Published : 04 Feb 2026, 11:08 PM
ঢাকা-৯ আসনের ভোটার ও বাসাবো এলাকার বাসিন্দা রট আয়রনের আসবাবের কারিগর মো. বাদল কাকে ভোট দেবেন, সে সিদ্ধান্ত এখনও নিতে পারেননি।
রাজধানীর সবুজবাগ, মতিঝিল, ডেমরা ও মান্ডা থানা নিয়ে গঠিত এ আসনের এক ডজন প্রার্থীর মধ্যে যে তিনজনকে নিয়ে আলোচনা, বাদলের দৃষ্টিতে তারা সবাই ‘ভোটের মাঠে নবীন'।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, "এইবার তিনজন প্রথমবার ভোট করতাসে, তিনজনই সেই ধার! এত ধার যে পাবলিকও বুঝতাসে না কোন দিকে যাইব।"
বাদল বলছিলেন, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব, স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট মনোনীত এনসিপির প্রার্থী মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া রাসিনের কথা।
ভোটের মাঠে নবীন হলেও রশিদের বয়স ইতোমধ্যে ৫৩ চলছে। আর তার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বয়সেও নবীন; রাসিনের ৩৬, আর জারার ৩২।
বাদলের ভাষ্য, "এই নির্বাচনে তিনজনেই হাড্ডাহাড্ডি ফাইট হবে।"

গত সোমবার সন্ধ্যা ও রাতে রাজধানীর বাসাবো ও মান্ডা এলাকা ঘুরে 'ভোটের হাওয়া' স্পষ্ট বোঝা গেল। প্রার্থীরা দল বেধে প্রচার চালাচ্ছেন, ভ্যানে ভ্যানে বাজছে নির্বাচনি গান। একদিকে চলছে উঠান বৈঠক, অন্যদিকে জনসংযোগ। রাস্তায় বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিও নজরে পড়ল।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-৯ আসন। মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬০ জন। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন ৫ হাজার ৯৫৪ জন।
সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে বিএনপির হাবিবুর রশিদ হাবিব ধানের শীষ, স্বতন্ত্র তাসনিম জারা ফুটবল আর এনসিপির জাবেদ মিয়া শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে ভোটে লড়ছেন।
এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী শাহ ইফতেখার তারিখ হাতপাখা, জাতীয় পার্টির কাজী আবুল খায়ের লাঙ্গল, সিপিবির মো. মনিরুজ্জামান কাস্তে, বিএনএফের মোহাম্মদ শফি উল্লাহ চৌধুরী টেলিভিশন, এনপিপির শাহীন খান আম, বাসদের (মার্কসবাদী) খন্দকার মিজানুর রহমান কাঁচি, গণফোরামের নাজমা আক্তার উদীয়মান সূর্য, ইনসানিয়াত বিপ্লবের নাহিদ হাসান চৌধুরী জুনায়েদ আপেল এবং মুসলিম লীগের মাসুদ হোসেন হারিকেন প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন।
ভোটারের যত চাওয়া, প্রার্থীদের যত আশ্বাস
বাসাবো ছায়াবীথি এলাকার গৃহিনী মাহমুদা আক্তার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছিলেন, "এলাকার সমস্যা গ্যাস সংকট। যদিও শুনেছি এটা পুরো ঢাকারই সমস্যা। রাস্তা কেটে ঠিক না করা ও অর্ধেক কাজ করে ফেলে রাখা আজকের বাস্তবতায় আরেকটা সমস্যা। আর ব্যাটারি রিকশা অনেক বেড়েছে এলাকায়।
"যিনি এইসব সমাধান করতে পারবেন তারেই ভোট দেব। কিন্তু কারে দেব এখনও ঠিক করি নাই।"
বাসাবো মাঠ সংলগ্ন একটি খাবার হোটেলে মালিক মো. শাহজাহান বললেন, "রাস্তাঘাটগুলা একটু ঠিকঠিক হওয়া দরকার। আর মুগদা হাসপাতালটা একটু বড় করতে হইব, যাতে বেশি মানুষ যাইতে পারে।"
তার ভাষ্য, "বিএনপির হাবিব ভাইই ভোটের মাঠে এগিয়ে আছেন।"

দক্ষিণ বনশ্রীর বাসিন্দা মাহবুবুল হক শিশির বলছিলেন, "কোরবানির সময় রাস্তার ওপরে মেরাদিয়া গরুর হাটটা বসে। এলাকায় আসা যাওয়া খুব অসুবিধা হয়। যেই নির্বাচিত হোক উনি যেন এ বিষয়টা দেখেন।"
বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব মুগদা জেনারেল হাসপাতাল আধুনিকায়ন, শিক্ষা ও যুব উন্নয়ন, নারী ও সামাজিক নিরাপত্তা, নারী-শিশুর নিরাপদ যাতায়াত, দরিদ্র ও প্রবীণদের সুরক্ষা, মাদকমুক্ত সমাজ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিচ্ছেন।
এদিকে গ্যাস–সংকট নিরসনে ‘সেবা নেই, বিল নেই’ নীতি বাস্তবায়ন, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত এলাকা গড়ে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে এমপির সুপারিশ ও কোটা বাতিল, মুগদা হাসপাতালকে একটি 'আদর্শ সেবা কেন্দ্র' হিসেবে গড়ে তোলা, শিক্ষা মানোন্নয়নে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা।
এনিসিপির প্রার্থী মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া রাসিন মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবা, ভাঙাচোরা রাস্তার স্থায়ী সংস্কার, ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন, কিশোর গ্যাং ও মাদক প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
বিএনপির 'শক্ত ঘাটি', 'গেইম চেঞ্জার' হতে পারে তরুণ ভোটাররা
মান্ডা ঝিলপাড় এলাকার চল্লিশোর্ধ্ব দোকানী মোকারম আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, "মুগদা, মান্ডা ও বাসাবো বিএনপির পুরোনো ঘাঁটি৷ তারা এ আসনের প্রচারে সর্বশক্তি দিচ্ছে। ভোটের মাঠে এগিয়ে হাবিব সাহেব।"
তবে একই এলাকার তরুণ ভোটার তাহমিদ ভোটের মাঠে ভিন্ন চিত্র দেখছেন। তিনি বলেন, "গণঅভ্যুত্থানের পরে তরুণরা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছে। তাই অন্যান্য নির্বাচনের সমীকরণ এখানে নাও খাটতে পারে। তরুণ ভোটাররাই মূলত ফল নির্ধারণ করবে।
" তাসনিম জারা ও রাসিন দুজনই তরুণ প্রার্থী। তরুণ ভোটাররা তাদের দিকে ঝুঁকে গেলে তারাই এ আসনের গেইম চেঞ্জার হিসাবে সামনে আসবেন।"
তাই তাহমিদও এ আসনে 'হাড্ডাহাড্ডি' লড়াই দেখার আশায় আছেন।

আত্মবিশ্বাসী তিন প্রার্থীই, আছে অভিযোগও
ভোটের প্রচারে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করলেও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব, স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা ও এনসিপির প্রার্থী মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া রাসিন–তিনজনই নির্বাচনে জয়লাভের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী।
বিএনপি প্রচারের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক শক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ করলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট মনোনীত এনসিপির প্রার্থী প্রচার চালাচ্ছেন ঘরোয়া ঢংয়ে। অপরদিকে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া তাসনিম জারা প্রচারের ক্ষেত্রে 'ধুমধাম' ও 'চাকচিক্য' পরিহার করে ভোটারের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হাবিব সোমবার রাতে মান্ডা প্রথম গলির সরকার বাড়িতে উঠান বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠক শেষে করে নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসের কথা বলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে।
তিনি বলেন, "আমি এই এলাকার ছেলে। এই এলাকায় জন্মেছি, এই এলাকায় বেড়ে উঠেছি। এখানে আমার সবার সাথে সামাজিক রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। আর এলাকার রাজনীতির সাথে আমার সম্পর্ক ৩৮ বছরের।
"এ এলাকার ভোটাররা মনে করেন যে তারা তাদের ঘরের ছেলে, প্রতিবেশীকে পেয়েছেন, যার সাথে সকল কিছু সহজে শেয়ার করতে পারেন।"
তবে 'একটি চক্রান্তকারী মহল' ভোটের পরিবেশ বানচাল করার চক্রান্ত করছে অভিযোগ করে হাবিব বলেন, "সরকারের আরও সতর্ক থাকা উচিত এবং প্রার্থী এবং সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা উচিত। এখানে সারাদিন আমি ঘুরছি, প্রশাসনের কোনো লোক আমাদের আশপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। আমরাই আমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছি, প্রশাসনতো নিরাপত্তা ব্যবস্থা করছে না।"
মান্ডা প্রধান সড়ক জুড়ে সোমবার সন্ধ্যায় ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিলেন তাসনিম জারা। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নির্বাচনে জয়ের ব্যাপার তিনি দারুণ আশাবাদী।
“ভোটারদের কাছ থেকে এবং এলাকাবাসী যারা আছেন, তাদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। সবাই অনেক শুভকামনা জানাচ্ছেন, অনেক শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, দোয়া করে যাচ্ছেন। মুরুব্বিরা, ছোটরা সবাই অনেক উৎসাহ দেখাচ্ছেন। সব মিলিয়ে খুবই অর্থপূর্ণ একটা অভিজ্ঞতা এবং এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।"
নিজের প্রচারের নীতি তুলে ধরতে গিয়ে জারা বলেন, "যারা আসলে ভোটের প্রচারে অনেক লোকের শোডাউন করেন, তারা জনসেবার চেয়ে বেশি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ভোট নেওয়ার জন্য তা করেন। আমরা সেই পথ থেকে সরে এসেছি। আমাদের বিশ্বাস, সাধারণ মানুষের বড় শোডাউন বা উচ্চশব্দ করে মাইকিংয়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী একে অপরের প্রতি বিশ্বাস এবং আস্থা, সেখান থেকেই আমরা কাজ করছি।

"আমাদের ভলেন্টিয়ার প্রায় ১৫ হাজার। তারা তাদের পরিচিত পাঁচ জনের সাথে কথা বলছেন ঢাকা ৯ আসনের। এছাড়া আমাদের ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইনেও চলছে। বাসায় বাসায় গিয়ে আমরা প্রচার চালাচ্ছি। নতুন রাজনীতির কথা বলছি এবং এখানে অনেক ইতিবাচক সাড়া আমরা পাচ্ছি।"
সোমবার বিকালে বাসাবো ছায়াবীথি এলাকায় জনসংযোগে এসে জয়ের আশাবাদ জানান এনসিপির রাসিনও। তবে প্রচাররের ব্যানার-প্ল্যাকার্ড 'রাতে আঁধারে গায়েব হয়ে যাচ্ছে’ বলে তিনি অভিযোগ করেন।
১১ দলীয় জোট মনোনীত এই প্রার্থী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, " মানুষের যে সাড়া পাচ্ছি, মানুষের কাছাকাছি যাচ্ছি এইটাই বড় পাওয়া। সবার সঙ্গে মেশা হচ্ছে, কথা বলা হচ্ছে–খুবই এনজয় করছি। তবে প্রচারে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে।
"আমাদের প্রচুর ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড ছিল এই গলিতেই। কিন্তু এখন আপনি দেখতে পাচ্ছেন একটাও নাই। রাতের বেলা তারা কেটে নিয়ে যাচ্ছে। পুরো ঢাকা ৯ আসনের প্রত্যেকটা জায়গায় আমাদের শুধুমাত্র শাপলা কলির ব্যানার তারা ছিঁড়ে ফেলছে, কেটে ফেলছে।
“তবে আগামী ১২ তারিখে গণরায় আসতে যাচ্ছে শাপলা কলির পক্ষে; মানুষ নীরব ভোট বিপ্লবের জন্য প্রহর গুনছে। এটাকে বানচাল করার জন্য তারা অপকর্মগুলো করছে।"
ভোটারদের কাছ থেকে ‘অভূতপূর্ব’ সাড়া পাওয়ার কথা তুলে ধরে রাসিন বলেন, "৫ অগাস্টের পরে আমরা যে পরিবর্তনটা চেয়েছিলাম; ভোটে জয়ের মাধ্যমে একটা দুর্নীতিবাজমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ আমরা গড়তে পারব ইনশাআল্লাহ।
"তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটা দল পূর্বের ফ্যাসিবাদীর সময়ে যেভাবে তারা চলেছে, এখনো তারা সেই স্টাইলেই চলছে। এটা আমাদের জন্য একটা অশনি সংকেত। তবে সাধারণ মানুষ ভোট বিপ্লব করতে মুখিয়ে আছে। তারা প্রায় দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভোট প্রয়োগ করার ক্ষমতা পেয়েছে, তারা সঠিক সিদ্ধান্তটা নেবে ইনশাআল্লাহ।"