Published : 15 Feb 2026, 07:21 PM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটাধিকার প্রয়োগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ‘প্রতিবন্ধকতার’ শিকার হয়েছেন বলে পর্যবেক্ষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতার ভয় কাজ করলেও নির্বাচনের দিন পরিস্থিতি তুলনামূলক ভিন্ন ও ইতিবাচক ছিল৷ তবুও কিছু কিছু ভোট কেন্দ্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা ‘অসহযোগিতা’ পেয়েছেন বলে উঠে এসেছে পর্যবেক্ষণে।
নির্বাচনের আগে প্রচারের সময় নারী প্রার্থীরা অনলাইনে ‘পরিকল্পিত ও সমন্বিত’ আক্রমণের শিকার হলেও তা রোধে অন্তর্বর্তী সরকার বা নির্বাচন কমিশন আইন প্রয়োগ করেনি।
সামগ্রিকভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ হলেও সহিংসতা একটি বড় উদ্বেগের কারণ ছিল বলে পর্যবেক্ষকরা দেখেছেন। আর নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সহিংসতার ঘটনা ‘উল্লেখযোগ্য হয়ে বেড়েছে’ বলেও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণের পর সুশীল সমাজের চার সংগঠনের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার রাজধানীর গুলশানে ওয়েস্টিন হোটেলে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন সংগঠনেগুলোর প্রতিনিধিরা এই প্রতিক্রিয়া জানান।
পোস্টাল ব্যালটে প্রতিবন্ধীদের ভোট নেওয়ার সুপারিশ
নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নানা অবকাঠামোগত বাধার সম্মুখীন হয়েছেন বলে উঠে এসেছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন বি স্ক্যানের পর্যবেক্ষণে।
এই বাস্তবতায় প্রতিবন্ধী ভোটারদের ভোট পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে নেওয়ার সুপারিশ করেছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাটি।
বি স্ক্যানের সাধারণ সম্পাদক ও নির্বাহী পরিচালক সালমা মাহবুব সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মেহেরপুর, ফরিদপুর, দিনাজপুর জেলা এবং ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মোট ৮টি আসনে ১০০টি ভোটকেন্দ্র ১০০ জন প্রতিবন্ধী পর্যবেক্ষকের মাধ্যমে তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন।
বি স্ক্যানের পর্যবেক্ষণ বলছে, বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্রে যাতায়াতের রাস্তা সুগম ছিল না এবং র্যাম্পের অভাব ছিল। কোথাও র্যাম্প থাকলেও তা মানসম্মত ছিল না। যানবাহন চলাচলে সীমাবদ্ধতা থাকায় অনেক প্রতিবন্ধী ভোটার কেন্দ্রে যেতে পারেননি।
অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক প্রতিবন্ধী ও প্রবীণদের ভোটদান কক্ষ তৃতীয় থেকে পঞ্চম তলায় রাখা হয়েছিল, যা তাদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ভোটকেন্দ্রে দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল ব্যালট বা সাইনেজের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। গোপনীয় কক্ষের পর্দা পাতলা হওয়া এবং নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধীদের হয়ে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ভোট দিয়ে দেওয়ার ফলে গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তার বিষয়ে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা লিখিত নির্দেশনার অভাবও লক্ষ্য করেছে বি স্ক্যান।
পর্যবেক্ষক সংস্থাটি প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য ভোটদান কক্ষ বাধ্যতামূলকভাবে নিচতলায় স্থাপন করা, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিওতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রতিবন্ধী ভোটারদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা ও তাদের জন্য প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে।
কিছু কেন্দ্রে ‘সহায়তা পাননি’ সংখ্যালঘুরা
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিয়ে কাজ করা পর্যবেক্ষক সংগঠন রূপসার শেখ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ কেমন ছিল, মূলত সেটাই তারা পর্যবেক্ষণ করেছেন।
খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি জেলাসহ ছয়টি বিভাগের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ২৫টি সংসদীয় আসন পর্যবেক্ষণ করেছে রূপসা।
মোস্তাফিজ বলেন, “পর্যবেক্ষণে আমরা এই নির্বাচনের তিনটি পর্যায়ে কাজ করেছি; নির্বাচন পূর্ব অবস্থা, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন পরবর্তী অবস্থা। আমাদের কাজ এখনো চলমান রয়েছে আমরা পরবর্তীতে আবারো আসব নির্বাচন পরবর্তী অবস্থা নিয়ে।
দেশের ৬টি বিভাগের ২৫টি নির্বাচনী আসনের ৫০৯টি ভোট কেন্দ্রে কাজ করা রূপসার প্রাথমিক প্রতিবেদন বলছে, নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতার ভয় কাজ করলেও নির্বাচনের দিন পরিস্থিতি তুলনামূলক ভিন্ন ও ইতিবাচক ছিল।
প্রায় ৯৮ শতাংশ কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ে ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে এবং ভোটারদের সহায়তা করতে কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শৃঙ্খলা দেখা গেছে। খুলনা-৫সহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ আসনে নিরাপত্তা বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল।
রূপসা বলছে, ৪ দশমিক ২ শতাংশ কেন্দ্রে কর্মকর্তাদের আচরণ সংখ্যালঘু ভোটারদের প্রতি আশানুরূপ বন্ধুসুলভ ছিল না।
৮ দশমিক ৩ শতাংশ কেন্দ্রে রাজনৈতিক দলের এজেন্টরা ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। প্রায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ কেন্দ্রে সীমানার ভেতরে থাকা সত্ত্বেও অনেক ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ কেন্দ্রে গণনার সময় পর্যবেক্ষকদের পূর্ণ প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি।
আগামীর নির্বাচনগুলোতে ভোটগ্রহণ শুরু থেকে গণনা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জোরালো সহায়তা যেন দেন, সেই ব্যবস্থা নিতে সংগঠনটি নির্বাচন কমিশনের কাছে সুপারিশ করেছে।

অনলাইনে আক্রমণের শিকার নারী প্রার্থীরা
নারী অধিকার সম্পর্কিত পর্যবেক্ষক সংগঠন আরশি ট্রাস্টের পর্যবেক্ষণ বলছে, নারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অনলাইনে ‘পরিকল্পিত ও সমন্বিত’ আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং তাদের পোস্ট বা পেইজ রিপোর্ট করে নামিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।
আরশি বলছে, ৮৫ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৭ জন জয়ী হয়েছেন, যা এই প্রতিকূল পরিবেশের চ্যালেঞ্জকে ফুটিয়ে তোলে। সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিনেন্স ২০২৫ থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ হয়নি।
অনলাইন সহিংসতা রোধে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন এবং বর্তমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে আরশি ট্রাস্ট।
সংগঠনটির প্রতিনিধি নাফিসা রায়হানা বলেন, "আমরা প্রথমবারের মত বাংলাদেশে অনলাইন জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্সের মনিটর করছি প্রায় একশর উপরে নারী রাজনীতিবিদ, অ্যাক্টিভিস্ট, ক্যান্ডিডেট এবং সাংবাদিকদের নিয়ে। আরও একটি বিষয় উল্লেখ করব যে আমাদের এই স্টাডির সাথে বিআইজিডিও আছে, তারা মূলত ইন্টারভিউ করছে অফলাইন লেভেলে বা ফিল্ড লেভেলে।
“আমাদের স্টাডির কাজটা পুরোপুরি আসলে অনলাইন বেজড এবং মনিটরিংটা শুরু করেছি ১৪ জানুয়ারি থেকে এবং এখন পর্যন্ত করেছি। এটা মোটামুটি হচ্ছে প্রি-ইলেকশন এবং নির্বাচনকালীন সময়ের রিপোর্ট।”
তিনি বলেন, "আরেকটা বিষয় হচ্ছে যে আমাদের এই স্টাডিটা এখনো অনগোইং, মানে আমরা নির্বাচন পরবর্তী সময়েও এই স্টাডিটা হচ্ছে আমরা চালিয়ে যাব এবং আমাদের এখনকার যে ফাইন্ডিংসগুলো সেগুলো মোটামুটি প্রিলিমিনারি ফাইন্ডিংস।"
ভোটের পর বেড়েছে সহিংসতা
অধিকারের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর কোরবান আলী বলেন, "ইইউর সহযোগিতায় আমরা কয়েকটা ভাগে আমাদের এই পর্যবেক্ষণটাকে দেখছি। আমরা নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতি, বিশেষ করে আমরা সহিংসতা পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু করি জানুয়ারি ১৮ তারিখ থেকে। এই পর্বে আমরা ৫০টি সংসদীয় এলাকা পর্যবেক্ষণ করেছি।
"এই ৫০টি আসন আমরা ২২টি জেলা থেকে নিয়েছি, যার রাজনৈতিক সহিংসতা এবং নির্বাচনী সহিংসতার আগের ইতিহাস রয়েছে। আমরা একটি পদ্ধতি, স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে এই কাজগুলো করেছি।"
অধিকারের পর্যবেক্ষণ বলছে, ১৮ জানুয়ারি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৮টি জেলায় ৬১টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে শারীরিক সংঘাত ও সম্পত্তি ধ্বংস উল্লেখযোগ্য। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে নির্বাচন-পূর্ব সহিংসতা দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো সময়মত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
নির্বাচনের দিন ২২টি আসনে ৪৫টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে এবং নির্বাচনের পর এই মাত্রা আরও বেড়ে যায়। ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ৩ জন নিহত (যার মধ্যে একজন শিশু) এবং ১০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
অধিকার বলছে, সামগ্রিকভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ হলেও সহিংসতা একটি বড় উদ্বেগের কারণ ছিল। নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে সহিংস ঘটনা বেড়েছে। প্রায় ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষকরা দায়িত্ব পালনে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।