশাল, খুলনা এবং মেদিনীপুর জেলার যেসব নৌকায় দশজন পর্যন্ত লোক উঠতে পারে, সেগুলো ভেঙে ফেলা অথবা বাজেয়াপ্ত করা। একমাত্র তমলুকেই আঠারো হাজার নৌকো ভেঙে ফেলা হয়েছিলো। উদ্বৃত্ত ধান-চালও বাজেয়াপ্ত এবং আটক করেছিলো। এই সুযোগে ব্যাপক হারে দেখা দিয়েছিলো কালো-বাজারি। মজুদদারগণ বিশাল পরিমাণ ধান-চাল গোপনে মজুদ করে রাখে। ফলে ১৯৪৩ সালের দ্বিতীয় ভাগে যখন দুর্ভিক্ষ আরম্ভ হয়, তখন সময়মতো সাহায্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি। সরকারের তেমন ইচ্ছে ছিলো বলেও মনে হয় না।
ওদিকে, বেকারত্বের হতাশা শিক্ষিত তরুণদের অনেককে ঠেলে দিয়েছিলো বামপন্থী আন্দোলনের দিকে। অনেকে সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টিতেও যোগদান করেন। যেমন, নাট্যকার ও অভিনেতা বিজন ভট্টাচার্য সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। তিনি ১৯০৬ সালে ফরিদপুরের একটি জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর পিতা ছিলেন স্কুলের শিক্ষক। বিজন অল্পবয়স থেকেই বামপন্থী ভাবধারায় বিশ্বাস করতেন। তাঁর বয়স যখন বছর তিরিশ তখনই তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। ১৯৪২ সালের 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের পটভূমিতে তিনি একটি নাটক রচনা করেন।
মূলধারা কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি ছাড়াও, চল্লিশের দশকে বামপন্থী আন্দোলন দেখা দিয়েছিলো নানা নামে। যেমন, ১৯৩৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র মিলে ইউথ কালচারাল ইনস্টিটিউট নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এঁদের লক্ষ্য ছিলো সাংস্কৃতিক কাজের মাধ্যমে বামপন্থী আন্দোলনকে জনপ্রিয় করা। এঁরা বিশেষভাবে গণসংগীতের মাধ্যমে তাঁদের উদ্দেশ্য সফল করতে চান।
এ ছাড়া, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তার আর-একটা বহিঃপ্রকাল ঘটেছিলো ইন্ডিয়ান পীপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন—সংক্ষেপে আইপিটিএ-র নামে। বাংলায় একে বলা হতো 'গণনাট্য আন্দোলন।' এ আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন বহু প্রগতিশীল শিক্ষিত তরুণ। নাটকের মাধ্যমে শুরু হয়েছিলো এ আন্দোলন। তবে নাটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই আন্দোলনে যে-নাটকটি বিশেষ সাড়া জাগিয়েছিলো, সেটি হলো বিজন ভট্টাচার্য লিখিত 'নবান্ন' নাটক। সেটি অভিনীত হয়েছিলো ১৯৪৪ সালে। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে এ নাটকটি রচিত হয়েছিলো। তুলসী লাহিড়ী তাঁর 'ছেঁড়া তার' নাটিকাও রচনা করেছিলেনে এই দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে।
তেভাগা আন্দোলন এই দশকের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একটা সময় ছিলো যখন ফসল কেটে তা তোলা হতো জমির মালিকের বাড়িতে। তখন বর্গা-চাষীরা পেতো উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের এক ভাগ। আর দু ভাগই থাকতো জমির মালিকের। কিন্তু এই অন্যায্য ভাগ সম্পর্কে চাষীদের সচেতন করে তুলেছিলেন বামপন্থীরা। সেই সচেতন ও সংগঠিত চাষীরা দাবি করেন যে, ফসল তোলা হবে চাষীর বাড়িতে এবং বর্গাচাষী পাবেন ফসলের তিন ভাগের দু ভাগ। এই দাবিতে খুলনা থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা জুড়ে আন্দোলন শুরু হয় ১৯৪৬ সালের শেষ দিকে, ধান কাটার মরসুমে। আর এ আন্দোলন শেষ হয় পরের বছরের প্রথম ভাগে। এই উপলক্ষে সলিল চৌধুরী লিখেছিলেন 'হেই সামালো ধান হো' গানটি। হেমাঙ্গ বিশ্বাসও সলিল চৌধুরীর মতো কাস্তে শান দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তাঁর একটি গানে:
তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান, কিষান ভাই রে
তোমার কাস্তেটারে দিও জোর শান
ফসল কাটার সময় হলে কাটবে সোনার ধান
দস্যু যদি লুটতে আসে কাটবে তাহার জান রে
তেভাগা আন্দোলন ব্যাপক সাড়া জাগালেও, অল্পসময়ের মধ্যেই তা শেষ হয়ে গিয়েছিলো।
এই দশকে বঙ্গদেশ সরকারের প্রধান মন্ত্রী ছিলেন প্রথমে এ কে ফজলুল হক, তারপর মুসলিম লীগ-নেতা খাজা নাজিমুদ্দীন এবং তাঁর পর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি। কিন্তু ব্যবস্থাপক সভায় তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিলো না। তাই তাঁদের জোট বাঁধতে হয়েছিলো কোনো না কোনো অমুসলিম দলের সঙ্গে। এ সময়ে কলকাতায় মাঝেমধ্যেই সাম্প্রদায়িক দাঙা হতো। মোট কথা, হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক চরম তিক্ত হয়ে ওঠে। মুসলিম লীগ সরকার প্রমাণ করতে চায় যে, হিন্দু ও মুসলমানদের পক্ষে একত্রে অথবা এক দেশে বাস করা অসম্ভব। মুসলমানদের চাই একটা স্বাধীন দেশ। যেন এই দাবির পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ দেওয়ার জন্যেই ১৯৪৬ সালের অগস্ট মাসে কলকাতায় এবং তারপর নোয়াখালিতে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে দারুণ রক্তক্ষয়ী দাঙা শুরু হয়। এবং এর ঠিক এক বছর পরে দেশবিভাগ হয় এবং পূর্ব পাকিস্তান নামে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড তৈরি হয়। তারপর পূর্ব পাকিস্তান থেকে হিন্দুরা, বিশেষ করে শিক্ষিত হিন্দুরা, দেশত্যাগ করতে আরম্ভ করে। দেশত্যাগের গতি বৃদ্ধি পায় ১৯৫০ সালের রক্তক্ষয়ী দাঙার পর। এক-তরফা এই দাঙা ছিলো কার্যত হিন্দু-খেদাও দাঙা।

চল্লিশ দশকের এই বিক্ষুব্ধ পটভূমিতে আইপিটিএতে অর্থাৎ বামপন্থী থিয়েটার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন কিছু মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাঁরা সবাই নাটক লিখতেন না, অথবা অভিনয়ও করতেন না। অনেকে কেবল গান রচনা করতেন। যেমন সলিল চৌধুরী এবং হেমাঙ্গ বিশ্বাস। অনেকে শুধু গান গাইতেন। যেমন, দেবব্রত বিশ্বাস। এঁরা গণনাট্যের পাশাপাশি গড়ে তোলেন গণসংগীতের আন্দোলন। গণসংগীতের সূচনা অবশ্য হয়েছিলো এর দু দশক আগে—১৯২৬ সালের প্রথম দিকে। বাংলা ভাষায় প্রথম গণসংগীত রচনা করেছিলেন নজরুল ইসলাম। তিনি ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে তিনটি গান লেখেন যা তাঁর আগেকার গান থেকে আলাদা। এগুলো দেশাত্মবোধক গান নয়, গণসংগীত। গান তিনটি হলো 'ওঠ রে চাষী জগৎ-বাসী ধর কষে লাঙল' [কৃষকের গান], 'ধ্বংসপথের যাত্রীদল / ধর হাতুড়ি তোল কাঁধে শাবল' [শ্রমিকের গান] আর 'আমরা নীচে পড়ে রইব না আর শোন রে ও ভাই জেলে' [জেলেদের গান]।
আইপিটিএ এবং গণসংগীত আন্দোলন নামেই বামপন্থী আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিলো না। বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের কেউ কেউ সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। যেমন, নাম-করা সংগীতজ্ঞ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্র যোগদান করেন ১৯৩৯-৪০ সালে। তাঁর পিতা ছিলেন পাবনা জেলার একজন জমিদার। জ্যোতিরিন্দ্র্রনাথের জন্ম ১৯১১ সালে। ছেলেবেলা থেকে তিনি নানা ধরনের সংগীত শেখেন। তার মধ্যে একদিকে ছিলো উচ্চাঙ্গ সংগীত, অন্যদিকে ছিলো রবীন্দ্রসংগীত এবং লোকসংগীত। তা ছাড়া, তিনি পাশ্চাত্য সংগীতেরও উৎসাহী শ্রোতা ছিলেন। তাঁর 'নবজীবনের গানে' তিনি উচ্চাঙ্গ সংগীতের সঙ্গে পাশ্চাত্য সংগীতের সমন্বয় ঘটানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন।
দেবব্রত বিশ্বাসের পিতা ছিলেন কিশোরগঞ্জের একটি সম্পন্ন ব্রাহ্ম পরিবারের সন্তান। তাঁর জন্ম ১৯১১ সালে। তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ না-দিয়ে যোগ দিয়েছিলেন আইপিটিএ অর্থাৎ গণনাট্য সংঘে। তাঁর অতুলনীয় কণ্ঠ এবং এক্সপেশন দিয়ে গণসংগীত এবং রবীন্দ্রসংগীতকে দারুণ জনপ্রিয় করেছিলেন। বিশেষ করে তাঁর কণ্ঠে 'হেই সামালো ধান হো', 'বিচারপতি তোমার বিচার', 'আমার প্রতিবাদের ভাষা' 'অবাক পৃথিবী' ইত্যাদি গানকে জীবন্ত করে পরিবেশন করেছিলেন।
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের পিতাও ছিলেন জমিদার, সিলেটের। হেমাঙ্গ জন্মেছিলেন হবিগঞ্জে, ১৯১২ সালে। তিনি লেখাপড়া শেখেন প্রথমে হবিগঞ্জ স্কুল, তারপর মুরারীচাঁদ কলেজে। ছাত্রজীবনেই তিনি দুবার রাজবন্দী হিসেবে জেল খাটেন এবং সেখানেই যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হন। স্কুল-জীবন থেকে তিনি গ্রামের শ্রমজীবী মানুষদের দুঃখদারিদ্র্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন। এই নিয়ে পিতার সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য মতবিরোধ হয়। তখন থেকেই তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। দরিদ্রদের প্রতি তাঁর দরদ তাঁর গানে গানে প্রকাশ পেয়েছে। যেমন, 'বাঁচবো বাঁচবো রে আমরা বাঁচবো রে বাঁচবো … গোলায় গোলায় উঠবে ধান / গলায় গলায় উঠবে গান।' অথবা 'হায় হায় / ঘোর কলিকাল আইল আকাল সোনার বাংলায় / ক্ষুধার অনল দিকে দিকে ধিকিধিকি ধায়।' তাঁর গানের তিনটি সংকলন আছে।
সলিল চৌধুরীর পিতা ছিলেন আসামের চা-বাগানের ডাক্তার। তিনি পাশ্চাত্য সংগীতের একজন আগ্রহী শ্রোতা ছিলেন। তাঁর সংগ্রহে ছিলো পাশ্চাত্য সংগীতের বহু রেকর্ড। বিশেষ করে সিম্ফনির রেকর্ড। এক কথায়, তিনি ছিলেনে একটি শিক্ষিত সম্পন্ন পরিবারের প্রধান। তাঁর পুত্র সলিল চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৩ সালে। ছেলেবেলা থেকে তিনি পাশ্চাত্য সংগীতের পরিবেশে মানুষ হন। তা ছাড়া, উচ্চাঙ্গসংগীত এবং লোকসংগীতের ব্যাপক প্রভাবও পড়েছিলো তাঁর ওপর। তরুণ বয়সে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগদান করেন। তিনি তাঁর অসংখ্য গান ও কবিতায় সমাজের নীচের তলার লোকের প্রতি তাঁর গভীর দরদ প্রকাশ করেন।
এ রকমের নিবেদিত-প্রাণ বামপন্থী গীতিকার ছাড়াও, চল্লিশের দশকের অন্য অনেক গীতিকারের রচনায়ও বাম রাজনীতি এবং সমাজের নীচের তলার মানুষদের প্রতি আন্তরিক দরদ লক্ষ করা যায়। যেমন, শৈলেন রায়ের 'মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান / লেখা আছে অশ্রুজলে'। অজয় ভট্টাচার্য-রচিত 'দুঃখে যাদের জীবন গড়া, তাদের আবার দুঃখ কি রে!' গানটিও এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এ গানের একটি পংক্তি বিশেষভাবে লক্ষণীয়: তোদের প্রাণে বন্দী হয়ে কাঁদে ভুখা ভগবান।' মোহিনী চৌধুরী এ রকমের আর-একজন গীতিকার। তিনি বামপন্থী ছিলেন না, কিন্তু তাঁর বহু গানে দরিদ্র ও নিপীড়িতদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। যেমন, তাঁর জনপ্রিয় গান: 'আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়, তুমি যে বহ্নিশিখা', 'জেগে আছি একা জেগে আছি কারাগারে … মুক্তির পথে কত বাধা, কত রক্ত' এবং 'পৃথিবী আমারে চায় রেখো না বেঁধে আমায় …শোনো নাকি ঐ আজ দিকে দিকে হায় / কত বধূ কাঁদে, কাঁদে কত অসহায়।' এ রকম মানবিকতা প্রকাশ পেয়েছে পরেশ ধরের গানেও। তাঁর বক্তব্য হলো: 'মোদের গানের অঙ্গনে যদি মানুষ না পায় ঠাঁই / গানের আসর ভেঙে দাও তবে, আমরা সেথায় নাই।'