Published : 19 Jan 2026, 11:48 PM
মহাবিশ্বের দিগন্তবিস্তারী মহাশূন্যতা ফরাসি ভাবুক ব্লেইস পাস্কালের আত্মাকে এতটাই স্পর্শ করেছিল যে তাঁর মনে হয়েছিল এই মহাশূন্যতা তাঁকে গিলে খাচ্ছে (swallows me up like an atom )। এই নিখিল শূন্যতাকে তিনি পরিমাপ করতে গিয়ে এও বলেছিলেন: “প্রকৃতি এক অন্তহীন পরিমণ্ডল যার কেন্দ্র সর্বত্রই, যার পরিধি নেই কোথাও।” ( Nature is an infinite sphere whose center is everywhere, whose sircumference is nowhere.) এই পরিধিহীন সর্বব্যাপী পরিমণ্ডল হোর্হে লুইস বোর্হেসকে ভাবিয়েছিল তার পূর্বসুরী পাস্কালের মতোই। কিন্তু তাঁর ভাবনার বিন্যাস ছিল অন্য রকম।
বোর্হেসকে দুই ধরনের শূন্যতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল: একটা এই বিশ্বজগতের নিখিল শূন্যতা, অন্যটি তার সংস্কৃতির শূন্যতা।
বিশ্বজগতের নিখিল শূন্যতার যে-রূপক তিনি গড়ে তুলেছিলেন আমরা তা দেখতে পাবো তাঁর The Library of Babel গল্পটিতে। এটি মূলত কিংবদন্তী কথিত ব্যাবেল-এর ভাষিক বিশৃঙ্খলার সঙ্গে মহাবিশ্বের শূন্যতাকে বোর্হেস তাঁর স্বভাবসুলভ সৃজনীপ্রক্রিয়ায় মিশিয়ে এক গ্রন্থগারের আদলে উপস্থাপন করেছেন। গল্পটি যাদের পড়া আছে, তাঁদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে গল্পের সেই সূচনা:
“ষড়ভূজ গ্যালারিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এই মহাবিশ্ব( যেটা কারও কারও মতে একটা লাইব্রেরি)। গ্যালারির সংখ্যা অনির্দিষ্ট, হয়তো বা গণনার অতীত। …প্রবেশ পথে একটি আয়না টাঙানো। প্রতিটি দৃশ্যরূপ এতে যথার্থই প্রতিফলিত হয়। এই আয়না থেকে মানুষ ধারণা করতে অভ্যস্ত যে লাইব্রেরি অসীম নয় (যদি তাই হতো তহালে আয়নার পটে এই মিথ্যা অনুকৃতি কেন?); আমি বরং সেই স্বপ্নই দেখতে চাই যে আয়নার ঝকঝকে বুকে অসীমের মিথ্যা হাতছানি…
ভাববাদীরা বলবেন ষড়ভূজ হলগুলো শাশ্বত মহাশূন্যের, অন্তত আমাদের প্রজ্ঞাজনিত শাশ্বত মহাশূন্যের, অনিবার্য রূপ। ” ( বাবেলের গ্রন্থাগার)
গল্পের সূচনাপর্বে বোর্হেস আমাদেরকে মহাশূন্যতার বিশাল গহ্বরে নিক্ষেপ করেন, কিন্তু এই মহাশূন্যতার কারুকার্যময় আদল তিনি তৈরি করেন শিল্পীর নিপুন দক্ষতায়। শূন্যতাকে তিনি হাজির করেন আমাদের জ্ঞানবিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, কিংবদন্তী ও কল্পনার মিশ্র এক রসায়নে, যেমনটা তিনি অন্যসব লেখাতেও করে থাকেন। কিন্তু এই মিশ্রণ নিছক খেয়ালি মনের এলোমেলো রূপ নয়, একে তিনি এমন এক অর্থবোধক বিন্যাসে দাঁড় করান যা বহুস্তরের ব্যঞ্জনায় ভিন্ন ভিন্ন পাঠের পিরামিড হয়ে ওঠে। গল্পের শুরুতেই আমাদের জানিয়ে দেন এটি ষড়ভূজীয় এক গ্রন্থাগার। আমরা গল্পের আরও কিছু দূর এগিয়ে গেলে বুঝতে পারি এই গ্রন্থগার নিজেই আসলে বহু গ্রন্থের সমন্বয়ে একটি মাত্র বিশাল গ্রন্থ। “প্রতিটি বইয়ের সকল ভাষায় অনুবাদ, সব বইয়ের মধ্যে প্রত্যেকটি বইয়ের প্রক্ষেপ।” –অর্থাৎ, সবগুলো বই আসলে একটি মাত্র বইয়ের পুনরাবৃত্তি—ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়; আর সব বই যদি অন্য বইয়েরই ‘প্রক্ষেপ’ হয়, তাহলে সবগুলো আসলে একটি অভিন্ন বই। “প্রত্যেকটা বই একক ও অনন্য, কিন্তু (গ্রন্থাগার যেহেতু সার্বিক) প্রত্যেকটা বইয়ের অসম্পূর্ণ নকল রয়েছে যেটার সঙ্গে মূল বইয়ের তফাৎ মাত্র একটা অক্ষর কিংবা একটা কমা।” বোর্হেস আমাদেরকে আবারও নিশ্চিত করেন--কিছুটা ভাষিক চাতুরির সাথে—বহু গ্রন্থের সমন্বয়ে একটি একক গ্রন্থের অস্তিত্বকে। মহাবিশ্বকে একটি গ্রন্থ হিসেবে দেখার ধারণা নতুন নয়, বোর্হেসের আগেও কোনো কোনো ভাবুক এই ধারণাকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন। যেমন ১২ শতকেই হিউ অব সেন্ট ভিক্টর (Hugh of St Victor) দ্বাদশ শতকে লিখলেন:
“For this whole visible world is a book written by the finger of God, that is, created by divine power; and individual creatures are as figures therein not devised by human will but instituted by divine authority to show forth the wisdom of the invisible things of God.” (Gabriel Josipovici, The World and the Book, The Macmillan Press Ltd, 1979, P 29)

যে-মহাশূন্যতা পাস্কালের আত্মাকে আলোড়িত করেছিল, বোর্হেস অতীতে গিয়ে সেই সূত্রটিকে হাতে তুলে নিতে ভোলেন না: “গ্রন্থাগার হচ্ছে একটা বলয় যার মোক্ষম কেন্দ্র যেকোনো ষড়ভূজ এবং যার পরিধি অনধিগম্য।” পাস্কাল যা বলেছিলেন এ যেন তারই কিঞ্চিত পরিবর্তিত রূপ, এক বোর্হেসীয় সংস্করণ। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই মহাবিশ্বের এই নিখিল শূন্যতার এক ইঙ্গিত। কিন্তু এই নিখিল শূন্যতা বস্তুগত উপাদানহীন শূন্যতা নয়। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানও মনে করে, মহাবিশ্বে আপাত যে-শূন্যতা আমরা দেখতে পাই তা পুরোপুরি শূন্য নয়, এই শূন্যতা ভরে আছে বস্তুগত নানা উপাদানে, যেমন আলোক ও শব্দ তরঙ্গ। বোর্হেস, জড়জগতের অনুসরণে যখন এই শূন্যতাকে তাঁর লেখায় ফুটিয়ে তোলেন, তখন সম্ভাবনা এবং ঘটনাবলী দিয়ে এই ভৌত শূন্যতাকে তিনি কেবল পরিপূর্ণই করে তোলেন না, একই সঙ্গে শূন্যতা এবং অনুপস্থিতির কাব্যিক ধারণার সাথে আকর্ষণীয় এক বৈপরীত্যও তৈরি করেন। তাঁর The Garden of Forking Paths গল্পে আমরা দেখতে পাবো শূন্যতাকে পূরনের আরেক নজির, অনুপস্থিতিকে পূরণের এক দৃষ্টান্ত।
বোর্হেসকে যে বিষয়টি সব সময়ই ভাবিত করেছে তা হলো উপস্থিতি বনাম অনুপস্থিতির রহস্য। এ এমন এক রহস্য যা প্রত্যেক পাঠক নিজের ধরনে ভিন্নভাবে সমাধান করতে পারেন। ফুয়েন্তেস তার এক সাক্ষাতকারে বোর্হেসের এই গল্পটির উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন যে কোনো দাবারু যেমন বলতে পারেন : না দেয়া চালটাও দেয়া চালটার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এই গল্পে বোর্হেস দাবার চালের সেই অদৃশ্য অনুপস্থিতিকে নিপুণ শিল্পকুশলতায় ব্যবহার করেছেন। উপস্থিতির বিপক্ষে অনুপস্থিতির ব্যবহার, এ কেবল তাঁর শিল্পকৌশলই নয়, তাঁর নিজের দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শূন্য জায়গা পূরণ করার পক্ষে এক দার্শনিক অবস্থানও বটে। এ কারণে তিনি নতুন ধরনের আখ্যানের পাশাপাশি তৈরি করেন নতুন শিল্পতত্ত্ব যে শিল্পতত্ত্ব পাঠ আর সৃষ্টির স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করে তোলে। আর তাই The Garden of Forking Paths বা ‘প্ররোহী পথের বাগান’-এ প্রত্যেক পাঠকই ভিন্ন ভিন্ন শাখা প্রশাখায় ঘুরে বেড়াতে পারেন কোনো রকম ধারণাগত প্রতিকূলতা ছাড়াই। পাঠকের জন্য এ হয়ে ওঠে এক মুক্ত রচনা। ‘প্ররোহী পথের বাগান’ সেই প্রেক্ষাপটেরই এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
বোর্হেস এই গল্পে সময়ের প্রতিটি সম্ভাবনাকে ধারণ করেন, কিন্তু এমনও ভাবতে বাধ্য হন যে “সব কিছুই এই মুহূর্তেই ঘটে, একেবারে এই মুহূর্তে। শতাব্দীর পিছে পিছে ধায় শতাব্দী। কিন্তু ঘটনা কেবল বর্তমানকালেই ঘটে…।” “তাই কেবল বর্তমানকালেই আমরা কাহিনী পাঠ করি, এবং গল্প যদি ঘটনার একমাত্র সত্য বৃত্তান্ত বলে দাবীও করে, আমরা পাঠকেরা এ-রকম ঐক্যের প্রয়াসকে ভন্ডুল করে দেই। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো কাহিনীকার কিন্তু গল্পের পরিসরে “একই মহাকাব্যিক অধ্যায়ের” দুটো সংস্করণ পাঠ করেন। অর্থৎ তিনি কেবল প্রথম রক্ষণশীল সংস্করণটিই পড়েন না বরং দ্বিতীয় অরক্ষণশীল সংস্করণও পাঠ করেন। তিনি মহাকাব্যিক অধ্যায় নির্বাচন করেন, কিংবা বলা যায় ইচ্ছে করলে উভয় বা বহু ইতিহাসের অস্তিত্ব একই সঙ্গে ধারণ করেন। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের বিচারে এর অর্থ হলো এই যে বোর্হেসের পাঠক কেবল বিজয়ই পাঠ করেন না, প্রতি-বিজয়ও পড়েন, কেবল সংস্কারই পাঠ করেন না প্রতি-সংস্কারও পড়েন এবং অবশ্যই বোর্হেসীয় রাজনৈতিক বিচারে কেবল বিপ্লবই নয়, প্রতি-বিপ্লবও পাঠ করেন।”( Norman Thomas di Giovanni, The Borges Tradition, Constable London, 1995, P. 68.) আর এই গল্পে ইতিহাসের, সময়ের, ঘটনার, সর্বোপরি মানব অস্তিত্বের বৈপরীত্যপূর্ণ চরিত্রের প্রতিনিধি আলবার্ট আমাদেরকে এও জানান : “সম্ভাব্য অনেকগুলো অতীতের কোনোটিতে আপনি আমার শত্রু ছিলেন, আবার অন্য কোনটিতে ছিলেন আমার বন্ধু।” অর্থাৎ, বর্তমানে যা উপস্থিত নয়, যার অবস্থান অতীতে এবং ভবিষ্যতে, সেই দুই সময়কেও তিনি হাজির করেন এমনভাবে যেন এরা পূর্ণাঙ্গতার স্বার্থেই বর্তমানে এসে হাজির। বোর্হেস কি মনে করছেন না যে অতীত ও ভবিষ্যত ছাড়া বর্তমান নিতান্ত অপূর্ণ? বর্তমানের এই শূন্যতা পূরণের জন্য বোর্হেসকে আবিস্কার করতে হয় Ts-ui Pên নামক কাল্পনিক লেখকের এক কাল্পনিক উপন্যাসের কথা যেখানে অসংখ্য সময়ের প্রবাহের কথা আছে।
বোর্হেসের আগে লাতিন আমেরিকায় তো বটেই, এমনকি অন্য ভাষার সাহিত্যেও ফুয়েন্তেস-কথিত ‘রক্ষণশীল’, ‘বিজয়’, ‘সংস্কার’ ও ‘বিপ্লব’-এর পাঠটাই পড়েছি, এগুলোর বিপরীতে সম্ভাব্য পাঠগুলোর কথা আমরা ভেবেও দেখিনি। বোর্হেস আমাদেরকে দেখিয়ে দিলেন যে ওই সম্ভাব্য পাঠগুলো ছাড়া বাস্তবতা পূর্ণ হতে পারে না, আমাদের বাস্তবতায় এক শূন্যতা থেকে যাবে। এই শূন্যতা পূরণের জন্য তাকে কাল্পনিক এমন সব উপাদানের আশ্রয় নিতে হয় যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবেরই অংশ হয়ে ওঠে।
কিন্তু বোর্হেসকে আরও এক শূন্যতাকেও পূরণ করতে হয়; ঠিক কল্পনা দিয়ে নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া ঐহিত্যের পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে।

বোর্হেসের আগে লাতিন আমেরিকায় স্থানিকতায় (Local color) পূর্ণ সাহিত্যের যে প্রবাহ ছিল তা ছিল সংর্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির, যা জন্ম দিয়েছে আঞ্চলিকতাবাদী বা স্থানিকতাবাদী সাহিত্যের। এবং সন্দেহ নেই, এরা যত সংকীর্ণই হোক না কেন, এখন তারা আর্হেন্তিনিয় ঐহিত্যেরই অংশ। বোর্হেসের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এদের রয়েছে বিরাট পার্থক্য। কিন্তু বোর্হেস এদেরকে পুরোপুরি বর্জন না করে আত্মীকৃত করে নিয়েছেন একেবারে নিজস্ব ধরনে। উনিশ শতকে রচিত গাউচো সাহিত্য, সার্মিয়েন্তোর রচনাসম্ভার, জাতি-রাষ্ট্র গড়ে ওঠার আগে রচিত গৃহযুদ্ধভিত্তিক প্রায় পারিবারিক আখ্যানসমূহ আর আদিবাসী ও বহিরাগত শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে বিরামহীন, রক্তক্ষয়ী ও অন্যায় যুদ্ধের দশকগুলোর ঘটনাপুঞ্জ বোর্হেস নতুনভাবে তুলে নিলেন তার গল্পে ও কবিতায়। এসবই ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর আড়ালে অপঠিত ও অজ্ঞাত অন্ধকারে চলে গিয়েছিল। বোর্হেস-বিশেষজ্ঞ বেয়াত্রিস সার্লো বোর্হেসের এই ভূমিকাটি সম্পর্কে চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে:
“তার লক্ষ্যগুলির একটি ছিল সেই ঐতিহ্যবাহী বিক্ষিপ্ত টুকরোগুলোকে একত্রিত করা এবং তার নিজের লেখায় ইতিমধ্যে হারিয়ে যাওয়া অন্যান্য আর্জেন্টাইনদের লেখাকে পুনরুজ্জীবিত করা।” ( Beatrirz Sarlo, Jorge Luis Borges: A writer at the Edge, Verso, 1993, P 4)
সার্লোর এই উক্তিটি উদ্ধৃত করার উদ্দেশ্য এটাই যে বোর্হেসের পূর্ববর্তী লেখক ও ইতিহাসের ঘটনাপুঞ্জ হারিয়ে যাওয়ায় (disappeared) যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, বোর্হেস তা পূরণ করেছিলেন তাঁর অসামান্য গল্পে, কোনো কোনো প্যারাবলে এবং কবিতায়। তার The Aleph গল্পে এই নিখিল শূন্যতার সমস্ত কিছু একটি মাত্র কোণে ধরতে চাইলেন যেখানে কিনা সবগুলো কোণ এসে মিশেছে। শূন্যতাকে তিনি মানুষের ভাবনার সমস্ত কিছু দিয়ে ভরে দিলেন, যেখানে সবই দৃশ্যমান।
অন্য লেখকদের সাথে তাঁর পার্থক্য এই যে তিনি কেবল শূন্যতার মুখোমুখিই হন না, সেই শূন্যতাকে তিনি ভরে তোলেন তাঁর কল্পনার উপাদানে।
শূন্যতা, যা অনুপস্থিতিরই নামান্তর, সেই অনুপস্থিতির ধারণা বোর্হেসে বলতে গেলে লেখকজীবনের প্রায় শুরু থেকেই ছিল। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গ্রন্থ Fervor de Buenos Aires-এ ‘অনুপস্থিতি’—Ausencio-- শীর্ষক কবিতার শেষ স্তবকে আমরা দেখতে পাবো শূন্যতা তাকে কতটা গ্রাস করেছিল:
কোন গহন প্রান্তে আমি আত্মাকে লুকাবো আমার
যাতে করে তোমার শূন্যতা চোখে পড়বে না
নিশ্চিত ও নির্মম জ্বলজ্বলে
তীব্র এক সূর্যের মতো?
একটি দড়ির মতো আমার গলার চারিপাশে
তোমার শূন্যতা আমাকে ঘিরে ধরে,
ডুবে যায় সমুদ্রের জলে।
নিশ্চিতভাবেই এই শূন্যতার পেছনে ছিল তার প্রথম প্রেমিকা কনসেপসিয়ন গের্রেরোকে বুয়েনোস আইরেস-এ রেখে বাবা-মার সাথে স্পানঞায় যাওয়ার ঘটনা। বোর্হেসের সাহিত্যের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে এই যে তা আত্মজৈবনিক। কিন্তু আত্মজৈবনিক উপাদানকে ব্যক্তির গণ্ডি থেকে সামষ্টিক, এবং সামষ্টিককে সর্বজনীন করার শিল্পিতস্বভাব দ্বারা তিনি সবসময়ই চালিত ছিলেন। সুতরাং এই শূন্যতা ব্যক্তিগত ঘটনা থেকে উদ্ভূত হলেও এটি তাঁর সামগ্রিক আদর্শেরও এক প্রতিভূ। ফলে এটি তাঁর সাহিত্যিক সত্তার এক স্মারকচিহ্ন।
বলেছিলাম, বোর্হেসকে দুই ধরনের শূন্যতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। দ্বিতীয় যে শূন্যতার মোকাবেলা তিনি করেছিলেন সেটি ছিল সাংস্কৃতিক, যার কিছু দৃষ্টান্ত আমরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করেছি। কিন্তু এটা ভাবার কোনোই কারণ নেই এসব দৃষ্টান্ত আকস্মিক এবং অপরিকল্পিত। মহৎ সাহিত্য শিল্পীর অবচেতন মনের উৎসার, কিন্তু কোনো শিল্পীই স্রেফ অবচেতন-নির্ভর নন। চেতন ও অবচেতন, এই দুই প্রবৃত্তির সুষম সমন্বয়ের ফলই হচ্ছে শিল্পকলা। সুতরাং ওই দুই ডানায় ভর করেই বোর্হেস তাঁর সাহিত্যিক লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে গেছেন।
১৯২৬ সালে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ যে-প্রবন্ধের বইটি বেরিয়েছিল সেটি ছিল El Tamano de mi esperanza , অর্থাৎ ‘আমার আশার আয়তন’ যা ছিল আর্হেন্তিনার ভাষা ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে ও নতুন অর্থে সাজিয়ে নেয়ার প্রধান প্রস্তাবনা। বোর্হেসের আগে সংস্কৃতির শূন্যতা সম্পর্কে এত স্পষ্ট ধারণার কথা কেউ উল্লেখ করেননি। ২৭ বছরের যুবক বোর্হেস নিশ্চিত আস্থায় জানালেন:
“এই দেশে কোনো কিংবদন্তী নেই, এমনকি, আমাদের রাস্তাগুলোয় একটা ভূতকেও হাঁটতে দেখা যায় না। এটা আমাদের এক লজ্জা।”
No hay leyendas en esta tierra y ni un solo fantasma camina por nuestras calles. Ese es nuestro baldon. (El Tamano de mi esperanza, Jorge Luis Borges, 1926, P 8)
শূন্যতার এই লজ্জাকে তিনি ঢেকে দিয়েছিলেন তাঁর কল্পনা ও সৃষ্টি দিয়ে। বোর্হেসের কাছে উপস্থিতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, অনুপস্থিতিও সমান গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়েছিল। আর্হেন্তিনার ইতিহাস ও ঐতিহ্যে এমন এক শূন্যতা তিনি অনুভব করেছিলেন যা পূরণ করার দায়িত্ব তিনি স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। উপস্থিতির পাশে অনুপস্থিতির ব্যবহার, এ কেবল তাঁর শিল্পকৌশলই নয়, তাঁর নিজের দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শূন্য জায়গা পূরণ করার পক্ষে এক দার্শনিক অবস্থানও বটে।
“প্রাচীন রসিকতা বলে মেক্সিকোবাসীরা এসেছে আসতেকদের থেকে আর আর্হেন্তিনোরা এসেছে জাহাজ থেকে। পৃথিবীর অন্য কোনো জাতিকেই বোধহয় এত শোরগোল করে ইতিহাসের বাইরে নিজের ইতিহাস আবিস্কার করে নিতে হয়নি, তৈরি করে নিতে হয়নি এমন এক ভাষিক ইতিহাস, যা তাদের সংস্কৃতির আর্তনাদ থেকে উদ্ভূত, সে আর্তনাদ মুহুর্মুহু বলছে: দয়া করে আমাকে ভাষিক রূপ দাও।
এই জাতীয় ইতিহাসোত্তর ঐতিহাসিকতার মূল উৎস অবশ্যই বোর্হেস। The Aleph-এর সমস্ত স্থান,The Gargen of Forking Paths-এর সমস্ত কাল আর The Library of Babel-এর সমস্ত গ্রন্থ হলো ওই দেশে যে যথেষ্ট পরিমাণে মায়াদের ধ্বংসস্তুপ কিংবা ইনকাদের দালানকোঠা নেই, সেই অভাব পূরণ।”(Raymond Leslie Williams,The Novel in the Americas, University Press Colorado, 1992, P-7)
সুতরাং গল্পে তিনি কাল্পনিক যে-ইতিহাস দিয়ে ইতিহাসের শূন্যতা পূরণ করেছিলেন, তা নিছক সাহিত্যিক খামখেয়ালি হিসেবে থাকেনি, আর্হেন্তিনার ঐতিহ্য ও জাতিসত্তার নির্মাণে তার এক গভীর তাৎপর্যও আছে। নিজের দেশের এই শূন্যতা পূরণের জন্য তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের নানান জাতির ইতিহাস, কিংবদন্তী, দর্শন ও সাংস্কৃতিক উপাদানের বিশাল ভাণ্ডার থেকে দুহাত ভড়ে নিয়েছেন।
লেখা বনাম শূন্যতা—এটি অনাদিকাল থেকেই পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। মানুষের সৃজনশীল প্রবৃত্তি শূন্যতাকে মেনে নেয়নি কখনোই। মানুষের ইতিহাস হচ্ছে কল্পনা ও সৃষ্টি দিয়ে শূন্যতাকে জয় করার ইতিহাস। আর বোর্হেসের মতো লেখক যখন শূন্যতাকে তাঁর অসামান্য কল্পনাশক্তি ও সৃষ্টিসম্ভার দিয়ে পূরণ করতে আসেন তখন জন্ম হয় বিস্ময়কর এক ইতিহাসের। আর্হেন্তিনার সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এককভাবে আর কোনো লেখকই নিজের সংস্কৃতির শূন্যতা পূরণে এত বড় ভূমিকা পালন করেননি। এই ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় তাঁর সাথে তুলনীয় ব্যক্তিত্ব একমাত্র রবীন্দ্রনাথ।