Published : 12 Feb 2026, 01:46 PM
ঢাকার তেজগাঁওয়ের আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভোট দিতে এসেছিলেন কুনিপাড়ার বাসিন্দা আফসানা আক্তার। গণভোট সম্পর্কে ধারণা আছে কি না জানতে চাইলে এই ভোটার উত্তর দিলেন এক শব্দে, “মোটামুটি।”
আফসানার মোটামুটি ধারণা থাকলেও গণভোট দিতে আসা অনেকেরই গণভোট কী, কেন এই ভোট, সে সম্পর্কে ধারণাই নেই।
বেগুনবাড়ি এলাকার বাসিন্দা মিতু আক্তারও এসেছিলেন একই কেন্দ্রে ভোট দিতে। গণভোট নিয়ে ধারণা আছে কি না জানতে চাইলে, তিনি করলেন পাল্টা প্রশ্ন। বললেন, “গণভোট কিতা?”
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে দেশে চতুর্থবারের মতো গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ঢাকার অন্তত তিনটি কেন্দ্র ঘুরে এবং কয়েকটি কেন্দ্রের তথ্য নিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভোটারদের গণভোট নিয়ে ধারণা নেই। যাদের ধারণা আছে, তারাও পুরোপুরি অবগত নন।
বনানী আদর্শ বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা শরিফুল ইসলামের কাছেও প্রশ্ন ছিল গণভোট নিয়ে।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি ভাই টু বি অনেস্ট, গণভোট নিয়ে খুব-একটা জানি না। তবে, ভোট দিয়ে এসেছি।”
এই কেন্দ্রের আরেক ভোটার সাইফুল আলমও বললেন একই কথা। তিনি বলেন, “গণভোট নিয়ে ধারণা কম। তবু ভোট দিলাম। দল থেকে যেভাবে দিতে বলেছে, সেভাবেই দিলাম।”
এই কেন্দ্রের আরেক ভোটার হাসিব রাইয়ান বলেন, “গণভোট নিয়ে বিস্তারিত পড়া হয়নি। ব্যালটে যা লেখা থাকবে, ওইটুকু মোটামুটি জানি। সেভাবেই ভোট দিলাম।”
মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা নাছির নামের একজন বলেন, “সংস্কার চাইলে গণভোটে হ্যাঁ দেওয়া উচিত।” পাশে থাকা বোন তানিশাও তাতে সায় দিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা কেন্দ্রে ভোট দেওয়া আবদুল কাদের বেপারীও বলছিলেন গণভোট কী, তা তিনি জানেন না।
৮৬ বছর বয়সী এই ভোটার বলেন, “এইডা কিতা, এতো তো জানি না।”
একই কেন্দ্রের আরেক ভোটার আলিম মিয়া বললেন, “ভোট দিতে এসেছি। তবে গণভোটে চারটা প্রশ্ন একসাথে দেওয়াটা জটিল। আলাদা হলে ভালো লাগতো। তবে একটু বেশি টাইম লাগলো। পড়লাম তারপর দিলাম “
কার্জন হল কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা আদিত্য কুমারের অবশ্য গণভোট নিয়ে ধোঁয়াশা নেই।
তিনি বললেন, “গণভোট নিয়ে এত দিন দেখেছি নানা বিতর্ক। একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। আর নাগরিক হিসেবে কর্তব্য রাষ্ট্র সংস্কারে অংশ নেওয়া। তাই, বাসা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছি। জাস্ট ভোটটা দিলাম মাত্র।”
একই কেন্দ্রে ভোট দেওয়া লাবণ্য চৌধুরীও এ বিষয়ে সচেতন।
তিনি বলছিলেন, “গণভোট বিষয়টি বেশ সেন্সিটিভ। পড়লাম, দেখলাম। সবকিছু বিবেচনা করে ভোট দিয়েছি। দেশের ভাগ্য নির্ধারণে এ গণভোটেই তো প্রভাব ফেলবে।”
এর আগে ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে গণভোট দিয়েছে দেশের মানুষ।
জনগণের মতামত গ্রহণের জন্য এবারের গণভোটের ব্যালট পেপারে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ চারটি প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এসব প্রশ্নের বিপরীতে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে হচ্ছে। ভোটের আগে সরকারের তরফে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়েছিল।
ব্যালট পেপার যেমন—
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি আছে?: (হ্যাঁ/না)
(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।
(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।
(গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে—সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।
(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।
গণভোটের ইতিবৃত্ত
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত নেওয়ার পদ্ধতিই হল গণভোট। এর মাধ্যমে জনগণের কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চূড়ান্তভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের জন্য উপস্থাপিত হয়।
>> ১৯৭৭ সালের ৩০ মে প্রথম গণভোট হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার অনুসৃত নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি জনগণের মতামত যাচাইয়ের জন্য। প্রদত্ত ভোটের ৯৮.৮% ‘হ্যাঁ’ ভোট; ১.১২% ‘না’ ভোট পড়েছিল তখন।
>> ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ দেশে দ্বিতীয়বার গণভোট হয় তখনকার রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অনুসৃত নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি আস্থা এবং স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠান পর্যন্ত তার রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকার বিষয়ে জনগণের সিদ্ধান্ত জানতে। মূলত সামরিক শাসকের বৈধতা দেওয়ার জন্য সেই গণভোট হয়েছিল। প্রদত্ত ভোটের ৯৪.১১% ‘হ্যাঁ’ এবং ৫.৫০% ‘না’ ভোট পড়েছিল সেবার।
>> ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ১৪২ (১ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তৃতীয়বার গণভোট হয়। এ গণভোট ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের সামনে প্রশ্ন ছিল- ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান (দ্বাদশ সংশোধন) বিল, ১৯৯১-এ রাষ্ট্রপতির সম্মতি দেওয়া উচিত কি না?’ ভবিষ্যতে দেশে কোন ধরনের সরকার পদ্ধতি চলবে, জনগণের কাছে তা জানতে চাওয়া হয়েছিল এ প্রশ্নের মাধ্যমে। সেবার ৮৪% ‘হ্যাঁ’ ভোট এবং ১৫.৬২% ‘না’ ভোট পড়েছিল।