Published : 11 Feb 2026, 12:09 AM
এবারের ভোটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক প্রচার ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এর নেতিবাচক ব্যবহার দলগুলোর প্রচারণায় বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
ভোট যত এগিয়ে আসছে ভুয়া ভিডিও, ছবি ও অডিও ছড়িয়ে অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও অনলাইনে প্রার্থী ও দলগুলোর বিরুদ্ধে হয়রানির মাত্রা বাড়ছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল, বিশ্লেষক ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সামনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেইসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভুয়া কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। এতে নির্বাচনি পরিবেশ, ভোটার আস্থা এবং প্রচারণা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
এসব ভুয়া কনটেন্টের মধ্যে রয়েছে ডিপফেক ভিডিও, কণ্ঠ নকল করে বানানো বক্তব্য, ভুয়া সংবাদ বুলেটিনের আদলে তৈরি ক্লিপ এবং এআই দিয়ে সম্পাদনা করা পোস্টার ও গ্রাফিক্স।
ভুক্তভোগী ও বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে কনটেন্ট এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে সেগুলো বাস্তব সংবাদ বা প্রকৃত বক্তব্যের সঙ্গে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে তা ভোটারদের ভুল বার্তা দিচ্ছে এবং এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের সময়ে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট শুধু ভোটারদের বিভ্রান্ত করে না; রাজনৈতিক পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও চাপ তৈরি করতে পারে।
তারা যেকোনো তথ্য বা ভিডিও যাচাই না করে শেয়ার না করতে এবং নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করার পরামর্শ দিয়েছে।

প্রচারণার মাঠে নতুন বাস্তবতা
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণা দল ও পর্যবেক্ষক বলছেন, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট এখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নির্বাচনি প্রচারণার প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলতে একটি পক্ষ তা ইচ্ছাকৃতভাবে করছে। এটি এবার ভোটের লড়াইয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
অনেক কনটেন্টে দেখা যাচ্ছে, কোনো দলের নেতার মুখে এমন বক্তব্য ‘দেখানো হচ্ছে’, যা বাস্তবে বলা হয়নি। ঠোঁটের নড়াচড়া মিলিয়ে ভিডিও তৈরি, কণ্ঠ নকল করে অডিও বসানো বা পুরোনো ভিডিওতে নতুন বক্তব্য যুক্ত করে তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি পেইড ও টার্গেটেড অপপ্রচারের মাধ্যমে ‘অর্গানিক’ সমর্থনের আবহ তৈরি করার অভিযোগও উঠছে।
একই সঙ্গে পুরোনো বা ভিন্ন দেশের সহিংসতার ভিডিওকে স্থানীয় রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হচ্ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলেও অভিযোগ করছেন প্রচার সংশ্লিষ্টরা।
এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া স্ক্রিনশট, জরিপ বা গ্রেপ্তারের তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
নারী রাজনীতিকদের লক্ষ্য করে চরিত্রহননমূলক ও অপমানজনক ডিপফেক কনটেন্ট ছড়ানোর ঝুঁকিও বাড়ছে বলেও তুলে ধরেন বিশ্লেষকরা।
কী বলছে দলগুলো
এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এআইকে আসলে ইতিবাচক বা নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচকভাবে এআই ব্যবহার করে ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে।
“নাহিদ ইসলাম থেকে নারী নেত্রী- সবাই প্রতিদিন অনলাইনে আক্রান্ত হচ্ছে; বহুমুখী অনলাইন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। আমরা এআইভিত্তিক অপব্যবহার বিষয়ে প্রতিনিয়ত ফ্যাক্টচেকারসহ অন্য বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিচ্ছি।”
তার অভিযোগ, “বিরোধীরা প্রতিনিয়ত আমাদের বিরুদ্ধে অনলনাইন-অফলাইন আক্রমণ চালালেও ইলেকশন কমিশনের কোনো তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে না। তারা শুধু বক্তব্যের পর বক্তব্য দিয়েই তারা সময় পার করছে।”
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ ধরনের অপপ্রচার সম্পর্কে আমরা সতর্ক আছি। এতে কিছুটা বাড়তি চাপ তৈরি হলেও আমরা উদ্বিগ্ন নই। কারণ দলের কেউ কোনো অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত নয়। সব দিকেই আমাদের নজর রয়েছে।”
পুরোনো ভিডিও, নতুন দাবি
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ করে ফেইসবুকে পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে রাজনৈতিক সহিংসতার দাবি তোলা হচ্ছে।
যাচাইয়ে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ভাইরাল হওয়া অন্তত ছয়টি বহুল প্রচারিত ভিডিওর দাবিই বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা। বিমানের ভেতরের থাপ্পড়ের ভিডিও, স্থানীয় সংঘর্ষের দৃশ্য কিংবা নির্বাচন বাতিলের দাবিতে সংঘর্ষ বা বিক্ষোভের ভিডিও—এসবই ভিন্ন সময় বা ভিন্ন দেশের ঘটনার সঙ্গে মিলেছে।
এমন সব ভুয়া কনটেন্ট নিয়ে সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়ে ডিসমিসল্যাবের রিসার্চ অফিসার আহমেদ ইয়াসীর আবরার বলেন, নির্বাচনের এ সময়ে কোনো কিছু প্রচারের ক্ষেত্রে যাচাই করে নিন। একাধিক সূত্র থেকে যাচাই করুন।
“কোনো ছবি বা ভিডিও যদি আপনাকে দ্রুত উত্তেজিত করে, তবে সেই ভিডিওকে সন্দেহ করুন। ভিডিও বা ছবি বা যেকোনো দাবি কে পোস্ট করছে সেটি দেখুন, মূল সূত্র জানার চেষ্টা করুন।“

ভুয়া কনটেন্ট থামাতে কী পদক্ষেপ
এআইভিত্তিক অপপ্রচার মোকাবিলায় দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনেকেই এখন প্রচারণা টিমে আলাদা করে ফ্যাক্টচেক বা ডিবাঙ্ক টিম যুক্ত করেছেন। তাদের কাজ ভাইরাল হওয়া ভুয়া ভিডিও বা পোস্ট শনাক্ত করা, উৎস যাচাই করা এবং একই প্ল্যাটফর্মে তা খণ্ডন করে প্রচার চালানো।
তবে প্রচারণা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মিথ্যা কনটেন্ট কয়েক মিনিটেই ছড়িয়ে পড়লেও খণ্ডনের বার্তা বা কনটেন্ট পৌঁছাতে সময় লাগে। সময়ের এ ব্যবধানের কারণে প্রচারণা কার্যক্রমে বাস্তব চাপ তৈরি হচ্ছে। কেননা এরমধ্যেই ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচনের সময়ে এআইয়ের অপব্যবহার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে-এমন আশঙ্কার কথা শুরু থেকেই বলে আসছে নির্বাচন কমিশন।
আচরণবিধিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারে এআই সংক্রান্ত বিধিনিষেধ যুক্ত করা হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, অসৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার, ভুল তথ্য বা বানোয়াট নির্বাচনসংক্রান্ত কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার নিষিদ্ধ। তবে এরপরও তা কমছে না।
র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এআই ভুয়া, মিথ্যা বা অসত্য কনটেন্ট বিষয়ে এসবি, সিআইডি, আইসটি মন্ত্রণালয় সমন্বয়ে র্যাবের সাইবার টিম কাজ করছে। এ বিষয়ে আমরা গুরুত্ব দিয়েই কাজ করছি।”