বড় বাজার জাপানে রপ্তানি বাড়াতে নতুন উদ্যোগ, এবার সাফল্য আসবে?
জাপানে রপ্তানি বাড়াতে নতুন করে ১০০ কারখানাকে নির্বাচিত করা হয়েছে; আগের ১৭২টি কারখানার পাশপাশি এই ১০০টি কারখানাও জাপানে পোশাক রপ্তানি করবে।
জাপানের ২৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাকের বিশাল বাজার ধরতে এবার সুদূরপ্রসারী কৌশল নিয়েছেন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পমালিক ও রপ্তানিকারকরা।
দীর্ঘ এক বছর ধরে দুই দেশের নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও ক্রেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার পর তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ চালু করেছে ‘জাপান ডেস্ক’।
গত বুধবার ঢাকার উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ডেস্কের উদ্বোধন করা হয়। বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি এই ডেস্কের উদ্বোধন করেন। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানসহ পোশাক শিল্পমালিকরাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
জাপানি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিতে এই ডেস্ক ‘ওয়ান-স্টপ প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে কাজ করবে।
এছাড়া জাপানে রপ্তানি বাড়াতে নতুন করে ১০০ কারখানাকে নির্বাচিত করা হয়েছে। আগের ১৭২টি কারখানার পাশপাশি এই ১০০টি কারখানাও জাপানে পোশাক রপ্তানি করবে।
এই ২৭২টি কারখানা জাপানের বাজারের জন্য ‘ডেডিকেটেড বা সংরক্ষিত’ থাকবে। এই কারখানাগুলোর বাইরে অন্য কোনো কারখানা জাপানে পোশাক রপ্তানি করতে পারবে না।
এছাড়া বাংলাদেশ থেকে আমদানি সহজ ও মসৃণ করতে জাপানের ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এই পরিকল্পনায়।
জাপানে রপ্তানি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে জাপানের সঙ্গে কৌশলগত বাজার উন্নয়ন নামে একটি কমিটি গঠন করা হয় এক বছর আগে। ওই কমিটি দুই দেশের নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও আমদানি-রপ্তানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত বিরতিতে বৈঠক করেছে। দুই দেশের বাজার সম্প্রসারণে সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমাধানের কৌশল নিয়ে একমত হয়েছে।
এর অংশ হিসেবেই সব মিলিয়ে ২৭২টি কারখানাকে নির্বাচিত করা হয়। এই কারখানাগুলো জাপানি ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের (যেমন- ইউনিক্লো, মুজি, জিইউ, শিমামুরা) চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে পোশাক তৈরি করবে।
এই কারখানাগুলো তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী অন্য দেশেও পোশাক রপ্তানি করতে পারবে। তবে জাপানের বাজারের জন্য তৈরি পোশাকের গুণগতমানসহ আলাদা কিছু নির্দেশনা থাকবে, যেগুলো পূরণ করার পরই কেবল জাপানে পোশাক রপ্তানি করা যাবে। আর এসব কাজ তদারকি করবে ‘জাপান ডেস্ক’।
জাপানে রপ্তানি বাড়াতে বিজিএমইএর উদ্যোগে এক বছর আগে ‘কৌশলগত বাজার উন্নয়ন’ নামে যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেই কমিটির সমন্বয়কারী ছিলেন বিজিএমইএর পরিচালক ও বাংলা পোশাক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সোহেল।
জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাপানে আমাদের পোশাক রপ্তানি একই জায়গায় আটকে আছে। কোনো বছর বাড়লেও অল্প কিছু বাড়ছে। বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যের ঘোলাটে পরিস্থিতিতে আমরা জাপানের বাজারে আমাদের রপ্তানি বাড়াতে চাই। সেজন্য গত এক বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করে এখন একটা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েছি। এই পরিকল্পনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আমরা বিজিএমইএতে ‘জাপান ডেস্ক’ চালু করেছি।
“এখানে একটা বিষয় আমি বলতে চাই, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দেশে রপ্তানি বাড়াতে বিজিএমইএতে আলাদা ‘ডেস্ক’ খোলা হয়েছে। জাপান কিন্তু অন্য দেশ থেকে আলাদা। জাপানের ক্রেতারা পোশাাকের গুণগতমান বা কোয়ালিটিকে খুবই গুরুত্ব দেয়। প্রতিটি পোশাক দেখে দেখে নেয়। তাদের কাছে স্ট্যান্ডার্ডই বড়; দাম বেশি হলেও আপত্তি নেই।”
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা সাজানোর কথা তুলে ধরে সোহেল বলেন, “জাপানে তৈরি পোশাকের বাজার ২৫ বিলিয়ন ডলারের। এই বাজারে আমরা ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের মত রপ্তানি করি। এটা আমরা ৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে চাই; এটাই আমাদের টার্গেট। তবে কবে ওই লক্ষ্যে পৌঁছাব, তা সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলছি না।
“আমরা বলতে চাই—কেবল শুরু করলাম। আস্তে আস্তেই এগোতে চাই। তবে এটা বলতে পারি, দুদেশের মধ্যস্থতায় নতুন যে উদ্যোগ আমরা নিয়েছি, সে উদ্যোগের অংশ হিসেবে আমরা যদি জাপানের ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করতে পারি, তাহলে ৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য ছুঁতে খুব বেশিদিন লাগবে বলে মনে হয় না।”
জাপানে রপ্তানি বাড়াতে নতুন আর কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে মোহাম্মদ সোহেল বলেন, আগের ১৭২টি কারখানার সঙ্গে যে ১০০ কারখানাকে জাপানে পোশাক রপ্তানির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে, নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে তাদের ওরিয়েন্টেশন দেওয়া হয়েছে।
“সবাইকে বলা হয়েছে, আমরা জাপানের মার্কেট ভালোভাবে ধরতে চাই। সেজন্য তাদের ক্রেতাদের পছন্দমত পোশাক তৈরি করতে হবে। কোয়ালিটিতে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না। প্রত্যেক কারখানা বা গ্রুপকে দেশের ভাবমূর্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পোশাক তৈরি ও রপ্তানি করতে হবে।”
বড় বাজার জাপানে রপ্তানি বাড়েনি কেন?
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও আরেক বড় বাজার জাপানে মোটেই ভালো করতে পারছে না। রপ্তানির অংক প্রায় এক যুগ ধরে এক থেকে দেড় বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই আটকে আছে।
এমনকি জাপানের সঙ্গে বহুল প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) পরও রপ্তানি বাড়ছে না; উল্টো কমছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-অগাস্ট) জাপানে ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ কম। ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের এই দুই মাসে ২৬ কোটি ৪৬ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-অগাস্টে জাপারে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২২ কোটি ৭২ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে আয়ের অংক ছিল ২২ কোটি ৪২ লাখ ডলার; সেই হিসেবে বেড়েছে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপানে ১৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ কম। আর নির্ধারিত লক্ষমাত্রার চেয়ে কম ১৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
এর মধ্যে ১১৬ কোটি ডলারই এসেছিল তৈরি পোশাক থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপান থেকে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ১৪১ কোটি ১৬ লাখ ডলার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে জাপানে পণ্য রপ্তানি থেকে সবচেয়ে বেশি বিদেশি মুদ্রা এসেছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে। ওই আর্থিক বছরে জাপানে ১৪৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ।
বিভিন্ন সময়ে সরকার ও রপ্তানিকারকদের পক্ষ থেকে জাপানে রপ্তানি বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্খিত সুফল পাওয়া যায়নি। অথচ এই বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকেরই চাহিদা ২৫ বিলিয়ন ডলারের মত। এই চাহিদার মাত্র ৫ শতাংশের মত রপ্তানি করতে পারেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা।
গত বছরের মে মাসে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জাপান সফর করেন; সে সময় জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি বড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এর ধারাবাহিকতায় জাতীয় নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করে বাংলাদেশ।
কোনো দেশের সঙ্গে এটাই বাংলাদেশের প্রথম অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি। এই চুক্তির ফলে জাপানের বাজারে ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তারপরও দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে না। অথচ দেশ হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঋণ-সহায়তা আসে এই জাপান থেকেই।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর প্রশাসক ও নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সত্যি কথা বলতে কী, আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর দিকে যতটা নজর দিয়েছি, বড় মার্কেট হওয়ার পরও জাপানের দিকে তেমন মনোযোগ দিইনি।
“এতে সরকারের দিক থেকে যেমন ব্যর্থতা আছে, আমাদের রপ্তানিকারকদের দিক থেকেও ব্যর্থতা আছে। সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে জাপানে আমাদের রপ্তানি অবশ্যই বাড়ত; সেটা ৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছাত হয়ত; কিন্তু দেড় বিলিয়ন ডলারও ছাড়াতে পারিনি।”
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির পরও রপ্তানি বাড়ছে না কেন, সেই প্রশ্নে প্লামি ফ্যাশনস এবং জেসিস নিটওয়্যারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক বলেন, “ইপিএ এর ফলে খুব বেশি লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না। কেননা, জাপানে আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য হচ্ছে তৈরি পোশাক। এই তৈরি পোশাকে আমরা আগে থেকেই শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছি। তবে এই চুক্তির পোশাক খাতে ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ একটা বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে।”
তবে ঘরে বসে থাকলে রপ্তানি বাড়বে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বড় মার্কেট হওয়ার পরও কেন এতদিন রপ্তানি বাড়েনি, কোথায় ভুল ছিল, সেটা উদঘাটন করে নতুন পরিকল্পনা সাজিয়ে এই বাজার ধরতে হবে।”
ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাপানে আমাদের রপ্তানি পণ্যের ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে। নতুন নতুন প্রোডাক্ট সংযোজন করতে হবে। যেমন—জাপানে প্রচৃর স্পোর্টস আইটেমের চাহিদা রয়েছে; আমাদের সেগুলো রপ্তানি করতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকায় আমরা যে সব পোশাক রপ্তানি করি সেগুলো দিয়ে জাপান মার্কেটে সুবিধা করা যাবে না।
“অনেকে বলে থাকেন, জাপানিরা বেশি দামের পোশাক ব্যবহার করে থাকেন; এটা ঠিক নয়। তারা এখন কম দামি পোশাকও কিনে থাকেন। মোদ্দা কথা হচ্ছে, তাদের চাহিদা ও পছন্দের পোশাক রপ্তানি করতে হবে। তাহলে রপ্তানি বাড়বে।”
তিনি বলেন, “জাপানের ফ্যাশন অগ্রগামী এবং মান সচেতন বাজার যদি আমরা ধরতে পারি, তাহলে আমাদের জন্য নতুন পথ খুলে দিতে পারে।”
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, একটি নির্দিষ্ট খাত বা প্রচলিত কয়েকটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে গুরুত্ব দিচ্ছে বিজিএমইএ। জাপানের বাজার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য সম্ভাবনাময়। সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতেই ‘জাপান ডেস্ক’ চালু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের ভৌগোলিক দূরত্ব বেশি। ফলে জাপানি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে সময় বেশি লাগে। ‘লিড টাইম’ বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
“পরিবহন ব্যয় কমানো এবং দ্রুত পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে জাপান সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। পাশাপাশি কয়েকটি প্রচলিত বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বাজার ও পণ্যের বহুমুখীকরণ জরুরি।”
