১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ঢাকা-১৫: নারীদের ভোটে নজর দুই শফিকের

এ আসনে জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক শফিকুরের বিপরীতে তরুণ নেতা শফিকুলের লড়াইকে ঘিরে চাঙ্গাভাব দুই দলের সমর্থকদের মাঝে। এলাকাবাসীরও ধারণা, তাদের দুজনের মধ্যেই হবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

ঢাকা-১৫: নারীদের ভোটে নজর দুই শফিকের
ঢাকা-১৫ আসনের মধ্য মনিপুরে মঙ্গলবার জনসংযোগের সময় জামায়াতের নারী প্রচারকর্মীদের কাছে নিজের প্রচারপত্র তুলে দিচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

হামিমুর রহমান ওয়ালিউল্লাহ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Jan 2026, 01:53 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:49 PM

তিন-চারজনের ছোট ছোট দল হয়ে বাসায় বাসায় গিয়ে নারীদের কাছে ভোটের বার্তা পৌছে দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীরা। ‘ন্যয়-ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠায় দলের আমির শফিকুর রহমানের পক্ষে ভোট চাইছেন তারা।

এমন একটি দলের সঙ্গে মধ্য মনিপুরে মঙ্গলবার বিকালে দেখা হয়ে গেল বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের। নিজে থেকে এগিয়ে গেলেন তিনি। ওই নারী প্রচার কর্মীদের হাতে নিজের বার্তা ও নির্বাচনি ইশতেহার তুলে দিলেন। বললেন, “আপনারা আমাকে একটা দেন (প্রচারপত্র), আমিও আপনাদের একটা দেই।”

পরে একই গলিতে আলাদাভাবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার পক্ষে প্রচার চালাতে দেখা গেল তাদের। জামায়াতের নারী কর্মীরা প্রচারপত্র বিলি করছেন। বিএনপির প্রার্থী মিল্টন গলির সড়কে থাকা বাসিন্দা, দোকানদারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন। নিচ থেকে পাশের ভবনগুলোর বারান্দা, জানালা দিয়ে উঁকি দেওয়া বাসিন্দাদের প্রতি হাত নাড়লেন, চাইলেন ভোট।

রাজধানীর মিরপুর ও কাফরুল নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে নারীদের প্রচারকে ঘিরে সপ্তাহখানেক আগে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ও উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল, সেখানে এখন এমন তুলনামূলক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের দেখা মিলল।

উভয় প্রচার শিবিরের লক্ষ্য এলাকার নারী ভোটারদের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছানো; প্রতীককে পরিচিত করে তোলা। এ আসনে ভাগ্য নির্ধারণে দুই প্রার্থীর চেষ্টাই নারী ভোটারদের আস্থা জয় করা। কেননা এখানকার মোট ভোটের প্রায় ৫০ শতাংশ নারী।

নিজ নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১৫ আসনে জনসংযোগে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

নিজ নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১৫ আসনে জনসংযোগে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

জোটসঙ্গী থেকে ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বী

নির্বাচনি প্রচার শুরুর ঠিক আগে আগে গত ২০ জানুয়ারি পীরের বাগে প্রচারপত্র বিলিকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে এলাকায় তৈরি হয় উত্তেজনা, একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে দলগুলো।

আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর আগের সেই ঘটনার রেশ আর দেখা যায়নি। জামায়াতের প্রধান শফিকুর জোটের প্রার্থী হয়েছেন ঢাকার এ আসনে। ভোটকে ঘিরে গঠিত ১১ দলীয় জোটের প্রচার শুরু হয়েছে এ আসনে জনসমাবেশের মাধ্যমেই। সেই থেকে জোটের হয়ে দেশজুড়ে নির্বাচনি সমাবেশ করে বেড়াচ্ছেন তিনি। তবে যখনই সময় পাচ্ছেন এলাকায় এসে ভোট চাইছেন।

রাজনৈতিক পালাবদলে দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী থেকে এবারের ভোটে প্রধানতম প্রতিপক্ষ হওয়া বিএনপির প্রার্থীর নামও শফিক। জামায়াতের আমিরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাকে বেছে নিয়েছে বিএনপি।

শফিকুল মিল্টন ঢাকা মহানগরের যুবদল নেতা, যিনি বিএনপির সহযোগী এ সংগঠনের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। তিনি কিছুদিন এ সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

অন্যদিকে জামায়াতের তিনবারের আমির শফিকুর এ আসনে ২০১৮ সালে নির্বাচন করেছিলেন ধানের শীষ প্রতীকে। ওই সময় নিবন্ধন না থাকায় জোটের হয়ে বিএনপির প্রতীকেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। নানা বিতর্ক ওঠা ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদারের কাছে হেরে যান তিনি।

এ আসনে জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক শফিকুরের বিপরীতে তরুণ নেতা শফিকুলের লড়াইকে ঘিরে চাঙ্গাভাব দুই দলের সমর্থকদের মাঝে। এলাকাবাসীরও ধারণা, তাদের দুজনের মধ্যেই হবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

কাফরুল ও মিরপুরের আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত এ আসনে তাদের বাইরে প্রার্থী রয়েছেন আরও ছয়জন। তবে এ আসনের বিভিন্ন এলাকাজুড়ে মূলত বিএনপি-জামায়াতের প্রচারণাই বেশি চোখে পড়ল। এর বাইরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তের পক্ষেও খণ্ড খণ্ড প্রচারণার দেখা মিলেছে।

পশ্চিম কাজীপাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে থাকেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরিজীবি আব্দুল্লাহ। পুরো নাম বলতে চাইলেন না। ভোট নিয়ে আলাপে বললেন, এখানে মূল প্রতিযোগিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। জামায়াতের আমির হওয়ায় এলাকায় তার প্রভাব রয়েছে। তবে মিল্টনও (বিএনপি প্রার্থী) এখানকার স্থানীয়। তারও প্রভাব আছে। তিনিও কম যান না।

“কী হয় এখনই বলা যাচ্ছে না।”

ঢাকা-১৫ আসনে জনসংযোগে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। 

ঢাকা-১৫ আসনে জনসংযোগে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

আমিরের শূন্যস্থান কাজে লাগানোর চেষ্টায় বিএনপি

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে হতে যাওয়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু করে বিএনপি-জামায়াতসহ অর্ধশত রাজনৈতিক দল।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেটে শাহজালালের (র.) মাজার জিয়ারতের পর্ব সেরে সেখান থেকে শুরু করেন নির্বাচনি যাত্রা।

অপরদিকে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান তার নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১৫ আসনে জনসভার মধ্য দিয়ে প্রচার কার্যক্রমে নামেন।

এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জোট ও দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। এতে করে নিজ আসনে সময় দিতে পারছেন কম। এটিকেই সুযোগ হিসেবে নিয়ে হরদম প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন বিএনপির শফিকুল মিল্টন।

প্রচারে নেমে মিরপুর-কাফরুলকে বদলে দেওয়ার নানা অঙ্গীকার যেমন করছেন, তেমনি এলাকার যেকোনো কাজে যখনই দরকার তখনই তাকে বাসিন্দারা পাবেন বলে প্রচার চালাচ্ছেন।

মঙ্গলবার দিনভর এলাকায় চষে বেরিয়েছেন তিনি। তার জন্মস্থান ১৩ নম্বর ওয়ার্ড তথা পশ্চিম কাজিপাড়া থেকে মনিপুরের পুরো এলাকায় সকাল-বিকাল পালাক্রমে মানুষের কাছে যাচ্ছেন।

এ এলাকাকে ‘বিএনপির দুর্গ’ দাবি করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মিল্টন বলেন, এই ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে স্বাধীনতার পরে অনেক ‘খারাপ নির্বাচনেও’ বিএনপি কখনও হারেনি। বারবার জয়ী হয়েছে।

“এই ১৩ নম্বর ওয়ার্ডেই আমার জন্ম। ছোট থেকে এখানে আমি অনেক বছর ছিলাম, পরে বাবার চাকরির সুবাদে পল্লবীতে যাই।”

প্রচারে জামায়াত আমিরের অনুপস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে মিল্টনের ভাষ্য, “তো আমি যেখানেই যাচ্ছি, সবখানে আমাকে তারা বলছে, যেহেতু আপনি এলাকার ছেলে এবার আপনাকে ভোট দিব।“

ঢাকা-১৫ আসনে জনসংযোগে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। 

ঢাকা-১৫ আসনে জনসংযোগে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

ঘাটতি পূরণে কী করছে জামায়াত

জামায়াত আমির দলীয় প্রচারণার ফাঁকে ঢাকায় এলে প্রচারে নামছেন তার আসনে। বাকি সময় তার ‘প্রতিনিধি’ হয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা জনসংযোগ করছেন। এক্ষেত্রে তারা ছোট ছোট দল করে সারাদিন প্রচারণা চালাচ্ছেন বাসা-বাড়িতে গিয়ে। সন্ধ্যার পর চার ওয়ার্ডে পৃথক পৃথক মিছিল করছেন।

মিছিলের স্লোগানে তারা দাঁড়িপাল্লার পক্ষে আওয়াজ তুলছেন; গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর প্রচার করছেন।

এর বাইরে শরীফ ওসমান বিন হাদির বিচার ও আধিপত্যবাদবিরোদী জুলাই আন্দোলনের শ্লোগানের মাধ্যমে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখা।

আমিরের পক্ষে মূল ভোট টানার কৌশল দেখা গেছে নারীদের মাধ্যমে বাসায় গিয়ে প্রচারণা চালাতে। নারী ভোটারদের দাঁড়িপাল্লার পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন তারা।

জামায়াত আমির দক্ষিণের নির্বাচনি সফর শেষে ঢাকায় ফিরেছেন মঙ্গলবার রাতে। বুধবার দিনভর তাকে নিজ আসনে জনসংযোগে দেখা গেল। এদিন সকালে উত্তর কাফরুল এলাকা থেকে শুরু করেন প্রচার। বিকালে মনিপুর ও মিরপুর এলাকায় পথসভা করেন।

ফাঁকে ফাঁকে মসজিদে পড়ছেন নামাজ, কথা বলছেন স্থানীয়দের সঙ্গে চাইছেন ভোট।

মিরপুরে গণসংযোগ শেষে বক্তব্য রাখেন শফিকুর রহমান। বলেন, "আজ আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আমি গভীর দায়িত্ববোধ অনুভব করছি। কারণ মিরপুর শুধু ঢাকার একটি এলাকা নয়-মিরপুর হলো সংগ্রামের প্রতীক, সাহসের প্রতীক, প্রতিবাদের প্রতীক। এই মিরপুর জুলাই বিপ্লবের অন্যতম দুর্গ ছিল। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এই মিরপুরই আজ অবহেলা, দখলদারি, যানজট, জলাবদ্ধতা, অপরাধ আর অনিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। আপনারা আমাদের দায়িত্ব দিলে–সঠিক ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনা হবে।

“ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে। মনে রাখবেন, যাদের চাঁদা তোলার মানসিকতা রয়েছে, তারা ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চাইবে না। জামায়াতে ইসলামীকে আল্লাহ এই অভিশাপ থেকে মুক্ত রেখেছেন।“

নারীদের নিরাপত্তাকে রাজধানীর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, “ছিনতাই, মাদক, কিশোর গ্যাং–সব মিলিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ। আমরা নারীদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়বো, ইনশাআল্লাহ। ঘর থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, রাস্তাঘাট ও গণপরিবহন-সব জায়গায় নারীরা নিরাপদ থাকবে, ইনশাআল্লাহ।”

এ আসনে জামায়াতের নির্বাচনি প্রচারণার দায়িত্বে থাকা লসকর মো. তাসলিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমিরে জামায়াততো প্রথম থেকেই এখানে আসতেছেন। যখনই সুযোগ পান এলাকায় আসেন, আগামীতেও আসবেন। আর ওনার তো সারাদেশে দায়বদ্ধতা আছে, সেখানেও ওনার হক রয়েছে।

“আর এখানে ওনার প্রতিনিধি হিসেবে তো আমরা আছি, জামায়াতের প্রতিটা কর্মী ওনার প্রতিনিধি। সেই হিসেবে এলাকার জনগণ ওনার প্রতিনিধি, ওনাকে যারা ভোট দেবে সবাই ওনার প্রতিনিধি। সেই হিসেবে আশা করি তিনি আরও আসবেন, বিগত দিনেও আসছেন, আরও আসবেন। আর ওনার সকল ঘাটতিগুলো আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।”

ঢাকা-১৫ আসনে জনসংযোগে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। 

ঢাকা-১৫ আসনে জনসংযোগে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রচারণা

এ আসনে প্রচার চালানো নিয়ে সংঘাতের ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রিটার্নিং অফিসারের কাছ থেকে প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দিয়ে এসেছিল বিএনপির প্রার্থী ও জামায়াতের প্রার্থীর প্রতিনিধি।

ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের নারী কর্মীরা বাসায় বাসায় গিয়ে ভোটারদের আইডি কার্ড ও ‘বিকাশ নম্বর’ সংগ্রহ করছেন বলে অভিযোগ তুলেছিলেন শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

তিনি ২১ জানুয়ারি অভিযোগ করেন, “নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে একটি দল নারীদের বাসায় বাসায় পাঠিয়ে দেয়। ভিডিওতে দেখা গেছে নারীকর্মীরা এনআইডি আর বিকাশ নম্বর চাইছিল।

“এগুলো ব্যক্তিগত তথ্য। বাইরের কাউকে হস্তান্তরযোগ্য নয়। নারীকর্মীদের এসব জিজ্ঞেস করলে তারা ছুটোছুটি শুরু করেন। পরে তাদের নেতারা ২০, ২৫ জন নিয়ে এসে প্রশ্নকর্তাকে নাজেহাল করে।"

বিএনপি প্রার্থী সেদিন দাবি করেছিলেন, পীরেরবাগ, শেওড়াপাড়াতেও একই ঘটনা ঘটেছে।

তবে সেদিন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন জামায়াতের মুখপাত্র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। বলেছিলেন, "পুরোপুরি অসত্য তথ্য। তফসিল ঘোষণার পর সব প্রচার সামগ্রী আমরা অপসারণ করেছি, ইসির অপেক্ষা করিনি।

“অপপ্রচার চালিয়ে ১০ দলীয় ঐক্য বিনষ্টের চেষ্টা চালাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষপাতমূলক আচরণ হচ্ছে। ইসির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।"

তিনি বলেছিলেন, “একটি বিশেষ দল থেকে আমাদের নারী ভোটারদের উপর সন্ত্রাসী লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আশা করছি দ্বিতীয়বার যেন এমনটা না ঘটে।”

ওই ঘটনার সপ্তাহখানেক পর মঙ্গলবার এ আসনে গিয়ে সেই উত্তেজনা থিতিয়ে যাওয়ার দেখা মিলল। দল দুটির নেতাকর্মীদের সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে প্রচার চালাতে দেখা গেছে।

পথসভা করতে গিয়ে মিল্টন কথা বলেছেন জামায়াতের নারী কর্মীদের সঙ্গে যারা বিভিন্ন বাসায় প্রচারপত্র বিলি করতে ঢুকছিলেন। জামায়াতের তরফ থেকেও নতুন করে অভিযোগের কথা বলেননি কেউ।

ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের পক্ষে দলের নেতাকর্মীদের মিছিল। 

ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের পক্ষে দলের নেতাকর্মীদের মিছিল।

নারী ভোটার ঘিরে ছক 

এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৬ জন এবং নারী ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৮ জন। চারজন হিজড়া ভোটার রয়েছে। অর্থ্যাৎ নারী ভোটারের সংখ্যা ৪৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

ধানের শীষের প্রার্থী মিল্টন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই অঞ্চলে ৪০-৪১ বছর রাজনীতি করেছি। এখানে আমি আশা করি মহিলারা-আপনারা জানেন নারী ভোটার যারা-আমাদের দলের প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সারা বাংলাদেশের মহিলারা অনেক দুর্বল।

“তারপর মহিলারা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন। অত্র ঢাকা-১৫ আসনে নারী ভোটারদের সাথে আমার একাধিকবার কথা হয়েছে এবং সম্মেলনের মধ্য দিয়ে অনেক নারীদের সাথে কথা হয়েছে। তাদেরও একই বক্তব্য–আমরা এমন একজন প্রতিনিধি বানাবো, বানাতে চাই, যে প্রতিনিধিটা অন্ততপক্ষে নির্বাচনের পরে আমাদের সাথে তাদের দেখা হয়, সাক্ষাৎ হয়। আমি তাদের সাথে কথা বলতে পারবো, আমরা তাকে সবসময় পাব।”

জামায়াতের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি তাসলিম বলেন, “আসলে নারীদের ভোটতো প্রায় ৫০ শতাংশের উপরে। তো নারীদের ভোট, দেশ গঠনেও নারীদের সহযোগিতা লাগবে, সমর্থন লাগবে, সবকিছুর ক্ষেত্রেই নারীদের ভূমিকা আছে। 

“সবকিছু মিলিয়ে নারীদের ছাড়াতো কিছুই চিন্তা করা যাবে না। সেই হিসেবে নারীদের ভোট সংগ্রহের জন্য বা তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য আমরা মা-বোনদের যে অধিকার, সেই অধিকারের প্রতি আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।”

তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বলেও তিনি তুলে ধরেন।

নারীদের কাছে জামায়াত পৌঁছাচ্ছে কীভাবে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমাদের বোনেরা, নারী কর্মীরা তাদের ঘরে ঘরে যাচ্ছে, তাদের সাথে সাক্ষাৎ করছে।

“আমরাও তাদের সাথে যখন নারীদের সাথে দেখা হয়, আমরা দাওয়াত দেই দাড়িপাল্লার পক্ষে। আর আমাদের যারা নারী কর্মী আছে তারা ঘরে ঘরে যাচ্ছে।”

সামাজিক মাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা

মাঠের প্রচারণায় প্রকাশ্যে বিদ্রুপ ও নেতিবাচক প্রচারণার দেখা না মিললেও সামাজিক মাধ্যমে দুই দলের পক্ষেই যেন যুদ্ধে নেমেছেন তাদের সমর্থকরা।

প্রার্থীদের দুইজনের নিজস্ব পেইজের বাইরেও তাদের সমর্থনে আলাদা পেইজ এবং একাধিক গ্রুপ দেখা গেছে ফেইসবুকে। সেগুলোতে তাদের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিভিন্ন বিষয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চলছে।

জামায়াত আমিরের সমর্থনে তৈরি গ্রুপে মো. জোবায়ের আহাম্মেদ নামের একজন লেখেন, “বিএনপির চূড়ান্ত মনোনীত একজন প্রার্থী ঢাকা-১৫ আসনে নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র এইট পাস।

“এখানে প্রশ্ন উঠে আসে- এত বড় এবং পুরনো একটি রাজনৈতিক দলের কি সত্যিই যোগ্য ও শিক্ষিত কর্মীর এতটাই অভাব যে তাদেরকে একটি জাতীয় সংসদ আসনের জন্য এমন একজন প্রার্থীকে মনোনীত করতে হচ্ছে?”

ওই পোস্টে মিল্টনের নির্বাচনি হলফনামা শেয়ার করে বলা হয়, “বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, একটি সাধারণ সিকিউরিটির চাকরির ক্ষেত্রেও এর চেয়ে বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয়।”

অপরদিকে জামায়াত আমিরের বিরুদ্ধে ভোটার ‘মাইগ্রেট’ করার অভিযোগ তোলা হয় বিএনপি সমর্থকদের পোস্টগুলো থেকে।

ফেইসবুকে মো. আব্দুস সালাম নামে একজন লেখেন, “আমার ধারণা ঢাকা-১৫ তে শফিক সাহেব হারবেন। এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা। একজন সাবেক বাম তাদের আমির, এইটা শিবিরাগত নেতারা হজম করতে পারছেন না।”

সেখানে মাহাদি উল মোর্শেদ নামে একজন কমেন্ট করেন, “হারবে ভাই। মিল্টন ভাইকে অনেকে রিড করতে পারছে না।”

জাহিদুল ইসলাম নামে একজন কমেন্ট করেন, “ভোটার মাইগ্রেট করেও।” 

ঢাকা-১৫ আসনে জনসংযোগে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। 

ঢাকা-১৫ আসনে জনসংযোগে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

আশাবাদী দু’দলই 

মনিপুরের বর্ডার বাজারে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন বিএনপির এক কর্মী। যশোরের এ বাসিন্দা আওয়ামী লীগ আমলে ব্যবসা হারিয়ে মামলায় জর্জরিত ছিলেন। পরে মালয়েশিয়ায় চলে গিয়েছিলেন। ফিরে আসার পর গত তিন বছর ধরে থাকছেন এ এলাকায়।

আব্দুল আলীম নামের এই কর্মীর ভাষ্য, “সকাল থেকে ভোট চাইতে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছি। যেখানেই যাচ্ছি ভোট চাইতে হচ্ছে না। আগেই বলে দিচ্ছে, ভোটটা ধানের শীষেই দেবে।”

এমন বক্তব্যের বিপরীতে জয় নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কথা বললেন জামায়াতের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি সরোয়ার হোসেন। বলেন, “আমরা গ্রুপ গ্রুপ হয়ে সবার বাসায় বাসায় যাচ্ছি। সবার থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি।

“বিশেষ করে নারী ভোটাররা সৎ ও যোগ্য প্রার্থী হিসেবে আমিরে জামায়াতকে ভোট দিতে চাচ্ছেন। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে যাচ্ছি, তারাও ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছেন।”