Published : 28 Jan 2026, 11:06 PM
সিলেট থেকে নির্বাচনি প্রচারভিযান শুরু করার পর এবার উত্তরাঞ্চলে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মাঝে চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে গেছেন, দাঁড়িয়েছেন ঢাকায় নিজের আসনে প্রচার মঞ্চে।
এই কদিনের প্রচারাভিযানে তারেক রহমানকে অনেকেই কাছ থেকে দেখেছেন, শুনেছেন তার বক্তব্য।
এক সংকটময় মুহূর্তে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে বিএনপির হাল ধরা তারেক রহমানের নির্বাচনি প্রচার সম্পর্কে মূল্যায়ন উঠে এল বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের কথায়।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কানিজ ফাতিমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবার বিএনপির নির্বাচনি প্রচারে মূল শক্তি তারেক রহমান। ১৭ বছর দেশের বাইরে নির্বাসিত ছিলেন, পুরো পরিবারসহ।
“ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচনি প্রচারে তারেক রহমানের বক্তব্য আমাকে অভিভূত করেছে। কারণ তিনি যাদের উদ্দেশে কথা বলতে এসেছেন, তাদের কাছে থেকে সমস্যাগুলো শুনেছেন আর সমাধান কীভাবে হতে পারে তার পথরেখা জানতে চেয়েছেন তাদের কাছেই। আপনিই বলুন, অতীতে এরকম কোনো পলিটিশিয়ান কী মানুষকে সেভাবে বিবেচনা করেছেন? করেন নাই। ইট ইজ ইউনিক।”
তারেক রহমান ঢাকায় তার নির্বাচনি এলাকার ভাষানটেকে জনসভায় বক্তব্য রাখেন ২৩ জানুয়ারি।

প্রচারাভিযানের দ্বিতীয় দিনের এই সমাবেশ মঞ্চে ভাষানটেকের বাসিন্দাদের কয়েকজনকে ডেকে নেন তারেক রহমান। তাদের কাছে থেকে সমস্যার কথা শোনেন।
মঞ্চে ডাক পাওয়া বাসিন্দারা ভাষানটেকের বস্তিবাসীর পুনর্বাসন, নারীদের কর্মসংস্থান ও ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন দাবিদাওয়া তুলে ধরেন।
জবাবে তারেক রহমান বলেন, “আমিও এ এলাকায় গত ৫০ বছর যাবত বড় হয়েছি। যদিও মধ্যে অনেকদিন বাইরে থাকতে হয়েছে আমাকে। তারপরও আমি আপনাদেরই একজন।”
এলাকাবাসী যে সমস্যার কথা বলেছেন সেসব সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
মঞ্চে মাইক হাতে হেঁটে হেঁটে বক্তব্য দেওয়া, মঞ্চে ডেকে সমাবেশে আসা লোকজনকে মঞ্চে ডেকে কথা বলা- পারস্পরিক আদানপ্রদানের তারেক রহমানের যে ধরন, তাও মানুষের চোখে পড়েছে।
রোববার চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে নির্বাচনি সমাবেশের মঞ্চে বক্তব্য দেন তারেক রহমান। ফেনী, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জে প্রচার সমাবেশে বক্তব্য রেখে ঢাকায় ফেরেন তিনি।
বিএনপির মিডিয়া সেল তারেক রহমানে কর্মসূচিগুলো সরাসরি প্রচার করছে।
এসব সমাবেশের আগে তরুণদের সঙ্গেও আলাদাভাবে বসছেন তিনি।
'ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান' শিরোনামের এই আয়োজনে তরুণদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন তারেক। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নে জবাব দেন তিনি।
চট্টগ্রামের হালিশহরের কলেজ শিক্ষার্থী তাবাসুম আহমেদ বলেন, “আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেশি লাইক করি। মিডিয়ায় প্রচারিত তথ্য চিত্র এবং সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব ভিডিও আপলোড হয়েছে তাতে এটা স্পষ্ট যে, সবগুলো স্পটে তারেক রহমানকে দেখতে মানুষের প্রচণ্ড ভিড় ছিল।
“সেই ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষ তাকে দেখতেই এসেছেন এবং তার কথা শুনছেন।”
এই শিক্ষার্থী বলছিলেন, “তারেক রহমানের বক্তৃতা দেওয়ার ধরন, তার বক্তব্যের বিষয়বস্তু গতানুগতিক ধারার বাইরে বলে আমার মনে হয়েছে। এটা আমার মতো সাধারণ ভোটার, যারা কোনো দলের সমর্থক নই তারা গ্রহণ করছে।”
মঙ্গলবার ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ মাঠে জনসভা মঞ্চে বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
সমাবেশে ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি আসনের ধানের শীষের প্রার্থীরাও ছিলেন। ময়মনসিংহ থেকে ফেরার পথে গাজীপুর ও ঢাকার উত্তরায় সমাবেশ করেন তারেক রহমান।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী হাসিব আহমদ বলেন, “এবারের নির্বাচনে একটা বড় ব্যাতিক্রম হচ্ছে বিএনপির যে নির্বাচনি সমাবেশটি হয়ে গেল, সেখানে মূল ফোকাস ছিলেন তারেক রহমান। প্রার্থীরা সেভাবে নয়। কারণ কী জানেন?

“তারেক রহমান এখন একটা ক্রেইজ। সেই একজন স্কুল ছাত্রকে বলেন, সেই একজন শ্রমিককে বলেন, সেই একজন মেডিকেল স্টুডেন্টকে বলেন, তারা কী বলবেন? আমরা তারেক রহমানকে দেখতে এসেছি, তার কথা শুনতে এসেছি। দিস ইজ ফ্যাক্ট।”
চার দশকের বেশি সময় বিএনপিকে নেতৃত্ব দেওয়ার দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গেল ৩০ ডিসেম্বর মারা যান। তার কয়েকদিন আগে লন্ডন থেকে স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে দেশে ফেরেন তার বড় ছেলে তারেক রহমান।
স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর বিএনপির হাল ধরেন গৃহবধু খালেদা জিয়া ১৯৮৩ সালে। এরপর ৯১ সাল থেকে বিএনপি সব কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে তার নেতৃত্বে।
‘আপসহীন নেত্রী’ তকমা পাওয়া মায়ের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান।
নির্বাচনি প্রচারভিযানে মায়ের সঙ্গে ছেলের কোনো পার্থক্য কী চোখে পড়ে?
আগের নির্বাচনগুলোতে খালেদা জিয়াকে প্রচার মঞ্চে দেখেছেন এমন একাধিক ব্যক্তিকে এই প্রশ্নটি করা হয়েছিল।
৭১ বছর বয়েসী অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে এম হাফিজুর রহমান, যিনি ঢাকার পুরানা পল্টনে বসবাস করছেন, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ভোটের প্রচারের পার্থক্য টেনে তিনি বলছিলেন, “বেগম খালেদা জিয়ারও ইমেজ ছিল বিশাল-বিস্তৃত। তার ইমেজকে ব্যবহার করে বিএনপি বার বার সামনের দিকে এগিয়ে গেছে, দলটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে তার সময়েই। তিনি যখন প্রচার সমাবেশে মঞ্চে উঠতেন, তখন জনস্রোত যেন সমুদ্রের টেউয়ের মতো আন্দোলিত হত। স্লোগানে স্লোগানে সরব থাকতো নেতা-কর্মীরা।”
তিনি বলেন, “ম্যাডামের সামনে দলের প্রার্থীরা বক্তব্য দিতেন, ম্যাডাম প্রার্থীদের বক্তব্যে সমাবেশের মানুষের রেসপন্স দেখে আঁচ করতে পারেতেন কোনো প্রার্থীর কী অবস্থা? কিন্তু এবারকার দৃশ্যপট ভিন্ন।
“তারেক রহমানকে দেখতে মানুষের আগ্রহ আপনারা দেখেছেন। তবে তিনি যখন আসেন তার উপস্থিতিতে কী প্রার্থীদের বক্তব্য দেওয়া দেখেছেন? দেখেননি। কারণ মানুষ শুধু তারেক রহমানের কথাই শুনতে চায়। তার বক্তৃতার স্টাইলই আলাদা।”
হাফিজুর রহমান বলেন, “আমার বউ মা এবং নাতি দুইজন তারেক রহমানেকে ভীষণ পছন্দ করে। তাদেরকে বলেছিলাম, কেন? তারা বললো, তারেক রহমান গতানুগতিক ধারার রাজনীতিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছেন। দেশের নেতৃত্ব দেবেন আপনি? আপনার পরিকল্পনাটি বলুন, বাস্তবায়ন কীভাবে করবেন বলুন? নতুন প্রজন্মের এটি নতুন ভাবনা, আমিও এটা পছন্দা করি।”
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে প্রার্থীদের প্রচার শুরু হয়েছে ২২ জানুয়ারি।
বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়া দুইজনই রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন, দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা নির্বাচনি প্রচারাভিযান শুরু করতেন সিলেট থেকে হয়রত শাহ জালাল (রহ) ও হয়রত শাহ পরান (রহ.) মাজার জিয়ারত করে।

তারেক রহমানও বাবা-মায়ের পথ ধরে ২১ জানুয়ারি রাতে সিলেট আসেন। মাজার জিয়ারত করার পর ২২ জানুয়ারি ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসভা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, “সিলেটে ম্যাডাম যখন আসতেন তখনও সিলেট মিছিলের শহর ছিল, এবারও তারেক রহমান এসেছেন সিলেটে মানুষের ঢল নেমেছে আগেরই মতো। এই পুণ্যভূমি বিএনপির ঘাঁটি। এখানকার মানুষ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু ধর্মান্ধ না। সেজন্য বিএনপির সমর্থন সিলেটে বেশি।
“তবে এবার তারেক রহমানের সিলেটে আসা নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এক তিনি আমাদের সিলেটিদের জামাই, যাকে ভালো বাংলায় বলা যায় পরম আত্মীয়। তিনি ১৭ বছর পর সিলেটে আসছেন, সেজন্য সিলেটিদের আলাদা আগ্রহ আছে বৈকি। তাই বলে খালেদা জিয়াকে পেছনে ফেলা যাবে না। সত্যিকার অর্থেই জিয়া পরিবারের ক্রেইজ আলাদা মাত্রায় নিয়ে গেছে বিএনপিকে।”
তারপর একে একে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণাড়িয়া, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে সমাবেশ করে ঢাকায় ফেরেন তিনি।
হবিগঞ্জের চুনারিঘাটে স্কুল শিক্ষক আনিসুর রহমানও বলছিলেন, সাধারণত হবিগঞ্জ এলাকার মানুষ রাতে খুব একটা বাসা-বাড়ির বাইরে বিচরণ করেন না।
“কিন্তু ২২ জানুয়ারি রাতে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা মাঠে এত তীব্র শীতের মধ্যেও মানুষ অপেক্ষায় ছিল, কখনো তারেক রহমান আসবেন?
“৪টার নির্ধারিত টাইম পেরিয়ে ৮টা বেজে গেছে সেই অপেক্ষায়?”
তিনটি প্রচারাভিযানে দেখা গেছে, ব্যাপক মানুষের উপস্থিতির কারণে তারেক রহমান প্রতিটি সমাবেশে আসতে ৩/৫ ঘন্টা বিলম্ব হয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত মানুষ বসে ছিল তার অপেক্ষায়।
এবার উত্তরাঞ্চলে যাচ্ছে তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার রাজশাহী থেকে নির্বাচনি প্রচারাভিযান শুরু করবেন তিনি। শহরে সমাবেশ করে নওগাঁ হয়ে বগুড়ায় আসবেন তিনি।