২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

হরতাল: রামপালবিরোধীদের মিছিলে টিয়ার শেল, রাবার বুলেট

সুন্দরবনের কাছে বাগেরহাটের রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধের দাবিতে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আধাবেলা হরতালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশকে দেখা গেছে মারমুখী ভূমিকায়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 Jan 2017, 11:53 PM

Updated : 11 Oct 2022, 01:23 PM

পুরানো খবর:

রামপালবিরোধী হরতাল: পল্টনে যান চলাচল বন্ধ
রামপাল: ২৬ জানুয়ারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও হরতালের ডাক

শাহবাগ থানার সামনে ব‌্যারিকেড দিয়ে দফায় দফায় কাঁদুনে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়ে, জলকামান ব‌্যবহার করে বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল তারা ক‌্যাম্পাসের ভেতরেই আটকে রাখে হরতালের শেষ পর্যন্ত।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত উভয়পক্ষের মধ্যে অন্তত নয় দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের টিয়ারশেল, জলকামান ও রাবার বুলেটে ডজনখানেক নেতাকর্মী ও দুই সংবাদকর্মী আহত হন। একটি টেলিভিশনের দুই সাংবাদিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হন মারধরের শিকার।

প্রগতিশীল ছাত্র জোট অর্ধদিবস হরতাল কর্মসূচি শেষ করে চারুকলা অনুষদের সামনে সমাবেশের মধ্য দিয়ে। জোটের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল কবীর বলেন, আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করবেন তারা।

হরতালের সমর্থনে এদিন পল্টন, প্রেসক্লাব, মোহাম্মদপুর ও মিরপুর এলাকায় সকাল থেকে মিছিল চললেও ঢাকা বিশ্ববিদ‌্যালয় ছাড়া অন‌্য কোথাও বড় কোনো গোলাযোগের খবর পাওয়া যায়নি। রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে নগর পরিবহন ও ব‌্যক্তিগত যানবাহন চলছে স্বাভাবিক দিনের মতই।

সকাল ৬টার দিকে হরতালের শুরুতেই বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা টিএসসি মোড় থেকে হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনের রাস্তায় তারা পুলিশের বাধার মুখে পড়ে।

এক পর্যায়ে সেখানে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হলে পুলিশ পিছিয়ে যায়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশের একটি পিকআপ ভ‌্যানের কাচ ভাংচুর করে এবং পুলিশের দিকে ঢিল ছোড়ে।

আধা ঘণ্টা পর হরতালকারীরা মিছিল নিয়ে আবার শাহবাগের দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাসের শেল ছোড়ে। বাধা পেয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা চারুকলা অনুষদের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেন এবং সেখানে টায়ারে আগুন দিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন।

এরপর দুপুর পর্যন্ত যতবারই বিক্ষোভকারীরা শাহবাগের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, ততবারই পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে তাদের হটিয়ে দিয়েছে। কয়েক দফা ব‌্যবহার করা হয়েছে জল কামানও। জবাবে পুলিশের দিকে ঢিল ছুড়তে দেখা গেছে আন্দোলনকারীদের। 

ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তার ও সাধারণ সম্পাদক জি এম জিলানী শুভ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ‍ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নাঈমা খালেদ মনিকা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ইভা মজুমদারসহ বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ও বিভিন্ন বাম ছাত্রসংগঠনের দেড়শতাধিক নেতাকর্মীকে এই বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা যায়।

এক পর্যায়ে লাকী আক্তার রাবার বুলেটে আহত হলে তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা মহানগরের সভাপতি অনিক রায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান।

প্রগতিশীল ছাত্র জোটের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল কবীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ দফায় দফায় টিয়ার শেল ছুড়েছে, রাবার বুলেট ছুড়েছে।”

শাহবাগ থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিক্ষোভ মিছিল করে তারা শাহবাগের দিকে আসতে চাইলে পুলিশ বাধা দিয়েছে। থানার সামানে আমাদের ব‌্যারিকেড আছে।”

কয়েক দফা টিয়ারশেল ছোড়া হয়েছে স্বীকার করলেও রাবার বুলেটের বিষয়ে কোনো কথা বলেননি ওসি।

তিনি বলেন, “বিক্ষোভকারীদের শাহবাগ মোড়ে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। আশপাশে কয়েকটি হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। এ কারণেই পুলিশ বাধা দিয়েছে।

এদিকে কাঁদুনে গ‌্যাস থেকে বাঁচতে আন্দোলনকারীরা চারুকলা অনুষদের ভেতরে অবস্থান নিলে সকাল পৌনে ১০টার দিকে সেখানেও টিয়ার শেল ছোড়ে পুলিশ।

চারুকলার ড্রইং ও পেইন্টিং বিভাগের শিক্ষার্থী জয় প্রকাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অন্তত ৬টা শেল মেরেছে ভেতরে। শিক্ষার্থীরা ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে গ‌্যাস থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে।”

এ সময় চারুকলার লাগোয়া বিশ্ববিদ‌্যালয় কর্মচারীদের একটি ঘরের ওপর একটি টিয়ারশেল এসে পড়লে ওই ঘরে থাকা দেড় বছরের একটি শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে।

শিশুটির বাবা মোহাম্মদ সোলায়মান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঘরের ভেতরে আমার বউ ছিল আর বাচ্চা ছিল। গ‌্যাসে বাচ্চার অবস্থা খারাপ।”

চারুকলার ছাত্রছাত্রীরা শিশুটিকে শুশ্রূষা দিচ্ছেন বলে জানান সোলায়মান।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ‌্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আমজাদ আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি শুনেছি চারুকলার ভেতরেও পুলিশের টিয়ার শেল পড়েছে। আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমস‌্যা হয় এমন কিছু যাতে তারা না করে।”

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমান শাহবাগ এলাকায় সাংবাদিকদের বলেন, “এ এলাকার আশপাশে হাসপাতাল আছে, গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো স্থাপনা আছে। জনদুর্ভোগ এড়াতেই পুলিশ থানার সামনে বিক্ষোভকারীদের বাধা দিয়েছে। তারা যখন পুলিশের দিকে ঢিল ছুড়েছে তখনই টিয়ার শেল ব‌্যবহার করা হয়েছে।”

হরতালের একেবারে শেষ দিকে কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে ধরে পিটুনি দেয় পুলিশ। তাদের কয়েকজনকে টেনে হিঁচড়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

ওই ঘটনা ভিডিও করতে গিয়ে শাহবাগ থানার ফটকে পুলিশের মারধরের শিকার হন এটিএন নিউজের প্রতিবেদক এহসান বিন দিদার ও ক্যামেরা পারসন আব্দুল আলীম। পরে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হরতাল চলাকালে পুলিশের টিয়ার শেল মাথায় লেগে কালের কণ্ঠের চিফ ফটোগ্রাফার শেখ হাসান এবং বিক্ষোভকারীদের ছোড়া ঢিলে ঢাকা ট্রিবিউনের আলোকচিত্রী মোহাম্মদ হোসেন অপুও আহত হন।

ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি লাকী ছাড়াও ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির, ছাত্রফন্টের নাসির উদ্দিন প্রিন্স, ছাত্র ইউনিয়নের জয় বণিক, আজিজুল হক কনক, লাবনী মণ্ডল, সৈয়দ ফরহাদ এবং মিজানুর রহমান আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

এছাড়া ছাত্র ইউনিয়ন কলা ভবনের সাংগঠনিক সম্পাদক হাসিব মাহমুদ আশিক, মিজান, মাহতাব, তপু ও জুয়েলকে পুলিশ আটক করে।  

গত ২৬ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ থেকে ২৬ জানুয়ারি ঢাকা মহানগরীতে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতালের এই কর্মসূচি ঘোষণা করে তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটি।

বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায় ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ চলছে। সুন্দরবনের কাছে হওয়ার কারণ দেখিয়ে শুরু থেকেই এ কেন্দ্রটির বিরোধিতা করছে বাম দলগুলো।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের পরিবেশ-প্রতিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তবে সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন বক্তব্যে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বলেছেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না।

তেল-গ্যাস খনিজ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি শুরু থেকেই এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনে রয়েছে। তাদের এবারের হরতালে বিএনপিও সমর্থন দেয়।