ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের জায়গা নিচ্ছে চীন?
ইইউতে জুলাই-অগাস্টে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সেখানে অন্য কোনো দেশের রপ্তানি এতটা কমেনি।
ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে চীনকে প্রায় ধরে ফেলেছিল বাংলাদেশ। ২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ২০২৫ সালের জানুয়ারি-এপ্রিলে ৮০৭ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ, যা ছিল এর আগের একই সময়ের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি।
চীন ওই চার মাসে ইউরোপের এ বাজারে ৮৩৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল। প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২১ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। চলতি বছর অগাস্টে এসে সেই চিত্র পাল্টে গেছে। এখন সেখানে চীনের পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে; তবে কমছে বাংলাদেশের।
শনিবার প্রকাশিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অফিসের (ইউরোস্ট্যাট) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অগাস্ট আট মাসে ইউরোপের বাজারে ১ হাজার ১৯২ কোটি ৮০ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা। এ অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কম।
ইইউতে অন্য কোনো দেশের রপ্তানি এতটা কমেনি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ১২ শতাংশ কমেছে শ্রীলঙ্কার; ১১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ কমেছে তুরস্কের।
ভারত ও পাকিস্তানের কমেছে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৮৪ ও ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। কম্বোডিয়ার কমেছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়েছে ভিয়েতনামের। আর চীনের বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-অগাস্ট সময়ে চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ৬ হাজার ২৮ কোটি ৯৩ লাখ (৬০.২৯ বিলিয়ন) ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে ইইউর ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ কম।
ইইউতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এটা হয়েছে মূলত ট্রাম্প শুল্কের কারণে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক রপ্তানি বাণিজ্যের গতিধারা পাল্টে দিচ্ছে। উচ্চ শুল্ক এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ক্রমেই ইউরোপমুখী হয়ে উঠছে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশ চীন। দেশটি সুদূর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সেখানে পোশাক রপ্তানি বাড়াচ্ছে। এর প্রভাবে সেখানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমছে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীন প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। তাদের রয়েছে নিজস্ব কাঁচামাল, লিড টাইমের সুবিধা। লিড টাইম হচ্ছে রপ্তানি আদেশ পাওয়ার পর ক্রেতার হাতে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত সময়। বেশি উৎপাদনশীলতার সুবিধায় রপ্তানি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে চীন।
ইউরোপের বাজারে চীনের রপ্তানি বাড়ার বিষয়টিকে উদ্বেগের বলছেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা। তারা মনে করেন, ইইউ জোটে আগামীতে চীনের রপ্তানি আরও বাড়তে পারে, বিপরীতে কমতে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক; মোট রপ্তানির আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে।
একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি বিদেশি মুদ্রা আসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে। পোশাক রপ্তানি থেকে মোট যে আয় আসে, তার ২০ শতাংশের মত আসে সেখান থেকে। অন্যদিকে জোটগত ভাবে ইউরোপের বাজারগুলো থেকে আসে ৬০ শতাংশের মত।
ইইউর বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সব সময়ই চীনের আধিপত্য। চলতি বছরের জানুয়ারি-অগাস্ট সময়ে দেশটি ১ হাজার ৯৭১ কোটি ৩৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে এই আট মাসে ভিয়েতনাম ইউরোপের বাজারে ৩০০ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে; বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
এই তথ্য বলছে, সামগ্রিকভাবে ইইউর ব্যবসায়ীরা তৈরি পোশাক কেনা কমালেও চীন ও ভিয়েতনাম থেকে বাড়িয়েছেন।
অন্যদিকে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-অগাস্টে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৫৩৯ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।
ইউরোপে রপ্তানি কমার কারণ
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমার বিষয়ে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিন কারণে ইইউতে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমছে। এক. বাজারটিতে ভোক্তা পর্যায়ে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমেছে। দুই. চীন ইইউতে আগ্রাসী বিপণন করে ক্রয়াদেশ নিচ্ছে। তিন. ভারতের সঙ্গে এফটিএ হওয়ায় ইইউ অনেক ক্রেতা দেশটিতে ক্রয়াদেশ সরাচ্ছে।
“ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানিতে ধস নেমেছে। সেটা পুষিয়ে নিতে তারা এখন ইউরোপে রপ্তানি বাড়াতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। সরকারও সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে। তার সুফলই পাচ্ছে চীন।”
ইউরোস্ট্যাটের তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-অগাস্ট) চীন ইইউর বাজারে ৯৯ কোটি ৪৪ লাখ ৬০ হাজার কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে এ আট মাসে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার কেজি পোশাক, যা গত বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ কম।
ইইউতে চীনের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে মূলত তৈরি পোশাকের দামে। চলতি বছরের জানুয়ারি-অগাস্টে চীন ইউরোপের বাজারে প্রতি কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ১৯ দশমিক ৮২ ইউরোতে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ প্রতি কেজি রপ্তানি করেছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে, যা কিনা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।
যদিও তুরস্ক, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার রপ্তানি করা প্রতি কেজি তৈরি পোশাকের দাম বেড়েছে। ভারতের কমেছে ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মূলত পোশাকের দাম কমার কারণেই ইউরোপের বাজারে আমাদের রপ্তানি কমেছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ আগের তুলনায় কিছুটা কম পোশাক রপ্তানি করছে, পাশাপাশি প্রতি কেজি পোশাকের বিপরীতে আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে কমছে।”
‘তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই পতনের গতি কিছুটা কমেছে’ তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছিল। সাত মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি-জুলাই সময়ে কমেছিল ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ কম। জানুয়ারি-অগাস্টে কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
“এই তথ্যই বলছে, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।”
