মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়: ইরান যুদ্ধ ও ট্রাম্পের শুল্কনীতি রুখতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা?
ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের নতুন আইন পাসের পরিকল্পনা আটকে দিতে পারবে এবং বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবে, কিন্তু প্রেসিডেন্টের ভিটো বাতিল করার মতো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ৩ নভেম্বরের এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। আগামী জানুয়ারি থেকে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যাবে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং তদন্ত চালানোর সুযোগ পাবে বিরোধী শিবির।
বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলোর উপর শুল্ক চাপানো, অভিবাসন এমনকি ভিসা নীতিতে কড়াকড়ি নিয়েও ট্রাম্পকে চাপে ফেলতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। আগামী ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা তদন্ত কমিটি গঠন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের হিসাব চাওয়ার সুযোগ পাবে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেই যে প্রেসিডেন্টের সমস্ত সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়া যাবে তা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের হাতে এখনও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা থাকবে। ফলে ট্রাম্পকে সরাসরি ঠেকানো সহজ হবে না।
কারণ, সেনেটে কোনও বিল পাস করাতে সাধারণত ৬০ ভোট প্রয়োজন হয়। ডেমোক্র্যাটদের হাতে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে না। তাছাড়া কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনও বিলে প্রেসিডেন্ট ভিটো দিতে পারেন। সেটি অগ্রাহ্য করতে হলে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন।
ইরান যুদ্ধ:
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের যে ভূমিকা ছিল, ট্রাম্প তা স্বীকার করেছেন। ফক্স নিউজে টেলিফোনে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমি মনে করি এর একটা অংশ ছিল ইরান (যুদ্ধ), তবে একইসঙ্গে মানুষ এও বুঝতে পেরেছে যে, ইরানের বিষয়ে আমি যা করেছি তার গুরুত্ব কতটা ছিল'।"
মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে ভোটারদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা রিপাবলিকানদের প্রত্যাখ্যান করার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। ডেমোক্র্যাটরা জীবনযাত্রার খরচ কমানো এবং দেশের অভ্যন্তরীন খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির ওপর জোরাল প্রচার চালিয়ে ভোটারদের এই ক্ষোভকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়েছে।
কংগ্রেসের কোনও অনুমোদন ছাড়াই গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন ট্রাম্প। তিনি এখনও সামরিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখলেও, নতুন কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারেন।
আগামী ১১ ডিসেম্বর বর্তমান সরকারি বাজেট বিলের মেয়াদ শেষ হলে আইনপ্রণেতারা নতুন সামরিক তহবিল বরাদ্দ দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। যুদ্ধের তহবিল বন্ধ হয়ে গেলে ট্রাম্পের পক্ষে ইরানের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযান চালানো অসম্ভব হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে ৪৭০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ হয়েছে বলে পেন্টাগনের তথ্য উল্লেখ করে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এর আগে জুন মাসে দুই কক্ষেই ট্রাম্পকে সামরিক অভিযান বন্ধের নির্দেশ দিয়ে প্রস্তাব পাস হয়েছিল।
কিন্তু হোয়াইট হাউজ সেই প্রস্তাবকে অসাংবিধানিক এবং বাধ্যতামূলক নয় বলে দাবি করে। এবার যুদ্ধের জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা।
তবে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক জেমস বয়েজের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনা থাকা অবস্থায় কংগ্রেসের পক্ষে সামরিক তহবিল বন্ধ করা খুবই জটিল এবং রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। এই পরিস্থিতির কারণে মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদপ্তর পেন্টাগনের হাতে আগে থেকে থাকা অর্থ দিয়ে অবশ্য সামরিক অভিযান চলতে পারে। ফলে সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
তাছাড়া, বিশ্লেষকেরা এও বলেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে 'ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন' (যুদ্ধ ক্ষমতা আইন) সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। ১৯৭৩ সালের এই ফেডারেল আইন ব্যবহার করার পূর্ববর্তী সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে অথবা অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
যুদ্ধ ক্ষমতা আইন অনুযায়ী, একজন প্রেসিডেন্ট দেশের ওপর যে কোনও আসন্ন বা তাৎক্ষণিক হামলা প্রতিহত করতে পারেন, তবে কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা না করলে সেই সামরিক অভিযান ৬০ দিনের মধ্যে অবশ্যই শেষ করতে হবে। কংগ্রেস বাধা দিলে প্রেসিডেন্ট তার ওপর ভিটো দিতে পারেন, যা বাতিল করা সহজ হবে না।
কারণ, ভিটো বাতিল করতে যে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, নতুন নির্বাচিত কংগ্রেসের সম্ভাব্য আসন বণ্টনের চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ডেমোক্র্যাটরা সেই বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে অনেক কম আসন পাচ্ছে।
আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের ইউসিডি ক্লিনটন ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক স্কট লুকাস বলেছেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় কংগ্রেসের হাত কিছুটা বাঁধা থাকলেও, তারা এমন কিছু রিপাবলিকানের সঙ্গে মিলে নতুন আইন প্রস্তাব করতে পারে, যারা এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষ দেখার পর ট্রাম্পের কাছ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে চাইছেন।
উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, “ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন এবং শুরু থেকেই তিনি এটি করে আসছেন।” গত সপ্তাহে, শান্তি আলোচনা আবার শুরুর চেষ্টায় এবং পরবর্তী হামলা এড়াতে ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তা প্রধানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
লুকাস প্রশ্ন করেন, “তিনি কি এখন যুদ্ধ শেষ করতে আরও বেশি জোরালো চাপ দেবেন?”
তবে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক জেমস বয়েজের মতে, ট্রাম্পকে যেহেতু আর পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে না, কারণ- সংবিধান অনুযায়ী দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে তাকে ক্ষমতা ছাড়তেই হবে—তাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উল্টো মনে করতে পারেন যে, বিশ্বমঞ্চে যে কোনও শাস্তি বা জবাবদিহিতার তোয়াক্কা না করে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তিনি এখন পুরোপুরি স্বাধীন।
অর্থাৎ, মূলত দেশের ভেতরে নিজের দুর্বল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে, ট্রাম্প পশ্চিম এশিয়ায় তার নীতির পরিধি আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন।
শুল্ক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য:
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে গত বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায় ৯০টি দেশের ওপর ১০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন।
বিশ্ববাজারকে ওলটপালট করে দেওয়া তার এই সিদ্ধান্ত গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সেই রায় পাশ কাটিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন বিকল্প আইনি পথ বা কৌশল খুঁজে বের করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের ৬-৩ ভোটের রায়ের মাত্র কয়েকদিন পর, ট্রাম্প তার শুল্কনীতির পক্ষে অবস্থান আরও শক্ত করেন। তিনি ভিন্ন একটি আইনের ধারার ভিত্তিতে দ্রুত একটি নতুন নির্বাহী আদেশে সই করেন এবং শুল্কের হার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেন।
তবে কংগ্রেসের মাধ্যমে মেয়াদ বাড়ানো না হলে, এই শুল্কগুলোর সময়সীমা সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সংকট আরও শোচনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে (ট্যারিফ) দায়ী করেছে। কারণ, এই শুল্কের বোঝা শেষ পর্যন্ত মার্কিনিদের ওপরেই পড়ে এবং তারা সেই বাড়তি খরচ সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়। তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে 'আমেরিকান জনগণের পকেট কাটার' অভিযোগ করেছে।
ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মার্কিন কংগ্রেস এমন কিছু বিশেষ ছাড়ের জন্য চাপ দিতে পারে, যা রপ্তানিকারকদের সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি দেবে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতিতে বড় ধরনের কোনও আমূল বা স্থায়ী পরিবর্তন দেখতে হলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং হোয়াইট হাউজের নতুন প্রেসিডেন্টের আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
জেমস বয়েজ বলেছেন, “শুল্কের বিষয়টি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের আদালতগুলোতে বিবেচনাধীন রয়েছে” এবং সরকারের ইতোমধ্যে আদায় করা শুল্কের অর্থ ব্যবসায়ীদেরকে ফেরত দিতে হবে কি না—এবং ঠিক কত টাকা ফেরত দিতে হবে—তা নিয়ে এখনও বিতর্ক ও আইনি বিরোধ চলছে।
দলের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন (রিপাবলিকান থেকে ডেমোক্র্যাট) হওয়ার পরও যে একটি বিষয়ে কংগ্রেস তার আগের ধারা বজায় রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে, তা হল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের প্রবেশাধিকারের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা।
চীনের প্রযুক্তিগত উত্থান ঠেকানোর ক্ষেত্রে মার্কিন রাজনীতিতে কোনও মতভেদ নেই। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলেও তারা ট্রাম্প প্রশাসনের চীন-বিরোধী প্রযুক্তি নীতি বজায় রাখবে এবং আরও কঠোর করবে।
'রিমোট অ্যাক্সেস সিকিউরিটি অ্যাক্ট' (দূরবর্তী প্রবেশাধিকার সুরক্ষা আইন) এর আওতায় আগে কেবল যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি চিপ বা সফটওয়্যার সরাসরি চীনে রপ্তানি করায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু এখন এই নতুন আইনের মাধ্যমে ক্লাউড বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে দূর থেকে মার্কিন সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি ব্যবহার করার পথও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
তাছাড়া, চিপ সিকিউরিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে উন্নত এআই চিপগুলো যেন কোনও তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ঘুরে বা অবৈধ উপায়ে চীনের মতো কোনও 'বিদেশি শত্রু' দেশের হাতে চলে না যায়, সেজন্য কোম্পানিগুলোকে কড়া নজরদারি ও চিপের অবস্থান নিশ্চিত করতে বাধ্য করা হতে পারে।
অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ:
আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের ইউসিডি ক্লিনটন ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক স্কট লুকাস বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের একটি অন্যতম বড় ফল বা প্রভাব হল, ডেমোক্র্যাটরা এখন কংগ্রেসের সব কমিটির সভাপতি বা চেয়ারম্যানের পদ পাবে। এই কমিটিগুলোর যে কোনও বিষয় নিয়ে তদন্ত শুরু করার এবং তদন্তের প্রয়োজনে যে কোনও সাক্ষীকে তলব করার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে।
ফলে ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিবারের বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ভূমিকা নিবিড় তদন্ত ও পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে। এমনকী তারা এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন করার চেষ্টাও করতে পারে।
কংগ্রেস ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধেও ব্যাপক তদন্ত শুরু করতে পারে। তাদের সেই পরিকল্পনাও রয়েছে। ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান ও বিতর্কিত কর্মসূচি হল অভিবাসী ও শরণার্থীদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা এখন ট্রাম্পের এই অভিবাসন নীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ ও তদন্ত করার আইনি সুযোগ পেয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসীদের খুঁজে বের করে বিতাড়িত করতে মার্কিন কর বিভাগ এর গোপন ট্যাক্স ডেটা এবং স্বরাষ্ট্র বা অভ্যন্তরীন নিরাপত্তা বিভাগ এর গোয়েন্দা তথ্য যৌথভাবে ব্যবহার করছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। কর বিভাগের গোপন তথ্য এভাবে অভিবাসী তাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা আইনসম্মত কি না, ডেমোক্র্যাটরা তা খতিয়ে দেখতে চায়।
সেক্ষেত্রে তারা তলব করার ক্ষমতা (সাবপিনা পাওয়ার) ব্যবহার করতে পারে। এটি কংগ্রেসের এমন এক বিশেষ ক্ষমতা, যার মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের যেকোনো শীর্ষ কর্মকর্তা, গোপন নথি বা ফাইল জোর করে কংগ্রেসের সামনে হাজির করতে বাধ্য করতে পারে।
কেউ এই নির্দেশ অমান্য করলে তা আদালত অবমাননার শামিল হয়। ডেমোক্র্যাটরা এই ক্ষমতার জোরে ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির নেপথ্যের সব গোপন নথিপত্র জনসমক্ষে নিয়ে আসতে চায়। ট্রাম্পের অভিবাসী বিতাড়ন নীতিকে আইনি ও প্রশাসনিকভাবে কোণঠাসা করতে ডেমোক্র্যাটরা কর বিভাগ ও নিরাপত্তা বিভাগের মধ্যকার গোপন আঁতাত তদন্ত করা এবং ট্রাম্পের কর্মকর্তাদের কংগ্রেসে জবাবদিহি করতে বাধ্য করতে পারে।
ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি ক্ষমতায় আসলে রেকর্ড সংখ্যক অবৈধ অভিবাসীকে আমেরিকা থেকে তাড়িয়ে দেবেন। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য তার প্রশাসন বিমানবন্দরগুলোতে কড়াকড়ি শুরু করে, সন্দেহভাজনদের আটকে রাখে এবং তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া বা আদালতের শুনানি দ্রুত শেষ করার ব্যবস্থা নেয়।
ট্রাম্পের এই কঠোর পদক্ষেপ সাধারণ মার্কিনিদের একটি বড় অংশই পছন্দ করেনি। 'ফক্স নিউজ'-এর নিজস্ব জরিপেই উঠে এসেছে যে, অর্ধেকেরও বেশি (৫৩ শতাংশ) ভোটার মনে করছেন ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসীদের ওপর যে মাত্রায় দমনপীড়ন চালাচ্ছে, তা সীমার বাইরে চলে গেছে।
ট্রাম্পের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের দাবি, তারা যাদের বিমানবন্দরে আটকে রেখেছে, তাদের বেশিরভাগই (৭০ শতাংশ) অপরাধী। তবে এই ৭০% সংখ্যার মধ্যে এমন মানুষও আছেন, যাদের বিরুদ্ধে কেবল অভিযোগ উঠেছে কিন্তু এখনও অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।
সমালোচকরা বলছেন, এভাবে সবাইকে অপরাধী বলা ভুল এবং বেআইনি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও বিচার ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হল—যতক্ষণ না আদালতে কোনও মানুষের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ শতভাগ প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ আইনের চোখে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর, ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি রিপাবলিকান দলের ভেতর যারা ট্রাম্পের উগ্র নীতির বিরোধী তারা একসঙ্গে কাজ করার একটি ক্ষেত্র তৈরি করতে পেরেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি রাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনগুলোর বহু নিজস্ব ক্ষমতা থাকে। ডেমোক্র্যাট ও ট্রাম্পবিরোধী রিপাবলিকানরা এখন ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ওপর নির্ভর না করে সরাসরি এই স্থানীয় ও রাজ্য সরকারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে পারবে।
ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি বা বিতর্কিত সব নীতির কারণে সমাজে এবং অর্থনীতিতে যে ক্ষতি বা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে তারা স্থানীয় প্রশাসনগুলোকে উদ্বুদ্ধ করতে পারবে। যেমন: স্থানীয় পর্যায় থেকে যুদ্ধবিরোধী জনমত গড়ে তোলা, কর কমানোর বিকল্প ব্যবস্থা করা কিংবা অভিবাসীদের সুরক্ষায় স্থানীয় আইন তৈরি করা।
